বহুরূপী I সুশি সান্নিধ্য
জাপানের সবচেয়ে বড় হ্রদ লেক বিওয়ার পাশে জন্ম নেয় পৃথিবীর প্রথম সুশি। দেশটির বিখ্যাত কিয়োটো শহরটি অবস্থিত এই লেকের কাছাকাছি। বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলটিকে বলা হয় শিগা অঞ্চল। জায়গাটির জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী খাবার নারেযুশি। দীর্ঘদিন ধরে মাছ ও ভাত ফারমেন্ট করে হাতের মধ্যে কায়দা করে চেপে বানানো এ খাবারই আধুনিক সুশির আদি রূপ। শিগা অঞ্চলের এই নারেযুশিকে মাদার অব অল সুশি বললেও ভুল হবে না। দীর্ঘকাল ধরে এটি শিগার আঞ্চলিক খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল।
সুশির রয়েছে নানা ধরন। এগুলোর মধ্যে মাকি সুশি সবচেয়ে পরিচিত সুশি রোল, যা সাধারণত নরি নামের সামুদ্রিক শৈবাল দিয়ে ভাত ও বিভিন্ন উপকরণ একসঙ্গে রোল করে তৈরি করা হয়। এরপর রোলটিকে ছোট ছোট টুকরায় কেটে পরিবেশনের চল রয়েছে। মাকিরও আবার ভিন্ন ভিন্ন ধরন রয়েছে, যেমন হোসোমাকি (পাতলা রোল) এবং ফুতোমাকি (মোটা রোল)। এর ভেতরে সাধারণত মাছ, শসা, অ্যাভোকাডো বা ডিমের মতো উপকরণ ব্যবহৃত হয়। সব উপাদান একসঙ্গে থাকায় মাকি সুশির স্বাদ বৈচিত্র্যময় ও মিশ্র, যেখানে এক কামড়ে একাধিক স্বাদের অভিজ্ঞতা মেলে।
উড়ামাকি সুশি মূলত মাকির উল্টো ধরন হিসেবে পরিচিত। এতে ভাত বাইরে এবং নরি ও ভেতরের ফিলিং ভেতরে থাকে। সাধারণত এর বাইরের দিকে তিল, মাছের ডিম বা বিভিন্ন সস দেওয়া হয়, যা স্বাদকে সমৃদ্ধ করে। উরামাকি সুশির স্বাদ মূলত ক্রিমি এবং ফিউশনধর্মী, যেখানে জাপানি ও পাশ্চাত্য স্বাদের মিশ্রণ পাওয়া যায়।
তেমাকি সুশি দেখতে অনেকটা কোন বা আইসক্রিম কোণের মতো। এতে নরি দিয়ে বাইরের অংশ তৈরি এবং এর ভেতরে ভাত ও বিভিন্ন টপিং পুরে দেওয়া হয়। এই সুশি সাধারণত হাতে ধরে সরাসরি খাওয়ার রেওয়াজ। ইজি গোয়িং বলে এটি তরুণদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তেমাকিতে নরি বাইরে থাকায় খেতে টাটকা ও ক্রাঞ্চি লাগে।
ওশিযুশি সুশি অন্য ধরনের সুশির তুলনায় বেশ অভিজাত। তৈরি করা হয় কাঠের বাক্স বা ছাঁচে, যেখানে ভাত ও মাছ স্তরে স্তরে সাজিয়ে ওপর থেকে চাপ দেওয়ার চল। চাপের প্রদানের এই প্রক্রিয়ার কারণে সুশিটি সুন্দর দেখায় এবং কাটার পর প্রতিটি টুকরো নিখুঁত, সুন্দর ও পরিপাটি দেখায়। এর উৎপত্তি জাপানের ওসাকা অঞ্চলে। স্বাদের দিক থেকে এটি কিছুটা কমপ্যাক্ট ও ঘন, যেখানে উপকরণগুলোর স্বাদ একসঙ্গে মিশে মুখে দারুণ আনন্দের উদ্রেক করে।
ইনারি সুশি ভিন্ন স্বাদের একটি পদ। তৈরি করা হয় মিষ্টি দিয়ে ভাজা টোফুর পকেটের মধ্যে, অল্প পরিমাণ ভাতের মিশ্রণ দিয়ে। এর স্বাদ হালকা মিষ্টি। যারা কাঁচা মাছ খেতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন না, অথচ সুশির অভিজ্ঞতা নিতে চান, তাদের জন্য ইনারি সুশি একটি চমৎকার বিকল্প।
জাপানে আরেক ধরনের সুশি বেশ জনপ্রিয়। চিরাশি সুশি। মূলত বাটি ভর্তি ভাতের ওপর বিভিন্ন ধরনের মাছ, ডিম ও সবজি ছড়িয়ে, সাজিয়ে বানানো হয়। সাধারণত ঘরে তৈরি করা হয় এবং বিশেষ দিন বা আয়োজনেও পরিবেশন করতে দেখা যায়।
আঠারো ও উনিশ শতকের টোকিও শহরের ব্যস্ত জীবনে মানুষ দ্রুত এবং সহজ খাবারের প্রয়োজন অনুভব করে। সেই প্রেক্ষাপটে শহরটির প্রখ্যাত শেফ হানায়া ইওহি ভাতের ওপর তাজা মাছ রেখে, হাতে চেপে নারেযুশির আদলে নতুন রেসিপি তৈরি করেন, যা নিগিরি সুশি নামে পরিচিতি এবং দ্রুত জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডে পরিণত হয়। ফারমেন্টেড মাছের টুকরোর পরিবর্তে শেফ হানায়া তার রেসিপিতে তাজা মাছ ব্যবহার করেন এবং সুশি হয়ে ওঠে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় জাপানি খাবার। তাই শেফ হানায়া ইওকিকে আধুনিক সুশির জনক বলা হয়।
ফুড ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট
