এডিটর’স কলাম I স্বাধীনতার সুবাতাস
স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। এর অপব্যবহার তাই রোধ করা বাঞ্ছনীয়। কারও কোনো তথাকথিত স্বাধীন আচরণ যদি অপরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটি স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্যকে ব্যাহত করে
‘স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,/ কে বাঁচিতে চায়?/ দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে,/ কে পরিবে পায়’—উনিশ শতকের কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতার পঙ্ক্তি। আদতেই স্বাধীনতা প্রত্যেক মানুষের এমন এক জন্মগত অধিকার, যা তাকে অন্যের অধিকারে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করে নিজের মতো জীবনযাপন করতে দেয়। অবশ্য সেটি নিয়ন্ত্রণহীন অরাজকতার মধ্য দিয়ে নয়; বরং যৌক্তিক ও আইনানুগ পন্থায়।
দুই
স্বাধীনতার দর্শনগত গুরুত্ব অসীম। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাসের মতে, স্বাধীনতা মানে নিজের ‘সকল বাসনা চরিতার্থ করা’ নয়; বরং নিষ্ফলা, নিষ্প্রয়োজনীয় কিংবা আসক্তিকর বাসনাগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করা। কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তি যখন মাদক গ্রহণ করে, সে মাদকের ক্রীতদাসে পরিণত হয়; অন্যদিকে প্রকৃত স্বাধীন মানুষ এতটাই মুক্তচিত্তের অধিকারী হয়ে থাকেন, যার মনে কোনো ধরনের মাদক গ্রহণের বাসনা জাগে না। শুধু তা-ই নয়; স্বাধীনতার মানে হলো নিজের ক্রোধ, উৎকণ্ঠা, লালসা, ঘৃণা এবং অপ্রয়োজনীয় বাসনাগুলো দূরে সরিয়ে রাখতে পারার সক্ষমতা।
তিন
স্বাধীনতাকে যথাযথ উপভোগের জন্য স্বাধীনচেতা মানসিকতা গড়ে তোলা অপরিহার্য। সেই দক্ষতা অর্জনের উপায় ঘিরে ভাবনাচিন্তার অন্ত নেই। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের অভিমত ও গবেষণা বিশ্লেষণ করে তাতে সাধারণ কিছু উপায়ের দেখা মেলে। শুরুতেই গুরুত্বারোপ করা চাই জীবনযাপনের ক্ষেত্রে নিজ লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারকে মূল্যায়ন করার মাধ্যমে; যা আপনার কাছে সত্যিকারভাবে অর্থবহ এবং একই সঙ্গে বৃহৎ অর্থে পৃথিবী তথা মানবসভ্যতার জন্য উপকারী, এমন বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া শ্রেয়। প্রকৃত স্বাধীন হতে চাইলে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া কোনো কাজের কথা নয়; বরং যোগাযোগ দক্ষতার বিকাশ ঘটানো উত্তম। আত্মবিশ্বাসে রাখা চাই ভরসা। আর সবকিছু ভালোভাবে উপলব্ধি করার জন্য নিজেকে একান্ত সময় দেওয়াও জরুরি।
চার
শুধু ব্যক্তিগত গণ্ডিতেই নয়; স্বাধীনতার তাৎপর্য আরও বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃত। জাতিগত বা ভূখণ্ডের স্বাধীনতা এর মধ্যে সম্ভবত অধিক গুরুত্ববহ। উদাহরণ হিসেবে আমাদের গৌরবময় ইতিহাসের দিকেই নজর দেওয়া যাক। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে এই ভূখণ্ডের মানুষ জীবনবাজি রেখে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র আমাদের এনে দিয়েছেন। সেই দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’। তখন থেকে ২৬ মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। এর সুফল কী, তা আমরা রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধি করছি।
পাঁচ
স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। এর অপব্যবহার তাই রোধ করা বাঞ্ছনীয়। কারও কোনো তথাকথিত স্বাধীন আচরণ যদি অপরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটি স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্যকে ব্যাহত করে।
স্বাধীনতার সুবাতাস সবার জীবন ছুঁয়ে-ছুঁয়ে যাক। কল্যাণ হোক।
