ছুটিরঘণ্টা I মালদ্বীপের নীল জলে, মহাসাগরের তলে
যেন জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো নীরব প্রবহমান ও গভীরবোধী প্রকৃতি। জলের ওপরে ও অতলে মন্ত্রমুগ্ধকর জীবনের ছাপ। ঘুরে এসে লিখেছেন লোপা মমতাজ
প্রথমবার সাহস করে যখন সাগরে ডুব দিলাম, মনে হলো এক অচেনা দরজা খুলে গেল। ওপরে যে জীবনকে আমরা খুব জরুরি মনে করি, নিচে নামতেই সেটা হালকা হয়ে গেল! শব্দ কমে এলো। দেহের ভেতরের অপ্রয়োজনীয় কথাগুলো থেমে গেল। সময়ের ধারণা গেল পাল্টে। অনেকক্ষণ সাগরের নিচে ভেসে আছি। এতটাই স্বাভাবিক লাগছে যে মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি মানুষের শরীর নিয়ে আছি। মনে হলো, আমি সত্যিই সমুদ্রের একটি মাছ। আমার বুকের ভেতর ফুসফুসের বদলে যেন জেগে উঠেছে ফুলকা। জল থেকে শ্বাস টেনে নিচ্ছি; কোনো হুড়োহুড়ি নেই, কোনো ঘাটতি নেই। শরীর নিজেই শিখে নিয়েছে কীভাবে শক্তি বাঁচাতে হয়। হৃৎস্পন্দন ধীরে ধীরে নেমে আসছে, রক্তের গতি খুব শান্ত। মাছেদের মতোই স্থির হয়ে আছি। লবণাক্ত জল আমাকে আর টানছে না, ঠেলে দিচ্ছে না। ভেসে আছি, ঠিক যেমন সাগরের প্রাণীরা ভেসে থাকে।
এই নিচের জগৎ একেবারে আলাদা। আলো এখানে শব্দের মতো নরম। দূর থেকে আসে অজানা ছায়া, অচেনা নড়াচড়া। কোথাও কোথাও নীল এত গাঢ় যে মনে হয় তার ভেতরে গোপন কথা লুকিয়ে আছে। প্রবাল, শৈবাল, ক্ষুদ্র জীবনের নীরব আনাগোনা—সব মিলিয়ে সমুদ্র যেন নিজস্ব ভাষায় কথা বলছে। এখানে কোনো তাড়া নেই। নেই মানুষের হিসাব। সময় এখানে সোজা লাইনে হাঁটে না; সে ঘুরে বেড়ায়। প্রতিটি মুহূর্তে একধরনের গভীরতা আছে, যেন সাগর নিজের রহস্য আমাকে দেখাচ্ছে, কিন্তু পুরোটা নয়। শুধু যতটুকু দেখালে আমি ভয় না পেয়ে মুগ্ধ হয়ে থাকি।
কিন্তু এই সবটাই আসলে একটুখানি ভ্রম। কয়েক মুহূর্তের জন্য জন্ম নেওয়া এক গভীর অনুভূতি। বাস্তবে সময় খুব অল্পই কেটেছে। তবু সেই কয়েক মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, অনন্তকাল ধরে ভেসে চলেছি জলের নিচে, সাগরের কোলে। মানুষ হয়ে ফিরে আসার আগে যেন এক টুকরো সমুদ্র হয়ে গিয়েছিলাম!
মালদ্বীপে যাওয়ার আগে গুগল খুলেছিলাম। ছবির মধ্য দিয়ে সাঁতার কাটছিল চোখ, প্রতিটি ছবি যেন ডুবে যাওয়ার তাগিদ জাগাচ্ছিল। তবে শুধুই ছবি নয়, সাগরতলে মানুষের জীবনকথাও উথলে উঠছিল। গুগলে বাজাউ লাউতের কথা পড়লাম। তারা জন্মের পর থেকে সমুদ্রের সঙ্গে মিশে থাকে; নৌকা তাদের ঘর, জল তাদের রক্ত। শৈশব থেকে তারা ডুব দেয়, অক্সিজেন ছাড়াই, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাদের প্লীহা বড়। তাদের শরীর স্বাভাবিকভাবে পানির নিচে অক্সিজেন ছাড়তে শেখে। আর ভয়? ভয়ও তাদের কাছে এক প্রাচীন বন্ধু; কোনো বাধা নয়, অভ্যাস। মাছ, ঝিনুক, প্রবাল—সবই তাদের ছন্দে নাচে। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোনো জয় করার তাগিদ নেই। সমুদ্রকে তারা জয় করে না। সমুদ্রের সঙ্গে তারা এক হতে চায়।
পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যাদের কাছে সমুদ্র কোনো গন্তব্য নয়। সমুদ্রই তাদের ঠিকানা। তারা বাজাউ লাউত। অনেকে তাদের চেনে সি নোম্যাডস নামে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া আর ফিলিপাইনের উপকূলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা জলের সঙ্গে বসবাস করছে। স্থলভূমি তাদের কাছে অপরিচিত। জন্ম, বেড়ে ওঠা, জীবনযাপন—সবই নৌকায়। তাদের শিশুদের খেলা কেবল ঘাসের ময়দানে নয়; ছোট নৌকায় ডুবে থাকা, মাছ ধরার খেলা, জলের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে চলার মধ্যেই। জন্মলগ্ন থেকে সমুদ্র তাদের ঘর; নৌকা তাদের শয্যা। স্থলভূমির মাটির গন্ধ তারা অল্পই চেনে। আর চেনা মানেই কোনো আকাক্সক্ষা নয়, শুধু অচেনার স্বাদ।
সমুদ্র থেকে চোখ তুলে বাজাউদের জীবনে মজে গেলাম। অদ্ভুতভাবে তাদের শরীরও যেন সমুদ্রের ভাষা শিখে নিয়েছে। শৈশব থেকে তারা ডুব দেয়, কোনো সাঁতার পাঠ বা প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়াই। তারা অক্সিজেন সিলিন্ডারের প্রয়োজন অনুভব করে না। গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের প্লীহা অন্যান্য মানুষের তুলনায় বড় ও শক্তিশালী। ডুব দেওয়ার সময় প্লীহা অতিরিক্ত অক্সিজেনযুক্ত রক্ত ছেড়ে দেয়, যা তাদের দীর্ঘ সময় জলের নিচে থাকার ক্ষমতা দেয়। তবে এই জিনগত অভিযোজনের চেয়ে বড় সত্য হলো, তারা ভয়কে ছোটবেলা থেকে চেনে, স্বীকার করে এবং নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়। ভয় তাদের কাছে বাধা নয়; বরং অভ্যাস ও জীবনধারার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তারা মাছ ধরে, ঝিনুক তোলে, প্রবালের পাশে নিঃশব্দে সাঁতার কাটে। প্রতিটি কাজ ধীর, নিখুঁত; কোনো তাড়াহুড়োর ছাপ ছাড়াই। প্রতিটি ডুব তাদের কাছে একটি ধ্যান, একটি নীরব যাত্রা। কোনো জয় করার তাগিদ নেই। কোনো প্রতিযোগিতা নেই। সমুদ্রকে তারা জয় করে না। সমুদ্রের সঙ্গে প্রতিনিয়ত তাল মেলায়। জীবনের এই যাত্রায় নৌকা শুধু যানবাহন নয়; এটি তাদের ঘর, বাজার, স্কুল ও বিশ্রামের স্থান। সাগরের গভীরতা যেমন তাদের খাদ্য আর আয়ের; তেমনি তা শৈশব, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়েরও উৎস।
এবার নিজের কথায় আসি। আমার জন্ম খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর-বাঁওড়ের দেশে। অতীতে বাংলাদেশে নদী ছিল প্রায় ১৫০০। কিন্তু গত ৫০ বছরে অনেক নদী হারিয়ে ফেলেছি। দখল, দূষণ আর অবহেলায় নদীর দেহ মরে গেছে। নদীর এই ক্ষয় আমার শৈশবকেও ছোঁয়। আমাদের বাড়ির পাশে ছিল শীতলক্ষ্যা নদী। একে ঘিরে আমার প্রতিটি খেলা, কল্পনা, ভয় আর আনন্দ জড়িয়ে আছে।
যদি জন্মটি নতুন করে হতো, আমি হয়তো মানুষ হতাম না। হয়তো একটা মাছ হতাম। সমুদ্রের নীল ঢেউয়ের তলে ভেসে বেড়াতাম। প্রবাহের সঙ্গে মিশে নিঃশব্দ যাত্রা করতাম। হয়তো সমুদ্রতলের কোনো শৈবাল হতাম, যেখানে ঢেউয়ের তলে ধীরে দুলে থাকা এক সহজ জীবন। যেখানে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো প্রতিযোগিতা নেই; শুধু উপস্থিতি ও শ্বাসের স্পর্শ।
আজ, যখন মালদ্বীপে যাওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছি, মনে হলো এবার সেই ভয়ের মুখোমুখি হতে হবে। সমুদ্রের নীল বিশালতায়, প্রবাহের গভীরে, আমার শরীর আর মন একসঙ্গে ডুবে যাবে। তবে ভয়কে ভয় পেলেই তো ভয়। এবার সাহস করব, ভয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ডুব দেব। আর সেই ডুব, হয়তো আমাকে আমার জন্মের বাইরে এক নতুন জীবন দেখাবে।
কর্মস্থলের পক্ষ থেকে মালদ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সঙ্গে রয়েছে ব্যক্তিগত একটি ছোট ইচ্ছাও—দেশটি দেখার। শুনেছি, একদিন সমুদ্রস্তরের উষ্ণতা আর জলবৃদ্ধির কারণে এই দ্বীপগুলো সম্ভবত ডুবে যেতে পারে। সেই ভঙ্গুরতা, সেই অস্থিরতা, যেন আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে আমার কৌতূহল।
মালদ্বীপে পা রাখার মুহূর্তটা ছিল অদ্ভুত রকমের। বিমানের দরজা খুলতেই প্রথম যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা কোনো শহর নয়; এক বিশাল নীল সমুদ্র। বিমানবন্দর যেন জলের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে জল, দূরে দূরে ছোট দ্বীপ, আকাশ আর সমুদ্রের মাঝে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সেই প্রথম মুহূর্তেই বুঝে গিয়েছিলাম, এখানে ভূমি নয়, জলই প্রধান। আমরা যেখানে নামলাম, সেটাও যেন সমুদ্রের সঙ্গে চুক্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। লাগেজ হাতে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, আমি কোনো দেশে নয়; এক নীল অনুভূতির ভেতরে ঢুকে পড়ছি। এখানে সমুদ্র নীল ব্যালেরিনার মতো দোল খায়; সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত একই সঙ্গে নীরবতার রঙে রাঙিয়ে দেয়।
মালদ্বীপ আসলে ২৬২টি ছোট দ্বীপের একটি চেইন, যা ভারত মহাসাগরের উপকূলে। অবশ্য সব দ্বীপে মানুষ থাকে না। কয়েকটিতে স্থানীয়রা জন্মেছে, বড় হয়েছে, জীবন যাপন করছে। কিছু দ্বীপ পুরোপুরি নির্জন। আর কিছু দ্বীপ পর্যটকের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয়; যেখানে রিসোর্ট, সাঁতার, ডলফিন ওয়াচিং এবং স্যান্ড ব্যাংকের আনন্দের জন্য মানুষ ভিড় জমায়। প্রতিটি দ্বীপের আলাদা ছন্দ, আলাদা অভিজ্ঞতা। এখানে প্রতিটি দ্বীপের গল্প ভিন্ন; কিন্তু সব গল্পই এসে সমুদ্রে মিশে গেছে।
এই দেশের সমুদ্র আমাকে নিয়ে গিয়েছিল বিয়াদু রিফের শান্ত নীল গভীরতায়, টার্টল পয়েন্টের কাছাকাছি ভেসে থাকা কচ্ছপের রাজ্যে, কোরাল গার্ডেনের রঙিন জীবনের ভেতর দিয়ে আমার যাত্রা চলছিল। ডলফিন ওয়াচিংয়ে দেখেছি জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে উঠে আসা আনন্দের গতি। আর স্যান্ড ব্যাংকে দাঁড়িয়ে বুঝেছি, সমুদ্রের মাঝখানে এক টুকরো বালুও কত গভীর অর্থ বহন করতে পারে। প্রতিটি জায়গাই ছিল আলাদা অভিজ্ঞতা। এখানে সৌন্দর্য আর জীবনের ছন্দ আলাদা হয়ে নেই; বরং একে অপরের ভেতরে মিশে আছে।
মালদ্বীপে প্রথম দিনটি কাটিয়েছি মাফুসিতে। সন্ধ্যায় সাগরের পাড়ে গিয়ে বসেছিলাম। সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল, আকাশের রং বদলাচ্ছিল, আর সমুদ্র সেই রং নিজের শরীরে তুলে নিচ্ছিল। গভীর রাত পর্যন্ত সাগরের পাড় আমাকে তার ধারে বসিয়ে রেখেছিল। রাতের সমুদ্রে একধরনের গর্জন থাকে—ভয় আর সম্মোহন মেশানো এক অদ্ভুত মাদকতা। ঢেউয়ের শব্দে ঘুম আসে না; বরং মন আরও জেগে ওঠে। অন্ধকারের ভেতরেও সমুদ্র যেন কথা বলে, ঢেউয়ে জলে মেশানো সেই কথা। কান পেতে, চোখ বন্ধ করে শুনতে হয়। এখানে আসনগুলো খুব মনোরম। দূরে দূরে বালির মাঝখানে একটি ছোট্ট টেবিল, দুটো চেয়ার আর মনোরম মোমের আলো। কপোত-কপোতি হাত ধরে বসে আছে; তাদের দৃশ্য যেন সমুদ্রের গভীরতায় মিলেমিশে গেছে। কেউ কেউ নেমে যাচ্ছে সাগরের বুকে। আবছা আলোয় তাদের প্রেমের ইতিহাস যেন সমুদ্রের খেরোখাতায় লেখা হয়ে যাচ্ছে। এই সৈকতের নাম বিকিনি বিচ।
পরদিন সকালে বোটে করে সমুদ্রদর্শনে বের হলাম। তখনো জানতাম না, এই যাত্রা কতটা বদলে দেবে। তখনো সিদ্ধান্ত ছিল—শুধু দেখব; ছুঁব না, নামব না। সাঁতার ভালো জানি না, আর জলের ভয় আমার পুরোনো সঙ্গী। নদীকেন্দ্রিক পরিবেশে বেড়ে উঠলেও ছোটবেলায় একবার শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে গিয়ে ডুবতে বসেছিলাম। একমুহূর্তে পানি যেন সবকিছুকে ঢেকে দিচ্ছিল। ঢেউয়ের ভাঙন কানে বেজেছিল; ভেতরে অজানা আতঙ্ক। সেই একটিমাত্র মুহূর্ত মনে এমন গভীর দাগ রেখেছে, আজও জলে নামার ভয় আমার সঙ্গে লেগে আছে। সেই ভয় নিয়েই সিদ্ধান্ত ছিল, দূর থেকেই দেখব। তাই সাগরে যাওয়ার দিনও শাড়ি পরে বের হয়েছিলাম। কিন্তু সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, নামা ছাড়া ফিরে যাওয়া যায় নাকি! ঢেউয়ের শব্দ, নীলের টান—সব মিলিয়ে সে এক অদ্ভুত আহ্বান।
আমরা বের হলাম ছোটখাটো এক বোটে। বোটের ভেতরেই একটি ছোট্ট বাথরুম, কোনোমতে বসা যায় প্রাকৃতিক কাজ সেরে নেওয়ার জন্য। চলন্ত বোট, চারদিকে ঢেউয়ের দোল, সেই বাথরুমে ঢুকে শাড়ি বদলে জলে নামার পোশাক পরা সহজ কাজ নয়। চার দেয়ালের ভেতরেও ঢেউয়ের ধাক্কা অনুভূত হচ্ছিল। তবু কোনোমতে পোশাক বদলে নিলাম। মুখে লাগানোর মাস্ক, শ্বাস নেওয়ার জন্য লম্বা একটি পাইপ, আর পায়ে দেওয়া বিশেষ জুতা, যেটা সাধারণত সাঁতারুরা পরে। কিন্তু তখন সেই জুতা উল্টো ঝামেলা শুরু করল। অগত্যা খুলে ফেললাম।
আমাদের সঙ্গে ছিলেন তিনজন প্রশিক্ষক। তারা শুধু জলে নামার নির্দেশনা দিচ্ছিলেন না; বোট চালানো, ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মেলানো, শরীরের ভারসাম্য আর শ্বাসের ছন্দ ঠিক রাখতে শেখানো—সবই চোখের ভাষা আর হাতের ইশারায়। প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছিল, এই মানুষগুলোর শরীর যেন জলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস নিয়েই গড়ে উঠেছে।
তাদের চেহারায় একটা মিল চোখে পড়ছিল—ঝাঁকড়া ঘন চুল, তামাটে ত্বক, লম্বা গড়ন, আর চোখে দীর্ঘদিন প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস থেকে জন্ম নেওয়া স্থিরতার ছাপ। ঠিক কোনো জাতিগত পরিচয় নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন; কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলবর্তী মানুষের সঙ্গে তাদের চেহারার একটা স্বাভাবিক সাদৃশ্য আছে। এই অঞ্চলজুড়ে সমুদ্রঘেঁষা জীবনে শরীর যেমন হয়ে ওঠে, তাদের মধ্যেও তেমনই এক ছাপ। অভিজ্ঞতার গভীরতা চোখে জমে আছে, কথার চেয়ে কাজে বেশি বিশ্বাস।
মালদ্বীপের অধিবাসীরা নিজেদের বলে মালদিভিয়ান, ভাষা ধিবেহি। ইতিহাস জানায়, বিভিন্ন সময়ে দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে সমুদ্রপথে মানুষ এসে এখানে স্থায়ী হয়েছে। সেই আসা-যাওয়ার ধারাতেই গড়ে উঠেছে আজকের মালদ্বীপ—একটি সংহত সংস্কৃতি। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও দৈনন্দিন জীবনে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি চোখে পড়ে না; জীবনের সঙ্গে ধর্ম এখানে শান্তভাবে মিশে আছে।
এখনকার মালদ্বীপে বৈদেশিক শ্রমিকের উপস্থিতি স্পষ্ট। মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিদেশি কর্মী। এর মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা বেশি। তাদের দেখা পেয়েছি—হাটে, ঘাটে, নির্মাণকাজে, হোটেল-রেস্তোরাঁয়, পর্যটন আর মাছ ধরার কাজে। পরে জেনেছি, মালদ্বীপে এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করছেন। পর্যটনশিল্পে কাজ করা মানুষের পটভূমিও বহুজাতিক—ভারত, নেপাল, ফিলিপাইনসহ নানা দেশের মানুষ এখানে জীবন গড়ছে। হয়তো এই প্রশিক্ষকদের পারিবারিক ইতিহাসও সেই দীর্ঘ সমুদ্রপথের গল্পেরই অংশ।
প্রশিক্ষক সাদী বেশ অভিজ্ঞ। তিনি সবটাই বুঝতে পারছিলেন। প্রথমবার জলে নামার ভয় আমার চোখে-মুখেই ধরা পড়ছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন, কোনো ক্ষতি হবে না। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং যা হবে, তা এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা; যা আজীবন থেকে যাবে। তারপর যা ঘটল, তা লেখার পাতায় কী করে তুলে আনব!
মানব জীবন বড় অদ্ভুত। আমরা যেভাবে জন্মাই, তার বাইরে আরও কিছু হতে ইচ্ছা জাগে। সেটাই বোধ হয় দর্শন; সেই প্রশ্নই বোধ হয় আত্মজিজ্ঞাসা—আমি কে, কোথায়, কেন। স্থলে যারা, তারা থাকে একটানা চলাফেরার মধ্যে। সেখানে অস্থিরতা থাকে যূথবদ্ধতার মধ্যে থেকেও নিজেকে জানান দেওয়ার বাসনা থাকে। স্থলভূমির জীবন যেন এক অবিরাম ধাঁধা। প্রতিটি পদক্ষেপে অনিশ্চয়তার ছায়া, প্রতিটি নিশ্বাসে অবিশ্বস্ততা। এমন অস্থিরতার মধ্যেও সমুদ্রের নিচে একটি বিপরীত জগৎ খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে ধীরতা, প্রবাহের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা, নিঃশব্দ, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার ধ্যানমগ্নতা।
জলের নিচে নামার পর বুঝলাম, মালদ্বীপের সমুদ্র শুধু নীল নয়, বহুরঙা। এখানে মাছেরা যেন রঙের ভাষায় কথা বলে। চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল ক্লাউনফিশ, নীল-হলুদ স্ট্রাইপওয়ালা সার্জনফিশ, শান্ত গতির প্যারটফিশ, আর কখনো কখনো রিফ বা প্রবালপ্রচীরের ধারে লুকিয়ে থাকা বাটারফ্লাই। কিছু মাছ এত কাছ দিয়ে যাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল, তারা আমাকে দেখে পথ বদলাচ্ছে; আবার কেউ কেউ নির্লিপ্ত, নিজের ছন্দে চলমান। প্রবালের ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে ছিল নানা শৈবাল। সবুজ সি গ্রেপস, নরম ঢেউখেলানো সি ফার্ন, আর লম্বা ফিতা-আকৃতির সি গ্রাস। জলের স্রোতে তারা ধীরে দুলছিল, ঠিক যেন সমুদ্রের শ্বাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। এই শৈবাল আর প্রবালের মাঝে সমুদ্রের জীবন গড়ে উঠেছে—নীরব, কিন্তু গভীরভাবে সংগঠিত।
একসময় সাদী আমাকে আরও গভীরে নিয়ে গেলেন। ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, এখন আর ভয় আঁকড়ে রাখার সময় নেই। ছেড়ে দিতে হবে, পুরোটা। জলের নিচে কথা নেই; শুধু চোখ আর হাতের ভাষা। হঠাৎ দেখি, তিনি মুখ থেকে পানি ছুড়ে গোল গোল রিংয়ের মতো বুদ্বুদ ওপরে পাঠাচ্ছেন। নীল জলের ভেতর সেগুলো আলো ছুঁয়ে স্বচ্ছ বৃত্ত হয়ে উঠল। ইশারায় বললেন ওটা ধরতে। আমি ধীরে হাত বাড়ালাম। জানতাম, ধরা যাবে না। তবু সেই চেষ্টা জরুরি ছিল। জলের ভেতর যা ধরা যায় না, তাকেই ছুঁতে চাওয়ার সাহসটাই আসল শিক্ষা। আঙুলের ফাঁক দিয়ে বুদ্বুদ সরে গেল; ভেঙে গেল মুহূর্তে। ওপরের দিকে উঠতে উঠতে সেই জলের রিংগুলো আরও হালকা হয়ে মিলিয়ে গেল নীলের ভেতর। তখন মনে হলো, জীবনের অনেক সত্যও এমনই—ধরা দেয় না; কিন্তু তাদের দিকে হাত বাড়ালেই আমরা বদলে যাই।
এরপর সাগরের বুকে এক টুকরো বালির পৃথিবী—স্যান্ড ব্যাংক। চারদিকে শুধু জল, মাঝখানে শুভ্র বালির দ্বীপ। পাখিদের ভিড় ঠেলে আমরা দাঁড়ালাম বিচে। তারা আসে, বসে, উড়ে যায়। কেউ আমাদের দেখে ভয় পায় না। যেন আমরাও তাদেরই দলের। পাখি আর আমি ভাগাভাগি করে দাঁড়িয়ে আছি এই একটুকরো বালির ওপর, পৃথিবীর কোলাহল থেকে একটু দূরে। শহরের শব্দ এখানে পৌঁছায় না। সময়ও যেন একটু থেমে থাকে। এই সাদা বালির বিচে দাঁড়িয়ে মনে হলো, জীবনের ভারী কথাগুলো হালকা হয়ে গেছে। এখন শুধু নীল, সাদা, আর নিঃশব্দে বয়ে চলা একটুকরো সময়। দুপুরের খাবার খেলাম সেখানে। সমুদ্রপাখিরা খুব কাছে চলে এলো; কেউ খাবারের আশায়, কেউ কৌতূহলে। মানুষের আর প্রকৃতির মাঝে তখন কোনো দেয়াল নেই। পাখির চোখে ভয় নেই, লোভ নেই; শুধু উপস্থিতি। আমি বালিতে বসে ভাবছিলাম, কত অল্প জায়গায় কত গভীর শান্তি ধরে রাখা যায়! চারপাশে অনন্ত জল, গভীর নীল, অনিশ্চয়তার বিস্তার। আর তার মাঝখানে এই ছোট্ট দ্বীপ, সাদা বালির নরম কোমলতা। নীল জল ঘিরে রেখেছে একফোঁটা সাদা, যেন সমুদ্র নিজেই তাকে আগলে রেখেছে। বালিটা চোখধাঁধানো সাদা। রোদে ঝলমল করে; অথচ চোখে লাগে না। পায়ের নিচে সে নরম; কিন্তু ভেঙে পড়ে না। চারদিকে নীল আর সাদা মিলে এমন এক দৃশ্য তৈরি করে, যেখানে রং নয়, নীরবতাই বেশি কথা বলে। দূরে দূরে ঢেউ আসে, আবার মিলিয়ে যায়। কোনো তাড়া নেই; কোনো আহ্বান নেই।
প্রাচীনকালে এই দ্বীপপুঞ্জকে কেউ কেউ ‘মহালি দ্বীপ’ বা ‘মাহিলা’ নামে ডাকত। ধারণা করা হয়, এই নামগুলো ধীরে ধীরে উচ্চারণ বদলে ‘মালিলা’, সেখান থেকে ‘মালা’, আর পরে ‘মালদ্বীপ’ বা ইংরেজিতে ‘Maldive’ হয়ে গেছে। এই ব্যাখ্যায় মূলত লোকজ উচ্চারণের পরিবর্তন আর মুখে মুখে ছড়ানো নামের রূপান্তরের কথা বলা হয়। আরেকটি লোককাহিনিতে আছে, প্রাচীনকালে এখানে বাস করত এক সুন্দরী মহিলা, যাকে কেউ কেউ ‘মালা দেবী’ (Mala Devi) বা ‘মালিকা’ (Malika) নামে ডাকত। তার শাসনাধীন অঞ্চল ছিল সমুদ্র ও দ্বীপের সীমান্ত। স্থানীয়রা বলে, সেই সময় ওই অঞ্চলকে বলা হতো ‘Mala Devi Dvipa’; যার অর্থ ‘মালা দেবীর দ্বীপ’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নামটি পরিবর্তিত হয়ে ‘Maldive Islands’; বা বাংলায় ‘মালদ্বীপ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই কাহিনি, যদিও কোনো লিখিত ইতিহাস বা নথিপত্রে নিশ্চিত প্রমাণ নেই; তবু স্থানীয়দের মুখে আজও বেঁচে আছে। সাগরের মধ্য দিয়ে ভেসে বেড়ানোর সময়, সেই গল্পের ভাবনা যেন সঙ্গে চলে আসে। ডুবের সময়, প্রবালের মাঝখানে ভেসে থাকা রঙিন মাছ, শৈবালের ধীর দোল, সমুদ্রের নীরব ছন্দ—সবই যেন সেই প্রাচীন শাসকের আভা, তার সৌন্দর্য এবং রহস্যের আভাস দিচ্ছে। সমুদ্রের প্রতিটি তরঙ্গ, প্রতিটি রঙিন মাছ যেন সেই গল্পের চমক।
জলে নামার আগে যে ভয় ছিল, তা তখন আর ভয় মনে হয় না। প্রশিক্ষকের হাতের ইশারা, মাছেদের নীরব উপস্থিতি, শৈবালের ধীর দোল—সব মিলিয়ে সাগর আমাকে শেখাল, নিয়ন্ত্রণ নয়; আস্থা জরুরি। ভাসতে পারলেই বাঁচা যায়। ধরতে না পারলেও চলা যায়। আর কখনো কখনো, গভীরে নামলেই নিজের ভেতরের আলোকে ওপরে উঠতে দেখা যায়।
বাজাউদের জীবনদর্শন আর আমার সেই ডুব দেওয়ার মুহূর্ত যেন এক জায়গায় এসে মিলে যায়। তারা শেখায়, কম নিয়ে বাঁচা যায়। গভীরতায় গেলে সত্য ধরা দেয়। ওপরের জীবন আমাদের শেখায় দৌড়াতে, নিচের জীবন শেখায় স্থির হতে। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ শুধু শ্বাসের সংখ্যা দিয়ে নয়; উপস্থিতির গভীরতা দিয়ে বাঁচে।
মানুষ যেভাবে জন্মায়, তার বাইরে কিছু হওয়ার ইচ্ছাটাই বোধ হয় মানবিক। সেই ইচ্ছাই দর্শন। সেই ইচ্ছাই পুনর্জন্মের কল্পনা। যদি আবার জন্ম নিতে হয়, আমি আধুনিক কিছু হতে চাই না। আমি চাইব এমন এক জীবন, যেখানে শ্বাস কম হলেও উপস্থিতি গভীর। যেখানে শব্দ নয়; নৈঃশব্দ্যই বোধের মূল। যেখানে দৌড়ানো নয়; ধীর চলাটাই উপলব্ধি দেয়।
আবার যদি জন্ম হয়, আমাকে যদি খোদা জিজ্ঞেস করে, কী হতে চাই, আমি চাইব একটুখানি জলজ জীবন। যেখানে জল আমার বুকে ঢুকে ভেতরের ভয় ভেঙে নিয়ে যাবে। যেখানে প্রতিটি প্রবাহ আমাকে জীবনের সীমাহীনতা শেখাবে। যেখানে মৃত্যুতেও হয় না ভয়; বরং পুনর্জন্মের মতো ধীরে আসা আর ধীরে যাওয়া, যা সমুদ্রতলের প্রকৃতি আমাকে নতুন করে ভাবায়। পুনর্জন্ম মানে হয়তো আবার মানুষ হয়ে ফেরা নয়। পুনর্জন্ম মানে দৃষ্টিভঙ্গির বদল। সহজ জীবন লালনের সাহস। কম চাওয়ার আনন্দ। অল্পে সম্পূর্ণ হওয়ার শিক্ষা।
জলে ভেসে থাকা মুহূর্তগুলো শুধু ভ্রমণের স্মৃতি নয়; এগুলো শেখায়—আমরা চাইলে আরও শান্ত হতে পারি, আরও ধীর হতে পারি, আরও গভীর হতে পারি, ঠিক সমুদ্রের মতো। ওপরে ঢেউ, ভেতরে অগাধ নীরবতা। হয়তো পরের জন্মে আমি মাছ হবো। কিংবা এই জন্মেই, একটু একটু করে, মানুষের ভেতরের অতিরিক্ত মানুষটুকু ঝরিয়ে দিয়ে, সমুদ্রের মতো হতে শিখব।
ছবি: লেখক ও ইন্টারনেট
