ছুটিরঘণ্টা I রঙিন মাসাই জীবন
আদিবাসী মাসাই জনগোষ্ঠীর জীবন ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে নানা রূপকথা, উপকথা। কখনো কখনো কল্পনাকেও হার মানিয়ে যায় তাদের রঙিন জীবন। কেনিয়া থেকে ঘুরে এসে লিখেছেন ফাতিমা জাহান
গতকাল নাইরোবি এসেছি। আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডে এই প্রথম। এর আগে মিসরে গিয়েছিলাম অবশ্য; কিন্তু সে দেশকে আফ্রিকা মনে হয়নি। অনেকটাই আরব দেশগুলোর মতো।
আজ কাছের একটি বাজারে যাব ঠিক করেছি। আমার হোটেলের খুব কাছেই একটি হস্তশিল্পের বাজার আছে। যেকোনো দেশের হস্তশিল্পের বাজারে আমি পুরো দিন কাটিয়ে দিতে পারি। আর আফ্রিকার হস্তশিল্পের মতো এমন রঙের দুনিয়া তো দ্বিতীয়টি নেই।
বাজারের নাম সিটি মার্কেট। বাইরে তো তা-ই লেখা। কয়েক পা এগিয়ে ভেতরে ঢুকে মনে হলো, যেন চলে এসেছি অন্য কোনো জগতে! আমার পেছনে ফেলে আসা জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এই রঙিন জগৎ। আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের কোনো হস্তশিল্পের বাজারে এই প্রথম প্রবেশ করলাম। চারদিকে মুঠো মুঠো উজ্জ্বল রং ছড়িয়ে দিয়েছে যেন কেউ। যেদিকে তাকাই, রঙের ফল্গুধারা বয়ে চলছে। সামনে সারি সারি হস্তশিল্পের দোকান। দোকান তো নয়, যেন একেকটি রত্নখনি।
প্রথমে চোখ পড়ল সারি সারি আফ্রিকান পেইন্টিংয়ের দিকে। বেশির ভাগ ছবিতেই মাসাই জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের চিত্র ফুটে উঠেছে। মাসাই আদিবাসী গোষ্ঠী তাদের রঙিন পোশাক, চওড়া গয়না এবং আদিম জীবনযাপনের জন্য বিখ্যাত। হাতে আঁকা বিভিন্ন ছবিতে মাসাই জনজীবনের বিভিন্ন ঘটনা আঁকা। কোথাও রঙিন পোশাক পরা মায়ের হাত থেকে শিশু পানি খাচ্ছে, কোথাও এক দল মাসাই পুরুষ লাঠি হাতে রঙিন পোশাক পরে কোথাও যাচ্ছে। কোনো ছবি শুধু নারী-পুরুষের পোর্ট্রেট, কোনো ছবিতে পশু নিয়ে মাসাই রাখাল চলছে। কোথাও নারীরা মাথায় কলস আর পিঠে ছোট শিশুকে বেঁধে দূরদূরান্ত থেকে পানি বয়ে নিয়ে আসছে। প্রতিটি ছবিতেই গ্রামীণ জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে। আমার এখনো মাসাই আদিবাসী বা রঙিন পোশাক ও উজ্জ্বল চওড়া পুঁতির গয়না পরা কোনো মাসাই নারী-পুরুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি; যা দেখেছি, সব ছবিতে।
এই বাজারে একটি গলি আছে শুধু পেইন্টিংয়ের। সেই গলি পেরিয়ে আসল হস্তশিল্পের জগতে আসতে না আসতেই একরাশ পুঁতির গয়না আমাকে তাদের দিকে টেনে নিল! লাল, নীল, হলুদ সবুজ, সোনালি পুঁতি চিকন চিকন তারে বেঁধে একেকটি অনন্যসাধারণ গয়না তৈরি হয়েছে। চওড়া গলার হার আর বড় বড় কানের দুলে জ্বলজ্বল করছে দোকান। সঙ্গে ব্রেসলেট কোমরের বিছা, বাজুবন্ধ, নূপুর আছে; সেসব পুঁতির তৈরি। আগে হরেক গয়না আগে দেখলেও একসঙ্গে এত ধরনের পুঁতির গয়না এই প্রথম দেখলাম। পাশাপাশি কয়েকটি গয়নার দোকান পেরিয়ে পেলাম ঘর সাজানোর বিভিন্ন উপকরণের দোকান। টেবিল ম্যাট, ওয়াল হ্যাংগিং, ঝুড়ি একধরনের লম্বা ঘাসের মতো পাতা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এই পাতাকে স্থানীয় ভাষায় বলে মিয়া। আমাদের দেশের ধামার মতো কিছু ঝুড়িও দেখলাম। ধামাও তৈরি হয় এ দেশীয় একধরনের বেত দিয়ে। এই ধামার ঝুড়িগুলোর চারধার রঙিন কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে, এর ওপর সারি সারি পুঁতি সেলাই করে, বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মিয়া বা ঘাসে তৈরি নানা রঙের ব্যাগও শোভা পাচ্ছে অন্য দোকানে। একেক ব্যাগের একেক আকার ও রং। সব ব্যাগই রঙিন আর আকর্ষণীয়। ব্যাগের বহর যেন শেষ হতে চায় না। এই জিনিসগুলোর দাম তুলনামূলক সস্তা।
এক দোকানে দেখি চামড়ার ফ্রেমে ছবি ঝুলিয়ে রাখা আছে। পাশেই টুলের উপরাংশে চামড়ার ওপর হাতে আঁকা আছে রঙিন মাসাই জীবনযাত্রার চিত্র।
আফ্রিকার আরও সুনাম মুখোশশিল্পের জন্য। কেনিয়া বিখ্যাত এর কাঠের মুখোশের জন্য। কাঠের ওপর খোদাই করে বিভিন্ন আকার ও নকশায় তৈরি করা হয় মুখোশগুলো। এরপর এর ওপর রং বসানো হয়। কেনিয়ার মুখোশে শুধু লাল, কালো আর বাদামি রং বসে। কোনো কোনো মুখোশে রং করা হয় না। সাধারণ কাঠের রংই রাখা হয়। এই মুখোশগুলো বাড়ির দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখার জন্য আদর্শ। দাম নির্ভর করে আকার ও খোদাই করা নকশার ওপর।
কেনিয়ার মাসাই পুতুল স্থানীয় মানুষের চেয়ে ট্যুরিস্টদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। জোড়ায় জোড়ায় বিভিন্ন আকারের মাসাই পুতুল সাজানো আছে দোকানের তাকে। আমাকে দেখে দোকানি গছিয়ে দিলেন লাল জামা আর পুঁতির গয়না পরা এক জোড়া মাসাই পুতুল।
কেনিয়ার কাঠ খোদাই শিল্পও দুনিয়াজোড়া বিখ্যাত। কাঠের ওপর নিখুঁতভাবে বিভিন্ন প্রাণী বা মানুষ খোদাই করে তাতে কালো বা বাদামি বার্নিশ করা হয়। এই খোদাই শিল্পও নানা আকারের হয়।
এই বাজারে খুব বেশি ক্রেতা নজরে পড়ল না। স্থানীয় এক যুগল ব্যাগের দোকানে ব্যাগ দেখছে। অনেক দূরে একটি দোকানে একজন নারী কিছু দেখছেন। এত বড় বাজারে আর ক্রেতা নেই।
সামনের দোকানে পাথরের তৈরি ছোট-বড় নানা শোপিস শোভা পাচ্ছে। আফ্রিকা বিভিন্ন ধরনের দামি, অল্প দামি পাথরের জন্য বিখ্যাত। পাথরের ধরন অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়। আর এর পাশেই যাকে আমরা দামি পাথর মনে করি, সেই ম্যালাকাইট ঝাঁপি খুলে বসেছে। ম্যালাকাইটের গয়না দেশে দেশে অনেক দামে বিক্রি হয়। তবে এখানে দাম যথেষ্ট কম মনে হলো। গাঢ় সবুজ রঙের ম্যালাকাইটের শোপিসও সাজিয়ে রাখা আছে। এখানে এসে এত ম্যালাকাইটের দেখা পাব, ভাবিনি।
এই বাজারে সবচেয়ে বেশি আছে কাঠে খোদাই করা নানা শিল্প। কেনিয়ার সাধারণ জনগণের জীবন থেকে শুরু করে আফ্রিকার বিগ ফাইভ বা উল্লেখযোগ্য পাঁচ পশুর দেহাবয়ব কাঠে খোদাই করে বিক্রি করা হয়। আফ্রিকান বিগ ফাইভ হলো সিংহ, হাতি, গন্ডার, লেপার্ড ও মহিষ।
কাঠশিল্পের সারি সারি দোকান পার হলে শোপিসের মতো সাজানো কয়েকটি স্যান্ডেলের দোকান। স্যান্ডেলেও যে পুঁতির শিল্প ধরে রাখা যায়, তা আগে এমনভাবে দেখিনি। চামড়ায় তৈরি স্যান্ডেলগুলোর বেল্ট নানা রং ও নকশার পুঁতি দিয়ে গাঁথা। দেখে মনে হচ্ছে যেন স্যান্ডেল নয়, অ্যাঙ্কলেট। একেকটি স্যান্ডেল দেখে মনে হচ্ছে, রানিদের পায়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে। কোনোটাতে চওড়া ফিতা, কোনোটায় চিকন ফিতা; সব স্যান্ডেলেই নানা রঙের পুঁতি দিয়ে নকশা করা। পুঁতি দিয়ে গয়না তৈরি করতে দেখলাম এই বাজারে, চোখের সামনে। নারীরা নিজেদের দোকানে বসেই এমন গয়না বানাচ্ছেন। আর গয়নাসদৃশ এই স্যান্ডেলও গয়নার জায়গা করে নিয়েছে। বেশির ভাগই মেয়েদের স্যান্ডেল। অল্প কিছু আছে ছেলেদের জন্য। ছেলেদের স্যান্ডেলে অবশ্য তেমন বিশেষত্ব নেই।
পাথরের শোপিসের বেশ কিছু দোকান আছে। সোপ স্টোন নামের একধরনের পাথর দিয়ে এখানে নানা শোপিস তৈরি হয়। এমন পাথর দিয়ে শুধু ছোট ছোট শোপিস তৈরি করা যায়। ছোট আর রঙিন বলে এদের দিকে চোখ চলে যায় নিমেষে। ছোট ছোট পশু বা ছোট ভাস্কর্য দেখলে মন মানতেই চাইবে না—এগুলো কোনো প্রসিদ্ধ ভাস্কর তৈরি করেননি। এগুলো আসলে কেনিয়ার সাধারণ মানুষের হাতে তৈরি। এই ছোট ছোট ভাস্কর্যের মাঝে বেশ কিছু বিমূর্ত ভাস্কর্যও আছে।
রঙিন হস্তশিল্পের বাজার দেখা প্রায় শেষ। কিন্তু আমার এই বাজার থেকে বের হতে ইচ্ছা করছে না। একসঙ্গে এত রঙের সমাহার এই প্রথম দেখলাম। তাই রঙের জগতে আরও কিছুক্ষণ থাকতে ইচ্ছা করছিল। বাজারে সারা দিন পার করে দিয়েছি, মনেই নেই। এই বাজার বন্ধ হয়ে যায় সন্ধ্যার সময়। যখন বাজার বন্ধ হবে প্রায়, তখন আমি বের হলাম।
পরদিন সকালে রওনা দিলাম মাসাই মারা ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশে। নাইরোবি থেকে প্রায় আড়াই শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আমি একটি ট্যুর কোম্পানির সঙ্গে জিপে করে যাচ্ছি। একা জিপ ভাড়া করার সামর্থ্য আমার নেই। জিপে বেশির ভাগই ইউরোপের ট্যুরিস্ট। এশিয়ান বলতে আমি আর একজন ভারতীয় ছেলে।
পথের দৃশ্য খুবই মনোরম। দুপাশে ঘন সবুজ ঝোপঝাড় আর মাঝখানে সরু রুপালি ফিতার মতো পথ অনেক দূরে চলে গেছে। পথ সমতল নয়; কখনো চড়াই, কখনো উতরাই। এতে পথের সৌন্দর্য আরও বেড়ে গেছে। এভাবে চলতে চলতে মাসাই মারা ন্যাশনাল পার্কে পৌঁছে এক নতুন জগতের দেখা পেলাম। বর্ষাকাল বলে রুক্ষ চরাচরে এখন সবুজের বন্যা ছড়িয়ে রয়েছে।
দুপুর গড়িয়ে গেল প্রায়। জিপের ড্রাইভার গাড়ি ঘুরিয়ে বললেন, ‘এখন আমরা মাসাই গ্রামে যাব।’ আমার মনের কোনা থেকে আনন্দ উথলে
উথলে পড়ছে। এত বছর ধরে বই পড়ে আর বিভিন্ন ভিডিও দেখে মাসাইদের রঙিন জীবন সম্পর্কে মন ভরিয়েছি। এবার সত্যি সত্যি দেখতে পাব। গ্রামের মেঠো পথ ধরে জিপ যখন চলছে, তখন এবড়োখেবড়ো পথে শুধু ভেড়া, ছাগলের পালের সঙ্গে দেখা হলো। আমি ভাবছি, রাখাল কোথায়? এক পাল ভেড়া পেরিয়ে গেলে দূরে কী যেন লাল রঙের একটি ঝলক নজরে পড়ল। সাদা ভেড়ার পাল আর চারদিকের বাদামি মাটির মাঝে হুট করে লাল রং এলো কোত্থেকে! দেখি, লাল বড় বড় চেক কাপড়ের চাদর আর লুঙ্গি জড়িয়ে এক মাসাই রাখাল লাঠি হাতে এগোচ্ছেন। এদিকে ভেড়ার পাল জিপের পথ রোধ করে রেখেছে। আমি ভেড়া, ছাগলের পাল আগে দেখলেও আমার সহযাত্রী ইউরোপীয়রা এমন খোলা মাঠে ভেড়া চরে বেড়াতে দেখেননি। এমনকি রাখাল চরে বেড়াতেও দেখেননি তারা।
আমার পাশে বসেছেন অ্যালিস নামের একটি ইউরোপীয় মেয়ে। সামনে বসেছেন বিজয় নামের ভারতীয় ছেলেটি। কিন্তু এদের সঙ্গে আলাপে আমার মনোযোগ নেই। আমি মাসাই রাখাল দেখতে ব্যস্ত। লম্বা একহারা গড়নের মাসাই যুবকটি ট্যুরিস্ট দেখে অভ্যস্ত; তাই তেমন ভ্রুক্ষেপ না করে চললেন ভেড়ার পিছু পিছু।
মাটির উঁচু-নিচু পথ পেরিয়ে মাসাই গ্রামে যেতে হবে। পথে দেখা হলো আরও কয়েকজন রঙিন পোশাকের মাসাই রাখালের সঙ্গে। ইতিহাস বলে, মাসাই জনগোষ্ঠী কেনিয়াতে মাইগ্রেট করেছে পনেরো থেকে সতেরো শতকে। এরা মূলত নীল নদের তীরে বা সুদানে বসবাস করতেন। পরে বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে কেনিয়া ও তানজানিয়ায় স্থানান্তরিত হন। মাসাই জনগোষ্ঠী এখন অবধি নিজেদের ঐতিহ্যকে ভুলে যায়নি। পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, রীতিনীতি, শিল্প, নৃত্যগীত—সবই নিজেদের মতো পালন করে। এ কারণেই অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠী থেকে মাসাই জনগোষ্ঠীকে আলাদা করা যায়। আগে এরা প্রাচীনকালের মতো জীবনযাপন করতেন। এখনো অনেকটাই সে রকমভাবে পালন করেন; তবে অনেকে স্কুলে যান। সরকারের পক্ষে এদের কারও কারও বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। তবু নিজেদের সংস্কৃতি এরা ভুলে যাননি। আদিমকালের মতোই এদের পেশা পশুপালন। এরা অন্য কোনো পেশার কথা চিন্তাই করতে পারেন না। নারীরা ঘরের কাজ ও সন্তান পালন করেন। আরও একটি কাজ করেন; তা হলো, ঘরে বসে নানা রঙিন হস্তশিল্প তৈরি করা।
আমরা যখন মাসাই আদিবাসীদের গ্রামে এসে পৌঁছালাম, তখন রোদ ঝলমল করছে। স্বচ্ছ নীল আকাশ আর আকাশে গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘ আঁচল উড়িয়ে চলছে। কেনিয়ায় এখন বর্ষাকাল। একটু আগেই বৃষ্টি হয়েছে। তাই চারপাশ ঝকঝকে সবুজ হয়ে আছে।
জিপ থেকে নেমে আমরা হেঁটে হেঁটে গ্রামে প্রবেশ করতে যাচ্ছি, এমন সময় লাল, ম্যাজেন্টা, কমলা পোশাক এবং সারা অঙ্গে নানা পুঁতির গয়না পরিহিত একদল মাসাই পুরুষ আমাদের পথ রোধ করে দাঁড়াল। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে হঠাৎ উচ্চ স্বরে আওয়াজ শুরু করল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। এরা কী চায়? কয়েক সেকেন্ড পর ধাতস্থ হতেই বুঝলাম, এরা নিজেদের সংস্কৃতি অনুযায়ী গান গেয়ে আমাদের সংবর্ধনা জানাচ্ছেন। কাউকে স্বাগত জানাবার সংগীত আর সুরের ধারা যে এমন হতে পারে, তা আমার জানা ছিল না। সমবেত সংগীতের পর এরা আরেকটি সংগীতের সঙ্গে লম্ফনৃত্য করতে থাকলেন। মানে কে কত উঁচুতে লাফ দিতে পারেন। এর সঙ্গে সংগীতের সুরও পাল্টে গেল। এই লম্ফসংগীতের নাম ‘আদুমু’। একহারা গড়নের একেকজন লম্বা লম্বা মাসাই পুরুষ লাফিয়ে লাফিয়ে যেন আকাশ ছুঁতে চলেছেন। আদুমুকে যুদ্ধ বা শক্তি প্রদর্শন সংগীতও বলা হয়। কারণ, যে মাসাই পুরুষ যত উঁচুতে লাফ দিতে পারবেন, তিনি তত শক্তিশালী হিসেবে পরিচিতি পাবেন এবং বিয়ের বাজারে তার কদর তত বেশি। সামর্থ্য অনুযায়ী যৌতুক দিতে পারলে একজন মাসাই পুরুষ একাধিক বিয়ে করতে পারেন। যৌতুক হিসেবে পালিত পশু গ্রহণ করে কন্যার পিতা। আর যে পুরুষ যত শক্তিমান, যৌতুকে দেওয়ার কারণে তার পশুর সংখ্যাও তত কমতে থাকে!
এরপর এরা ‘ওলে মপিরাই’ গান ধরলেন। এই গান সাধারণত গাওয়া হয় শক্তি, সাহসকে উদ্যাপন করার জন্য। এই গানের কথার সঙ্গে যুদ্ধের মিল থাকায় একে যুদ্ধের গানও বলা হয়।
গান আর নাচ দেখতে দেখতে এই গ্রামের মোড়লের সঙ্গে পরিচয় হলো। তার নাম রাফেল। ঘরে চার বিবি আছে। রাফেলও অন্যদের মতো পশুপালন করেন; তবে তার পশুর সংখ্যা বেশি। তিনি ইংরেজি জানেন। এ গ্রামে বলতে গেলে প্রতিদিনই ট্যুরিস্ট আসে; তাই এরা কম-বেশি ইংরেজি শিখে গেছেন। অবশ্য বেশির ভাগই কখনো স্কুলে যাননি। রাফেলের কাছে জানতে চাইলাম, ‘এখানে তো সব ছেলে। মাসাই মেয়ে কোথায়?’ আমার কথা শুনে কয়েকটি ছেলে আমাদের দলকে নিয়ে গেলেন কাছের একটি মাঠে।
সেই মাঠে পুরুষদের মতোই রঙিন লুঙ্গি আর গায়ে চাদর এবং মাথা থেকে পা অবধি পুঁতি ও মেটালের বিভিন্ন গয়না পরে নারীরা সারি সারি বসে আছেন নানা হস্তশিল্প নিয়ে। তাদের সামনে খুব ছোট ছোট কাঠের বা পুঁতির নানা ধরনের শোপিস, চাবির রিং, গয়না ইত্যাদি সাজানো। সবুজ মাঠে লাল, কমলা একগুচ্ছ রঙের পেছনে সবুজ পাহাড় হাতছানি দিচ্ছে।
মাসাই নারীরা খুব কর্মঠ। ঘরের কাজ থেকে শুরু করে সন্তান পালন, দূরের জলাধার থেকে পানি বহন করে আনা ইত্যাদি সব কাজ করেন। এমনকি কঞ্চি, খড় আর মাটি দিয়ে তৈরি নিজেদের বসবাসের ঘর বানানো ও মেরামত তাদেরই করতে হয়। এ ক্ষেত্রে মাসাই পুরুষেরা ভীষণ অলস! পশুপালন ছাড়া অন্য কোনো কাজ তারা করেন না।
হস্তশিল্পের সামনে যারা বসে আছেন, তারা ছাড়াও খানিক দূরে মাসাই ঘরগুলোর আশপাশে নারীরা সন্তান কোলে নিয়ে বসে বসে অবসর কাটাচ্ছেন। এখন বিকেল হতে চলল। হাতের কাজ শেষ হয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাক এরা সব সময় পরে থাকেন। মাসাই এক মেয়ে আমাকে বললেন, ‘মাসাই নারীদেরও আলাদা নৃত্যগীত আছে।’ আমি আবদার করলাম সেই গীত আমাকে শোনানোর জন্য। এই নারীদের মাঝ থেকে কিন্নরী কণ্ঠে একজন গেয়ে উঠলেন মাসাই ‘ওলারানিয়ানি’ গান। এই গানে গল্প লুকিয়ে থাকে। এই গানের শব্দে শব্দে রূপকথা বা লোককথার বিস্তার।
একসময় মাসাই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ছিল। এখন বেশির ভাগ সোয়াহিলি ভাষায় কথা বলেন। যে গান এখন রিনরিনে কণ্ঠে নারীরা গাইছেন, তার মর্মোদ্ধার করা সম্ভব না হলেও এই সুর শুনতে ভালো লাগছে। নারীরা এখন কয়েকজন মিলে গান ধরেছেন। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী গান আর তার সঙ্গে যেন বর্ষাকালের আকাশ, চারপাশের সবুজ ঘাস, ঝোপঝাড়—সব একসঙ্গে নিচু স্বরে গানে তাল মেলাচ্ছে। অবারিত সবুজের মাঝে গুচ্ছ গুচ্ছ লাল, কমলা রঙের পোশাক পরা মাসাই নারীদের গান মিশে যাচ্ছে ভেজা বাতাসে, দূর থেকে আরও দূরে।
ছবি: লেখক
