skip to Main Content

সুলুকসন্ধান I খাবার টিনজাত যেভাবে শুরু

ক্যানড ফুড। বিশেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্যের টেকসইতা বাড়ানোর উপায়। কারও কাছে বিলাসী, কারও কাছে আবার দারুণ দরকারি

সৃষ্টির শুরু থেকে ক্ষুধা শুধু উদরপূর্তি নয়; সভ্যতার গতি নির্ধারণ, যুদ্ধের ভাগ্যবদল, এমনকি আবিষ্কারের পথ প্রদর্শনেও ভূমিকা রেখেছে। শিকারের পর রান্না শেষে অতিরিক্ত যে মাংস থাকত আদিম মানুষের কাছে, তা কয়েক দিনের মধ্যে পচে যেত। কৃষি যুগে ফসল ঘরে উঠলেও সেই সমস্যা থেকে রেহাই মেলেনি। কেননা, সব খাবার একসঙ্গে খাওয়া সম্ভব নয়; অন্যদিকে প্রকৃতিও অপেক্ষা করে না মানুষের জন্য!
এই সমস্যার সমাধানে মানুষ কখনো খাবারে লবণ মিশিয়েছে, কখনো রোদে শুকিয়েছে, কখনো আগুনের ধোঁয়ায় ঝুলিয়ে রেখেছে। এসব পদ্ধতি খাবারকে কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী করলেও স্বাদ, গন্ধ আর পুষ্টিগুণ অনেকটা নষ্ট হতো। তা ছাড়া দীর্ঘদিন সতেজ ও খাওয়ার উপযোগী থাকত না। মানুষের মনে তাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেত—খাবার কি এমনভাবে সংরক্ষণ করা যায়, যাতে সময় তাকে ছুঁতে না পারে? এই প্রশ্নের উত্তরই একদিন জন্ম দেয় ক্যানড ফুড বা টিনজাত খাবারের; যা খাদ্য সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার এক গভীর বিপ্লব।
ক্যানড ফুডের আঁতুড়ঘর কোনো আরামদায়ক রান্নাঘর নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্র। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ইউরোপজুড়ে যখন নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সাম্রাজ্য বিস্তারের ঝড় চলমান, তার সৈন্যবাহিনীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খাবার। ঠিকই পড়ছেন; শত্রু নয়, খাবার! হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে খাবার দ্রুত পচে যেতে থাকে। একই সময়ে স্কার্ভির মতো রোগে সৈন্যরা দুর্বল হয়ে পড়েন; যুদ্ধের শক্তি হারিয়ে ফেলেন। এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে ফরাসি সরকার ১২ হাজার ফ্রাঁ পুরস্কার ঘোষণা করে। শর্ত একটাই—এমন পদ্ধতি চাই, যেখানে খাবার দীর্ঘদিন নিরাপদ থাকবে।
এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এক সাধারণ ফরাসি শেফ, নিকোলাস অ্যাপার্ট। তিনি কোনো বিজ্ঞানী কিংবা সামরিক বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। কিন্তু তার ছিল খাবার সংরক্ষণের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, অসীম ধৈর্য আর পরীক্ষার সাহস। প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি পরীক্ষা চালান। অবশেষে খেয়াল করেন, খাবারকে যদি কাচের জারে ভরে মুখ ভালোভাবে আটকে গরম করা হয়, তাহলে তা দীর্ঘদিন ভালো থাকে। ১৮০৯ সালে তিনি এই পদ্ধতি প্রকাশ করেন, যা ইতিহাসে অ্যাপারটাইজেশন নামে পরিচিত।
এই পদ্ধতি কার্যকর হলেও একটি বড় সমস্যা ছিল—কাচের জার। যুদ্ধক্ষেত্রে কাচ ভেঙে যেত; ভারী হওয়ায় পরিবহনও কঠিন ছিল। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে ১৮১০ সালে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী পিটার ডুরান্ড এক নতুন ধারণা নিয়ে আসেন। তিনি টিন প্লেটেড লোহার পাত্রে খাবার সংরক্ষণের পেটেন্ট নেন। এই টিনের কৌটা ছিল শক্ত, টেকসই ও বহনযোগ্য। এখান থেকে আধুনিক ক্যানড ফুডের যাত্রার সূচনা। মজার ব্যাপার হলো, ক্যান আবিষ্কৃত হলেও তখনো কেউ ক্যান ওপেনার বানানোর কথা ভাবেনি। সৈন্যরা ছুরি, পাথর কিংবা বেয়নেট দিয়ে ক্যান খুলতেন। ক্যান ওপেনারের উদ্ভাবন ঘটে প্রায় ৫০ বছর পর, ১৮৫৮ সালে।
নিকোলাস অ্যাপার্ট জানতেন কীভাবে খাবার সংরক্ষণ করতে হয়; কিন্তু কেন তা পচে না, তা তার জানা ছিল না। এই প্রশ্নের উত্তর দেন বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর। উনিশ শতকের ষাটের দশকে তিনি প্রমাণ করেন, খাবার পচে যাওয়ার মূল কারণ অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া। তাপ প্রয়োগে এই অণুজীব ধ্বংস হয়; ফলে খাবার দীর্ঘদিন নিরাপদ থাকে। এই আবিষ্কার ক্যানিং প্রযুক্তিকে দেয় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
সভ্যতার গতিপথ বদলাতেও ক্যানড ফুড রেখেছে বিস্তর ভূমিকা। যুদ্ধক্ষেত্রে, আমেরিকান গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে টিনজাত খাবার বহু সৈন্যের জীবন বাঁচিয়েছে। এই প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে বিশাল সৈন্যদলকে মাসের পর মাস খাবার সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। ভৌগোলিক অভিযানে, উত্তর মেরু বা দক্ষিণ মেরুর মতো দুর্গম এলাকায় অভিযাত্রীদের একমাত্র ভরসা ছিল টিনজাত খাবার। আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার সময়ও ক্যানড ফুড ছিল জীবন রক্ষাকারী। মহাকাশে, গেল শতকের ষাটের দশক থেকে মহাকাশচারীদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি টিনজাত ও প্যাকেটজাত খাবার মহাকাশ গবেষণার পথ প্রশস্ত করেছে।
আজকের ব্যস্ত জীবনে ক্যানড ফুড অনেকের কাছে বিলাস নয়; বরং প্রয়োজন। খাদ্য অপচয় রোধে এক শক্তিশালী অস্ত্র এটি। প্রতিবছর বিশ্বে উৎপাদিত খাবারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নষ্ট হয়ে যায়। ক্যানিং প্রযুক্তি এই অপচয় কমাতে বড় ভূমিকা রাখছে। মৌসুমি ফল, মাছ বা সবজি সারা বছর পাওয়া যায় ক্যানিংয়ের কারণে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এটি পুষ্টির এক নির্ভরযোগ্য উৎস। স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান শতভাগ রিসাইকেলযোগ্য, যা প্লাস্টিক দূষণ কমাতে সাহায্য করছে। তবে ক্যানড ফুড ব্যবহারে সতর্কতাও জরুরি। অতিরিক্ত সোডিয়াম ও চিনিসংবলিত কিছু ক্যানের আস্তরণে থাকে বিপিএ (ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিক্যাল বিশেষ), যা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। অতিরিক্ত তাপে ভিটামিন সি ও বি-এর বিনাশ ঘটে। তবে আধুনিক প্রযুক্তিতে এখন বিপিএ-ফ্রি এবং কম লবণ ও চিনির ব্যবহার বাড়ছে।
আজকের ক্যান আগের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ হালকা। কিউআর কোড স্ক্যান করে জানা যাচ্ছে খাবারের উৎস, পুষ্টিগুণ ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া। চীনের ঝেংঝো শহর এখন বিশ্বের অন্যতম বড় ক্যানিং হাব।
বিশ্বে জনসংখ্যা বাড়ছে; জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য উৎপাদনকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই বাস্তবতায় ক্যানড ফুড ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তায় প্রতিনিয়ত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সামনের দিনে দুর্যোগ, যুদ্ধ কিংবা মহামারিতে টিনের এই কৌটাগুলোই হয়ে উঠতে পারে মানুষের শেষ ভরসা। যুদ্ধের ময়দান থেকে আধুনিক সুপারশেলফ—এই দীর্ঘ যাত্রায় ক্যানড ফুড প্রমাণ করেছে, নীরব বিপ্লবই সবচেয়ে শক্তিশালী।

দায় স্বীকার: নেট বার্কসডেল; হাউ ক্যানড ফুড রেভল্যুশনাইজড দ্য ওয়ে উই ইট; হিস্ট্রি ডটকম, ২২ আগস্ট ২০১৪। আ জার্নি থ্রু টাইম: দ্য হিস্ট্রি অব ক্যানড ফুড ডেভেলপমেন্ট; ট্যান ক্যানড ফুড ডটকম, ১২ জানুয়ারি ২০২৪। নিকোলা জোনস; ক্যানড ফুড: আ পাওয়ারফুল উইপন ইন দ্য ওয়ার অন ওয়েস্ট; লিংকডইন, ১৮ জুলাই ২০২৩। ওমর ফোফানা; দ্য কোয়াইট রেভল্যুশন ইন ক্যানড ফুড টেকনোলজি; প্যাকেজিং গেটওয়ে ডটকম, ৩০ জুন ২০২৫
 নাঈমা তাসনিম
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top