যাপনচিত্র I পার্থ-সামিহা প্রণয়সূত্র
ধ্যান, জ্ঞান—সবই ছিল ক্রিকেট। প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন জাতীয় দলে খেলার। বলছি হালের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী পার্থ শেখের কথা। অভিনয়, সততা ও শ্রম দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন দর্শকের হৃদয়ে। অন্যদিকে পেশায় এডুকেটর সামিহা রহমানের বিচরণ শিল্পের বিভিন্ন অঙ্গনে। পার্থ ও সামিহা দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক বিয়েতে রূপ দিয়েছেন সম্প্রতি। এই দম্পতির ছুটির দিনের খুঁটিনাটি আর নানা গল্প জানার প্রয়াস
ছুটির দিনটি মর্জিমাফিক কাটানোর পরিকল্পনা করেন দুজনেই। ক্রিকেটের কোনো প্র্যাকটিস ম্যাচ না থাকলে পার্থ বিছানা ছাড়েন ১০টা-১১টায়। ইনজুরির কারণে জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন পূরণ না হলেও ক্রিকেটের অনুশীলন নিয়মিত করেন। সকালের নাশতায় বুটের হালুয়া, ডিম পোচ, নেহারি তার ভীষণ প্রিয়।
বরের সঙ্গে সামিহার ছুটির দিনের রুটিনের অবশ্য সামান্য তারতম্য আছে। দুজনে ঘুম থেকে প্রায় কাছাকাছি সময়ে উঠলেও কনের পছন্দ ইজি ব্রেকফাস্ট। জাম, ব্রেড টোস্ট, সিরিয়াল কর্নফ্লেক্স ইত্যাদি। তবে কুসুম গরম পানিতে আদা-জল খেয়ে নেন দিনের শুরুতে দুজনেই।
সকালে একদম বেসিক স্কিন কেয়ার করেন সামিহা—ফেসওয়াশ, ময়শ্চারাইজার, সানস্ক্রিন—ব্যস! তবে সময় পেলে পার্থ ক্লে মাস্ক কিংবা ফেস মাস্কের প্রলেপ নেন, যদিও সচরাচর তা করা হয়ে ওঠে না।
ব্রাঞ্চে সাধারণত কিছু খান না পার্থ, তবে হালকা মৌসুমি ফলের স্বাদ নেন কালেভদ্রে। অন্যদিকে, সামিহা নিয়মিত সিডমিক্স খান, হরমোনাল ব্যালেন্সের জন্য। লাঞ্চের আগপর্যন্ত পার্থ বসে পড়েন ক্রিকেট হাইলাইটস নিয়ে। সামিহা চেষ্টা করেন লেখালেখিতে মনোযোগ দেওয়ার। বই পড়তে ভালোবাসেন। সব ধরনের লেখা পড়লেও বিশেষ পছন্দ ক্রাইম জনরা। সূত্রপাত ব্রিটিশ সাহিত্যিক পলা হকিন্সের উপন্যাস ‘দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেন’ থেকে। ছবি আঁকার অভ্যাস এখনো ধরে রেখেছেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালে একক চিত্র প্রদর্শনীও করেছেন তিনি; যদিও এখন স্কেচ আঁকেন বেশি। ছবি আঁকার ক্ষেত্রে মামা চিত্রশিল্পী শাফাত হোসেন অনুপ্রেরণা ছিল ছেলেবেলায়।
মধ্যাহ্নভোজে সাদা পোলাও, ইলিশ পোলাও, টিকিয়া, মাটনকারি ভীষণ পছন্দ পার্থের। সামিহার পছন্দ খিচুড়ি, ড্রাই খিচুড়ি। তবে সামিহার সবচেয়ে প্রিয় খাদ্যপদ মায়ের রান্না করা গরুর মাংস, পার্থেরও মায়ের হাতের ইলিশ পোলাও। দুজনের একটি দারুণ মিল আছে। বাইরে কোথাও দাওয়াতে রোস্ট খান না। কিন্তু পার্থের মায়ের হাতের রোস্ট দুজনেরই ভীষণ প্রিয়। স্ত্রীর হাতের আফলাতুন নামের টার্কিশ মিষ্টি খেতে ভীষণ ভালোবাসেন পার্থ।
বিকেলে যে যার মতো ঘুরতে ভালোবাসেন এই বর-কনে। পার্থ চেষ্টা করেন এলাকার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। সামিহার চেষ্টা থাকে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বিকেল কাটানোর। কোনো ছুটির দিনে আড্ডা দিতে কিংবা বাইরে যাওয়া না হলে দুজনে বাসায় একসঙ্গে চায়ের পেয়ালা নিয়ে কাটান একান্ত সময়। বিকেলে বা সন্ধ্যার পরে তাদের বাসায় চা পানের রেওয়াজ পুরোনো। হালকা ভাজাপোড়া, পাকোড়াজাতীয় খাবার সঙ্গী হয় তখন।
বিকেলের গল্প শোনাতে শোনাতে দাদির সঙ্গে পার্কে লুকিয়ে থাকার স্মৃতিচারণা করলেন সামিহা। তার শৈশব কেটেছে যৌথ পরিবারে। দাদি ছিলেন অ্যাথলেট, নানি সেভ দ্য চিলড্রেনের কর্মকর্তা। নিজের জীবনে এই দুজন নারীকে আদর্শ মানেন। এ-লেভেল সম্পন্ন করার আগেই মেডিকেল ভর্তি কোচিংয়ে পড়ানো শুরু করেন তিনি। আত্মনির্ভরশীল নারী হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে মা, দাদি ও নানির ভূমিকা স্মরণ করেন। ছোটবেলায় বাউন্টি চকলেট সামিহার বেশ পছন্দের ছিল। আত্মীয়স্বজন বিদেশ থেকে অনেক চকলেট আনলে কাজিনরা কেউ বাউন্টি নিত না, সেটা সামিহার জন্য শাপে বরই হতো।
পার্থের ছেলেবেলা কেটেছে মফস্বলে। শৈশবে প্রিয় খাবার ছিল কটকটি, শনপাপড়ি। এই প্রজন্মের অনেকের এর সঙ্গে হয়তো পরিচয় নেই, লোহার জিনিসের বদলে পাওয়া যেত ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে। একটু বড় হওয়ার পর আজিজ মিমি। বন্ধুদের সঙ্গে মার্বেল খেলার স্মৃতি মনে পড়ায় হাসলেন। ম্যাচের বক্স দিয়ে বানাতেন টাকা, রুটি থাপ্পড় খেলা ছিল ভীষণ প্রিয়।
ছোটবেলা থেকে ক্রিকেট ভালোবাসেন পার্থ শেখ। কাঠের ব্যাট-বল কিনে খেলতেন বন্ধুদের সঙ্গে। সুতা ও স্কচ টেপ পেঁচিয়ে সেই ব্যাটকে বারবার ঠিক করতে হতো।
সামিহা জানালেন, পার্থকে সামিহার দাদা ভীষণ ভালোবাসতেন। দাদা চেয়েছিলেন তাদের বিয়ে দেখে যেতে। হঠাৎ তার আকস্মিক মৃত্যুতে, স্মৃতির প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে, পারিবারিকভাবেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এই যুগলের। রাতের খাবার মূলত দাওয়াতেই বেশির ভাগ সময় সারেন তারা। বাসায় থাকলে হালকা ভেজিটেবল চিকেন সঁতে বা সালাদ খান।
রাতের খাবার শেষে সিরিজ বা সিনেমা দেখার পালা। নতুন নতুন সিরিজ দেখতে ভালোবাসেন দুজনেই। পার্থ শেখের প্রিয় লেখক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। প্রিয় অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি; প্রিয় অভিনেত্রী নাটালি পোর্টম্যান, হেলেন মিরর। সামিহার পছন্দের অভিনেতা শাহরুখ খান, অভিনেত্রী দীপিকা পাডুকোন।
প্রথম দেখায় দুজনের কেউই বুঝতে না পারলেও মাসখানেক সময় লাগেনি ভালো লাগা ভালোবাসায় বদলে যেতে। সম্পর্কের শুরুর দিতে পার্থ প্রায় প্রতিদিনই সামিহার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। প্রথম দিন সামিহার পরনে ছিল টার্টেল নেকের কালো রঙের সোয়েট শার্ট, জানালেন পার্থ। অন্যদিকে পার্থের গায়ে ছিল খুঁতের একটি জ্যাকেট, জানালেন সামিহা। প্রথম দিনেই দুজনের দুজনকে ভালো লেগে যায়। পার্থই প্রথমে বন্ধুদের এবং নিজের বাসায় সামিহার কথা জানান।
রাতে ঘুমানোর আগে সামিহা ডিপ স্কিন কেয়ার করেন। পার্থের চেষ্টা থাকে ক্রিকেটের হাইলাইটস দেখা কিংবা বই পড়ার। মধুচন্দ্রিমায় কক্সবাজারে গিয়েছিলেন; শিগগির দেশের বাইরে সমুদ্রের কাছাকাছি আবারও কোথাও যেতে চান।
পার্থ শেখ সম্প্রতি লাভা নামে একটি শাড়ির বুটিক শুরু করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার ইচ্ছা আছে এ বছর। অভিনয় ক্যারিয়ারকে গুছিয়ে নিতে চান ভালো মানের কাজ দিয়ে। সামিহার ইচ্ছা নিজের লেখা নতুন বই প্রকাশ করার এবং শিক্ষাঙ্গনে নিয়মিত কার্যকরী ভূমিকা রাখার।
নাঈমা তাসনিম
ছবি: রনি বাউল
