দেহযতন I ফার্টিলিটি ফ্রেন্ডলি
শরীরচর্চার মাধ্যমে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো সম্ভব। তবে অবশ্যই বুঝে-শুনে; নিয়ম মেনে। এ বিষয়ে আলোকপাত করলেন নাঈমা তাসনিম
নারীর প্রজননক্ষমতা একটি প্রাকৃতিক ও সময়নির্ভর জৈবিক প্রক্রিয়া। জন্মগ্রহণের সময় ডিম্বাশয়ে নির্দিষ্টসংখ্যক ডিম্বাণু থাকে। জন্মের পর থেকে এই সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে থাকে; নতুন করে আর ডিম্বাণু তৈরি হয় না। কৈশোরে ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর প্রতিমাসে একটি ডিম্বাণু পরিপক্ব হয় এবং ওভুলেশন বা ডিম্বস্ফোটন ঘটে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু ডিম্বাণুর সংখ্যা নয়; এর গুণগত মানও কমতে থাকে, যা সরাসরি গর্ভধারণের সম্ভাবনার ওপর প্রভাব ফেলে।
নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের সঙ্গে শরীরচর্চার রয়েছে গভীর ও বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক। নিয়মিত ও মধ্যম মাত্রার ব্যায়াম শরীরে হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে, ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়ায়; বিশেষ করে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম এবং পেলভিক অঞ্চলে রক্তসঞ্চালন উন্নত করে। এসব উপাদান একত্রে ডিম্বস্ফোটন নিয়মিত রাখতে এবং গর্ভধারণের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। সচরাচর কোনো শারীরবৃত্তীয় জটিলতা দেখা না দিলে, নিয়মমাফিক স্বাস্থ্যকর খাবার ও শারীরিক ব্যায়ামের পরামর্শ দিয়ে থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞান, জানালেন ব্যক্তিগত ফিটনেস ও জীবনধারা প্রশিক্ষক এবং আমরা অ্যাকটিভের নির্বাহী পরিচালক নিবরাস পান্নি। তবে এখানে মূলকথা হলো ভারসাম্য। অতিরিক্ত কঠোর ব্যায়াম যেমন ক্ষতিকর হতে পারে, তেমনি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনও প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য মঙ্গলকর নয়।
ফার্টিলিটি সহায়ক ব্যায়ামের মধ্যে যোগব্যায়াম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিছু নির্দিষ্ট আসন পেলভিক অঞ্চলে রক্তপ্রবাহ বাড়াতে এবং স্নায়ুতন্ত্র শান্ত রাখতে কার্যকর বলে বিবেচিত। যেমন বদ্ধ কোণাসন বা বাটারফ্লাই পোজ, যেখানে দুই পায়ের পাতা একত্র করে হাঁটু দু পাশে নামিয়ে বসা হয়। এই আসন ডিম্বাশয় ও জরায়ুর আশপাশে রক্তসঞ্চালন বাড়াতে কাজে দেয়। ভুজঙ্গাসন বা কোবরা পোজ মেরুদণ্ড নমনীয় রাখার পাশাপাশি উদর ও পেলভিক অঙ্গগুলো সক্রিয় করে। নিম্ন উদর ও পেলভিক মাংসপেশি শক্তিশালীকরণ এবং হরমোনাল গ্রন্থিগুলোর কার্যকারিতা উদ্দীপিত করতে সহায়ক হতে পারে সেতু বন্ধাসন।
বদ্ধ কোণাসনের আরও উপকারিতা হলো, যেহেতু এটি রিল্যাক্সিং আসন, তাই মানসিক চাপ কমিয়ে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ প্রজনন হরমোনের ভারসাম্য ব্যাহত করতে পারে বলে নিয়মিত যোগব্যায়াম শরীর ও মনের সমন্বিত উপকার এনে দেয়।
এর পাশাপাশি ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ ও হালকা কার্ডিও ব্যায়াম অত্যন্ত কার্যকর। প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। হালকা জগিং, স্কিপিং বা সাইক্লিং শরীরের মেটাবলিজম বাড়ায় এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমাতে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে যেসব নারীর পিসিওস (পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম) রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত কার্ডিও এক্সারসাইজ করলে ফার্টিলিটি বুস্টআপ হতে পারে। তবে মনে রাখা চাই, অতিরিক্ত কঠোর বা দীর্ঘ সময়ের ব্যায়াম যেমন অত্যধিক জিম ট্রেনিং বা ম্যারাথনের প্রস্তুতি শরীরে স্ট্রেস হরমোন বাড়িয়ে, মাসিক চক্র অনিয়মিত করে দিতে পারে। তাই পরিমিত মাত্রা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন পান্নি।
মধ্যম মাত্রার স্ট্রেন্থ ট্রেনিংও ফার্টিলিটি সহায়ক হতে পারে। স্কোয়াট, লাঞ্জ, পেলভিক লিফট কিংবা হালকা ডাম্বেল ব্যবহারসংবলিত ব্যায়াম শরীরের বড় বড় মাংসপেশি সক্রিয় করে, যা ইনসুলিন সেনসিটিভিটির উন্নতি ঘটায় এবং মেটাবলিজম বাড়ায়। এর ফলে হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা পাওয়া যায়; বিশেষ করে পিসিওস আক্রান্ত নারীদের জন্য সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন হালকা থেকে মাঝারি স্ট্রেন্থ ট্রেনিং উপকারী বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ বা কেগেল ব্যায়ামও প্রজনন স্বাস্থ্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ব্যায়ামে তলপেটের নিচের অঞ্চলের গভীর মাংসপেশি সংকোচন ও শিথিল করা হয়। নিয়মিত কেগেল অনুশীলন জরায়ু, মূত্রথলি ও সংশ্লিষ্ট পেশিকে শক্তিশালী করে, রক্তসঞ্চালন বাড়ায় এবং ভবিষ্যৎ গর্ভধারণ ও প্রসব প্রক্রিয়ায় সহায়ক হতে পারে। যদিও এটি সরাসরি ফার্টিলিটি বাড়ায় না; তবে সামগ্রিক প্রজনন অঙ্গের সুস্থতায় ভূমিকা রাখে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ও মেডিটেশনও ফার্টিলিটি সহায়ক হিসেবে বিবেচিত। ডিপ ব্রিদিং, অনুলোম-বিলোম বা মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং মানসিক চাপ কমায়। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কর্টিসল বাড়িয়ে প্রজনন হরমোনের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই নিয়মিত রিলাক্সেশন টেকনিক শরীরকে একটি অনুকূল হরমোনাল পরিবেশে রাখতে সাহায্য করে। পরিমাণের দিক থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, সপ্তাহে মোট ১৫০ মিনিট মধ্যম মাত্রার ব্যায়াম মানবদেহের জন্য আদর্শ। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে পাঁচ দিন। তবে শরীরের সংকেত লক্ষ করা গুরুত্বপূর্ণ। যদি ক্লান্তি বাড়ে, ঋতুস্রাব অনিয়মিত হয়ে পড়ে কিংবা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে ব্যায়ামের মাত্রা কমানো এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ছবি: ইন্টারনেট
