skip to Main Content

এডিটর’স কলাম I মনের যত্নে

মনের যত্ন না নিলে সেই শূন্যস্থানে বাসা বাঁধে দীর্ঘশ্বাস আর অবসাদ। মনের কষ্ট দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু বিষণ্নতায় আটকে থাকে না; বরং শরীরে নানা জটিল রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়

যাপিত জীবনের ব্যস্ততায় আমরা শরীরের ক্ষত দেখতে পাই; কিন্তু মনের ভেতর জমে থাকা ধুলোবালি প্রায়শই নজরে আসে না। অথচ শরীর একটি যন্ত্র হলে মন তার চালিকাশক্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক প্রশান্তি ছাড়া মানুষের সুস্বাস্থ্য শুধু একটি অসার ধারণামাত্র। তাই মনের যত্ন নেওয়া বেঁচে থাকার অনিবার্য কৌশল। মনোবিজ্ঞানের কঠিন সংজ্ঞার বাইরে এমন যত্নের মানে হলো নিজের মন খারাপকে একটু জায়গা দেওয়া। আমরা অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে অনেক সময় নিজের ভেতরের সত্তাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলি। মনের যত্ন মানে নিজের কষ্টগুলোকে লুকিয়ে না রেখে আলিঙ্গন করতে শেখা, ক্ষতগুলো সারিয়ে তোলা।

দুই
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মনের যত্ন নেওয়া মানে নিজের ভেতরের ‘আমি’র সঙ্গে সন্ধি স্থাপন। আমরা অন্যের প্রত্যাশা মেটাতে গিয়ে নিজের আবেগ, অভিমান আর ক্লান্তিগুলোকে আড়ালে ঠেলে দিই। মনের যত্ন মানে সেই অবদমিত অনুভূতিগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া। যখন আমরা নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিই এবং প্রতিকূলতায় ভেঙে না পড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি সঞ্চয় করি, তখনই প্রকৃত অর্থে মানসিক পরিচর্যা শুরু হয়। এটি আমাদের স্নায়বিক ভারসাম্য রক্ষা করে এবং জীবনের জটিল অঙ্কগুলো মেলাতে সহায়ক। একটি সুস্থ ও শান্ত মন শুধু নিজের জন্য নয়; চারপাশের মানুষের জন্যও একপশলা বৃষ্টির মতো শীতল। মন যখন সতেজ থাকে, তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে, অনিদ্রা দূর হয় এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমে। ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির চিকিৎসায় ডাক্তাররা বলেন, অর্ধেক লড়াই-ই মানসিক। প্রফুল্ল মনে কাজ করলে সৃজনশীলতা বাড়ে, কঠিন কাজও সহজ মনে হয়। একজন মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক শক্তির উৎস। তিনি অন্যের দুঃখ বুঝতে পারেন, সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। সুস্থ মানসিকতার মানুষেরা সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির বীজ বপন করেন, যা একটি বিবাদহীন সুন্দর সমাজ গঠনে সহায়ক। মনের যত্ন না নিলে সেই শূন্যস্থানে বাসা বাঁধে দীর্ঘশ্বাস আর অবসাদ। মনের কষ্ট দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু বিষণ্নতায় আটকে থাকে না; বরং শরীরে নানা জটিল রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়। অনেক সময় মানুষ একাকিত্ব ঘোচাতে মাদক বা ক্ষতিকর অভ্যাসে আসক্ত হয়ে পড়ে। জীবন হয়ে ওঠে লক্ষ্যহীন ও ধূসর; বেড়ে যায় হতাশা। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তি অনেক সময় অসহিষ্ণু হয়ে পড়েন। ছোটখাটো বিষয়ে মেজাজ হারানো কিংবা সহিংস আচরণ পরিবারের শান্তি বিনষ্ট করে। সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার ফলে তৈরি হয় এক দুর্ভেদ্য নিঃসঙ্গতা, যা সামগ্রিকভাবে একটি জাতির কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

তিন
স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের এই মায়াবী অথচ যান্ত্রিক জগতের গোলকধাঁধায় আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তথ্যের এই অবিরাম ও প্রবল জলোচ্ছ্বাস আমাদের স্নায়ুর ওপর এক দুঃসহ চাপ সৃষ্টি করছে, যা থেকে পরিত্রাণ পেতে মাঝেমধ্যে পূর্ণ বিরতি নেওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। যান্ত্রিক পর্দার নীল আলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জানালার ধারে কিছুক্ষণ নিথর এবং স্তব্ধ হয়ে বসে থাকার মাঝে যে আদিম ও অকৃত্রিম প্রশান্তি লুকিয়ে আছে, তা পৃথিবীর কোনো কৃত্রিম বিনোদন বা ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা এনে দিতে পারে না। বারান্দার কোণে রাখা ওই একচিলতে সবুজের দিকে যখন আমরা অপলক তাকিয়ে থাকি, তখন প্রকৃতির সেই নিবিড় সান্নিধ্য হৃদয়ে এক প্রশান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দেয়। মানসিক প্রশান্তিও কিন্তু আমাদের শরীরের জটিল জৈবিক প্রক্রিয়ার এক অবিচ্ছেদ্য প্রতিফলন।
আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, মন ও শরীর একে অপরের পরিপূরক। যখন আমরা যোগব্যায়াম বা ইয়োগার মতো শারীরিক অনুশীলনে মগ্ন হই, তখন ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের প্রবাহ বহুগুণ বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত অক্সিজেন আমাদের স্নায়বিক উত্তেজনা প্রশমিত করে এবং স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা কমিয়ে হৃদয়ে অনাবিল ও তাৎক্ষণিক প্রশান্তি বয়ে আনে। মানসিক সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি হিসেবে পর্যাপ্ত নিদ্রা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসকে অবহেলার অবকাশ নেই; এটি মস্তিষ্কের একটি প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান। গভীর ঘুমের স্তরে মস্তিষ্ক তার অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি ও বিষাক্ত উপাদানগুলো ছেঁকে ফেলে আমাদের পুনরায় সজীব করে তোলে। সঠিক খাদ্য উপাদান মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারগুলো সচল রাখে, যা বিষণ্নতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। এগুলো শুধু দৈনন্দিন অভ্যাস নয়; বরং মানসিক সুস্বাস্থ্যের প্রকৃত মহৌষধ।

চার
হৃদয়ের গহিনে জমে থাকা পাথরসম অব্যক্ত যাতনাগুলো যখন কোনো প্রিয় ও বিশ্বস্ত মানুষের কাছে ব্যক্ত করা হয়, তখন মনের সেই অদৃশ্য ভার নিমেষে লাঘব হয়। এই ভাগ করে নেওয়া বা ‘শেয়ারিং’ শুধু দুঃখই কমায় না; বরং মানুষের একাকিত্বের বোধকেও দূর করে। তবে জীবনের সংকট যখন আরও ঘনীভূত হয়, তখন কোনো পেশাদার কাউন্সিলর বা বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া মোটেই দুর্বলতা নয়। এটি নিজ জীবনের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা এবং অনন্য সাহসিকতার পরিচয়। নিজের মানসিক সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে সাহায্যের হাত বাড়ানোই হলো একটি সুস্থ, সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের প্রথম ও প্রধান ধাপ। যখন আমরা শরীরের যত্ন নিই, মন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার প্রতিদান দেয়। একটি সচল ও সুস্থ শরীরই একটি শান্ত এবং স্থির মনের শ্রেষ্ঠ আবাসস্থল। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মনে চেপে রাখা ভার। মনের অব্যক্ত ক্ষতগুলো ভেতরে পুষে রাখলে তা কালক্রমে যন্ত্রণার পাহাড়ে পরিণত হয়। বিশ্বস্ত কারও কাছে তা প্রকাশ করা মানে নিজেকে ভারমুক্ত করে পুনরায় মুক্তভাবে শ্বাস নেওয়া। পেশাদার কাউন্সেলরকে সামাজিক জড়তা বা ‘ট্যাবুর’ ঊর্ধ্বে দেখা আজ সময়ের দাবি। নিজের মনের যত্ন নেওয়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ, আর এই যাত্রায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া এক বিচক্ষণ ও বীরোচিত সিদ্ধান্ত।

পাঁচ
জীবন একটি দীর্ঘ যাত্রা, আর মন সেই যাত্রার নিত্যসঙ্গী। আমরা যদি ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখতে পারি, তবে কেন মনের মণিকোঠা অবহেলায় পড়ে থাকবে! মনের যত্ন নেওয়া মানে নিজেকে ভালোবাসা। যখন আমাদের ভেতরের জগৎ আলোয় ভরে উঠবে, তখনই বাইরের পৃথিবীটা আরও সুন্দর ও অর্থবহ হয়ে ধরা দেবে।
নতুন বছরে নিজের মনের যথাযথ যত্ন নিন সবাই। দিন আনন্দে কাটুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top