skip to Main Content

ফিচার I ঘরের সাজে বাঙালিয়ানা

বৈশাখ। পুরোনোকে ঝেড়ে ফেলে নতুন সূচনার এক উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতি। গৃহসজ্জায়ও থাক তার ছোঁয়া

প্রকৃতির মতো মানুষের মনও নতুন করে সেজে ওঠে নতুন বছরে। এই সাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ঘর; যা আমাদের আশ্রয়, পরিচয় আর সংস্কৃতির প্রতিফলন। পয়লা বৈশাখ ঘিরে ঘরের সাজে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া যুক্ত করা মানে শৌখিন পরিবর্তনের পাশাপাশি নিজের শিকড়ের সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি। বাংলার গৃহসজ্জার ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। মাটির ঘর, খড়ের ছাউনি, আলপনা আঁকা উঠোন—সবই ছিল একসময়কার রূপসী বাংলার স্বাভাবিক চিত্র। আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই রূপ বদলালেও বাঙালিয়ানার সৌন্দর্য এখনো বিভিন্নভাবে আমাদের ঘরের সাজে ফিরে আসে। বৈশাখের সময় এই ঐতিহ্যকে নতুন করে তোলা যায় খুব সহজ কিছু উপায়ে, যা ঘরে এনে দেয় উৎসবের আবহ, আর মনে জাগায় একধরনের স্মৃতিকাতরতা।
শুরুতেই আসে রং প্রসঙ্গ। বৈশাখ মানেই উজ্জ্বল রঙের অপূর্ব মেলবন্ধন। ঘরের পর্দা, কুশন কভার, টেবিল রানার কিংবা বিছানার চাদরে যদি উজ্জ্বল রং ব্যবহার করা যায়, তখন ঘরে তৈরি হয় নতুন শুরুর আবহ। শুধু লাল-সাদা নয়; সঙ্গে হলুদ, কমলা বা সবুজের মতো রংও যোগ করা যেতে পারে, যা বসন্তের শেষ আর গ্রীষ্মের শুরু—এই সময়কালের মেজাজ যথার্থ ফুটিয়ে তোলে।
গৃহসজ্জায় বাঙালিয়ানার অন্যতম পরিচায়ক আলপনা। একসময় গ্রামবাংলার ঘরের মেঝে বা উঠোনে চালের গুঁড়া দিয়ে আঁকা হতো নানা নকশা। এখনো সেই ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব—হোক তা মেঝেতে, দেয়ালে, কিংবা টেবিলের ওপর ছোট্ট আলপনার নকশার মাধ্যমে। আজকাল স্টিকার বা পেইন্টের সাহায্যে সহজে এই কাজ করা যায়, যা দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি ঐতিহ্যের ধারাও বজায় রাখে। মাটির তৈরি জিনিসপত্র গৃহসজ্জায় যোগ করে দারুণ মাত্রা। মাটির কলস, হাঁড়ি, ফুলদানি কিংবা শোপিস—এসবের মধ্যে রয়েছে একধরনের সরল সৌন্দর্য, যা অন্য কোনো উপাদানে পাওয়া ভার। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ঘরের কোনায় একটি মাটির কলসে গাঁদা বা রজনীগন্ধা ফুল সাজিয়ে রাখলে যেমন দৃষ্টিনন্দন হয়, তেমনি ঘরে এনে দেয় গ্রামীণ আবহ। পাট, বাঁশ বা বেতের তৈরি আসবাব ও সামগ্রীও বাঙালিয়ানার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাটের দড়ি দিয়ে তৈরি দেয়ালের হ্যাংগিং, বেতের চেয়ার কিংবা বাঁশের তৈরি ল্যাম্পশেড—এসব ব্যবহার করলে ঘরে একধরনের প্রাকৃতিক ও শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়। এই উপকরণগুলো যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি আমাদের লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত।
দেয়াল সাজানোর ক্ষেত্রেও নববর্ষে আনা যেতে পারে ভিন্নতা। বাংলার গ্রামীণ জীবন, পটচিত্র, নকশিকাঁথা বা লোকজ শিল্পের ছবি ফ্রেম করে দেয়ালে টাঙানো যেতে পারে। এসব ছবির মধ্যে থাকে গল্প, ইতিহাস আর মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। সেই সঙ্গে ঘর হয়ে উঠবে একেকটি জীবন্ত ক্যানভাস। নকশিকাঁথা বাঙালির আবেগের সঙ্গে জড়িত একটি ঐতিহ্য। সূচিশিল্পে আবহমান বাংলার নিত্যদিনের জীবনের বহিঃপ্রকাশ। বিছানায়, সোফায় বা দেয়ালে নকশিকাঁথা ব্যবহার করলে তা যেমন দৃষ্টিনন্দন হয়, তেমনি ঘরে এনে দেয় গভীর সাংস্কৃতিক অনুভূতি। বৈশাখের সময় এই নকশিকাঁথার ব্যবহার যেন আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
আলোও গৃহসজ্জার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোমল, উষ্ণ আলো ঘরের পরিবেশকে অনেকটাই বদলে দিতে পারে। মাটির প্রদীপ, কাগজের লন্ঠন কিংবা হাতে তৈরি ফেইরি লাইট ব্যবহার করে তৈরি করা যায় মায়াবী আবহ। সন্ধ্যায় এই আলোয় যখন ঘর ভরে ওঠে, মনে হয় যেন সময় একটু থেমে গেছে শুধু উপভোগ করার জন্য। ঘরের সাজে গাছপালার ব্যবহারও বৈশাখের সঙ্গে মানানসই। টবে লাগানো মানিপ্ল্যান্ট, তুলসীগাছ কিংবা ফুলগাছ ঘরে এনে দেয় প্রাণের স্পর্শ। বারান্দা বা জানালার পাশে কিছু সবুজ গাছ রাখলে তা সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি মন প্রশান্ত করে।
বৈশাখের গৃহসজ্জা কি শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন? একেকটি গৃহের আবহ আমাদের মনস্তত্ত্বে একেক ধরনের অনুভূতির সৃষ্টি করে। যে ঘরের ছাপে বাঙালি অস্তিত্ব দৃশ্যমান, সেই ঘর মনে করিয়ে দেয়—আমরা কোথা থেকে এসেছি, আমাদের সংস্কৃতি কী, আর পরিচয় কোথায় নিহিত। বছরের এই সময়ে ঘর সাজানোর মাধ্যমে আমরা যেন নিজেদের ভেতরের বাঙালিয়ানাকেও নতুন করে খুঁজে পাই। গৃহসজ্জায় প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা নান্দনিকতার পাশাপাশি জীবনযাপন ও মানসিকতার উৎকর্ষ প্রকাশ ঘটায়। কাঠ, বাঁশ, বেত, মাটি, পাট কিংবা বিভিন্ন গাছপালা—এসব উপাদান গৃহে এনে দেয় একধরনের স্বাভাবিকতা ও প্রশান্তি, যার অনুভব কৃত্রিম কিছুতে বিরল।
প্রথমত, প্রাকৃতিক উপাদানের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর সরলতা। এগুলোর রং, গড়ন ও বুনন এমনভাবে তৈরি, যা চোখে আরাম দেয় এবং পরিবেশ শান্ত করে। যেমন একটি মাটির ফুলদানি বা বাঁশের ল্যাম্পশেড ঘরের কোনায় রাখলেই সেখানে একধরনের উষ্ণ ও স্বাভাবিক আবহ তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক উপাদান ঘরের সঙ্গে মানুষের একটি মানসিক সংযোগ ঘটায়। আমরা প্রকৃতির অংশ, তাই প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ আমাদের মনে স্বস্তি আনে।

ঘরে গাছপালা বা প্রাকৃতিক উপকরণ থাকলে তা দুশ্চিন্তা কমায় এবং ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে। তৃতীয়ত, বাঙালিয়ানার সঙ্গে প্রাকৃতিক উপাদানের সম্পর্ক খুব গভীর। গ্রামবাংলার ঘরবাড়ি, মাটির হাঁড়ি, পাটের আসন বা বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র আমাদের ঐতিহ্যেরই অংশ। তাই এসব উপাদান ব্যবহার করলে ঘরের সাজে শুধু সৌন্দর্যই বাড়ে না; বরং নিজের সংস্কৃতির একটি ছোঁয়াও যুক্ত হয়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক উপাদান পরিবেশবান্ধব। এগুলো সহজে নষ্ট হয় না কিংবা প্রকৃতির ক্ষতি করে না; বরং পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও টেকসই। এদিক থেকে এটি আধুনিক জীবনের জন্য একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল পছন্দ।
সবচেয়ে বড় কথা, গৃহসজ্জা খুব ব্যয়বহুল বা জটিল হতেই হবে, এমন নয়; বরং সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত এবং নিজের মতো করে সাজানো শ্রেয়। হাতে বানানো কিছু জিনিস, পুরোনো কিছু উপকরণের নতুন ব্যবহার—এসবের মধ্যে লুকিয়ে থাকে প্রকৃত সৌন্দর্য।

 লাইফস্টাইল ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top