skip to Main Content

প্রাগৈতিহাসিক I মামলুক খাদ্যাভ্যাস

আনুমানিক ১২৫০ থেকে ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সৌদি আরব, মিসর, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনজুড়ে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী এক মুসলিম সাম্রাজ্য, যা মামলুক সালতানাত নামে পরিচিত। ইতিহাসের পাতায় জায়গা নেওয়া সেই সাম্রাজ্যের খাদ্যসংস্কৃতিতে উঁকি দিলেন নাঈমা তাসনিম

বিস্তৃত এই সালতানাত গড়ে উঠেছিল মূলত দাস সৈনিকদের হাত ধরে, যাদের জীবন ছিল কঠোর শৃঙ্খলা, নিরন্তর প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। মামলুকরা আইয়ুবীয় রাজবংশকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং মোঙ্গল ও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদের মাধ্যমেই মূলত ইসলামি বিশ্বের ভিত শক্তিশালী হয়।
কঠোর ইসলামিক অনুশাসনে পরিচালিত বহুজাতিক মামলুক সমাজে খাবার ছিল ক্ষমতা, ধর্ম, বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি সাংস্কৃতিক ভাষা। যেহেতু সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যম খুব কম ছিল, তাই আনন্দ উদ্‌যাপনের মাধ্যম হিসেবে খাদ্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মামলুক সালতানাতে খাদ্যের ধরন নির্ধারিত হতো মানুষের সামাজিক অবস্থান ও জীবনের বাস্তবতার মাধ্যমে। সৈনিকদের খাবার ছিল শক্তিদায়ক, সহজপাচ্য এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণযোগ্য। যুদ্ধ ও অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সহনশীলতা তৈরিতে খাবারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সুলতান, আমির ও অভিজাত শ্রেণির খাদ্য ছিল বিলাসী, সুগন্ধি মসলা ও দুষ্প্রাপ্য উপাদানে ভরপুর। সাধারণ মানুষের খাবার ছিল তুলনামূলকভাবে সাদামাটা; তবে পুষ্টি, অভিজ্ঞতা ও প্রজন্মান্তরের জ্ঞানসমৃদ্ধ।
রুটি ছিল মামলুক খাদ্যসংস্কৃতির ভিত্তি ও কেন্দ্রবিন্দু। গম দিয়ে তৈরি নরম, চ্যাপ্টা রুটি প্রতিদিনের খাবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। যব ও বাজরার রুটিরও চল ছিল, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে। ওই সালতানাতে রুটি গণ্য হতো সামাজিক বন্ধনের প্রতীক হিসেবে। একই থালা থেকে দলবদ্ধভাবে রুটি ছিঁড়ে খাওয়ার মধ্য দিয়ে ভ্রাতৃত্ব, আত্মীয়তা ও সামাজিক সংহতি দৃঢ় হতো। রুটির সঙ্গে সাধারণত পরিবেশিত হতো ঝোল, ডাল, সবজি কিংবা মাংসের পদ, যা আহারকে দিত পূর্ণতা।
মামলুক খাদ্যতালিকায় মাংসের ছিল বিশেষ গুরুত্ব; ঠিক যেমনটা এখনো আরব সংস্কৃতিতে বিদ্যমান। সহজলভ্যতার পাশাপাশি হালাল ও হারামসংশ্লিষ্ট ইসলামি বিধিনিষেধের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্যতার কারণে ভেড়া ও খাসির মাংসের জনপ্রিয়তা ছিল সর্বাধিক। কিছু অঞ্চলে গরু ও উটের মাংসও খাওয়া হতো; তবে সীমিত পরিসরে। মুরগি, কবুতর ও হাঁসের মাংস ছিল উৎসব ও অতিথি আপ্যায়নে বিশেষ খাদ্য উপাদান। নীল নদের তীরবর্তী অঞ্চলের মাছও খাদ্যতালিকার বিশেষ অংশজুড়ে ছিল। মাংস সাধারণত ধীরে রান্না করা হতো, যাতে তা মোলায়েম হয় এবং মসলার স্বাদ মাংসে গভীরভাবে মিশে যায়।
রন্ধনপ্রক্রিয়ায় মামলুকরা ছিলেন বেশ ধৈর্যশীল ও নিখুঁতচারী। মাটির হাঁড়ি, তামার পাত্র ও খোলা আগুনের চুলায় রান্না করা ছিল সাধারণ রীতি। ধীর আঁচে দীর্ঘ সময় রান্নার ফলে খাবারে একধরনের গভীরতা ও পরিপক্বতা আসত। তন্দুর ও গ্রিল পদ্ধতিতে মাংস ঝলসে নেওয়ার চলও ছিল, যা যাযাবর ও সামরিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিভিন্ন সুগন্ধি মসলা ব্যবহারে আফ্রিকা ও এশিয়ার মানুষ অনেক আগে থেকে প্রসিদ্ধ। দারুচিনি, জিরা, ধনে, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ ও জাফরানের মতো মসলা খাবারে উষ্ণতা ও সুবাস যোগ করত। অনেক ক্ষেত্রে মধু, খেজুর বা শুকনো ফল ব্যবহারের মাধ্যমে মিষ্টি ও নোনতা স্বাদের সংমিশ্রণ তৈরি করা হতো, যা মামলুক রন্ধনশৈলীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে একসময়। সেই যুগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মিষ্টান্নগুলোর মধ্যে লুকাইমাত বা লুকমাত আল কাদি বিশেষভাবে পরিচিত। লুকমাত হলো ছোট ছোট গোলাকার ডিপ ফ্রাই করা ডো বল, যেগুলো পরে মধু বা চিনির শিরায় ডুবিয়ে পরিবেশন করা হতো। যদিও লুকমাতের প্রাথমিক রূপ আব্বাসীয় যুগে পাওয়া যায়, তবে মামলুকরা এই মিষ্টিকে জনপ্রিয় করে তোলেন এবং এর রেসিপিতে গোলাপজল, জাফরান ও তিলের ব্যবহার যোগ করেন।
হারিসা ছিল মামলুক সমাজের অন্যতম জনপ্রিয় ও পরিচিত খাবার। গম ও মাংস একসঙ্গে দীর্ঘ সময় রান্না করে তৈরি এই পদ পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য এবং পাকস্থলীর পক্ষে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রশান্তিদায়ক। সৈনিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সমানভাবে জনপ্রিয় ছিল এই খাবার। অন্যদিকে, রুটির ওপর মাংস ও সবজির ঝোল ঢেলে তৈরি করা হতো থারিদ। ধর্মীয় ও সামাজিক—উভয় বিবেচনাতেই খাবার হিসেবে এর ছিল আলাদা মর্যাদা। সিকবাজ নামের টক-মিষ্টি মাংসের পদে ভিনেগার ও মধুর ব্যবহার মামলুকদের সূক্ষ্ম স্বাদবোধের পরিচয় দেয়। এদিকে, কাবাব ও রোস্ট করা মাংস ছিল শক্তি ও বিজয়ের প্রতীক, যা সামরিক উৎসব ও আনন্দঘন উপলক্ষে পরিবেশিত হতো।
উৎসব ও রাজকীয় ভোজ ছিল মামলুক খাদ্যসংস্কৃতির সবচেয়ে বর্ণাঢ্য প্রকাশ। ঈদ, সুলতানের অভিষেক, সামরিক বিজয় কিংবা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিশাল ভোজের আয়োজন করা হতো। এসব ভোজে মসলা ও শুকনো ফলে ভরা পোলাও, আস্ত একটি ভেড়া বা উটের রোস্ট, নানা ধরনের মাংসের পদ এবং সুগন্ধি মিষ্টান্ন পরিবেশনের রেওয়াজ ছিল। খাবারের প্রাচুর্য দেখানো ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা, সমৃদ্ধি ও উদারতার প্রকাশ। ভোজের মাধ্যমে শাসকেরা প্রজাদের আনুগত্য এবং অভিজাতদের সমর্থন দৃঢ় করতেন। প্রজারা মনে করতেন, তারা শাসকদের কাছাকাছি আসতে পেরেছেন।
পানীয় সংস্কৃতিও মামলুক খাদ্যাভ্যাসে জনপ্রিয়তার অনেকটা জুড়ে ছিল। ইসলামি বিধানের কারণে মদ নিষিদ্ধ থাকায় বিকল্প হিসেবে ছিল নানা ধরনের পানীয়। সেগুলোর মধ্যে গোলাপ, লেবু, তেঁতুল ও বিভিন্ন ফল দিয়ে তৈরি শরবত ছিল ভীষণ জনপ্রিয়। দুধ ছিল পুষ্টির প্রধান উৎস, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য। নানা রকমের গবাদিপশু পালন করায় দুধের প্রতুলতাও ছিল বেশ। বিস্তৃত উপত্যকায় চাষ হওয়া ফলের রস ও মধুমিশ্রিত পানীয় গরম আবহাওয়ায় মামলুকদের শরীর শীতল রাখত। এই সময়েই ক্বাহওয়া বা কফির প্রাথমিক সংস্কৃতি গড়ে উঠতে শুরু করে, যা পরবর্তী সময়ে সামাজিক আড্ডা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
মামলুক জীবনে স্বস্তি ও আনন্দের মুহূর্ত এনে দিত জলখাবার ও মিষ্টান্ন। খেজুর ছিল সহজলভ্য ও পুষ্টিকর ফল। শিশু থেকে সৈনিক—সবার কাছে ছিল এর জনপ্রিয়তা; অবশ্য আরব সভ্যতায় খেজুর বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। বাদাম ও শুকনো ফল দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য হওয়ায় ভ্রমণ ও অভিযানে বিশেষ উপযোগী ছিল। মামলুকরা যেহেতু যুদ্ধ করতেন এবং ভ্রমণে থাকতেন; তাই বাদাম ও শুকনো ফল তাদের কাছে ছিল পছন্দের শীর্ষে। মধুতে ডোবানো পিঠাজাতীয় খাবার, দুধ ও চালের পায়েস এবং আখের চিনির মিষ্টি বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল। এসব মিষ্টান্ন ছিল উৎসব, অতিথি আপ্যায়ন ও সামাজিক মিলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অন্যদিকে শিশুদের খাবার ছিল তুলনামূলক নরম, কম মসলাদার ও সহজপাচ্য। দুধ, মধু, নরম রুটি, ফল এবং দুধভিত্তিক পায়েস তাদের খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করত। বিশ্বাস করা হতো, শৈশবে বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাবার শিশুর শারীরিক শক্তির পাশাপাশি চরিত্র ও নৈতিকতার ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই তাদের খাবারে মামলুকরা বিশেষ যত্নশীল ছিলেন বলা যায়।
মামলুক সমাজে খাবার পরিবেশনের রীতিনীতি ছিল সামাজিক শিষ্টাচার এবং মূল্যবোধের প্রতিফলন। সাধারণত বড় থালায় পরিবেশন করা হতো এবং সবাই একসঙ্গে বসে খেতেন। ডান হাত দিয়ে খাওয়া, অতিথি ও বয়োজ্যেষ্ঠের পাতে আগে পরিবেশন করা এবং খাবারের আগে ও পরে প্রার্থনা করা ছিল প্রচলিত রীতি। মাটিতে বসে খাওয়ার এই সংস্কৃতি সামাজিক সমতা ও পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি তৈরি করত।
সংরক্ষণ পদ্ধতি ছিল মামলুক খাদ্যব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। রেফ্রিজারেশন না থাকায় তারা শুকিয়ে, লবণ, ভিনেগার ও তেল ব্যবহারে এবং মাটির পাত্রে সংরক্ষণের কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। মাংস, মাছ, ফল ও বাদামজাতীয় খাবার শুকিয়ে রাখা হতো, যাতে দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যায়। এসব পদ্ধতি বিশেষ করে সামরিক অভিযান ও দীর্ঘ ভ্রমণের সময় ভীষণ কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।
মামলুক খাদ্যসংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ ও মসলা-বাণিজ্য তাদের খাদ্যসংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য এনেছিল। পুষ্টিকর ও শক্তিদায়ক খাবারের কারণে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বেড়েছিল। ভোজ ও আতিথেয়তা রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে সহায়ক হয়েছিল। সব মিলিয়ে বলা যায়, মামলুক সালতানাতে খাবার ছিল অর্থনীতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনস্থল।

চিত্রকর্ম: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top