যাপনচিত্র I অর্থবহ অর্থি
জ্ঞানীজন বলেন, জীবন দীর্ঘ নয়, অর্থবহ হওয়া চাই। কথাটি একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী অর্থি আহমেদের সঙ্গে দারুণ মানিয়ে যায়। কেমন তার একান্ত জীবন?
একজীবনে যা কিছু হতে চেয়েছেন, সবকিছুতেই ছাপ পাওয়া যায় ভিন্নতার। কখনো চেয়েছেন নির্ভীক, দ্ব্যর্থহীন সাংবাদিক হতে; কখনোবা গোয়েন্দা। আবার কখনো চেয়েছেন বিস্ফোরক ডিফিউজার হিসেবে কাজ করবেন সোয়াটে। সব শেষে খুঁজে পেয়েছেন একান্তই নিজের জায়গা। মানুষ তাকে চিনেছে দাপুটে নৃত্যশিল্পী হিসেবে। দেশের মানুষের আস্থার গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। নিরন্তর লড়ে চলেছেন বাংলা সংস্কৃতির জন্য। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি। বিশ্বদরবারে আবারও জাত চিনিয়েছেন। অর্থি আহমেদের কাজের প্রভাব যেন নতুন দিগন্তের উন্মেষ ঘটিয়েছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। সাত শতাধিক শিক্ষার্থী নাচ শিখেছে তার একাডেমিতে। অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমির অনুপ্রেরণা, উদ্দীপনা, উৎসাহ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের কোনায় কোনায়। বয়োজ্যেষ্ঠ কিংবা কচি-কাঁচার দল—সব বয়সীকে তিনি আলিঙ্গন করে নেন উৎকর্ষ চিত্তে। নেই বয়সসীমা, সামাজিক ট্যাবু।
একজন ষাটোর্ধ্ব শিক্ষার্থীর উদাহরণ টানা যাক, যিনি আত্মহত্যার প্রবণতায় ভুগছিলেন। জীবনকে অর্থহীন মনে হচ্ছিল। একপর্যায়ে এসে, নাচ তাকে নতুন আশা দিয়েছে বেঁচে থাকার। অর্থির নেতৃত্বে একই সারিতে দাঁড়িয়ে নাচ করতে পারেন একজন নিম্ন আয়ের মানুষ এবং একজন কেতাদুরস্ত করপোরেট কর্মকর্তা। নাচ সবাইকে একই কাতারে নামিয়ে এনেছে এই একাডেমিতে। নৃত্যশিল্প অধ্যবসায় ও অনুশীলনের বিদ্যা হওয়ায় একজন শিল্পীকে নিয়মিত নিজের শারীরিক ও মানসিক যত্ন নিতে হয়। শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন ও শরীরচর্চা তার কাছে প্রার্থনাস্বরূপ। শুদ্ধ সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে এবং নৃত্যের মাধ্যমে সামাজিক ও মানসিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের রূপরেখা নিয়ে এই দীর্ঘ লড়াইয়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করেছে তাকে।
এই সম্মাননা অর্থিকে আপ্লুত করেছে, দায়িত্ব দিয়েছে। নিরলস পরিশ্রম, সততা ও নিষ্ঠার পারদ ওপরে উঠেছে। এখনো ভোরবেলায় ক্লাস শুরু করে রাত অবধি রিহার্সালের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয় একেকটা দিন। এই কর্মব্যস্ততার ভিড়ে সপ্তাহে শুধু একটি দিন নিজের করে নিয়েছেন আজকাল। দিনটি বুধবার। এদিন একটু দেরি করেই বিছানা ছাড়েন। সাধারণত সকাল ও দুপুরের খাবার এড়িয়ে চলেন। বিকেল ৪টা নাগাদ পেটে পড়ে প্রথম আহার। চেষ্টা করেন ব্যালেন্সড নিউট্রেশন রাখার। সব ধরনের পুষ্টিগুণ যেন থাকে প্লেটে, সে জন্য খাদ্যে বেছে নেন পরিমিতি আর পুষ্টি। ছোটবেলায় মায়ের তৈরি ব্রেড টোস্টের স্বাদ এখনো যেন মুখে। বাটারের ওপর চিনি ছিটিয়ে খাবার কথা দেয় পিওর নস্টালজিয়া। বললেন, ছোটবেলায় যদি জানতেন, পুষ্টিকর খাবার কতটা প্রয়োজনীয়! ভীষণ ছিপছিপে ছিলেন তিনি ছোটবেলায়। চিনি খান না বহু বছর; তাই চা কিংবা অন্য কোনো পানীয়তে আসক্তি একেবারেই নেই। এমনকি ডেজার্টের অপশনও বেশ কম। আতিথেয়তার খাতিরে মাঝেমধ্যে চেখে দেখেন মিষ্টান্ন। রাতে শতভাগ বাসার খাবার, কোনো নখরার বালাই নেই সেখানে। ভাত ভীষণ প্রিয়। দক্ষিণ ইউরোপ বেড়াতে গিয়ে তা ভীষণ মিস করেছেন এবার।
নাচ দৃশ্যমান শিল্প। সচরাচর নিতে হয় বেশ ভারী মেকআপ। তাই অন্য দিনগুলোতে সাদামাটা থাকার প্রয়াস অর্থির। সানস্ক্রিন ও লিপবাম—ব্যস, বেরিয়ে পড়েন কাজে। তবে দিনের শুরুতে ও ঘুমাতে যাবার আগে চেষ্টা থাকে ত্বককে গভীরভাবে পরিষ্কার করার। রাতে ময়শ্চারাইজারের ব্যবহার ভোলেন না। ছুটির দিনে হাতের কাছে পাওয়া যায় এমন সব প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে বানিয়ে নেন ফেস মাস্ক। তবে চুলের যত্নে দু-এক দিন পরপর হট অয়েল মাসাজ তার চাই-ই চাই।
শাড়ি বাঙালি নারীদের পরিচয়ের অংশ বলে মনে করেন এই নৃত্যশিল্পী। সব সময়ের জন্য তার পছন্দের পোশাক এটি। শাড়ি যেমন পরতে কম সময় লাগে, তেমনি আরামদায়ক ভাবেন এই শাড়িপটীয়সী। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখনো এটিই হয়ে উঠেছে তার নিত্যদিনের ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। আমাদের সঙ্গে আলাপের দিন যে শাড়ি পরেছেন, সেটি দেশীয় ব্র্যান্ড—উৎসব বুননের।
নৃত্যে অর্থির যাত্রা শুরু শৈশবেই। ছায়ানটে পড়ার পাট চুকিয়ে ২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র নৃত্যশিল্পী হিসেবে পান ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক বৃত্তি। ভর্তি হন ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। যদিও কৈশোর পেরিয়ে স্বপ্ন ছিল চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার; কিন্তু শিক্ষক ও গুরুজনদের উৎসাহ ছিল নৃত্যে। সবাই প্রশংসা করেন তার নৃত্যপ্রতিভার। যদিও চলচ্চিত্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা এখনো বিদ্যমান।
ব্যস্ততা তাকে দিচ্ছে না অবসর। সামনে অনেক কাজ। একাডেমির বাইরেও তার নিজস্ব ড্যান্স গ্রুপ রয়েছে, যেটির সদস্যরা নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশে পারফর্ম করেন। এই বর্ষাতেই আবার আসছে বহুল অপেক্ষমাণ ঘনঘটা; যা মন মাতিয়েছে বহুজনের।
অর্থি আহমেদ আক্ষেপ জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে শিল্পচর্চা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৮০ শতাংশ নৃত্যশিল্পীর একমাত্র পেশা হচ্ছে নাচ। শো না করলে তাদের সংসার চলবে না। অথচ বেশির ভাগ নৃত্যশিল্পী তাদের পাওনাটুকু বুঝে পান না। তাই নিয়মিত শো করার চেষ্টা তার।
অর্থি আহমেদ জানান, তার ভিশন হচ্ছে দর্শক ও শিল্পীদের মাঝে সেতু হয়ে কাজ করা। দর্শক যেন একান্ত হয়ে যেতে পারে নাচের সঙ্গে এবং নিজেরাও যুক্ত হতে পারে, সে লক্ষ্যে নাচের সহজ বোধগম্য, অংশগ্রহণমূলক স্বরলিপি তৈরিতে কাজ করতে চান নিয়মিত।
পড়ালেখার পর্ব শেষে দেশে ফিরে যোগ দিয়েছিলেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রতি বৃহস্পতিবার ট্রেনে চেপে চট্টগ্রামে যেতেন ক্লাস নিতে। ঢাকাকেন্দ্রিকতার বাইরে ব্যাপ্তির চেষ্টা। ফিরতেন শুক্রবার রাতের ট্রেনে। উদ্দেশ্য- নাচকে সর্বজনীন করে তোলা।
অর্থি বিশ্বাস করেন, জীবনের তরঙ্গ সরলরৈখিক হতে পারে না। মনে করিয়ে দিলেন আইসিইউর মনিটরে হার্টবিট সংকেতের কথা। মৃত মানুষের মনিটরে সরলরেখা, কোনো ঢেউ নেই। তাই আঁধারের দিনে অর্থি অপেক্ষা করেন শুদ্ধতার, শুভ্রতার চর্চা নিয়ে। শূন্য থেকে শুরু করেছেন দেশে ফিরে, হল ভাড়া করার সঞ্চয় ছিল না। অথচ এখন শিক্ষার্থীদের স্থান সংকুলান হয় না একাডেমিতে। এখনো নিয়মিত সব ক্লাস নিজে নেন এবং ঠিক আগের মতো—একই উদ্যমে, সততায়, নিষ্ঠায় ও সংকল্পে দিন শুরু করেন।
নাঈমা তাসনিম
ছবি: শ্রী অনিক দাস
