মনোযতন ফোবি ফাঁদ
ফিয়ার অব বিয়িং ইনক্লুডেড। সরল বাংলায়, অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ভয়। জ্বালাতন উদ্রেককারী এক মানসিক অবস্থা। অজান্তেই এর শিকার অনেকে
আনিকা তার স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে গেট-টুগেদারের পরিকল্পনা করেন। এক মাস ধরে গ্রুপ চ্যাটে এ নিয়ে কী উন্মাদনা! আনিকা নিজেও বেশ কয়েকবার জোর দিয়ে বলেছেন, এবার যেন কেউ মিস না করে। আড্ডার দিন ঘনিয়ে আসতেই তার মনে হচ্ছে, ‘কেন যে রাজি হলাম! কেন যে অশান্তি ডেকে আনলাম! অর্ণবটা খুব বেশি কথা বলে। মালিহা সারাক্ষণ নিজের স্বামী-সন্তানের গল্প করে। সবাই কেমন যেন বিরক্তিকর। ধুর, এর চেয়ে বাসায় থাকতাম, একটা মুভি দেখতে কিংবা বই পড়তে পারতাম!’ আনমনে নিজেকে বলছেন, ‘না যেতে পারলেই বরং বেঁচে যেতাম।’
আনিকা ভাবছেন, তিনি বলে দেবেন তার শরীর খারাপ, নাকি বলবেন অফিসে কাজ পড়ে গেছে! হঠাৎ তার মুঠোফোনে টেক্সট আসে; অর্ণব লিখেছেন, ‘বন্ধুরা, খুব বৃষ্টি হচ্ছে আর ট্রাফিকও ভয়ানক। আজকের আড্ডাটা বরং ক্যানসেল করি? আগামী মাসে দেখা হবে।’ টেক্সটটি পড়ে আনিকার ভীষণ ভালো লাগছে এখন। একে বলে ক্যানসেলেশন রিলিফ। তবে একটু আগেও যে দেখা করাটা ‘বিরক্তিকর’ ছিল, এখন সেটির জন্য আবার মায়াও লাগছে। অবশ্য আড্ডাটা যে হচ্ছে না, এই খবরে তিনি যে রকম আনন্দ পেলেন, আড্ডা হলে বোধ হয় তার অর্ধেকও পেতেন না।
মানুষের মন বড় বিচিত্র! আমরা একদিকে একাকিত্বকে ভয় পাই, অন্যদিকে মানুষের ভিড়ে মিশে যেতেও অনেক সময় দ্বিধায় ভুগি। বর্তমান সময়ের মনোবিজ্ঞানে একটি টার্ম খুব আলোচিত হচ্ছে, ফোবি। ফিয়ার অব বিয়িং ইনক্লুডেডের সংক্ষিপ্ত রূপ। সহজ কথায়, অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ভয়। এই টার্ম বা শব্দ মিলেনিয়াল বা জেনারেশন এক্সের কাছে শুনতে কিছুটা খটকা লাগলেও, জেন-জির কাছে বেশ পরিচিত। তবে যে জেনারেশনেরই হোন না কেন আপনি, এই অভিজ্ঞতা নিশ্চয় পেয়েছেন? হয়তো কোনো অফিসের গেট-টুগেদার বা পুরোনো বন্ধুদের পুনর্মিলনীতে আমন্ত্রণ পাওয়ার আগপর্যন্ত খুব করে চেয়েছিলেন, আপনাকে যেন ডাকা হয়। কিন্তু যে মুহূর্তে আমন্ত্রণপত্রটি হাতে এলো কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আপনার নাম যোগ করা হলো, অমনি মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি দানা বাঁধতে শুরু করল। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন হয়? কেন আমরা কখনো কখনো সবার মাঝে থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাই?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যাদের আত্মসম্মানবোধ কিছুটা নড়বড়ে, তারা ভাবেন, ‘আমি তো সাধারণ একজন মানুষ, এই দল যদি আমাকে এত সহজে গ্রহণ করে নেয়, তাহলে নিশ্চয় দলটির মান তেমন ভালো নয়।’ একে বলে ডিভ্যালুয়েশন বা অবমূল্যায়ন। আমন্ত্রণ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সেই অনুষ্ঠান বা মানুষগুলোর খুঁত খুঁজতে শুরু করি। ‘ওরা খুব পুরাতন ভাবনার মানুষ’ কিংবা ‘ওখানে গিয়ে কোনো লাভ নেই’—অবচেতনে এমন যুক্তি দাঁড় করিয়ে আমরা আসলে নিজেকে একধরনের মানসিক নিরাপত্তা দিতে চাই। আবার কিছু মানুষের কাছে তাদের ‘নিজস্ব সময়’ বা ‘প্রাইভেট স্পেস’ খুব দামি। তারা মনে করেন, কোনো দলের অংশ হওয়া মানে নিজের স্বাধীনতার ওপর কারও হস্তক্ষেপ। আড্ডা বা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়াকে তারা উপভোগ হিসেবে না দেখে ‘দায়িত্ব’ বা ‘এনার্জি লস’ গণ্য করেন। মনে হয়, ‘ওখানে গেলে আমাকে অনেক কথা বলতে হবে, হাসতে হবে—যা হয়তো আমার ভেতরের মানুষটি এই মুহূর্তে চাচ্ছে না।’
ফোবির সবচেয়ে মজার ও যন্ত্রণাদায়ক দিক হলো, এর সঙ্গে ফোমো বা ফিয়ার অব মিসিং আউটের সহাবস্থান। প্রথমে আপনার মনে হয়, ‘সবাই যাচ্ছে, আমি বাদ পড়লে কি লোকে আমাকে গুরুত্বহীন ভাববে?’ এই স্বীকৃতির তাড়নায় আপনি দলে নাম লেখান। কিন্তু এরপর যখন সেই ‘স্বীকৃতি’ বা ‘অ্যাটেনশন’ পাওয়া হয়ে যায়, তখনই আপনার আসল অনাগ্রহ প্রকাশ পায়। আসলে আপনি ওই অনুষ্ঠানে যেতে চাননি; শুধু চেয়েছিলেন লোকে আপনাকে ডাকুক। আমন্ত্রণ পাওয়ার পর যখন সেই জেদ বা বাসনা মিটে যায়, তখন অবশিষ্ট থাকে শুধু সেখানে যাওয়ার শারীরিক ও মানসিক ধকল। আর ঠিক তখনই শুরু হয় ফোবির ফ্যাসাদ।
ফোবিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ কী, জানেন? যখন শেষ মুহূর্তে কোনো পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায় বা ক্যানসেলেশন রিলিফ। ধরুন, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার কথা। আপনি তৈরি হচ্ছেন ঠিকই; কিন্তু মনে মনে ভাবছেন, ‘ইশ্, যদি এখন বৃষ্টি নামত’ কিংবা ‘কেউ যদি মেসেজ দিত যে আজ আর আড্ডা-ফাড্ডা হচ্ছে না!’ এরপর যদি সত্যিই ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে—‘আজকের প্রোগ্রাম ক্যানসেল,’ তখন বুকের ওপর থেকে যেন বিশাল পাথর নেমে যায়। আপনি এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করেন। এই প্রশান্তি প্রমাণ করে, আপনি আসলে সামাজিকভাবে নিজেকে যুক্ত করতে চাইলেও মানসিকভাবে সে জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তবে এই অস্বস্তি থেকে বেরিয়ে আসার মানে এই নয়, আপনাকে জোর করে সবার সঙ্গে মিশতে হবে; বরং কিছু সহজ উপায়ে আপনি নিজের মনের এই টানাপোড়েন সামলাতে পারেন।
কোনো দলের সদস্য হওয়া মানেই নিজস্বতা হারিয়ে ফেলেছেন, তা নয়। দল আপনার একটি ছোট অংশমাত্র। চাইলে কোনো অনুষ্ঠানে গিয়েও নিজের মতো শান্ত থাকতে পারেন, এতে আপনার স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হবে না। আবার যখন কোনো অনুষ্ঠানে যেতে অস্বস্তি হয়, তখন ভাবুন, ‘আমি তো সারা জীবনের জন্য সেখানে যাচ্ছি না, মাত্র দু-তিন ঘণ্টার ব্যাপার।’ এই সময়টুকুকে একটি সাময়িক অভিজ্ঞতার মতো গ্রহণ করা শ্রেয়। ভাবুন, এই অস্বস্তিটুকু একটু পরেই কেটে যাবে এবং আপনি আবার একান্ত পরিসরে ফিরে আসবেন।
কোনো কিছু না ভেবে হঠাৎ করে ‘হ্যাঁ’ বলা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়। কোনো আমন্ত্রণ এলে তাই সম্মতি দেওয়ার আগে কিছুটা সময় নিন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, ‘সেখানে গেলে আমি কি সত্যিই আনন্দ পাব? নাকি শুধু লোকে কী বলবে—ভেবে রাজি হয়েছি?’ নিজের প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিলে পরে আর অনুশোচনা বা অস্বস্তি হয় না।
ফোবি বা ‘অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ভয়’ মনে করিয়ে দেয়, মানুষ হিসেবে আমাদের সামাজিক এবং ব্যক্তিগত চাহিদার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। নিজেকে দোষী না ভেবে বরং নিজের মনের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন। আপনি যদি কোনো ভিড়ে যেতে না চান, সেটি আপনার অধিকার। আবার যদি যান, সেখানেও স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রেখে সবার মাঝে থেকেও ‘নিজে’ হয়ে থাকা সম্ভব। কেননা, জীবন এমন কোনো প্রতিযোগিতা নয় যে আপনাকে সব দলেই থাকতে হবে। আপনার আপন জগৎ যদি আনন্দের হয়, কিংবা যে সঙ্গ আপনাকে আনন্দে রাখবে, সেখানেই আপনি যাবেন। নিজের সঙ্গে এমন বোঝাপড়ার পরও যদি ফোবির যাতনা সামাল দেওয়া না যায়, তাহলে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হওয়া শ্রেয়।
দিলজান নাহার চাঁদনী
ছবি: ইন্টারনেট
