skip to Main Content

বিশেষ ফিচার I ঐতিহ্যের মুর্গবাজি

মোরগ লড়াই। খেলা হিসেবে এর ইতিহাস সুপ্রাচীন। আমাদের ভূখণ্ডেও বহুকাল ধরে চলে এসেছে। যদিও কারও কারও কাছে নৃশংসতা হিসেবে নিন্দিত; তবে ঐতিহ্যগত মূল্য এড়ানো মুশকিল। বিস্তারিত লিখেছেন আল মারুফ রাসেল

জানুয়ারির এক বিকেলে দলবল নিয়ে হাঁটছিলাম, খান মুহাম্মাদ মিরধা মসজিদের দিকে। হঠাৎ করে দলছুট হয়ে যাওয়া তানভীর সরকার লিংকন ফিরলেন আরেকজনকে সঙ্গে করে। তিনি দীন মুহাম্মাদ। পাঠশালার সিনিয়র। কথা প্রসঙ্গে হুট করেই দাওয়াত দিলেন পরদিন, পশ্চিম ধানমন্ডিতে। সেখানেই নাকি ঢাকার তাবৎ বড় বড় মুর্গবাজ এসে জড়ো হবেন। তারা তাদের আসলি মোরগ নিয়ে লড়বেন। এমন আমন্ত্রণ উপেক্ষা করার মতো মহৎ হইনি এখনো! তার ওপর বাড়ির পাশে! ফলে পরদিন সকাল ১০টায় ক্যামেরাকে সঙ্গী করে পৌঁছে গেলাম মুর্গবাজদের ঠিকানায়।
মুর্গবাজি ও মুর্গবাজদের নিয়ে ব-কলম আমি তাই ঘরে ফিরেই বসলাম এই লড়াইয়ের ইতিহাস জানতে। দেখলাম, মূলত ভারতবর্ষ থেকে ছড়িয়ে গিয়েছিল বিশ্বের প্রাচীনতম দর্শকের উপস্থিতিতে হওয়া খেলা মোরগ লড়াই। আবার খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে পারসিক সভ্যতার অন্যতম খেলা ছিল এটি। সিন্ধু সভ্যতার মহেঞ্জোদারোর প্রাচীন নাম হিসেবে কুক্কুটার্মা বেশ শোনা যায়, যার আক্ষরিক অর্থ মোরগের শহর। শুধু তা-ই নয়; কালিকটের পুরোনো নাম ছিল কোযিকোড়ু; কোযি অর্থ মোরগ, আর কোড়ু মানে দুর্গ এলাকা। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা জানাচ্ছে, সিন্ধু সভ্যতায় মোরগ লড়াই একটি জনপ্রিয় লোকসমাগমের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ছিল। সিন্ধু উপত্যকার হরপ্পা সংস্কৃতি (২৫০০-২১০০ খ্রিস্টপূর্ব) থেকে মোরগ সম্ভবত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। আবার এটিরও ইঙ্গিত মেলে যে, সিন্ধু উপত্যকায় মোরগ-মুরগি খাওয়ার জন্য নয়; বরং খেলাধুলার জন্য পোষা হতো আর সিন্ধু সভ্যতায় সেগুলো ধর্মীয়ভাবে পবিত্র পাখির মর্যাদাও পেয়েছিল, যে কারণে মহেঞ্জোদারোর সিলমোহরে মোরগের উপস্থিতি পাওয়া যায়। পরে তামিল ভাষায় লেখা ‘কুরাম থোগাই’ কাব্যে (৩০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত) পাওয়া যায় বিরহী প্রেমিকার মানসিক পীড়ার সঙ্গে মোরগ লড়াইয়ের তুলনা: ‘এই ব্যথা অন্য কেউ সৃষ্টি করেনি আর অন্য কেউ নিরাময় করতে পারবেও না। এটা ছিল “কুপ্পাই কোযিকল” অর্থাৎ “বর্জ্য থেকে খাবার খুঁজতে থাকা মোরগগুলোর মধ্যে লড়াইয়ের মতো।” ওদের লড়াইয়ে কেউ উৎসাহিত করেনি আর সময়মতো ওদের আলাদা করারও কেউ ছিল না। একইভাবে নায়িকা এমন একটি ব্যথায় ভুগছিলেন, যা অন্য কেউ প্ররোচিত করেনি কিংবা অন্যরা সমাধানও করেনি।’
সে যাই হোক, আমাদের এখানে মোরগ লড়াই কিন্তু আদিবাসীদের ভেতরেও প্রচলিত। তাই মোরগ লড়াইয়ের কুল-ঠিকুজি বের করা বেশ মুশকিল। তারপরও যেটুকু জানা ও ধারণা করা যায়, পারস্য প্রভাবিত দিল্লি সাম্রাজ্যের সময়ে এর রাজকীয়তার শুরু হয়েছিল ভারতবর্ষে; তারই ধারাবাহিকতায় বাংলায়ও রাজকীয়ভাবে শুরু হয়েছিল। তার মানে এই নয়, আমাদের এখানে এর আগে এই খেলা প্রচলিত ছিল না; বরং ভেড্ডা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে এই খেলা বহু আগে থেকে প্রচলিত ছিল। তবে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা এসেছিল পারসিক দরবারি সংস্কৃতিকে মানদণ্ড ধরে নেওয়া দিল্লি সাম্রাজ্যের হাত ধরেই। মোগল বা গুরকানি জমানায় ঢাকায় এর প্রচলন ছিল বলে জানা যায়; এর অন্যতম কারণ হতে পারে বাংলার সুবাহদার হিসেবে পারসিকদের আগমন। ঢাকায় মোগল আমলের মোরগ লড়াইয়ের বর্ণনা না পেলেও ব্রিটিশ আমলের বর্ণনা বেশ সুলভ।
ঢাকার খোশবাস বা সোব্বাসি সংস্কৃতি অনেকটাই দিল্লি-লখনৌয়ি ঘরানার। তাই এখানে আবদুল হালিম শারারের মুর্গবাজি নিয়ে লেখা কয়েক ছত্র এখানে উল্লেখ করা যেতেই পারে। তিনি বলেছেন, ‘যদিও সব জাতের, সব ধরনের মোরগ লড়ে, তবু খাস লড়াকু হলো “অসীল” (কুলীন) মোরগ। এর চেয়ে বাহাদুর প্রাণী দুনিয়ায় আর দ্বিতীয় নাস্তি। এমনকি বাঘও না। এরা মরে যাবে, তবু লড়াই থেকে মুখ ফিরিয়ে পিঠ দেখাবে না। এই “অসীল-মোরগ” সম্বন্ধে গবেষকদের সিদ্ধান্ত: এদের পূর্বপুরুষ এসেছিল আরব থেকে। অসম্ভব নয়। কারণ, অসীলের যত রকম অভিজাত “নসল” (কুল), তার সব কটি ও সবচেয়ে বেশি এখন আছে হায়দরাবাদ-দাক্ষিণাত্যে। আর কোথাও নেই। এবং হিন্দুস্তানের ওই একটিই শহর, যেখানে আরবরা বাস করে সবচেয়ে অধিক সংখ্যায়।’
তিনি আরও যোগ করেছেন, ‘নবাব আসাফ আল-দৌলা অত্যন্ত প্রিয় ছিল এই খেলা। নবাব সাদত আলী খাঁ খুব বুঝেসুঝে চলতেন, তবু মোরগবাজি ভালোবাসতেন। তার শখ ছড়িয়ে পড়েছিল সমাজেও। লখনৌয়ের আমির ও সভাসদরা তো বটেই, যেসব ইউরোপিয়ান সে সময়ে এখানে ছিল, তাদের মধ্যেও এই শখ জেগে উঠেছিল। জেনারেল মার্টিন, যার বাড়ি এখন লখনৌয়ের এক দর্শনীয় ইমারত এবং ইউরোপিয়ান শিশুদের পাঠশালা, উচ্চ শ্রেণির মুর্গবাজ ছিলেন। নবাব সাদত আলী খাঁয়ের সঙ্গে বাজি রেখে মোরগ লড়াতেন।’
এই প্রসঙ্গে দুটি পেইন্টিংয়ের উল্লেখ করা প্রয়োজন। একটি লখনৌয়ের অজানা এক শিল্পীর আঁকা। ১৮৩০-৩৫ সালের দিকে লখনৌয়ের এক শিল্পীর আঁকা মোরগ লড়াইয়ে আসাফ আল-দৌলা ও কর্নেল মর্ডান্টের মধ্যে ১৭৮৬ সালের বিখ্যাত মোরগ লড়াইকে চিত্রিত করে। আর অন্যটি জোসেফ যোফানির আঁকা একই মোরগ লড়াইয়ের ছবি। এই পেইন্টিং দুটি সাদা গুরকানি তথা হোয়াইট মোগলদের দেশীয় সংস্কৃতিতে বুঁদ হওয়ার গল্পই বলে।

আওধের নবাব আসাফ-উদ-দৌলা ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুর্গবাজিতে মত্ত। লখনৌয়ের কোনো এক নাম না জানা দরবারি শিল্পী এটি এঁকেছিলেন ১৮৩০ থেকে ১৮৩৫ সালের মধ্যে। এটি সম্ভবত ১৭৮৬ সালে অনুষ্ঠিত কর্নেল মোর্দা ও নবাবের মোরগের মধ্যকার লড়াই দেখাচ্ছে

ঢাকায় মোরগের লড়াই নিয়ে বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন হাকিম হাবিবুর রহমান। তিনি লিখছেন, ‘এখানে “মোরগ লড়াই”-এর শখ খুব জনপ্রিয় ছিল। শহরের আর্মেনীয় এবং মুসলমান ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন আর এটাকে “শাহী” শখ বলা হতো। শুধু শুনেছি তা-ই নয়; ছবিতেও দেখেছি, কোম্পানি আমলের ফিরিংগি শাসকেরাও জমায়েতের মধ্যে উপস্থিত থেকেছেন এবং মোরগ লড়াই করেছেন। আমাদের বাল্যকালে এই শখ পূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং এর যৌবন গত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তবু মোরগ লড়াইয়ের জমায়েত অব্যাহত ছিল এবং মুন্সী গোলাম মাওলা এবং লালু মিয়া প্রসিদ্ধ জমিদার বাড়িতে খুবই যত্নের সঙ্গে মোরগ পোষা হতো এবং “মোরগ লড়াই” অনুরাগীদের কাছে ভালো ও উৎকৃষ্ট জাতের মোরগ ছিল।’
এরপর তিনি বলেছেন লড়াইয়ে ব্যবহৃত ছয় জাতের মুরগির নাম—খোরাসানি, ছাবজোয়ারি, রামপুরী, সিরাজী, বুশহরী ও আসলী। প্রত্যেক জাতের গঠন, শারীরিক বৈশিষ্ট্য বলার পর তিনি আর সব হারিয়ে যাওয়া জিনিসের মতোই হাহাকার করে বলেছেন, ‘আমার দেখতে দেখতে মোরগের জাত সম্ভ্রান্ত প্রাচীন বংশীয়দের মতোই শেষ হয়ে গেছে এবং এখন এই অবস্থা যে, শহরে কোথাও আসল জাতের মোরগ কদাচিৎ দেখা গেলেও দেখা যেতে পারে। মোরগের রক্ষণাবেক্ষণ এবং (লড়াই-এর) আখড়া এখানে তেমনই ছিল, যেমন লাখনুতেও ছিল এবং শুধু এই শখটিই এমন যার সমস্ত কায়দা-কানুন সারা দেশে (ভারতে) একরূপ।’
সোনারগাঁয়ের হযরত সৈয়দ ইবরাহিম দানিশমান্দের (রা.) বংশধর সৈয়দ এম তাইফুর ঢাকার বেশ কজন মুর্গবাজের নাম নিয়েছেন। ঢাকার নাইব-ই-নাযিম (১৮৩৬-৪৪) নওয়াব গাজী-উদ-দিন ফিরুয জংকে নিয়ে লিখেছেন, ‘ঘুড়ি ওড়ানো, মহিষ ও মোরগ লড়াই, আর তার পোষা বুলবুলি, বটের (কোয়েল), কুকুর ও বিড়ালের বিয়ের অনুষ্ঠান ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ছিল তার প্রিয় বিনোদন।’
তার লেখনীতেই আবার পাওয়া যায় বাবুবাজার ঘাটের নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত জন কোম্পানির ত্রিপুরার দারোগা আমির-উদ-দিনের নাতি গোলাম মাওলার কথা, যিনি ষাঁড় ও মোরগ লড়াইয়ে শুধু অংশই নিতেন না, বরং এর সঙ্গে সেকালে প্রচলিত বাজিতেও অংশ নিতেন। আরও একজনের কথা জানা যায় তার লেখনী থেকে; তিনি হলেন আর্মেনিয়ান বণিক ও জমিদার স্টিফেন আরাতুন। তার ভাষ্যে, ‘আরাতুন ছিলেন আর্মেনীয় এবং “শাওকিন আরাতুন” (শৌখিন আরাতুন) নামে জনপ্রিয় ছিলেন আর তার উপাধি ছিল খাজেহ। তার বসবাসের জন্য বিশাল বাড়ি ছিল ফরাশগঞ্জে নদীর ধারে (এখনকার রূপলাল হাউস) যেখানে তিনি বিলাসীভাবে থাকতেন। মোরগ-লড়াই, কবুতর-ওড়ানো আর ঘুড়ি ওড়ানো ছিল তার প্রিয় শখ।’
দুঃখজনকভাবে, মোরগ লড়াইয়ের ঢাকার পুরোনো কোনো ছবি আমরা এখনো খুঁজে পাইনি। হয়তো সেগুলো রয়েছে কোনো এক ব্রিটিশ ধনকুবেরের গুদামে। জোসেফ যোফানির ‘নাগাপন ঘাটে’র মতো হুট করে নজরে আসবে সবার।
যাহোক, দীন মুহাম্মাদ লোকেশন চিনিয়ে দিয়েছিলেন ঠিকঠাক। এলাকার লোকজনও দেখলাম এই মোরগ লড়াইয়ের ব্যাপারে কম-বেশি জানেন; ফলে পৌঁছাতে খুব বেশি বেগ পেতে হলো না। দোতলা বাড়িতে ঢোকার মুখে বড় করে লেখা ‘কুকুর হইতে সাবধান’, যদিও সারমেয় সাহেবকে সারা দিনে দেখা যায়নি! একবার-দুবার অন্দরমহল থেকে ডাক শোনা গেছে কেবল। বট আর অশ্বত্থের ডালে একগাদা জালালি কবুতর বসেছিল, দু-একটা হরিয়ালও দেখলাম। তার নিচে উঠোনে শামিয়ানা টাঙিয়ে চলছিল লড়াই। পাশাপাশি দুটো পালী (কোর্ট) কেটে তার চার ধার ধরে বসে আছেন মুর্গবাজ আর পুরান ঢাকার মুরব্বিরা। দীন মুহাম্মাদ জানালেন, এবারে মুর্গবাজরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসেছেন ঢাকায় তাদের ক্লাবের সঙ্গে লড়তে। তিনিই জানালেন অ্যাওয়ে ট্যুরের আয়োজনও করে ফেলেছেন তারা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।
এখানের বেশির ভাগ মোরগই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আসিল জাতের মোরগ। দু-একটা ভিন্ন থাকতেও পারে, আমার অনভিজ্ঞ চোখে সেটি ধরা পড়েনি। কারণ, জানা গেছে কিছু কিছু মুর্গবাজ নাকি ভারতের দাক্ষিণাত্য থেকেও মোরগ এনে পালেন, প্রশিক্ষণ দেন শুধু এই লড়াইয়ের জন্য। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই কেন দেশের আসিল মোরগের আবাস, এ নিয়ে লিখিত কোনো সূত্র না থাকলেও মুখে মুখে চলে আসা গল্পে জানা যায়, ষোলো শতকের মধ্যভাগে সরাইলের দিওয়ান পারস্য থেকে এনেছিলেন এই মুরগির জাত। ইতিহাসের দিকে আরেকবার ফেরা যাক তবে। ষোলো শতকের মাঝামাঝিতে পারস্য থেকে ফিরে এসেছিলেন কে বা কারা? আর সরাইল কার ঘাঁটি হয়েছিল সে সময়ে? ইতিহাস জানায়, সুলতান গিয়াস-উদ-দিন মাহমুদ শাহের জামাতা সুলাইমান খান, সূরি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে পরাজিত ও নিহত হলে তার দুই ছেলেকে ইসলাম খান সূরির আদেশে দাস হিসেবে পারসিক বণিকদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। পরে সুলাইমান খানের ভাই কুতব-উদ-দিন, ১৫৬৩-৬৪ সালের দিকে দুই ভাই ইসা খান ও ইসমাইল খানকে তুরান থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন আর দাউদ খান কররানির অধীনে সরাইল পরগনায় তাদের বাবার পরগনার দিওয়ানি ফিরে পেতে সহায়তা করেছিলেন। লোকগাথার সঙ্গে লিখিত ইতিহাস মিলিয়ে দিলে, শুধু একটা নামই সামনে আসে—তাহলে কি মসনদ-ই-আলা ইসা খানই সরাইলে এই মুরগি এনেছিলেন ইরান থেকে? এটি শুধু অনুমানমাত্র। কারণ, আরেকটি লোকগাথা জানান দেয়, মনোয়ার খান (মুসা খানের নাতি) ভারতের বিহারের আফগান ঘাটি দ্বারভাঙা থেকে এই মোরগ আনিয়েছিলেন। এটিই বেশি বিশ্বাসযোগ্য আমার কাছে। সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায় বহু আগে থেকেই আফগানরা, আর চট্টগ্রামে আরবরা বসবাস করছে; তাদের ভেতরেও এই মোরগের লড়াই বেশ জনপ্রিয় ছিল বলে জানা যায়।

কর্নেল মোদাঁ ও নবাব আসাফ-উদ-দৌলার মোরগেরা লড়াইয়ে মত্ত। আগের ছবিটিরই জোসেফ যোফানির তুলির সংস্করণ, ১৭৮৬ সালের। জোসেফ যোফানির ঢাকার লালবাগ কেল্লার দক্ষিণ তোরণ আর নাগাপন ঘাট নামে বিখ্যাত নারিন্দা কবরস্থানের পেইন্টিং ঢাকাবিদদের কাছে সুপরিচিত

ফিরে আসি পশ্চিম ধানমন্ডিতে। দ্বীন মুহাম্মাদ ‘বাংলাদেশ সৌখিন আসিল মোরগ উন্নয়ন সংস্থা’ নামের একটি সংগঠনের হর্তাকর্তা। এই সংগঠনের আয়োজনেই সব মুর্গবাজ এক হয়েছেন ঢাকার এক প্রান্তে। আমি যতক্ষণে পৌঁছলাম, ততক্ষণে খেলা শুরু হয়ে গেছে। ব্যাডমিন্টন কোর্টের মতো করে কাটা দুটো পালীতে লড়ছে চারটে মোরগ। এক পাশে চেয়ার-টেবিলে ফল ঘোষণার জন্য ম্যাচ অফিশিয়ালরা বসেছেন। খেলার বিচার থেকে শুরু করে খেলাসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখে এই অফিশিয়ালদের কমিটি।
লড়াই শুরু হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ। প্রচলিত পদ্ধতিতেই লড়াই চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে (মানে সকাল ১০টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত) মোট সাতটি লড়াই অনুষ্ঠিত হবে। দুই পক্ষেই কমপক্ষে নয়টি করে যোদ্ধা মোরগকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করে রাখা। সাত ম্যাচের জন্য সাতটি এবং লড়াইয়ে কোনো আহত মোরগের বদলি যোদ্ধা হিসেবে আরও দুটি মোরগ রাখা পালীর বাইরের এক ঘেরা জায়গায়। পাশাপাশি দুটো পালীতে লড়াই চলছিল। একেকবার সজোরে পা দিয়ে লাথি আর একই সঙ্গে ঠোঁট দিয়ে গলা চেপে ধরতে দেখা গেল। লড়াইটার ধারা এমনই। এসব যোদ্ধা মোরগের পায়ের পেছনের দিকের বড় নখকে কাটা বলা হয়। খেলার নিয়ম অনুযায়ী এই নখ কিছুটা ছোট করে কেটে শক্ত কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়। লড়াইয়ের একপর্যায়ে মোরগ দুটিকে বেশ আহত ও ক্লান্ত মনে হলো। তবু প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছে। একপর্যায়ে হলো পানির বিরতি। এ সময়ে মোরগকে খানিকটা গরম পানিতে গোসল করানো হয়; খানিকটা কসরত করিয়ে ভেজা কাপড় দিয়ে শুকনো করে, রক্ত পরিষ্কার করা হয়। দুই ঘণ্টার লড়াইয়ে এমন বিরতি হয় প্রতি ১৫ মিনিট পর। এ সময়ে মুর্গবাজ যেভাবে পরিচর্যা করেন তার লড়াকু মোরগদের, তাতে মনে হয় এরা যেন সত্যিকারের রেসলার। এ ছাড়া লড়াই করতে করতে পালী বা কোর্ট থেকে বেরিয়ে গেলে আবার কয়েক সেকেন্ডের বিরতিতে চলে মোরগগুলোর পরিচর্যা। এ সময়ে প্রায়ই মোরগের মাথা, গলা, ঘাড়ের রক্তাক্ত জায়গায় আলতো করে চেপে ঠোঁট দিয়ে ওই স্থান চুষে দিতে দেখা যায়। প্রথমে একটু অবাক লাগল, এক মুর্গবাজকে জিজ্ঞাসা করতেই জানালেন, মোরগটিকে বাঁচাতেই এমনটা করা হয়। লড়াইয়ের সময় মোরগগুলো শক্তিশালী পা, আর ঠোঁট দিয়ে নানা জায়গায় আঘাত করে থাকে। এতে মোরগের শরীরের বিভিন্ন জায়গায়—বিশেষত, গলায় আর চোখের চারপাশ দিয়ে রক্ত বের হয় বা জমাট বেঁধে যায়। বেশিক্ষণ এই জমাট রক্ত গলার মধ্যে থাকলে শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে মোরগটির মৃত্যু ঘটতে পারে। শরীরের এই অংশগুলো ঠোঁট দিয়ে চুষলে ওই রক্ত তাৎক্ষণিকভাবে মানুষটির মুখে চলে আসে। এর মাধ্যমে মোরগটিকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখা সম্ভব হয়। এখনকার লড়াইয়ে কোনো মোরগের প্রাণহানির ঘটনা জানা যায় না। তবে লড়াই যত বেশি সময় চলবে, মোরগের আহত হবার ঝুঁকিও বেড়ে যাবে। তাই দুই ঘণ্টার মধ্যে যদি কেউ কাউকে পরাস্ত করতে না পারে, তাহলে খেলা ড্র হয়ে যায়। অবশ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখলাম, মোরগগুলোর মনোভাব যুদ্ধংদেহী—বিনা যুদ্ধে নাহি দেবে সূচ্যগ্র মেদিনী। ফলে ক্লান্ত, শ্রান্ত, লড়াইরত মোরগেরা ড্রয়ের দিকেই এগিয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো মোরগ একের পর এক আক্রমণ শানিয়ে প্রতিপক্ষ মোরগকে ফেলে দিয়ে, তার ওপরে দাঁড়িয়ে যায়। আবার কোনো মোরগ আক্রমণ সামলাতে না পেরে পালী থেকে বেরিয়ে যেতে চায়।
লড়াই চলতে চলতেই, বেলা ১১টা নাগাদ চা-কফি, শিঙাড়া-সমুচা পরিবেশন করা হলো উপস্থিত সবাইকে। আশপাশের উৎসাহী স্থানীয়রা যেমন ছিলেন; তেমন ছিলেন পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার বিভিন্ন এলাকা তো বটেই, পুরো দেশের মুর্গবাজির সমঝদারেরা। আবার অনেক মুর্গবাজ থাকেন দেশের বাইরে। তারা তাদের মোরগ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিনিধি বা মোরগের কেয়ারটেকারের মাধ্যমে। আর এসব মোরগ সংগ্রহ এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করাও কম ঝক্কির নয়। আবার খাবার-দাবারের বহরও সাধারণ মোরগ-মুরগির চেয়ে ভিন্ন।
তবে যারা এটি করেন, তারা মোরগ লড়াইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই করেন; বেশির ভাগই শিখেছেন বাপ-দাদার কাছ থেকে! আবার নতুন লড়াইবাজও আছেন। সবাই এখানে আছেন ঐতিহ্য আর ভালোবাসার টানে। ভালোবাসার কথাই যখন উঠল, তখন বলা লাগে এর বাহ্যিক বর্বরতার কথাও। এই মোরগের জাতই লড়াকু; তাই এটি লড়বে—সেই ‘কুরাম থোগাই’ কাব্যের মতোই। এর বাইরে রক্তারক্তি ব্যাপার ঘটে; তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, আদৌ এই খেলা কি সমর্থন করার মতো? উত্তরটি দিলেন লড়াই করতে আসা একজন, ‘নিজের সন্তানের মতো পালা হয় এসব মোরগ, কীভাবে মানুষ ভাবতে পারে যে আমরা এগুলোকে হত্যা করার জন্য এই লড়াইয়ের আয়োজন করি।’
গ্রামে-গঞ্জে কিছু কিছু জায়গায় মোরগ লড়াইকে ঘিরে জুয়ার প্রচলন থাকায়, জুয়ার কারণে মোরগ লড়াই বন্ধ করার নজির রয়েছে। আরেকবার ২০১৪ সালে সুনামগঞ্জে মোরগ লড়াই বন্ধ করা হয়েছিল, একটি প্রাণী অধিকার প্রতিষ্ঠান আদালতের দ্বারস্থ হলে। ২০১৯ সালের আইনে মোরগ লড়াইয়ের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও এর প্রয়োগ নেই; এর জনপ্রিয়তা আর প্রাচীন ঐতিহ্যের কারণেই হয়তোবা। তবে বাজি ধরা, মোরগকে অন্যায়ভাবে সাজানোর (অনেক দেশে মোরগের পায়ে বেঁধে দেওয়া হয় ধারালো ব্লেড) মতো চর্চা বাংলাদেশ সৌখিন আসিল মোরগ উন্নয়ন সংস্থার সদস্যরা করেন না। লড়াইয়ের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে এখনো দেওয়া হয় পুরস্কার; দীন মুহাম্মাদের ভাষ্যে, ‘এখানে যত মুর্গবাজ আসেন, তারা সবাই বিজয়ী। সবার জন্যই কিছু না কিছু পুরস্কার থাকে। কিন্তু নিয়ম রক্ষার খাতিরে বিজয়ী মোরগ-মুর্গবাজ জুটি একটি বাড়তি পুরস্কার পায়। আর্থিক মূল্য হিসাবে একে বিবেচনা করাটা উচিত হবে না। সাধারণত অল্প কিছু টাকা বা গৃহস্থালির তৈজসপত্র বাড়তি পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়।’
বিতর্ক থাকুক আর না থাকুক, ক্লাব হিসেবে ১৯৭৭ সালে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ সৌখিন আসিল মোরগ উন্নয়ন সংস্থার মতো ক্লাবগুলোর কারণেই যে ঐতিহ্যবাহী খেলাটি এখনো টিকে আছে, তা বলা যায় নিঃসন্দেহে। ক্লাবের বর্তমান সদস্যদের মোরগের সংখ্যা দুই শতাধিক।

চিত্রকর্ম: সংগ্রহ; ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top