ফিচার I গ্ল্যাম গেম্বলিং
সাজের সান্নিধ্য, কখনো কম, কখনো বেশি। ঠিক মন যেমন চায়। যদিও সময় এখন সফট গ্ল্যামের, তবু মিইয়ে যায়নি ফুল গ্ল্যামের আবেদন
হালকা কিংবা গাঢ়, সাজের পুরোটাই ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য। নিত্যনৈমিত্তে হালকা মেকআপে সন্তুষ্টি আর বিশেষ দিনে চাই বিশেষ মেকআপ লুক। এখানেই বাধে সফট বনাম ফুল গ্ল্যামের বিতর্ক।
সফট গ্ল্যাম
পরিবর্তন নয়, পরিবর্ধন। অকৃত্রিম সৌন্দর্যকে ম্রিয়মাণ রাখা হয় সফট গ্ল্যাম মেকআপ লুকে। যিনি যেমন, তিনি যেন তেমনভাবেই সবচেয়ে সুন্দর। স্নিগ্ধ সাদরে আমন্ত্রিত হয় স্বাভাবিক স্বকীয়তা। সমাদৃত হয় ত্বক। বদলে ফেলা নয়; বরং বৈভবের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে মেকআপের সফট গ্ল্যাম ধারা। সূক্ষ্ম ও পরিপাটি উপায়ে ফুটিয়ে তোলা হয় চোখ, নাক, গাল আর ঠোঁট। স্পষ্ট করে তোলে মুখের বৈশিষ্ট্যগুলো। নাটকীয় নয় একেবারেই। হুট করে চোখে পড়ে না মেকআপের পরত। এতটাই মসৃণ।
মোহনীয় মৃদুময়
গ্ল্যামের মূল সম্পর্ক ত্বকের সঙ্গে। কারণ, ত্বকের পৃষ্ঠেই দৃশ্যমান হয় সাজ। তাই আসল কাজও সেখানেই। ফাউন্ডেশন আর কনসিলারের লেয়ারে ডুবে না গিয়ে ত্বকের স্বাভাবিকত্ব ধারণ করে সফট গ্ল্যাম। হালকা হয় বেজ। অল্প ফাউন্ডেশন আর হাতের সুকৌশলে মসৃণ করে তোলা হয় ত্বক। ফাউন্ডেশন ছাড়াও বিবি বা সিসি ক্রিমও থাকতে পারে সফট গ্ল্যামে। ত্বকের ক্ষুদ্র অসংগতিগুলো ঢেকে দেওয়ার প্রয়াস। তবে নিখুঁত দেখানোর চেষ্টা থাকে না। আর ত্বক সুন্দর হলে শুধু পাউডারেই চালিয়ে নেওয়া যায় বেজের কাজ।
সফট গ্ল্যামে সাধারণত নিউট্রাল রাখা হয় আইশ্যাডো। গাঢ় রঙের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় হালকা রং। চোখ সাজে নরম আলো-ছায়ায়। যেন সুন্দর চোখে আরও একটু সৌন্দর্য ঢেলে দেওয়ার প্রয়াস। ত্বকের সঙ্গে মিলিয়ে ব্রাউন, টোপ, হালকা গোলাপি অথবা কমলা রঙের আইশ্যাডো ব্লেন্ড করা হয় চোখের পাতায়। সাধারণত একটি, বেশি হলে দুটি শ্যাডো ব্যবহার করলেই সই। হতে পারে ম্যাট কিংবা শাইনি। যেন সুন্দর চোখে আরেকটু সৌন্দর্য ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা। আইলাইনার দেওয়া না দেওয়া ব্যক্তিগত ইচ্ছা। দিলেও হালকা। অদৃশ্য নয়; আবার বোল্ডও নয়। চিকন আইলাইনার ব্রাশ দিয়ে স্মাজ করে নিলে ন্যাচারাল দেখায়। মাসকারায় স্পষ্ট করে তোলা হয় পাপড়িগুলো। চোখের স্বাভাবিক গড়ন বোঝাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ। নিচের ল্যাশ লাইনে সাদা লাইনার ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে আরও খুলে যায় চোখগুলো। বড় দেখায়। ভ্রু যুগলেও থাকবে না ভারিক্কি। এমনিতেই ক্লিন লুক দেয় প্লাক করা ভ্রু। বাড়তি আঁকার প্রয়োজন পড়ে না। তবে হালকা হলে এঁকে নেওয়া যেতে পারে ব্রাউন ভ্রু পেনসিল দিয়ে।
গোলাপির নানা শেডের ব্লাশ ব্যবহার করা হয় গালে। অস্বাভাবিক দেখানো যাবে না, এমনভাবে। ব্রাশ দিয়ে হালকা হাতে। চিকবোনের ওপরে। হাসলে যেন আভা ছড়ায়। সফট গ্ল্যামে নানা রকম হতে পারে ঠোঁট। কখনো নজর কাড়বে, কখনোবা মিলেমিশে যাবে বাকি মেকআপের সঙ্গে। গ্লসি বা ম্যাট অথবা ন্যুড বা ডিপ, জুতসই লিপস্টিকেই পূর্ণতা পায় এই ধারার মেকআপ। দেখাতে পারে শিশিরভেজা কাচের মতো ডিউয়ি অথবা সিল্ক স্যাটিন কাপড়ের মতো মসৃণ।
দ্যুতিময় যেন
সবটাই নাটকীয়তা। নজর কাড়ার কৌশল। ফুল গ্ল্যামের ভাষ্য হচ্ছে সাজের শিখরে পৌঁছানোর চেষ্টা; যাকে বলে গ্ল্যামার। এ ধারায় চেহারার গড়ন নিয়ে চলে আঁকিবুঁকি খেলা। অল্প কিংবা বেশি, মুখের আদলে বদল আনা। তৈরি হয় স্টেটমেন্ট লুক। বেশ ড্রামাটিক হয় এ ধারার মেকআপ লুক। লোকের ভিড়েও আলাদা করে চোখে পড়ে ফুল গ্ল্যাম।
ফুল গ্ল্যামের আসল কাজ ত্বকের সব অসংগতি ঢেকে দেওয়া। ফুল-কভারেজ ফাউন্ডেশনে ত্বক হয়ে ওঠে মসৃণ। যেন এক নিখুঁত ক্যানভাস। তবে সামনা-সামনি স্পষ্ট হয়ে ওঠে ত্বকের ওপর ফাউন্ডেশনের পরত। কনট্যুর দিয়ে বেসের ওপর ছায়া আঁকা হয় এই ধারার সাজে। হাইলাইট করা হয় গাল, নাক এবং চোখের আশপাশ। যেন কাটছাঁট দেখায় মুখের গড়ন। হেভি সেটিং আর বেকিং কায়দায় সূক্ষ্ম ও ধারালো দেখায় মুখমণ্ডল।
আইশ্যাডো প্যালেটে থাকা সবচেয়ে রঙিন ও উজ্জ্বল শ্যাডোগুলোর ব্যবহার হয় ফুল গ্ল্যাম লুকে। ভিন্ন ভিন্ন রঙের শেড একসঙ্গে ব্লেন্ড করা হয়। যেন আলো-ছায়ার খেলা। গাঢ় রঙের শ্যাডো দিয়ে ডিফাইন করা হয় চোখের ক্রিজ। চোখের ইনার ও আউটার কর্নারে প্রাধান্য পায় ব্রাউন শ্যাডো ব্লেন্ড। মাঝামাঝি গ্লিটার বা শিমার যোগে চোখ হয়ে ওঠে ঝলমলে। বোল্ড-ড্রামাটিক আইলাইনার আর ডিপ-ডার্ক মাসকারা। থাকতে পারে ফলস ল্যাশ। মেটালিক, স্মোকি আই, কাট ক্রিস, হলো আই, অমব্রে আই লুকও দেখা যায় ফুল গ্ল্যামে। হাতের নিখুঁত আঁচড়ে আঁকা হয় ভ্রু। দেওয়া হয় পারফেক্ট শেপ। স্পষ্ট ভ্রুতে সংজ্ঞায়িত হয় মুখের গড়ন।
গাঢ় কনট্যুরের ওপর জুতসই ব্লাশ ব্যবহার করা হয় গালে। একটু বেশি, যেন স্পষ্ট দেখায়। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে ইচ্ছেমতো রঙের ব্লাশে সেজে ওঠে গাল। নাকে আর থুতনিতেও ব্লাশ দেন অনেকে। ঠোঁটের ব্যাপারে অনেকটাই সদয় ফুল গ্ল্যাম। উজ্জ্বল লাল, বেগুনি, বাদামি, কমলা, ম্যাজেন্টা কিংবা হালকা কোনো রং, চোখের সঙ্গে মিলিয়ে যা মানায়, তা-ই জায়গা পেতে পারে ঠোঁটে।
নমনীয় বনাম নাটকীয়তা
যত কম, ততই ভালো—মিনিমালিস্ট এই চেতনা ছুঁয়েছে মেকআপের জগৎও। অনেক দিন ধরে ট্রেন্ডে আছে ক্লিন গার্ল অ্যাসথেটিকস। পরিপাটি কিন্তু এমন সাজ, যা দেখাবে সম্পূর্ণ এফোর্টলেস। স্বাস্থ্যোজ্জ্বল, লাবণ্যময় দেখাবে ত্বক। আর হালকা মেকআপেই বাজিমাত। সফট গ্ল্যামের অংশ হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এই ট্রেন্ড। তা ছাড়া প্রতিদিনের উপযোগী সাজ হিসেবেও করা হয় সফট গ্ল্যামের চর্চা।
তবে কম মেকআপ মানেই কম সাজ, তা নয়। সফট গ্ল্যামের নমনীয়তা বিশেষ দিনেও মানানসই। এমনকি বিয়ের কনেরাও আজকাল মেকআপের নিচে চেহারা ঢেকে ফেলার পক্ষে নেই। সাজবেন কিন্তু চেনা যাবে না—এমন নয়, আজকাল এ কথা যেন নীতিবাক্য হয়ে উঠেছে। দিনের আলোতে অতিরিক্ত মনে হতে পারে ফুল গ্ল্যামের ভারী কনট্যুর, অতিরিক্ত হাইলাইট বা গাঢ় ফাউন্ডেশন। তাই ডে-ইভেন্ট, আউটডোর ফটোশুট বা ব্রাঞ্চে যাওয়ার সময় সফট গ্ল্যামই জুতসই। অন্যদিকে ফুল গ্ল্যাম ক্যামেরা-ফ্রেন্ডলি। সামনা-সামনি বেশি দেখালেও ক্যামেরায় পাওয়া যায় পারফেক্ট লুক। তা ছাড়া ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বা স্টেজ লাইট মেকআপকে ফিকে করে দিতে পারে। তাই সন্ধ্যার অনুষ্ঠান, রেড কার্পেট বা ইনডোর লাইটিংয়ে সুন্দর দেখায় ফুল গ্ল্যাম।
গ্ল্যাম বিতর্কে মাথায় রাখা যেতে পারে মুখের গড়ন এবং ত্বকের ধরনও। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বস্তি। সন্ধি ঘটায় সাজ। ভেতর ও বাইরের। আত্মপ্রকাশের অস্ত্র যেন। সফট হোক কিংবা ফুল—নিজেকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করাটাই জরুরি।
বিউটি ডেস্ক
মডেল: অ্যান্নি ও অদিতি
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
