skip to Main Content

বিশেষ ফিচার I সুলতানি ঈদের খাবার

ঈদ মানে খুশি। পাঠ্যবই আর ধর্মীয় সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে আরেকবার যদি বলি, চোখ বন্ধ করে বলুন তো ঈদ মানে কী আর কী দেখতে পান মনের আঙিনায়? ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে উত্তর হবে—খাবার। ঈদে দুর্দান্ত সব খাবার তৈরি হয় পরিবারের রন্ধনপটীয়সীদের হাতে। এই খাবারের গল্পের শুরুটা কোথায়, এখন কোথায় দাঁড়িয়ে—তা বোঝারই এক ক্ষুদ্র প্রয়াস এটি। লিখেছেন আল মারুফ রাসেল

আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী লুইস ডুপ্রি বলেছেন, ‘মানুষ শুধু ধর্ম, লোকসংগীত এবং লোককাহিনি দিয়েই বাঁচে না; তার অবশ্যই রুটিও (অর্থাৎ খাবার) থাকতে হবে।’ এই আপ্তবাক্যই ব্রাত্য হয়ে রইল বাঙালির, আরও ভালোভাবে বললে বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায়। তাই আজ অনেক ‘যদি’ আর ‘কিন্তু’ মিলিয়ে বলতে হয় আমাদের রসনার ইতিহাস।
বাংলায় সুলতানি আমলের একদম আদিতে, ইখতিয়ার-উদ-দিন বখতিয়ার খলজি যখন বিহার আর উত্তরবঙ্গের অল্প কিছু জায়গায় আফগান ঘোরদের পতাকা ওড়ালেন, তখন ঘুর সাম্রাজ্য পশ্চিমে কাস্পিয়ান ও পারস্য সাম্রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আর এই খলজিরা ছিলেন আফগান এলাকার হিরমান্দ নদীপারের গারশির (গরমশির) এলাকায় যাযাবর জীবন থেকে থিতু হওয়া তুর্ক গোত্রের মানুষ। ফলে পারস্য উপসাগর, হিরমান্দ ও পদ্মা নদী এক সূত্রে বাঁধা পড়ে এই বাংলার পাতে এসে। তবে পারসিক-তুর্ক ও আফগান-তুর্ক খাবার যতটা ধীরে ধীরে মিশেছিল বাংলায়, সম্ভবত ঠিক ততটাই দ্রুত বাংলার খাবার ঢুকে পড়েছিল বাংলায় নতুন উপনিবেশ গড়া মুসলিমদের খাদ্যতালিকায়। তবে সরাসরি দোগোশা পোলাও, কাবুলি পোলাও, বিভিন্ন ধরনের কাবাব, গাজনা ও সামারকান্দ থেকে আনা শুকনো ও কাঁচা ফলের বিভিন্ন বর্ণনা আমরা পাই বিভিন্ন সূত্রে। কিন্তু উৎসব হিসেবে ঈদের বর্ণনা সেভাবে নেই; খাবারের বিবরণও। বরং গুরকানি (মোগল) আমলের খাবারদাবার অনেক বেশি প্রামাণিকভাবে রয়েছে।
সুলতানি আমলের রাজকীয় ঈদ ও খাবারের বর্ণনা পাওয়া যায় ‘তুতিয়ে হিন্দ’ হযরত আমির খসরু দেহলভি, ইবন বাত্তুতা ও শামস সিরাজ আফিফের কলমে। ঈদ মিছিল, দরবার ও খাবারের বর্ণনা মেলে এখান থেকে। সেগুলোর বর্ণনা এখানে দেওয়া অহেতুক; তাই সরাসরি খাবারের বর্ণনায় চলে যাওয়াই ভালো। ঈদের মিষ্টি খাবার হিসেবে আমির খসরু বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন মিসরীয় ঘরানার রুটিজাতীয় মিষ্টি—‘রুকাক’-এর। দরবারি আনুষ্ঠানিকতার হিসাব-নিকাশ বাদে যদি শুধু খাবারের তালিকায় নজর দেওয়া হয়, তাহলে বিস্মিত হতে হয়। প্রথমে পাতলা রুটির (‘খুবস’, অনেকটা এখনকার শর্মার পিটা ব্রেডের মতো) সঙ্গে আসত রোস্ট করা অর্থাৎ কাঠ-কয়লার শুকনো তাপে তৈরি ভেড়ার মাংস (‘শিওয়া-উন’)। এমনভাবে কাটা হতো যেন একটি ভেড়ার মাংস কমপক্ষে চারজন আর সবচেয়ে বেশি হলে ছয়জন খেতে পারেন। আরেকটি রুটি ঘিয়ে ডুবিয়ে পরিবেশন করা হতো (সম্ভবত ‘শিরমাল’), যার মাঝে থাকত কাঠবাদাম, মধু ও তিলের তেল দিয়ে তৈরি ‘সাবুনিয়া’ নামের মিষ্টি (সম্ভবত এখনকার পারসিক ‘সোহান কোন্দেজি’ আর আমাদের ‘বাদামের টানা’র পূর্বসূরি)। এই রুটির ওপর আবার রাখা হতো ময়দা, চিনি ও ঘিয়ে তৈরি ‘খিশ্তি’ (আগা মাহদি হুসাইনের মতে, এর অর্থ ‘ইটের মতো’; খুব সম্ভবত এখনকার পারসিক ‘কাচি’র শক্ত রূপ)। এরপর সামনে আরেকটি চীনামাটির পাত্রে রাখা হতো কাঁচা আদা, পেঁয়াজ ও ঘিয়ে রান্না করা মাংস। আমাদের এখানেও বিভিন্ন সুলতানি আমলের প্রত্নস্থল খননে বেরিয়ে এসেছে চমৎকার চীনা পোর্সেলিন ও সেলাডিয়নের পাত্রের ভাঙা টুকরো। এরপরে আসত ট্রেতে করে ‘সামোসাক’ বা শিঙাড়া। এই খাবারের প্রথম বর্ণনা দিয়েছিলেন আমির খসরু, ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে; আর এর ৫০ বছর পর মুহাম্মাদ বিন তুঘলকের দরবারে বসে, খেয়ে ইবন বাত্তুতা। ইবন বাত্তুতার ভাষায়, ‘কাঠবাদাম, আখরোট, পিস্তা, পেঁয়াজ ও মসলা দিয়ে রান্না মাংসের কিমার পুর ভরা ঘিয়ে ভাজা ময়দার পাতলা খাম।’
এরপর আসত ‘দোজাজ-পিলাফ’, প্রাচীন ঘরানার এক তুর্ক-পারসিক খাবার—ঘিয়ে ভাজা সুগন্ধি চালকে মুরগির আখনিতে সেদ্ধ করে মসলাদার আস্ত মুরগি মুসাল্লাম। এরপর আসত ‘হাশিমি’ ও ‘আল-কাহিরিয়া’ নামের দুটো মিষ্টি পদ। অনেকে বলেন, ‘হাশিমি’ ও ‘লুকমাত-আল-কাযী’ বা একই খাবার। তবে আমার ধারণা, ১২২৬ সালে ‘কিতাব-আল-তাবিহ’-এ আল-বাগদাদির দেওয়া ‘লুকমা’ বা ‘লুকমাত-আল-কাযী’র রেসিপির চেয়ে খানিকটা ভিন্ন প্রকৃতির ছিল ভারতীয় ‘হাশিমি’। কারণ, ইবন বাত্তুতার ভাষ্যে, তিনিই প্রথম নিজের মধ্যপ্রাচ্যের তরিকার ‘লুকমা’ বানিয়ে খাইয়েছিলেন সুলতান মুহাম্মাদকে। এ নিয়ে দরবারি এক রসিকতার বিবরণও রয়েছে। ‘লুকমা’ মূলত ইস্ট দিয়ে ময়দার খামির বানিয়ে ডুবো তেলে ভেজে মধু বা চিনির শিরায় ডুবিয়ে পরিবেশন করা হতো। আর ‘আল-কাহিরিয়া’ মূলত ফাতিমি খিলাফতের সময়কার কাইরো নগরীর মিষ্টি। ইফতার ও ঈদের খাবার বাজারি পসরা থেকে কেনার চল প্রথমে বাগদাদ এবং পরে কায়রোর চক থেকে শুরু হয়েছিল বলে ধারণা অনেকের। তাই ‘আল-কাহিরিয়া’ যে কায়রো নগরীকে সম্মান জানাচ্ছে এই নাম নিয়ে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রথমে কাঠবাদামের রিং বানানো হতো কাঠবাদামের ময়দা (গুঁড়া), ঘি ও গোলাপজলের মিশ্রণ দিয়ে; তারপর সেটি দুদিন ধরে রোদে শুকিয়ে, জিলাপির মিশ্রণ মাখিয়ে ডুবো ঘিয়ে ভাজা হতো। খাওয়া শেষ হতো বার্লির তৈরি পানীয়—‘ফুক্কা’ দিয়ে। ফুক্কা তৈরি হতো পানি, চিনি, বেদানার বীজ, গরম রুটি (হালকা গাজনের জন্য), লেবুর রস, জায়ফল, মৌরি ও কস্তুরী এক দিন ও এক রাত ঠান্ডা জায়গায় রেখে। আর একেবারে শেষে পান-সুপারি দিয়ে বিদায় জানানো ছিল প্রাচীন ভেড্ডা বা অস্ট্রোলয়েডদের থেকে প্রবহমান ভারতীয় রীতি, যা তুর্ক-পারসিকরা গ্রহণ করেছিলেন।
এই তিনজনের বর্ণনার বাইরে একটি অপ্রচলিত বর্ণনাও পাওয়া যায় ইকতিদার আলম খানের কলমে, সুলতান কায়কোবাদের আমলের খাবারের; তুঘলকি কাণ্ডের ৩০-৪০ বছর আগেকার। যেটি বাংলার সঙ্গে দিল্লির খাবারের সম্পর্ককে আরও পোক্ত করে। কায়কোবাদ ছিলেন দিল্লির সুলতান বলবনের নাতি এবং বাংলার স্বাধীন সুলতান বুগরা খানের ছেলে। তার ভোজ শুরু হতো ফল, ফুল বা ভেষজের নির্যাস থেকে তৈরি শরবত দিয়ে। পরিবেশিত রুটির মধ্যে থাকত ময়দা দিয়ে তৈরি ‘নান-ই-তানুরি’, যা মিষ্টি ও শুকনো ফলের পুর দিয়ে তানুরে অর্থাৎ মাটির চুল্লিতে তাপের সাহায্যে তৈরি হতো, আর থাকত ‘কাক’। আংটি আকৃতির মুচমুচে এই আরব্য রুটিকে ভারতবর্ষে জনপ্রিয় করেছিলেন কিরগিজ এলাকা থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে দিল্লিতে আসা সুফি সাধক কুতব-উদ-দিন বখতিয়ার কাকি। তার আশ্রমে সবাইকে তিনি এই ‘কাক’ বিতরণ করতেন বলে তার নামের শেষে জুড়ে গিয়েছিল ‘কাকি’।

ময়দা, মৌরি, চিনি, মাহলাব ও পানি একসঙ্গে মিশিয়ে খামির তৈরি করে ছোট ছোট ডোনাট আকৃতি দেওয়া হতো। এরপর তানুর বা তন্দুরে তাপে ফুলে-ফেঁপে হাতের তালুর সমান হতো সেগুলো। চালজাতীয় খাবারের ভেতরে ছিল সাধারণ সেদ্ধ করা চাল ও ঘিয়ে ভেজে কয়েকটি দানায় লাল রং করা ভাত। এরপর আসত মাংস—রোস্ট করা খাসি, ছাগলের জিব, ভেড়ার রান, চামড়া ছাড়িয়ে পুর ভরা আস্ত খাসি, দুম্বার লেজের দিকে মাংস, মুরগি, তিতির, বটের ও অন্যান্য পাখি। সাম্বুসাকের উল্লেখ এখানেও মেলে। মিষ্টিজাতীয় খাবারের তালিকায় ছিল ‘সাবুনিয়া’, ‘লাউজ’ (ফিরনি), নানা প্রকারের বাদাম, চিনি, ঘি আর জাফরান দিয়ে বিভিন্ন ধরনের হালুয়া (বিশেষত গাজর ও লাউয়ের), আর সুলতান কায়কোবাদের প্রিয় মিষ্টিজাতীয় খাবার ছিল ‘তুৎমাজ’—নুডলস বা পাস্তাজাতীয় খাবার মিষ্টি ও ঝাল—দুভাবেই খাওয়ার উল্লেখ করেছেন ইতিহাসবেত্তারা; সুলতান কায়কোবাদের প্রিয় ছিল দুধ, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, চিনি, চাল ও দুই আঙুল মোটা করে কাটা বর্গাকার ময়দার বা খামিরের (পাস্তা বা নুডলস) এই মিশ্রণ।
সুলতানি আমলে ‘তুৎমাজ’ ঘরানার আরেকটি খাবার ছিল চেনা-পরিচিত শির খুরমা বা ঘি, দুধ, খেজুর, চিনির মিশ্রণের সেমাই। শুধু সেমাই-ই নয়; দুধজাতীয় যত খাবার ছিল, সবই এ সময়ে আরও জৌলুশ পেয়েছিল। স্থানীয় পায়েস-ক্ষীর বজায় ছিল, আবার সেগুলোতে ‘লাউজ’-এর মতো করে শুকনো ফল, বাদাম দিয়ে আরও বৈচিত্র্যময় করা হয়েছিল। আবার নতুন করে মাহলাবিয়ার মতো খাবারগুলোও ঢুকছিল।
সুলতানি আমলের আরেকটি বিশেষ দিক ছিল কাবাব। তবে সেটি ঈদে পরিবেশিত হতো, এমন তথ্য কোথাও মেলেনি। মাছ ছাড়া বাঙালির চলে না; তাই বাংলার ঈদ ভোজে সুলতান হোক বা দিল্লির থেকে পাঠানো প্রশাসক, তাকে স্থানীয়দের খুশি করতে মাছ রাখারই কথা। এ ছাড়া বাংলার ক্ষেত্রে একেবারে ধরে ধরে খাবার নিয়ে বলার জন্য যে গবেষণার প্রয়োজন, সেটি এখনো শুরুই হয়নি! তবে দিল্লি সালতানাতের প্রদেশ হিসেবে হাওয়া যে লেগেছিল, দিল্লির শাহযাদাদের সঙ্গে, অভিজাতদের সঙ্গে যে বাংলায় দিল্লির খাবার এসেছিল, তা বলা যায় চোখ মুদেই। আর আমজনতা? এই আগের শতকের শেষ দশকেও গ্রামে-গঞ্জে ঈদের নামাজের আগে দুধ-সেমাই বা ক্ষীর খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া আর ফিরে এসে শুকনো মরিচ-পেঁয়াজ ভাজা দিয়ে মাখানো মাষকলাইয়ের ডালের খিচুড়ি। পাতের পাশে ডিম ভাজা বা মাছ ভাজা, খাসি-মোরগের ঝোল—এসব তো ছিলই!
মোগল আমল আর সে সময়ে ঢাকার খাবারের সংস্কৃতি এবারে উহ্য রইল। পরে কখনো হবে সেই গল্প।
ছবি: সংগ্রহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top