রম্যরস I মামলা-সুমন্ত আসলাম
সম্মানের শেষটুকু খুলে ফেলার আগেই হাত দিয়ে ইশারা করলেন সোলেমান পাটোয়ারী। কিছুটা রূঢ় গলায় বললেন, ‘মজুল্যা, থাম।’
থেমে গেল মজুল্যা। অতি উৎসাহী হয়ে সে এতক্ষণ বাশার মুন্সীর কাপড়চোপড় খুলছিল। প্রথমে তার গায়ের শার্টটা খুলল সে। তারপর সেটা ছুড়ে ফেলে দিল মাটির ওপর। বাশার মুন্সী কাতর গলায় বললেন, ‘কাজটা কি ঠিক করলেন, ভাইজান! গত বিবাহবার্ষিকীতে আমার বউ শখ করে শার্টটা কিনে দিয়েছিল। সেটা এভাবে ছুড়ে মারলেন আপনি!’
‘কেবল তো শার্ট ছুড়ে মারলাম, একটু পর তোরে ছুড়ে মারমু।’
‘এটা আপনি কী বললেন!’
‘কেন, বোঝোস নাই? আমি কি হিব্রু ভাষায় কথা বলেছি, না চায়নিজ ভাষায়!’ মজুল্যা কথা বলতে বলতে বাশার মুন্সীর স্যান্ডো গেঞ্জিটা খুলে ফেলল। সেটাও জামার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘সোজা হয়ে দাঁড়া।’
ভীত স্বরে বাশার মুন্সী বললেন, ‘কেন?’
‘প্যান্ট খুলমু তোর।’
‘এটা আপনি কী বললেন, জনাব!’
‘কী বললাম, সেটা আপাতত না বুঝলেও চলব। সোজা হয়ে দাঁড়াতে বলেছি, সোজা হয়ে দাঁড়া।’
বাশার মুন্সীর দিকে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে মজুল্যা বলল, ‘ওভাবে ঠ্যাং ভাঙা কুত্তার মতো বাঁকা হয়ে দাঁড়ায়া আছোস কেন, সোজা হয়ে দাঁড়া। আসমানের দিকে মাথা উঁচা কইর্যা দাঁড়া।’
আগের মতোই দাঁড়িয়ে থেকে বাশার মুন্সী বললেন, ‘আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি, জনাব। আমার বড় মেয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে, ইকোনমিকসে; ছোট মেয়েটা পড়ে ভিকারুননিসাতে, ক্লাস নাইনে। আমার বয়স চুয়ান্ন বছর। ঠিক সময়ে বিয়ে করলে আপনার বয়সী একটা যুবক ছেলেও থাকত আমার। সেই আমাকে আপনি তুই তুই করছেন, সেটা কি ভালো দেখাচ্ছে!’
‘তুই তো তুই, এর চেয়ে যদি নিচের কিছু থাকত, তোরে তাই বলে সম্বোধন করতাম। তুই যে কাজ করেছিস, তোরে…!’ মজুল্যা তোতলাতে থাকে, কিছু মনে আসছে না তার। কয়েক সেকেন্ড পর ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘তোরে কী করমু, আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। ওই, তোরে সোজা হয়ে দাঁড়াতে কইলাম না, তোর প্যান্ট খুলমু আমি।’
মজুল্যা বাশার মুন্সীর প্যান্টের কোমরে হাত দিতেই স্যাত করে সরে গেলেন তিনি। রেগে উঠতে নিয়েই দ্রুত ঠান্ডা হয়ে বললেন, ‘জনাব, আমি কিন্তু সম্মানজনক একটা চাকরিও করি। আপনি যদি আমাকে এভাবে বেইজ্জতি করেন, আমার আর মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না।’
‘সম্মানজনক চাকরি শুধু তুই-ই করিস, আর কেউ করে না!’
‘করে তো।’
‘তাদের যদি সম্মান যায়, তাহলে তোরও যাবে।’ মজুল্যা আবার প্যান্টে হাত লাগাতে যায়, এবারও স্যাত করে সরে যান মুন্সী। কিন্তু তার আগেই প্যান্টের বেল্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ফেলে মজুল্যা। সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা কেমন যেন ঘুরে ওঠে মুন্সীর। বাইন মাছের মতো মোচড়াতে থাকেন তিনি, শক্ত করে ধরা বেল্টটা ছাড়াতে চেষ্টা করেন। পারেন না, মোচড়ানোও বন্ধ করেন না।
ভীষণ বিরক্ত হয় মজুল্যা। পাশে দাঁড়ানো ছেলেটার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ওই শফিকক্যা, তাকায়া দেখস কী, শালারে ধর।’
বিজ্ঞের মতো গলার স্বর শফিকের, ‘এত পিছলা-পিছলির কী আছে, হাত-পা বাইন্ধ্যা ফালাই ওর। তারপর যা যা পরনের আছে, আরাম করে তা খুলে ফেলি।’
‘ভালোই কইছস। যা, দড়ি নিয়া আয়।’
শফিক যেতে নিতেই থমকে দাঁড়াল, যেতে হলো না তাকে। কারণ, সে এক পা বেরোতেই সোজা হয়ে দাঁড়ালেন মুন্সী। বেশ বিচক্ষণ মানুষ তিনি। বিচক্ষণ মানুষেরা অনেক কিছু আগেই বুঝতে পারেন। তিনিও বুঝতে পেরেছেন—যেভাবেই হোক তার প্যান্ট যেহেতু খুলেই ফেলবে তারা, তাহলে শুধু শুধু কোরবানির গরুর মতো নিজেকে বাঁধতে দেওয়া কেন।
বেল্টের হুকটা খুলে মজুল্যা প্যান্টের বোতামটায় হাত দিল মুন্সীর। দুহাতের আঙুলের চাপেও খুলতে পারল না সেটা। অনেক কসরত করে খোলার পর সামনের চেইনের নবটা ধরল সে। নিচের দিকে নামাতে নামাতে একপলক মুন্সীর মুখের দিকে তাকাল। তার চেহারার ভঙ্গি দেখে ফিক করে হেসেও ফেলল; কিন্তু শব্দ করল না। তবে প্যান্টটা সম্পূর্ণ খোলার পর হাসি আর ধরে রাখতে পারল না সে। টকটকে লাল একটা আন্ডারপ্যান্ট পরেছেন মুন্সী। তাকে এ মুহূর্তে অবিকল একটা বাচ্চা ছেলের মতো লাগছে দেখতে, যে বাচ্চা লাল হাফপ্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে!
হাফপ্যান্ট খুলতে গিয়ে মজুল্যা নিজেই কেমন যেন ইতস্তত করতে লাগল। শফিকের দিকে একপলক তাকাল, ইশারাও করল। শফিকও ইশারা করে জানিয়ে দিল—না, তার দ্বারাও সম্ভব না। কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল সিদ্ধান্তহীনতায়।
খুক করে একটু কাশি দিল মজুল্যা। উত্তরে শফিকও দিল। কিন্তু বাশার মুন্সী রয়ে গেলেন আগের মতোই। লাল টকটকে হাফপ্যান্ট পরে তিনি তাকিয়ে আছেন দুজনের দিকে, তারা তাকিয়ে আছে পরস্পরের দিকে। কেটে গেল আরও কয়েক সেকেন্ড।
ফোঁত করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে কেমন যেন একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল মজুল্যা। ইতস্তত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকালও একবার। তারপর বাশার মুন্সীকে পাশে রেখে, ঠিক তার দিকে সরাসরি না তাকিয়ে, বাঁ হাত বাড়িয়ে দিল লাল প্যান্টটার দিকে। প্যান্টটা ছুঁয়েও ফেলেছিল সে। ঝটকা দিয়ে কেবল টান দেবে, ঠিক তখনই দরজাটা খুলে গেল ঘরের। সোলেমান পাটোয়ারী রূঢ় গলায় বললেন, ‘মজুল্যা, থাম।’
ঘরের ভেতর চলে এলেন সোলেমান পাটোয়ারী। সঙ্গে আরও তিনজন। বাশার মুন্সীর একেবারে কাছে এসে তিনি বললেন, ‘আপনার সাহসের তারিফ করতে হয়, বাশার সাহেব। আমার কথায় কোলের বাচ্চা পর্যন্ত ভয়ে মায়ের দুধ খাওয়া বন্ধ করে, আর সেই আপনি কিনা…।’ কথাটা শেষ করেন না পাটোয়ারী। কেবল নিজের দু গালে হাত বোলাতে থাকেন আলতোভাবে। দুচোখে রাগ, চেহারাও কঠিন হয়ে গেছে, কেমন যেন ফুঁসছেন তিনি। হঠাৎ বাশার মুন্সীর মুখে থুতু ছিটিয়ে দিলেন একদলা। থুতুটা ঠিক মুখে লাগল না, পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় ডান কানে এসে থেমে গেল। হাত উঁচু করে সেখানটায় নিতে গিয়েই থেমে গেলেন বাশার মুন্সী।
বাশার মুন্সীর আজকের দিনটাই শুরু হয়েছে অন্য রকমভাবে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কেমন যেন পেটব্যথা টের পেলেন তিনি। স্ত্রীকে ডেকে বললেন, ‘জাহানারা, আমার পেটে প্রচণ্ড ব্যথা। কিন্তু আমি কোনো রকম চিৎকার করছি না। ভদ্রলোকের মতো চুপচাপ বসে আছি। আমি কেন ভদ্রলোক, বলো তো?’
নাশতা বানানোর সময় চুলায় তেমন গ্যাস ছিল না, পাতিল গরম করা যায়নি তাতে। কিন্তু মেজাজ ঠিকই গরম হয়ে গিয়েছিল জাহানারা বেগমের। সেই গরম মেজাজ আরও গরম করে বললেন, ‘তুমি ভদ্রলোক আছো সুযোগের অভাবে!’
বাশার মুন্সী মুচকি হেসে বললেন, ‘আমার যে পেটে ব্যথা, তাতে আমার চিৎকার করা উচিত এখন, কিন্তু আমি তা করছি না। কারণ, আমি চিৎকার করলেই আশপাশের মানুষজন ভাববে, আমার খান্ডারনি স্ত্রী আমাকে পেটাচ্ছে, আর আমি সইতে না পেরে চিৎকার করছি।’
কঠিন চোখে স্বামীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন জাহানারা বেগম। তারপর সমস্ত ক্ষোভ একত্র করে বললেন, ‘তোমার মতো পুরুষেরা কেন জন্মেছে, জানো?’
বাশার মুন্সী হাসতে হাসতে বললেন, ‘মিথ্যা কথা বলার জন্য।’
‘আর আমার মতো মেয়েরা?’
‘সেই কথা বিশ্বাস করার জন্য।’
‘তুমি একটা…।’ জাহানারা বেগম তোতলাতে তোতলাতে বলেন, ‘দেখো, আমি একদিন ঠিকই গলায় দড়ি দিয়ে মরব।’
বাশার মুন্সী আগের মতোই হাসতে হাসতে বললেন, ‘সেটা দেখার সৌভাগ্য কি আমার হবে!’
‘কী!’ রাগে কাঁপতে থাকেন জাহানারা বেগম। সারা শরীরে কাঁপুনি নিয়েই বলেন, ‘কী কারণে যে তোমার সঙ্গে প্রেম করেছিলাম!’
‘চরানোর জন্য।’
‘মানে!’
‘প্রেমে পড়লে ছেলেরা হয় গাধা, আর মেয়েরা সেই গাধা চরায়।’
হাতের কাছে একটা ফুলদানি ছিল, সেটা ছুড়ে মারেন জাহানারা বেগম। সরাসরি সেটা লাগে বাশার মুন্সীর কপালে। হাত দিয়ে দেখেন, ফেটে গেছে সেখানে। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য দ্রুত বের হন বাসা থেকে। ততক্ষণে তার পেটের ব্যথাটা আরও বেড়েছে। ডাক্তার মাথাটা ব্যান্ডেজ করার পর বললেন, ‘আপনি এভাবে কোকাচ্ছেন কেন? মাথায় কি খুব ব্যথা করছে?’
‘না, ব্যথা মাথায় করছে না।’
‘তাহলে কোথায় করছে?’
‘পেটে।’
‘পেটে! কই, দেখি দেখি।’ বিছানায় শুইয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষার পর ডাক্তার বললেন, ‘আপনার তো গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা।’ প্রেসক্রিপশন লিখে হাতে দিয়ে বললেন, ‘এই ওষুধগুলো খাবেন, আর কিছু নিয়ম মেনে চলবেন, ভালো হয়ে যাবেন।’
ভিজিট দিয়ে প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে ডাক্তারের রুমের বাইরে চলে এলেন বাশার মুন্সী। কিন্তু মনটা কেমন যেন করতে লাগল তার। মনে হচ্ছে, এটা আসলে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা নয়, অন্য কোনো সমস্যা। ঢাকা শহরে এখন ক্লিনিক আর স্কুলের ছড়াছড়ি। রাস্তায় রাস্তায় স্কুল আর ক্লিনিক। দুটো ব্যবসাই এখন জমজমাট। হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূর যাওয়ার পর সামনে একটা ক্লিনিক চোখে পড়ল তার। মনের সন্দেহ দূর করতে একটা চেম্বারে ঢুকে পড়লেন তিনি। ডাক্তার বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘টিকিট কেটেছেন আপনি?’
বাশার মুন্সী অবাক হয়ে বললেন, ‘কিসের টিকিট?’
‘আমাদের এখানে কোনো ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিতে হলে আগে টিকিট কাটতে হয়।’
‘টিকিটের দাম কত?’
‘পাঁচ শ টাকা।’
‘পাঁচ শ টাকা!’ বাশার মুন্সী কিছুটা ভীত গলায় বললেন, ‘পাঁচ শ টাকা হলে তো কসাইয়ের কাছে গিয়ে তাজা একটা গরু জবাই করে এক কেজি মাংস কিনে আনা যাবে। অবশ্য আপনিও একধরনের কসা…।’ কথাটা শেষ করলেন না বাশার মুন্সী। বাইরে থেকে টিকিট কেটে এনে ডাক্তারের হাতে দিতেই ডাক্তার পেটে দুটো গুঁতো দিয়ে বললেন, ‘আপনার তো অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছে।’
‘অ্যাপেন্ডিসাইটিস!’
‘হ্যাঁ।’ চোখ বড় করে ফেললেন ডাক্তার, ‘অপারেশন করতে হবে। না হলে…।’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। তারপর হতাশার ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক করতে লাগলেন মাথাটা।
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন বাশার মুন্সী। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার বললেন, ‘কোথায় যাচ্ছেন আপনি?’
‘আপনার কথা শুনে মনে হলো, অপারেশন না করালে একটু পরই মারা যাব আমি। যাক, কী আর করা। বয়স তো আর কম হলো না, পৃথিবীর আলো-বাতাসও তো কম ভোগ করা হলো না। যাই, কোনো শান্ত জায়গায় গিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করি।’
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন ডাক্তার। কিছুটা উদাস মনে সেখান থেকে চলে এলেন বাশার মুন্সী। কিন্তু রাস্তার মোড়ে এসেই আরেকটা ক্লিনিক চোখে পড়ল তার। সেই ক্লিনিকেরও একটা চেম্বারে ঢুকলেন তিনি। ডাক্তার তাকে দেখে অতি তাচ্ছিল্য নিয়ে বললেন, ‘আপনার বিমা করা আছে?’
‘না।’
‘বিমা করা না থাকলে রোগী দেখি না আমরা।’ পাশ থেকে একটা কাগজ বের করে তিনি বললেন, ‘এই যে একটা বিমার ফরম, এটা পূরণ করুন, তার সঙ্গে চার শত তেতাল্লিশ টাকা দিন।’
বাশার মুন্সী ফরমটা পূরণ করলেন, টাকাগুলোও দিলেন। ডাক্তার সাহেবের মুখে একচিলতে হাসি দেখে মুন্সী বললেন, ‘আপনার বহুমুখী প্রতিভা দেখে আমি মুগ্ধ। আপনি ডাক্তারিও করতে পারেন, বিমার দালালিও করতে পারেন।’
কিছু বললেন না ডাক্তার সাহেব। মুখের চিলতে হাসিটা পূর্ণিমার চাঁদের মতো গোল করে তিনি বাশার মুন্সীর একটা হাত ধরে বিছানায় শোয়ালেন। তারপর পেটের দু পাশে বেশ কিছুক্ষণ টেপাটেপির পর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘গলব্লাডারে পাথর হয়েছে তো আপনার!’ খসখস করে আরেকটা কাগজে কী কী যেন লিখে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি যান, পাশের ওই ক্লিনিক থেকে এ টেস্টগুলো করিয়ে আনুন। অপারেশন করতে হবে আপনার। দেরি করলে সমস্যা হবে।’
টেস্টের কাগজটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হতে যাচ্ছিলেন বাশার মুন্সী। ‘কই, ভিজিট দিয়ে গেলেন না।’ ডাক্তারের উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ফিরে তাকালেন। ঠিক ডাক্তারের মতোই মুখটা হাসিময় করে বললেন, ‘ওই বিমার টাকা দিলাম না, আপাতত ওইটা দিয়ে চালান।’ ডাক্তারকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে এলেন মুন্সী।
হাঁটতে হাঁটতে মুন্সী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, এসব ডাক্তারের বিরুদ্ধে একটা কেস করা দরকার। পুলিশের কাছে যাওয়ার জন্য সামনের গলিতে ঢুকতেই তিনজন ছেলে সামনে এসে বলল, ‘কাক্কু, আলগা হন।’
‘আলগা হব মানে?’
‘আপনার শরীরের তো ওজন বেড়ে গেছে। হাতে ইয়া বড় ঘড়ি, প্যান্টের পেছনে মোটা মানিব্যাগ, পকেটে ওজনদার মোবাইল। এসব নিয়ে হাঁটতে কষ্ট হয় না আপনার? আপনি বরং ওগুলো দিয়ে দিন আমাদের। তারপর দেখবেন, নিজেকে কেমন হালকা লাগছে, ফুরফুরে, পথ চলতেও কী আরাম!’
বাশার মুন্সী সামনের রাস্তার দিকে তাকালেন। দাঁড়িয়ে গল্প করছেন চারজন পুলিশ। তাই দেখে একজন বলল, ‘না না কাক্কু, ওদিকে তাকিয়ে লাভ নেই। দেখছেন না, কী আরাম করে তারা সুখ-দুঃখের গল্প করছে। হাজার হলেও মানুষ তো। কত গল্প থাকে না মানুষের!’
কিছুই করতে হলো না বাশার মুন্সীর, যা করার তারাই করল। মোবাইল সেট, মানিব্যাগ আর ঘড়িটা নিয়ে বলল, ‘আপনাকে আমরা ভদ্রলোক ভাবি, ভদ্রলোকরা কখনো চিৎকার করে না। কী, ঠিক বলেছি না, কাক্কু?’
চিৎকার করে কাউকে ঠিক ডাকতে না, কাঁদতে ইচ্ছে করল মুন্সীর। গলি পেরোতেই থানাটা চোখে পড়ল বাশার মুন্সীর। থানার ভেতর ঢুকতেই একজন পুলিশ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী চাই?’
‘একটা সমস্যা ছিল আমার।’
‘ওই চেয়ারটাতে বসুন।’ পুলিশটি রুমের কোনার একটা চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে সামনে দাঁড়ানো লোকগুলোর দিকে তাকালেন, ‘এবার তুমি বলো…।’ লম্বাজনকে বললেন, ‘তোমার বাসা কোথায়?’
‘আমার নির্দিষ্ট কোনো থাকার জায়গা নেই, ছার।’
খাটোজনকে বললেন, ‘তোমার?’
বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনায় খাটোজন বলল, ‘আমি ওর ফ্ল্যাটের ঠিক ওপরের ফ্ল্যাটটায় থাকি, ছার।’
পুলিশটি খুব শান্ত গলায় বললেন, ‘সেন্ট্রি, এ দুটোকে লকাপে ঢুকাও এবং প্রস্রাব করে প্যান্ট না ভেজানো পর্যন্ত পিটাতে থাকো।’
‘আমার প্যান্ট, না ওদের প্যান্ট—কার প্যান্ট ভেজানো পর্যন্ত পিটাব, স্যার?’ সেন্ট্রি খুব উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
পুলিশটি দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, ‘আমার প্যান্ট!…এবার আপনি বলুন, আপনার সমস্যা কী?’ বাশার মুন্সীর দিকে তাকালেন পুলিশটি।
‘একটু আগে আমার ছিনতাই হয়েছে।’
‘কারা ছিনতাই করেছে?’
‘নাম তো জিজ্ঞাসা করা হয় নাই ওদের, ঠিকানাও জানি না।’
‘দেখতে কেমন ছিল ওরা?’
‘দুজন লম্বা, দুজন মাঝারি ধরনের। তবে চারজনের মুখেই গোঁফ ছিল, চুলও লম্বা ধরনের ছিল।’
‘ওরা ছেলে ছিল, না মেয়ে ছিল?’
বাশার সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। পুলিশটির চিন্তা এখন এদিকে নেই। তিনি ওই দুজনের চিন্তা করছেন। আজকের বাজারসহ আরও কয়েক দিনের বাজারের টাকা কীভাবে আদায় করা যায়, সম্ভবত সেটা ভাবছেন। তিনি আর নিজের মাঝে নেই। তার চোখের সামনে দিয়ে এখন বিভিন্ন সাইজের নোট উড়ছে।
উকিলের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন বাশার মুন্সী। ধানমন্ডিতে একজন চেনা উকিল আছে তার। সেখানে গিয়ে দেখেন, উকিল সাহেব এখনো আসেননি। তার এক অ্যাসিস্ট্যান্ট এসেছেন। তার সামনে একজন লোক বসা। একটা করে প্রশ্ন করছেন তিনি তাকে, উত্তর পেয়ে মনোযোগ দিয়ে তা লিখছেন একটা সাদা কাগজে।
পাশের লম্বা কাঠের চেয়ারটাতে বসলেন বাশার মুন্সী। অ্যাসিস্ট্যান্ট সাহেব সামনে বসা লোকটাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যারা আপনাকে হামলা চালিয়েছিল, তারা দেখতে কেমন ছিল?’
‘তা তো বলতে পারব না।’
‘কেন?’
‘তারা তো মুখোশ পরে ছিল।’
‘মুখোশ পরে ছিল!’ অ্যাসিস্ট্যান্ট সাহেব সামনে বসা লোকটার দিকে একপলক তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি কি এটা বলতে পারবেন, ওই মুখোশের নিচে কী ছিল?’
‘জি। তাদের মুখ।’
‘গুড।’ অ্যাসিস্ট্যান্ট সাহেব লিখতে লিখতে বললেন, ‘মুখোশ দিয়ে মুখ ঢাকা থাকলেও আপনি তো তাদের মাথা দেখতে পেয়েছিলেন?’
‘জি।’
‘তাদের মাথাগুলো কোথায় ছিল?’
‘তাদের ঠিক ঘাড়ের ওপরে।’
অ্যাসিস্ট্যান্ট কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, ‘মাথা তো ঘাড়ের ওপরই থাকার কথা, কিন্তু আমার মাথায় এটা আসলো না কেন? যাক, আপনি একজনকে সন্দেহ করেন বলেছিলেন।’
‘জি।’
‘তার বয়স কত?’
‘সতেরো-আঠারো হবে।’
‘সে তো আপনার বাসায় ভাড়া থাকে?’
‘জি।’
‘কত দিন ধরে ভাড়া থাকে?’
‘তা তো বাইশ-তেইশ বছর হবে।’
‘সতেরো-আঠারো বছরের ছেলে…।’ অ্যাসিস্ট্যান্ট সাহেব উচ্চারণ করছেন আর লিখছেন, ‘বাইশ-তেইশ বছর ধরে ভাড়া থাকে।’
বাশার মুন্সীর মেজাজটা প্রচণ্ড খারাপ হয়ে গেল। এই মুহূর্তে কাউকে থাপড়াতে পারলে ভালো লাগত। রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি একটা মাঠের কাছে এসে দাঁড়ালেন। অনেক লোক জড়ো হয়ে আছে মাঠে। ভাষণ দিচ্ছেন এক লোক, তারা তা শুনছে। অনেক দিন ধরে চেনেন তিনি লোকটাকে। তার কথা শুনে আরও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আস্তে আস্তে মঞ্চের কাছে গিয়ে দ্রুত উঠে গেলেন সেটাতে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই দু গালে ঠাস ঠাস করে দুটো থাপ্পড় মারলেন তিনি লোকটার। সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজন জাপটে ধরল তাকে। দ্রুত চোখ বেঁধে ফেলল। টেনে কোথায় যেন নিয়ে গেল। কয়েক ঘণ্টা পর চোখ খুলে দিলে তিনি নিজেকে এই ঘরের ভেতর আবিষ্কার করেন। তার সামনে মজুল্যা নামে এই লোক বসা। রক্তবর্ণের চোখ করে তাকে বলল, ‘তোর এত বড় সাহস, আমাদের মহান নেতা সোলেমান পাটোয়ারীর গালে থাপ্পড় মারছোস তুই! তোরে আজ ন্যাংটা করমু, তারপর সারা এলাকা ঘুরামু।’ বাশার মুন্সীর শরীর থেকে কাপড় খুলতে থাকে সে। সোলেমান পাটোয়ারী স্বয়ং এসে হাত উঁচু করলে থেমে যায় সে লাল হাফপ্যান্টে।
তিন দিন পর
মানহানির একটা মামলা করেছেন সোলেমান পাটোয়ারী। দ্রুত বিচার আইনে আজ বিচার হচ্ছে বাশার মুন্সীর। মহামান্য বিচারক অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘জনাব সোলেমান পাটোয়ারীর দু গালে দুটো থাপ্পড় মেরেছেন আপনি। আপনাকে তো ভদ্রলোকই মনে হয়। কিন্তু এ রকম অভদ্রজনোচিত কাজটা করলেন কেন আপনি?’
মাথা নিচু করে ছিলেন বাশার মুন্সী। খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে বিচারকের দিকে তাকালেন তিনি। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘মনটা সেদিন মোটেই ভালো ছিল না আমার। যথাযথ কারণ সেটাও না। তার দু গালে দুই দুগুণে চারটা থাপ্পড় মারতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দুটো মারার সঙ্গে সঙ্গেই জাপটে ধরে আমাকে। আপনাকে আসল কারণটা বলার আগে একটা গল্প বলি। যদি আপনি অনুমতি দেন, হুজুর।’
‘অনুমতি দেওয়া হলো,’ গম্ভীর গলায় বললেন মহামান্য বিচারক।
বাশার মুন্সী গল্প শুরু করলেন: সায়েদাবাদ থেকে মিরপুরগামী বাসে উঠেছেন এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। আরও অনেকের সঙ্গে এক ভদ্রমহিলাও উঠেছেন। মাঝপথে ভদ্রলোকটি হঠাৎ থাপ্পড় মেরে বসলেন ভদ্রমহিলাকে। অপমানিত বোধ করে তিনি মামলা করলেন। বিচারক ভদ্রলোকটাকে বললেন, ‘এ রকম একটা বাজে কাজ করেছেন আপনি। কিন্তু কেন?’
অভিযুক্ত ভদ্রলোকটি বললেন, ‘হুজুর, আমি অবশ্যই একজন ভদ্রলোক। কিন্তু অভদ্রের মতো এ কাজটা করার একটা কারণ আছে। বাসের ভেতর ভদ্রমহিলার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। বাস চলা শুরু করল এবং কন্ডাক্টর ভাড়ার জন্য সামনে আসতেই তিনি তার হাতে রাখা বড় ব্যাগটা খুললেন, ছোট্ট একটা ব্যাগ বের করলেন সেই ব্যাগ থেকে। বড় ব্যাগটা বন্ধ করলেন তারপর। ছোট্ট ব্যাগটা খুললেন তিনি এবার। সেটা থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে বন্ধ করে ফেললেন এটাও। তারপর বড় ব্যাগটি খুলে ছোট্ট ব্যাগটি তার ভেতর রেখে বন্ধ করলেন। ইতিমধ্যে কন্ডাক্টর একটু দূরে সরে যেতেই আবার বড় ব্যাগটি খুললেন তিনি। ছোট্ট ব্যাগটি বের করলেন। বড় ব্যাগটি বন্ধ করলেন আবার। ছোট্ট ব্যাগটি খুলে পঞ্চাশ টাকার নোট সেটাতে পুরলেন, তারপর সেটা বন্ধ করলেন। বড় ব্যাগটি আবার খুলে…।’
বিচারক বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কী এত বড় ব্যাগ-ছোট্ট ব্যাগ, ছোট্ট ব্যাগ-বড় ব্যাগ করছেন! ফাজলামি পেয়েছেন!’
অভিযুক্ত লোকটি বললেন, ‘হুজুর, আপনি দুই মিনিট শুনেই ধৈর্য হারিয়ে ফেললেন! ঝাড়া দেড় ঘণ্টা দুই শত বাহাত্তর বার চোখের সামনে এই জিনিস দেখেছি আমি। এবার বুঝুন, তখন আমার কেমন লেগেছে। আর সেটা সহ্য করতে না পেরেই…।’
মহামান্য বিচারক হাত উঁচু করে থামতে বললেন অভিযুক্ত লোকটিকে। তারপর বললেন, ‘মামলা ডিসমিসড।’
বাশার মুন্সী গল্পটা শেষ করে বিচারকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হুজুর, ওই যে সোলেমান পাটোয়ারী আছেন, আজ বত্রিশ বছর ধরে তাকে চিনি আমি। বত্রিশ বছর আগে তিনি যখন নির্বাচনে দাঁড়ান, তখন বলেছিলেন, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দেবেন এই এলাকা। নির্বাচনে জিতে সব ভুলে গেলেন তিনি। আবার নির্বাচন এলো, তিনি বললেন, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দেবেন এই এলাকা। এবারও জিতলেন তিনি এবং ভুলে গেলেন। আবার নির্বাচন এলো, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা বললেন তিনি। জিতলেন, ভুলে গেলেন। আবার নির্বাচন এলো, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা বললেন তিনি। জিতলেন, ভুলে গেলেন। আবার নির্বাচন এলো, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা বললেন তিনি। জিতলেন, ভুলে গেলেন।…’
‘কী আবোল-তাবোল বলছেন আপনি?’ বিচারক অধৈর্য হয়ে বললেন।
‘হুজুর, মাত্র দুই মিনিটেই বিরক্তি ধরে গেলে আপনার। আজ বত্রিশ বছর ধরে একই কথা শুনছি। সামনে নির্বাচন, তিন দিন আগেও সে একই কথা বলছিল, তাই…।’
আগের বিচারকের মতো এই বিচারকও হাত তুলে থামিয়ে দিলেন বাশার মুন্সীকে। তারপর আগের চেয়ে বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ভুল হয়েছে আপনার। যারা নির্বাচন এলেই প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু জেতার পর তা পূরণ করে না, আবার ভোট এলে আবার প্রতিশ্রুতি দেয়, আবার ভুলে যায়। এভাবে দিনের পর দিন দিতেই থাকে, কিন্তু আসল কাজ করে না; তাদের দুটো না, দু গালে চার-চারটি থাপ্পড়ই মারা দরকার ছিল আপনার। মামলা ডিসমিসড।’
অলংকরণ: দিদারুল দিপু
