ফিচার I পুষ্পপ্রাণিত খাদ্যচর্চা
খাবারের পদে কখনো সরাসরি ব্যবহার, কখনো আবার খাদ্যের আকৃতি কিংবা পরিবেশনায় ফুলের পানে হাত বাড়ানো থেমে নেই শিল্পপ্রেমী ভোজনরসিকদের। বসন্তের এই লগনে ফ্লাওয়ার থিমড ফুড কালচারের মাথাচাড়া মোটেই বাড়াবাড়ি নয় কিন্তু; বরং সময়ের দাবি
কথায় আছে, আগে দর্শনদারি পরে গুণবিচারি। বিষয়টা তা-ই বলা চলে; কেননা, খাবারের সঙ্গে মানুষের প্রথম যোগাযোগ চোখের মাধ্যমে। উৎসব, অনুষ্ঠান কিংবা ডিনারের টেবিল—সবারই প্রচেষ্টা থাকে একটু পরিপাটি, নান্দনিক রূপে খাবার পরিবেশনের। খাবারের স্বাদ যত গুরুত্বপূর্ণ, পরিবেশনও ততটা প্রভাবশালী। সেই পরিবেশনা যখন ফুল বা ফুলেল নকশাযুক্ত হয়, তা শুধু ভোজনে সীমাবদ্ধ থাকে না; হয়ে ওঠে একধরনের অনুভবের বিষয়। পরিবেশনে পুষ্পযোগ মানুষের চোখ, মন ও স্মৃতির ওপর একসঙ্গে প্রভাব ফেলে; যা খাবারকে আরও আকর্ষণীয় ও স্মরণীয় করে তোলে। ফুলের রং, পাপড়ির নকশা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থালায় যুক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে মনে-মননে আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরভাবে সাজানো খাবার মানুষের মস্তিষ্ক দীর্ঘদিন মনে রাখে; যাকে বলে ভিজ্যুয়াল টেস্ট পারসেপশন। ফুল এই দৃষ্টিনন্দনের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। খাবার যেহেতু সভ্যতার একটি বিশেষ ভাষা, তা যখন ফুলের মতো রং, সৌরভ এবং আকার-আকৃতিতে প্রকাশ পায়, তখন খাদ্যপদ হয়ে ওঠে শিল্পকর্ম।
ভোজ্য ফুল, ফুলের শেপে পরিবেশন এবং ফ্লাওয়ার প্লেটিং—এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ফ্লাওয়ার থিমড ফুড কালচার। আজ একে ইনস্টাগ্রাম-ট্রেন্ড মনে হলেও বাস্তবে ফুল দিয়ে খাবার সাজানো এবং রান্নার ইতিহাস মানবসভ্যতার সমান পুরোনো! কেননা, ফুল আদতে হাজার বছর ধরে মানুষের সংস্কৃতি, উৎসব ও আবেগের অংশ হয়ে আছে।
ইতিহাস ও সভ্যতার বাঁকে
প্রাচীন মিসরে নীলপদ্ম ছিল পবিত্রতার প্রতীক। রাজকীয় ভোজে পদ্মপ্রাণিত পানীয় পরিবেশন করা হতো। রোমান সভ্যতায় গোলাপ রান্নার চল ছিল স্বাদবর্ধক হিসেবে। গোলাপজল শুধু খাবারে নয়, ফোয়ারা আর স্নানঘরেও ব্যবহৃত হতো মানুষকে সতেজ রাখতে। চীনা সভ্যতায় চন্দ্রমল্লিকার চা দীর্ঘায়ু ও মানসিক প্রশান্তির প্রতীক ছিল। এই সভ্যতাগুলোতে ফুল মানে শুধু সৌন্দর্য নয়; স্বাস্থ্য, আধ্যাত্মিকতা ও ক্ষমতার চিহ্নও বহন করত।
ভারতীয় উপমহাদেশে ফুল মানেই উৎসব, পূজা ও প্রসাদ। মোগল আমলে গোলাপজল, কেওড়া জল রাজকীয় রান্নার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। বাংলায় কলাফুলের তরকারি, পালং বা কুমড়ো ফুলের ভাজা ইত্যাদি কালীপূজা ও দুর্গাপূজার ভোগ হয়ে এখনো ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এই উপমহাদেশে ফুল শুধু খাদ্যে সৌন্দর্যবর্ধক উপাদান নয়; শুভ সূচনা আর পবিত্রতার প্রতীকও।
জাপানের হানামি উৎসব সমগ্র বিশ্বে ফুলেল পরিবেশনার খাবারের এক অনন্য উদাহরণ। চেরি ফুল ফোটার এই মৌসুমে ফুল সংরক্ষণ করে তৈরি হয় সাকুরা মোচি, সাকুরা চা, সাকুরা রাইস। জাপানিরা চেরি ফুলকে সাকুরা বলে ডাকে। এই ফুল তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; বিশেষত খাবারের পরিবেশনায়, তৈরিতে, পোশাকে, গৃহসজ্জায়—সর্বত্র চেরি ফুলের প্রভাব সর্বাধিক। তা ছাড়া সাকুরা মৌসুমে বানানো খাবারগুলো জীবনের অনিত্যতা ও সৌন্দর্যের দর্শন বহন করে; তাই উৎসবটি জাপানিদের জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপের ইতিহাসে; বিশেষ করে প্রাচীন গ্রিক, রোমান, মধ্যযুগ ও ভিক্টোরিয়ান যুগে খাবারে ফুলের ব্যবহার প্রচলিত ছিল; যেখানে ফুল সৌন্দর্য, সুগন্ধ এবং ঔষধি গুণের জন্য মিষ্টি, পানীয়, স্যালাদ ও প্রধান খাবারে ব্যবহার করা হতো। গোলাপ, ভায়োলেট, ল্যাভেন্ডার, ড্যান্ডেলিয়ন ও ন্যাস্টারশিয়ামের মতো ফুলগুলো স্যুপ থেকে ডেজার্ট পর্যন্ত বিভিন্ন পদে যুক্ত করা হতো, যা আজকের রন্ধনশিল্পে আবার জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ইউরোপে মধ্যযুগ থেকে ল্যাভেন্ডার বিস্কুট, ভায়োলেট ক্যান্ডি, এল্ডারফ্লাওয়ার কর্ডিয়াল ছিল অভিজাত সংস্কৃতির অংশ। মধ্যপ্রাচ্যে রোজ ওয়াটার এবং অরেঞ্জ ব্লসম ওয়াটার ডেজার্ট ও মিষ্টান্নে সুবাস আর আধ্যাত্মিক প্রশান্তি যোগ করে চলেছে এখনো।
ভোজ্য ফুল: সৌন্দর্য ও সতর্কতা
গোলাপ, জবা, ল্যাভেন্ডার, অপরাজিতা, লাইলাক, প্যানসি, ন্যাস্টারশিয়ামের মতো ফুলগুলো খাবারে ব্যবহৃত হলেও সব ফুল কিন্তু ভোজ্য নয়। আজালিয়া, ড্যাফোডিল, উইস্টেরিয়ার মতো ফুলগুলো আবার বিষাক্ত। তাই ভোজ্য ফুল বাছাইয়ে সঠিক জ্ঞান ও সতর্কতা অপরিহার্য।
থালায় শিল্প
ভোজ্য ফুলের খাদ্যপদের পাশাপাশি পরিবেশনের সময় খাবার ফুলের আকারে কাটা ও সাজানো একটি গুরুত্বপূর্ণ নান্দনিক ধারা। কয়েকটিতে নজর বোলানো যাক:
মাছের ফুলেল পরিবেশন
ফিশ ফিলে পেঁচিয়ে গোলাপের শেপ
বৃত্তাকারে সাজানো পদ্ম-স্টাইল প্লেটিং
কারির ওপর ধনেপাতা ও সবজি দিয়ে ফুলের মোটিফ।
মাংসের পদে ফুলের নকশা
পাতলা স্লাইস করা চিকেন বা ল্যাম্ব দিয়ে রোজেট শেপ
সস ও গ্রেভি দিয়ে পাপড়ির মতো ডিজাইন
স্টাফড মাংসে ফুলের কাট।
সবজি ও ভাতের ফুলেল শিল্প
গাজর, বিটরুট, শসা খোদাই করে ফুল
টমেটোর খোসা দিয়ে গোলাপ
পোলাও, বিরিয়ানিতে বাদাম-কিশমিশ দিয়ে ফুলের নকশা।
খেয়াল রাখা চাই, খাদ্যপদের ফুলেল পরিবেশনায় শুধু চোখের তৃপ্তি নয়; বরং খাবারের প্রতি সম্মান ও যত্নের প্রকাশও গুরুত্ববহ।
বিখ্যাত শেফের হাতে ফুলের শিল্প
প্রখ্যাত ফরাসি শেফ অ্যালাঁ দুকাস তার রান্নায় ল্যাভেন্ডার, ভায়োলেট ও প্যানসি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, ফুল শুধু সাজ নয়, স্বাদেরও অংশ হতে পারে। ডেনমার্কের স্বনামধন্য শেফ রেনে রেজেপি বুনো ফুল, ঘাস ও মৌসুমি পাপড়ি দিয়ে প্লেটে প্রকৃতির গল্প বলেন সব সময়। তার থালা যেন একটি নরডিক অরণ্য! অন্যদিকে, গোলাপ, জুঁই এবং অন্যান্য ফুলের শেপ প্লেটিং ব্যবহার করে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক শিল্পকে একত্র করেছেন সে দেশের প্রখ্যাত শেফ গগন আনন্দ।
আধুনিক সময় ও টেকসই ভাবনা
ফ্লাওয়ার থিমড ফুড এখন শুধু বিলাসিতা নয়; ভোজ্য ফুলের চাষ একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব, পুষ্টিকর ও টেকসই। ফাইন ডাইনিং থেকে হোম কুকিং—সবখানে ফুলের ফিরে আসা ভবিষ্যতের খাদ্যসংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়। কোনো মাছের ফিলেতে যখন গোলাপ ফুটে ওঠে কিংবা ভাতের থালায় পদ্মের নকশা আঁকা হয়, তখন তা শুধু খাবার থাকে না; হয়ে ওঠে স্মৃতি, শিল্প ও সংস্কৃতির গল্প। মানুষের থালায়, উৎসবে ও অনুভূতিতে ছড়িয়ে পড়ে ফুলের সৌরভ।
নাঈমা তাসনিম
ছবি: ইন্টারনেট
