ফিচার I গ্লিচি গ্ল্যাম
নিখুঁত সিমেট্রির নিয়ম ভেঙে কনট্রাস্ট, ব্যক্তিত্ব আর সৃজনশীলতাকেই উদ্যাপন করছে। যেখানে পারফেক্ট হওয়ার চাপ নেই; আছে নিজস্বতার সাহসী প্রকাশ। লিখেছেন শিরিন অন্যা
বছর কয়েক ধরে ‘ক্লিন গার্ল’ ট্রেন্ড সৌন্দর্যজগতে প্রভাব বিস্তার করলেও সম্প্রতি সেই অতিরিক্ত নিখুঁততার আবরণে ধীরে ধীরে ফাটল ধরতে শুরু করেছে। নব্বইয়ের দশকের রেট্রো এসথেটিকস, ইন্ডি স্লিজ আর টাম্বলারকোর নস্টালজিক আবেশ আবার ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে জায়গা করে নিচ্ছে ‘টায়ার্ড গার্ল’ মেকআপ ও ডার্ক রোমান্টিক ধাঁচ। এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে পিন্টারেস্টের বার্ষিক পূর্বাভাস প্রতিবেদন পিন্টারেস্ট প্রেডিক্টস; যেখানে ২০২৬ সালের নতুন সৌন্দর্য ট্রেন্ড হিসেবে উঠে এসেছে ‘গ্লিচি গ্ল্যাম’।
পিন্টারেস্টের তথ্য বলছে, ফ্যাশনপ্রেমীদের মনজুড়ে এখন ইচ্ছাকৃত অসামঞ্জস্যের প্রতি নতুন আকর্ষণ। অদ্ভুত মেকআপ লুক, দুই হাতে ভিন্ন রঙের নখ কিংবা অ্যাসিমেট্রিক লব হেয়ারকাটের মতো ধারণাগুলোর খোঁজ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে ফ্যাশন প্ল্যাটফর্ম হু হোয়াট ওয়্যারের মতে, ২০২৬ সালে সৌন্দর্যের মূল চাবিকাঠি এই সচেতন অসম্পূর্ণতা, যেখানে আভাঁ-গার্দ মেকআপ, মিস-ম্যাচড নেইল আর অসমান চুলের স্টাইলের প্রতি আগ্রহ কয়েক গুণ বেড়েছে।
মিস-ম্যাচড মেনিকিউর
চলতি বছর নখের সাজে যে পরিবর্তন সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো, তা হলো পরিকল্পিত অসামঞ্জস্যের আত্মবিশ্বাসী ব্যবহার। একরকম নখ, নিখুঁত ম্যাচিং বা পরিমিত মিনিমালিজমের যুগ পেরিয়ে, নেইল আর্ট এখন অনেক বেশি ব্যক্তিগত। দুই হাতে ভিন্ন ভিন্ন রং, প্রতিটি আঙুলে আলাদা নকশা কিংবা এক হাতে সম্পূর্ণ অন্য রকম মুড—এই ভাঙাচোরা সৌন্দর্যই গ্লিচি গ্ল্যামের প্রাণ। আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে নখ শুধু সাজের অংশ নয়; নিজেকে প্রকাশের ছোট্ট অথচ শক্তিশালী মাধ্যমও। কোথাও গ্লসি আর ম্যাট ফিনিশের মিশ্রণ, কোথাও উজ্জ্বল পপ রঙের সঙ্গে সফট নিউট্রালের সংঘর্ষ। কেউ বেছে নিচ্ছেন মিনিমাল লাইন আর ডট। কেউ আবার সাহসী ব্রাশস্ট্রোক। রঙের প্রলেপে নখকে রীতিমতো ক্ষুদ্র ক্যানভাসে রূপ দেওয়া হচ্ছে যেন।
টু টোনড লিপস্টিক
ঠোঁটের সাজে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে রঙের ব্যবহারে। এক শেডে সীমাবদ্ধ থাকার ধারণা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। তার জায়গা নিচ্ছে দুই রঙের লিপস্টিক। যেখানে কনট্রাস্টই মূল আকর্ষণ। কয়েক বছর আগে চেরি কোলা লুক জনপ্রিয় হলেও এখন সেই ভাবনাকে আরও বোল্ড পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঠোঁটের এক পাশ বা এক কোণে ভিন্ন শেড, আবার কখনো একই রঙের দুটি টোন একসঙ্গে ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে গভীরতা আর ডাইমেনশন। এই ট্রেন্ডে ব্লেন্ডিং নিখুঁত হওয়া লক্ষ্য নয়; বরং রঙের আলাদা উপস্থিতিই লুককে আলাদা করে তোলে। কখনো ডিপ ব্রাউন আর কোমল ক্যারামেলের মেলবন্ধন, কখনো উজ্জ্বল নিয়ন পিংকের সঙ্গে সফট রোজ শেড। এই খেলায় ঠোঁট হয়ে উঠছে একেবারে নতুন ধরনের ক্যানভাস। মেকআপ আর্টিস্টরা লিপস্টিককে আর শুধুই ফিনিশিং টাচ হিসেবে দেখছেন না; বরং এটি এখন পুরো লুকের স্টেটমেন্ট।
অ্যাসিমেট্রিক হেয়ার কালার
গ্লিচি গ্ল্যাম ট্রেন্ডে শামিল হওয়ার আরেকটি উপায় চুলে পরিকল্পিত অসমতা। সমানভাবে রং করা, নিখুঁত হাইলাইট বা ব্যালান্সড ওমব্রে—এই পরিচিত স্টাইলগুলো এবার একটু পাশে সরে যাচ্ছে। তার বদলে দেখা যাচ্ছে অ্যাসিমেট্রিক হেয়ার কালার, যেখানে চুলের এক অংশ অন্য অংশের চেয়ে স্পষ্টভাবে আলাদা। কখনো কপালের এক পাশ জুড়ে উজ্জ্বল ফ্রিঞ্জ, কখনো পুরো চুল নিউট্রাল রেখে শুধু শেষ অংশে হালকা পার্পল বা নীলের ছোঁয়া। আবার কেউ বেছে নিচ্ছেন হাই-কনট্রাস্ট লুক—এক পাশে প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড, অন্য পাশে গাঢ় রং। এই অসমান রঙের খেলায় চুল হয়ে উঠছে ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন, ঠিক যেমনটা ফ্যাশনের রানওয়েতে দেখা যায়। অনেকে আবার চুলের ওপরের অংশ বা হেড ক্রাউন অংশে আলাদা রং বা হালকা ব্যান্ড তৈরি করে থাকেন, যেন মাথায় একটি ছোট আলোকিত রিং বসানো আছে। স্প্যানিশ গায়িকা রোজালিয়ার স্টেজ লুক থেকে এই আইডিয়া জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। নিজ পছন্দ ও ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী বেছে নেওয়া যেতে পারে স্টাইল।
স্টেটমেন্ট আই মেকআপ
যেকোনো ধরনের মেকআপের কেন্দ্রে চোখ। নরম ব্লাশ বা গ্লোয়ি স্কিনের চেয়ে আজকাল চোখের সাজেই বেশি নজর দিচ্ছেন ফ্যাশনপ্রেমীরা। কেননা চোখের মেকআপের একটু এদিক-সেদিক পুরো লুক বদলে দিতে পারে। রঙিন পিগমেন্ট, গ্লিটার, ক্রিস্টাল আর গ্রাফিক লাইনের মিশ্রণে চোখের মেকআপে ফিরছে আর্টিস্টিক এক্সপেরিমেন্ট। উইংড লাইনারের বদলে দেখা যাচ্ছে ভাঙা লাইন, ডাবল স্ট্রোক, এমনকি অসমান কার্ভ, যা প্রথম দেখায় এলোমেলো মনে হলেও আসলে খুবই ভাবনাচিন্তায় তৈরি। দুই রঙের আইশ্যাডো একসঙ্গে ব্যবহারে চোখে তৈরি করা হচ্ছে ডেপথ; আবার কখনো শুধু একটি চোখে অতিরঞ্জন, অন্য চোখে সামান্য সাজ।
গ্লিচি গ্ল্যাম শুধু এই কয়েকটি বিউটি এলিমেন্টের সমষ্টি নয়; এটি একটি পরিপূর্ণ ভিজ্যুয়াল মেন্টালিটির অংশ। এই ট্রেন্ডে সৌন্দর্য আর নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করে না; বরং ইচ্ছাকৃত অসমতা, ভাঙা ফিনিশ আর অপ্রত্যাশিত কনট্রাস্টই হয়ে ওঠে মূল আকর্ষণ। নিখুঁতভাবে ব্লেন্ড করা মেকআপের বদলে এখানে দেখা যায় লেয়ার্ড টেক্সচার, গ্লসি ও ম্যাটের মুখোমুখি অবস্থান, কিংবা এমন স্কিন ফিনিশ, যা দেখতে খানিকটা ‘অসমাপ্ত’ মনে হয়। এই অনিয়মই গ্লিচি গ্ল্যামের ভিজ্যুয়াল উত্তেজনা তৈরি করে, যেখানে সৌন্দর্য আর নিয়ম মানে না; বরং অনুভূতিকে অনুসরণ করে।
গ্লিচি গ্ল্যাম ট্রেন্ডকে বলা চলে একধরনের মেকআপ প্লে মাইন্ডসেট। শুধুই নিখুঁত হওয়ার চেয়ে, এখন মানুষ চাইছে মেকআপকে আনন্দের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে। রং, আকার, লাইন ও টেক্সচারের সঙ্গে খেলা; বিশেষ করে এডিটরিয়াল লুকগুলো ২০২৬ সালে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চোখ, ঠোঁট বা নখের ওপর শুধু সাজ করার বদলে, মেকআপকে এক্সপ্রেসিভ আর্টের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও হালকা রঙের বিস্ফোরণ, কোথাও সৃজনশীলভাবে ভাঙা লাইন, আবার কোথাও সামান্য অসমতা; সবকিছু মিলিয়ে এই ট্রেন্ডকে বানাচ্ছে সাহসী, রঙিন এবং ব্যক্তিত্বে ভরা এক্সপেরিমেন্টাল লুক, যা শহুরে তরুণ প্রজন্মের মাঝে বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
অ্যাকসেসরি ও সামগ্রিক স্টাইলিংয়েও গ্লিচি গ্ল্যাম একই দর্শন অনুসরণ করে। মুখের এক পাশে মাত্র একটি জুয়েল, অসমান ইয়ার কাফ কিংবা চুলে হঠাৎ বসানো একটি স্টেটমেন্ট ক্লিপ; সবকিছুতেই থাকে পরিকল্পিত এলোমেলো ভাব। এই ট্রেন্ডের কেন্দ্রে রয়েছে আত্মবিশ্বাস—নিজেকে ঠিক করার চেষ্টা নয়; বরং নিজের অসম্পূর্ণতা আর অনিশ্চয়তাকেই স্টাইলের অংশ করে নেওয়া। ২০২৬ সালের গ্লিচি গ্ল্যামে সৌন্দর্য আর নিখুঁত হওয়ার প্রতিযোগিতা নেই। সুন্দরতা এখানে সরল। আনকোরা। সহজাত।
মডেল: আনসা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
