কভারস্টোরি I আলো আলিঙ্গন
নিকষ কালো সুড়ঙ্গের শেষ মাথা থেকে যখন উঁকি দেয় একচিলতে আলো, বিপদের দিন পেরোনোর আশাবাদী বার্তা পায় মানুষ। রূপক কিংবা আক্ষরিক—সব বিবেচনায় আলো মানবজীবনের বহমানতা বজায় রাখার প্রেরণা জোগায়; দেখায় পথ। তাই আলোকে আপন করে নেওয়া, জীবনচর্চায় জড়িত করা শ্রেয়। বিস্তারিত লিখেছেন নাঈমা তাসনিম
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘সূর্য প্রণাম’ গীতি-আলেখ্য থেকে ‘পুব সাগরের পার হতে কোন পথিক তুমি উঠলে হেসে/ তিমির ভেদি ভুবন-মোহন আলোর বেশে’ পঙ্ক্তিমালা যখন কানে আসে, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক মহাজাগতিক উৎসবের দৃশ্য। এই পথিক আর কেউ নয়, স্বয়ং সূর্য। কিন্তু এই আলোর আগমন কি শুধুই অন্ধকারের অবসান, নাকি এটি এক অনন্ত যাত্রার শুরু? সৃষ্টির আদিতে সবকিছু ছিল নিকষ কালো আঁধার। সেই শূন্যতাকে চিরে যেদিন প্রথম আলোর কণা বা ফোটন বিচ্ছুরিত হয়েছিল, সেদিনই জন্ম নিয়েছিল জীবন।
বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, আলো হলো তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ, যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে আলোর সংজ্ঞাটি এর চেয়ে অনেক বেশি গভীর। আমরা যখন অন্ধকারকে ভয় পাই, তখন আসলে অনিশ্চয়তা ঘিরে শঙ্কায় ভুগি। আলো আমাদের সেই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দেয়; এনে দেয় দৃশ্যমানতা ও অস্তিত্বের প্রমাণ। এই ‘সূর্য প্রণাম’ আসলে মানুষের ভেতরের সেই আদিম আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ, যা সব সময় সুন্দর ও সত্যের আলোয় অবগাহন করতে চায়।
আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি থেকে শুরু করে আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিকস—সবকিছুতেই আলোর রহস্য মানুষকে আজীবন মুগ্ধ করেছে। আলো একই সঙ্গে কণা ও তরঙ্গ। এই দ্বৈত সত্তা যেন মানুষের জীবনের প্রতিফলন। আমাদের জীবনও কখনো স্থির, কখনোবা তরঙ্গের মতো অস্থির। তবে বিজ্ঞানের এই আলোর সমান্তরালে শিল্পীর চোখে এর রূপ ভিন্ন। যখন নগর বাউল জেমসের উদাত্ত কণ্ঠে বেজে ওঠে, ‘সুস্মিতার সবুজ ওড়না উড়ে যায়…/ উড়ে যায়…/ ছুঁয়ে যায় নিঝুম মফস্বলের সবুজ মাঠ,/ ছুঁয়ে যায় দুখিনী মায়ের দুখিনী ললাট,/ দূর আঁধারে দূর জঙ্গলে,/ ঐ পাহাড়ে, ঐ সাগরে/ ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যায়…’, তখন সেই ‘সবুজ ওড়না’ মামুলি কোনো বস্ত্র নয়; বরং আলোরই রূপক হয়ে ওঠে, যা সকল অনুর্বরতায় এনে দেয় উর্বরতা। আর সেই আলো ল্যাবরেটরির কোনো পরিমাপযোগ্য বস্তু থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর পাওয়া একচিলতে জয়। জেমসের গানে যে রোদের কথা বারবার আসে, তা মোলায়েম নয়; বরং তপ্ত, বিদ্রোহী। এই আলো মানুষকে টেনে নিয়ে যায় রাজপথে, যেখানে ‘পথের বাপই বাপ রে মনা’। নগর বাউলের গিটারের সোলো যখন অন্ধকারের বুক চিরে তীব্র আলোকচ্ছটা তৈরি করে, তখন বোঝা যায়, আলো মানেই গতি, আলো অর্থ স্বাধীনতা।
আলোর কথা বলতে গেলে অনিবার্যভাবে আসে অন্ধকারের অনুষঙ্গ। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার দিকে তাকালে আমরা এক অন্য ধরনের আলোর সন্ধান পাই। তার কবিতা মানেই যেন একাকিত্বের গলিঘুঁজি, অন্ধকার দেয়াল আর বৃষ্টির শব্দ। কিন্তু সেই অন্ধকারের গহিনেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন মানবিকতার পরম আলো। কবি যখন আকুল হয়ে বলেন, ‘মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও’, তখন সেই আহ্বানই হয়ে ওঠে সমাজের তিমির নাশের প্রধান অস্ত্র। শক্তির চোখে আলো মানে এক অস্থির সময়ের বুক চিরে সত্যকে খুঁজে বের করা। তার ‘অবনী বাড়ি আছো?’ কবিতার সেই নিঃসঙ্গতা আসলে আলোরই একধরনের পরোক্ষ অন্বেষণ। সে খুঁজে বেড়ায় তার জীবনের ধ্রুবতারাকে, যে আলোকিত করবে তার অন্তর। মানুষের মনের গহিনে যে বিষণ্নতার অন্ধকার জমে থাকে, শক্তির কবিতা সেখানে এক জ্বলন্ত প্রদীপের মতো কাজ করে, যা আমাদের নিজের ভেতরের সত্তাকে চিনতে শেখায়।
রাত আর দিনের সন্ধিক্ষণে যখন প্রথম আলোর রেখা পুব সাগরের জল ছুঁয়ে যায়, তখন সেই আলো পৃথিবীর কানে কানে দিয়ে যায় এক অমোঘ প্রতিশ্রুতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, সেই ‘তিমির-ভেদী’ আলোর বেশেই লুকিয়ে আছে জীবনের আদিমতম সত্য। আলো মানে কি শুধু কয়েক লক্ষ ফোটন কণার বিচ্ছুরণ?
মানব সভ্যতা, মানুষের মন বলে, আলো মানে আমাদের মজ্জায় মিশে থাকা সেই আদিম বাসনা, যা প্রতিটি ধ্বংসের পর নতুন করে সৃষ্টির স্বপ্ন দেখে। মানুষের অবচেতন মন অন্ধকারের চেয়ে আলোকে কেন বেশি আপন করে নেয়? কারণ, আলো মানে স্বচ্ছতা। জীবনের জটিল অলিগলি যখন অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢাকা পড়ে, তখন আমাদের অবচেতন একফালি রোদের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। এই তৃষ্ণা আত্মার। আলো শেখায়, জরা বা স্থবিরতা ধ্রুব নয়; বরং প্রতিটি ভোর একেকটি রিসেট বাটন, যা আমাদের তারুণ্য আর নতুনত্বের দিশা দেখায়। অন্ধকারে আমরা হাতড়াই, আর আলোয় খুঁজে পাই। এই ‘খুঁজে পাওয়া’র নাম উদ্ভাস। কোনো নতুন আইডিয়া মাথায় এলে আমরা বলি, মাথায় যেন বাতি জ্বলে উঠল! অর্থাৎ, অন্ধকার হলো স্থবির চিন্তা আর আলো মানে সৃজনশীলতার বিস্ফোরণ। আমাদের চারপাশের ধূসর সময়ে আলো নতুনত্বের প্রতীক হয়ে বারবার ফিরে আসে, আর তারুণ্যের স্পন্দন সেই আলোর ছন্দে নাচতে চায় প্রতিবার।
বিজ্ঞান বলছে, আলো একাধারে তরঙ্গ এবং কণা বা ফোটনের সমষ্টি। আমাদের চারপাশের জগৎকে দেখার জন্য এই ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন বা তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ অপরিহার্য। যখন আলো কোনো বস্তুর ওপর পড়ে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখের রেটিনায় পৌঁছায়, তখন আলোক-সংবেদনশীল কোষগুলো সেই সংকেত মস্তিষ্কে পাঠায় এবং আমরা বস্তুটি দেখতে পাই। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, আলোর গতিবেগ শূন্যস্থানে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৯ কোটি ৯৭ লাখ ৯২ হাজার ৪৫৮ মিটার। এই তীব্র গতি এবং আলোকশক্তির রূপান্তরই পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের স্পন্দন বজায় রাখে। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ আলোকশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তর করে, যা পরোক্ষভাবে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। তাই বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আলো মানেই শক্তির প্রবাহ এবং তথ্য আদান-প্রদান।
দর্শন বলে, আলো হলো সত্য ও জ্ঞান। প্লেটোর অ্যালিগোরি অব দ্য কেইভ বা গুহার রূপকে অন্ধকার ছিল অজ্ঞতা ও ভ্রান্ত ধারণার প্রতীক; আর বাইরের আলো মানে পরম জ্ঞান। তারুণ্য কেন আলোর ছন্দে নাচতে চায়? কারণ, তারুণ্য মানেই জড়তা ভাঙার সাহস। ধূসর সময় বা স্থবিরতা হলো স্থিতাবস্থা, যা মানুষকে সৃজনশীল হতে বাধা দেয়। আলো সেখানে একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করে, যা পুরোনো চিন্তাকে পুড়িয়ে নতুন স্বপ্নের উদ্ভাস ঘটায়। তাই আলো শুধু দেখার মাধ্যম নয়; এটি ক্রমাগত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার একটি চিরন্তন প্রেরণা।
ধরা যাক, একটি অন্ধকার গুহার ভেতর কিছু মানুষ জন্ম থেকে বন্দি। তাদের হাত-পা এবং ঘাড় শিকল দিয়ে এমনভাবে বাঁধা, যাতে তারা শুধু সামনের দেয়াল ছাড়া আর কিছু দেখতে পান না। তাদের পেছনে একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড জ্বলছে। সেই আগুনের সামনে দিয়ে যখন কোনো মানুষ বা প্রাণী যাতায়াত করে, তাদের ছায়া এসে পড়ে সামনের দেয়ালে। বন্দিরা সেই ছায়াগুলোকেই আসল জগৎ মনে করেন এবং ছায়ার শব্দকেই বিশ্বাস করেন আসল শব্দ হিসেবে। হঠাৎ যদি একজন বন্দিকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং তিনি গুহার বাইরে বেরিয়ে আসেন, তাহলে সূর্যের প্রখর আলোয় প্রথমে তার চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। আগে কখনোই প্রকৃত আলো দেখেননি বলে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাবেন তিনি। ধীরে ধীরে যখন তার চোখ অভ্যস্ত হবে, বুঝতে পারবেন, এতকাল যা দেখে এসেছেন, সবই ছিল মিথ্যে ছায়া। আসল জগৎ অনেক বেশি রঙিন, উজ্জ্বল ও জীবন্ত। তিনি বুঝতে পারবেন, সূর্যই সেই পরম সত্য, যা সব আলোর মূল উৎস। সেই ব্যক্তি যখন গুহায় ফিরে গিয়ে অন্য বন্দিদের বলবেন, ‘তোমরা যা দেখছ তা মিথ্যা, বাইরে এক বিশাল আলোর জগৎ আছে;’ তখন হয়তো অন্য বন্দিরা তাকে পাগল ভাববেন এবং মেরে ফেলার চেষ্টা করবেন। কারণ, তারা তাদের অন্ধকারের নিরাপদ জগৎ ছাড়তে ভয় পান।
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তার দ্য রিপাবলিক গ্রন্থে মানুষের জ্ঞান ও অজ্ঞতার পার্থক্য বোঝাতে অ্যালিগোরি অব দ্য কেইভ নামের এই রূপক ব্যবহার করেছিলেন। আমাদের চারপাশের চেনা জগৎ বা সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে অন্ধকার হচ্ছে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এবং গড্ডলিকা প্রবাহ। অন্যদিকে আলো পরম সত্য বা বিশুদ্ধ জ্ঞান।
আলো মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার এক পরম শুদ্ধি। মানুষ যে সর্বাত্মক ইতিবাচকতার কথা বলে, তা মানবিক গুণাবলির প্রতিটি স্তরে আলোর মতো বিচ্ছুরিত হয়। সততা হলো সেই আলো, যা মানুষের চরিত্রকে কাচের মতো স্বচ্ছ করে তোলে। অন্ধকারে যেমন অনেক কিছু লুকিয়ে রাখা যায়, তেমনি অসততা বা অনৈতিকতা মানুষের কুৎসিত দিকগুলো আড়াল করতে চায়। আলো যেখানে পড়ে, সেখানে কিছু লুকানোর উপায় থাকে না। একজন সৎ মানুষের চিন্তা ও কাজ আলোর মতোই উন্মুক্ত। এই স্বচ্ছতাই তাকে নির্ভীক করে তোলে; কারণ, তার ভেতরে কোনো অন্ধকার কোণ বা গোপন পাপবোধ নেই। মহৎ মানুষের গুণাবলি অন্ধকার পথে বাতিঘরের মতো কাজ করে। যখন কেউ নৈতিক সংকটে ভোগেন, তখন এই ইতিবাচক গুণগুলোই তাকে সঠিক পথ দেখায়। আলো যেমন ধূলিকণাকে উজ্জ্বল করে তোলে; মহত্ত্ব তেমনি সাধারণ মানুষকেও অনুপ্রাণিত করে অসাধারণ হয়ে উঠতে।
‘জ্ঞানের আলো’ কথাটি বহুল প্রচলিত হলেও এর গভীরতা সীমাহীন। অন্ধকার যেমন মানুষকে স্থবির ও ভীত করে রাখে, জ্ঞান তেমনি দেয় মুক্তি এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। অজ্ঞতা হলো এক প্রকার মানসিক অন্ধত্ব, যেখানে মানুষ কুসংস্কার ও সংকীর্ণতায় বন্দি থাকে। জ্ঞানের আলো যখন সেখানে পৌঁছায়, তখন ভ্রান্ত ধারণাগুলো প্লেটোর গুহার ছায়ার মতো মিলিয়ে যায়। জ্ঞানের আলো মানেই ইতিবাচকতার এক অবিরাম প্রবাহ। এটি শুধু তথ্য জানা নয়; বরং জগৎকে সুন্দরভাবে দেখার মানসিকতা। আলো যেমন সবকিছুকে সমানভাবে আলোকিত করে, প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে পরমতসহিষ্ণুতা শেখায়। গভীরতম অন্ধকারেও একটি ছোট মোমবাতির আলো যেমন জয়ের বার্তা দেয়, ইতিবাচক চিন্তা বা পজিটিভিটি তেমনি চরম দুঃসময়েও মানুষকে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়। আলোকিত মানুষ হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ পথ, নিজের ভেতরে প্রতিদিন একটি প্রদীপ জ্বালানোর চর্চা। সেই উদ্ভাস বা সৃজনশীলতার বিস্ফোরণকে জীবনের ধ্রুবতারা করতে চাইলে নিজের ব্যক্তিত্ব ও রুচিকে সেই আলোর ছাঁচে ঢেলে সাজানো দরকার।
আলোকিত মানুষ হওয়া এমনই নির্জন সাধনা, যা ব্যক্তিত্বকে দারুণ এক স্বচ্ছতায় নিয়ে যায়, যেখানে ধুলো জমতে পারে না। এই যাত্রার প্রথম ধাপ হলো রুচির আভিজাত্য। রুচি শুধু পোশাকে কিংবা কথায় থাকে না; থাকে ব্যক্তির আচরণ, নীরবতা এবং জীবন দেখার ভঙ্গিতে। একজন আলোকিত মানুষ যখন কথা বলেন, তার শব্দে অন্ধকারের স্থবিরতা থাকে না; থাকে ভোরের আলোর মতো স্নিগ্ধ নিশ্চয়তা। তিনি অন্যের রুচিকে আঘাত না করে, নিজের পরিশীলিত আচরণের আলোয় চারপাশের পরিবেশ বদলে দেন। ব্যক্তিত্বের এই আলোকায়ন শুরু হয় নিজের অন্ধকার বা সীমাবদ্ধতাগুলো চিনে নেওয়ার মাধ্যমে। প্লেটোর সেই গুহাবন্দি মানুষের মতো আমরাও অনেক সময় সংস্কারের শিকলে আটকে থাকি; যে শিকল ভাঙার জন্য প্রয়োজন নির্ভীক সততা। নিজের ভুলের সামনে দাঁড়িয়ে যে মানুষ বলতে পারেন, ‘আমি ভুল ছিলাম;’ তার মাথায় যেন সহসা হাজার ওয়াটের সেই বাতি জ্বলে ওঠে! এই স্বচ্ছতাই প্রকৃত আভিজাত্য। যে ব্যক্তিত্বে মিথ্যে কিংবা কৃত্রিমতার অন্ধকার নেই, সেই ব্যক্তিত্বই হয়ে ওঠে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা।
তারুণ্যের যে স্পন্দনের কথা মানুষ বলে, সেটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন নিজের ভেতরে সৃজনশীল বিস্ফোরণ ঘটানো প্রয়োজন। এটি হতে পারে একটি নতুন শব্দ শেখা, কোনো নতুন সুরের গভীরে ডুবে যাওয়া কিংবা নিছক এক কাপ চা হাতে নিয়ে জানালার ধারের ধূসর সময়কে পৃথিবীর কবিতার রঙে রাঙিয়ে তোলা। ব্যক্তির রুচি যখন সূক্ষ্ম হবে, তখন তিনি সাধারণের মাঝেও অসাধারণকে খুঁজে পাবেন। খুঁজে পাওয়ার এই যে আনন্দ, এই যে উদ্ভাস, এটিই তাকে ভিড় থেকে আলাদা করবে। কেননা, আলোকিত মানুষ হওয়া মানে এক হাতে জ্ঞানের মশাল ধরা আর অন্য হাত আর্তের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া। তাই ব্যক্তিত্ব যেন এমন হয়, আপনার উপস্থিতিতে চারপাশের মানুষের ভেতরের ভয় বা হীনম্মন্যতার অন্ধকার কেটে যাবে। আপনি যখন নিজের রুচি আর নৈতিকতাকে মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপন করবেন, তখন নিজেই একটি জীবন্ত কবিতা হয়ে উঠবেন। সেই কবিতায় ছন্দ দেবে আপনার নীতি, আর প্রাণ দেবে নিজ অন্তরের সেই চিরন্তন আলো।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কল্যাণে আমাদের সমাজে ‘আলোকিত মানুষ’ শব্দবন্ধটি আজ অত্যন্ত জনপ্রিয়। তার মতে, আলোকিত মানুষ হওয়ার মানে শুধু অনেক তথ্য জানা নয়; বরং নিজের ভেতরকার উচ্চতাকে স্পর্শ করা। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। এই স্বপ্নই হলো আলো। বই পড়া, শিল্পচর্চা এবং সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে একজন মানুষ যখন তার সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসে, তখনই সে প্রকৃত অর্থে আলোকিত হয়। এই আলো তাকে স্বার্থপরতার অন্ধকার থেকে মুক্তি দেয়। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের এই দর্শন আসলে জেমসের গানের সেই বোহিমিয়ান মুক্তি আর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার সেই মানবিকতারই আরেক রূপ। একটি প্রদীপ যেমন নিজেকে পুড়িয়ে অন্যকে আলো দেয়, একজন প্রকৃত মানুষকেও তেমনি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে হয়।
সৃজনশীলতায় আলো একটি শক্তিশালী রূপক। চলচ্চিত্রে যখন কোনো অন্ধকার দৃশ্য থেকে হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখা যায়, সেটি অনেক সময় মুক্তির সংকেত দেয়। একইভাবে জীবনের জটিলতায় আমরা যখন বারবার পথ হারাই, তখন চারপাশের জরা আর জঞ্জাল আমাদের গ্রাস করতে চায়। সেই সময় বাইরের কোনো প্রদীপ আমাদের বাঁচাতে পারে না। তখন প্রয়োজন হয় নিজস্ব বিবেকের আলো।
আলোর শক্তি অসীম। তা যেমন বিজ্ঞানের সূত্রে ধরা দেয়, তেমনি জেমসের গিটারে কিংবা শক্তির কবিতায় বিদ্রোহের সুর হয়ে বেজে ওঠে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই ‘তিমির ভেদি’ পথিকের মতো হওয়া, যিনি নিজের ভেতরের অন্ধকারকে জয় করে সুন্দরকে আহ্বান জানাতে জানেন। তাই প্রকৃত আলোকে আলিঙ্গন করে নেওয়া চাই নিজ জীবনে।
মডেল: পারসা ইভানা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: আনোখি
ছবি: জিয়া উদ্দীন
