প্রাগৈতিহাসিক I ইনসাইড ইনকা
প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে জীবনযাপন করতেন অধুনালুপ্ত ইনকা সভ্যতার বাসিন্দারা। তাদের খাদ্যসংস্কৃতি ছিল দারুণ স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময়
বারো শতকের শেষ দিকে দক্ষিণ আমেরিকার পেরুভিয়ান অঞ্চলে, বিশেষ করে কুসকো উপত্যকায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে শুরু করে ইনকা সভ্যতা। ১৪৩৮ সালের পর থেকে এর দ্রুত বিস্তার ঘটে এবং ১৪৫০ সালের মধ্যে বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। আন্দিজ পর্বতমালার কোলে গড়ে ওঠা এই সভ্যতা টিকে ছিল ১৫৩৩ সাল অবধি। পাথরে নির্মিত চমৎকার শহর মাচুপিচু, সূর্যদেব ইন্তিকে কেন্দ্র করে ধর্মবিশ্বাস কিংবা একদম নিখুঁত সড়কব্যবস্থা—সবকিছুর পাশাপাশি ইনকাদের খাদ্যসংস্কৃতিও ছিল বেশ সমৃদ্ধ ও বৈজ্ঞানিক।
ইনকাদের খাদ্যাভ্যাস ছিল মূলত কৃষিনির্ভর, যদিও এ সভ্যতার অধিবাসীদের আদি পুরুষেরা ছিলেন শিকারি। আন্দিজের উঁচু-নিচু পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে ওরা টেরেস (ধাপযুক্ত কৃষি) পদ্ধতির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন শুরু করেন। বিভিন্ন জাতের ভুট্টা, আলু, কিনোয়া, কাসাভা, মটরশুঁটি, কুমড়া বা লাউ ধরনের সবজি ছিল তাদের প্রধান খাদ্যশস্য।
এই সভ্যতার খাদ্যজগতের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আলু। ইতিহাসবিদদের মতে, ইনকারা তিন সহস্রাধিক প্রজাতির আলুর চাষ করেছেন। প্রতিটি প্রজাতির স্বাদ, রান্নার উপযোগিতা ও সংরক্ষণক্ষমতা ছিল আলাদা। কিনোয়া, যাকে আজ সুপারফুড বলা হয়, ইনকারা সেই আদি আমল থেকে দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় তা রেখেছিলেন। প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস হিসেবে তারা খেতেন লামা, আলপাকা (উট ও লামা প্রজাতির প্রাণী) এবং কুই (গিনিপিগ)। বিশেষ করে গিনিপিগ ছিল উৎসব ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উৎস। তা ছাড়া মাছ ও জলজ প্রাণীও খাদ্যতালিকায় থাকত, বিশেষত উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারীদের মধ্যে। টিটিকাকা হ্রদ কিংবা পাহাড়ি নদীগুলোর মাছ ছিল ইনকাদের জন্য প্রোটিনের দারুন উৎস। তবে বিস্তীর্ণ ইনকা সভ্যতার বাসিন্দারা প্রশান্ত মহাসাগর থেকে প্রাপ্ত মাছ শুঁটকি করে রাখতেন। খাদ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সমসাময়িক সভ্যতাগুলোর মধ্যে তাদের ছিল বিশেষ দক্ষতা।
ইনকা সভ্যতার অন্যতম জনপ্রিয় ফল ছিল লুকুমা। স্বাদে মিষ্টি এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় রাজপরিবার ও সাধারণ জনগণ—উভয়ের কাছে প্রিয় ছিল। এর স্বাদ অনেকটা মিষ্টি আলু, মধু ও ক্যারামেলের সংমিশ্রণ। ভেতরের শাঁস নরম ও শুকনো ধরনের; খুব বেশি রসাল নয়। কাঁচা অবস্থায় তেমন সুস্বাদু না হলেও পাকলে দারুণ সুঘ্রাণ ছড়ায়, মিষ্টতাও বাড়ে। ইনকারা লুকুমা তাজা খেতেন, আবার শুকিয়ে গুঁড়া করে বিভিন্ন খাবারে ব্যবহার করতেন। এখনো লাতিন আমেরিকায় লুকুমা দিয়ে আইসক্রিম, মিষ্টান্ন ও পানীয় বানানোর চল রয়েছে।
ওই সভ্যতায় খাদ্যরুচিতে সামাজিক শ্রেণিভেদও ছিল স্পষ্ট। সাধারণ নাগরিকেরা প্রতিদিন আলু, কিনোয়া ও ভুট্টায় তৈরি খাবার খেতেন; অভিজাত ও রাজপরিবারের সদস্যরা পরিমাণে বেশি গ্রহণ করতেন মাংস, উন্নত মানের ভুট্টা, ফলমূল ও বিশেষ পানীয়। তবে ইনকার অন্যতম বিস্ময়কর দিক ছিল খাদ্য সঞ্চয় ও সংরক্ষণব্যবস্থা। রেফ্রিজারেশন প্রযুক্তি আসার বহুকাল আগের সেই দিনগুলোতে তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন পর্যন্ত খাদ্য সংরক্ষণ করতে পারতেন। সবচেয়ে বিখ্যাত সংরক্ষণপদ্ধতি ছিল চুনিও। এটি মূলত আলু সংরক্ষণের এক অদ্ভুত কৌশল। পাহাড়ের উঁচুতে মোটামুটি সব সময় ঠান্ডা থাকে। তাই রাতে ঠান্ডা আবহাওয়া কাজে লাগিয়ে, আলু বাইরে রেখে জমিয়ে ফেলা হতো। সেই জমাটবাঁধা খাদ্যশস্যকে দিনের বেলায় রোদের তাপে শুকানো হতো আবারও। কয়েক দিনের এই প্রক্রিয়ায় আলু হয়ে উঠত হালকা ও শুকনো এবং বছরজুড়ে সংরক্ষণযোগ্য। এই চুনিও পদ্ধতি যুদ্ধকালীন রেশন এবং দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
মাংস সংরক্ষণের জন্য তারা একটি বিশেষ ধরনের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, যাকে বলা হতো চার্কি, যা আজকের দিনের জার্কির আদি রূপ। লামা বা আলপাকার মাংস পাতলা করে কেটে, লবণ মাখিয়ে, রোদে শুকানো হতো দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য। আবার, এই সংরক্ষিত খাদ্য রাখা হতো কোলকা নামে পরিচিত রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গুদামে। সাম্রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই গুদামগুলো দুর্যোগ, যুদ্ধ কিংবা দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করত। এককথায়, একটি দারুণ ফুড চেইন ছিল ইনকা সভ্যতার। উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত সুশৃঙ্খল এক ব্যবস্থাপনা।
ইনকাদের রন্ধনপ্রণালি ছিল একেবারে সহজ; কিন্তু ভীষণ কার্যকর। ধাতব পাত্র তাদের সভ্যতায় দেখা মেলেনি। তারা ব্যবহার করতেন মাটির হাঁড়ি, পাথরের পাত্র ও কাঠের সরঞ্জাম। ইনকারা পনেরো শতক অবধি প্রকৃতির সঙ্গে মূলত সহাবস্থান করতেন; অন্তত তাদের যাপন প্রণালি দেখলে সহজে তা অনুমান করা যায়।
খাদ্যপণ্য স্রেফ সেদ্ধ করে খেয়ে ফেলা ছিল ইনকাদের সাধারণ জীবনের রন্ধন পদ্ধতি। আলু, ভুট্টা ও কিনোয়ার মতো শস্য এবং কন্দজাতীয় খাদ্য সাধারণত পানিতে সেদ্ধ করে খাওয়া হতো। এই পদ্ধতিতে খাবারের পুষ্টিগুণ বজায় থাকত এবং প্রস্তুতিও ছিল তুলনামূলক সহজ। এ ছাড়া ভাজা ও গ্রিল করার পদ্ধতিও ছিল বহুল ব্যবহৃত। মাংস সরাসরি আগুনে ঝলসানো কিংবা উত্তপ্ত পাথরের ওপর ভাজা হতো, ফলে খাবারে পাওয়া যেত একধরনের স্বাভাবিক ধোঁয়াটে স্বাদ। আমরা যেটিকে এখন বারবিকিউ বলি, সেটিই ছিল ইনকাদের রেগুলার পদ্ধতি।
রন্ধন পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল ছিল পাচামাংকা। মাটি গর্ত করে ওভেনের মতো বানিয়ে রান্না করতেন ইনকারা। গর্ত করা মাটিতে প্রথমে গরম পাথর সাজিয়ে দেওয়া হতো; এরপর সেই পাথরের ওপর মাংস, আলু, ভুট্টা ও বিভিন্ন শাকসবজি সাজিয়ে, সবশেষে মাটি দিয়ে ঢেকে কয়েক ঘণ্টা রাখা হতো। ধীরতালে রান্না করা এই খাবার বিশেষ ধোঁয়াটে স্বাদ ও প্রাকৃতিক সুগন্ধে ভরে উঠত।
উৎসবে, পার্বণে সাপা ইনকা বা রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতিতে আয়োজন করা হতো এক বিশেষ ভোজের; স্বভাবতই সেখানে থাকত নানা পদের আয়োজন। কোনোটা তৈরি হতো ঝলসে, কোনোটা সেদ্ধ করে, কোনোটাতে ব্যবহৃত হতো ভেষজ লতাপাতা। পানীয়ের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল চিচা। বলা চলে, ইনকারা চিচায় ডুবে থাকতে ভালোবাসতেন; চিচা বানানো হতো ভুট্টা থেকে। ভুট্টা পচিয়ে, ন্যাচারালি ফারমেন্ট করে এই পানীয় বানানো হতো। সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনেও ওতপ্রোতভাবে সামাজিক আড্ডা, উৎসব ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে চিচাই ছিল প্রধান পানীয়। এটি পান করলে প্রথমে ঘুম আসতে শুরু করে; তারপর ধীরে ধীরে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় মানুষ। এরপর কোনো হুঁশ থাকে না।
ইনকাদের খাদ্যসংস্কৃতি গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল; খাদ্য অপচয়কে তারা পাপ মনে করতেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, পাচামামা বা ধরিত্রী মাতাই খাদ্যের উৎস। তাই ফসল তোলার আগে ও পরে পৃথিবীর উদ্দেশে খাদ্য উৎসর্গ করা হতো ইনকা সভ্যতায়। সূর্যদেব ইন্তির উদ্দেশেও বিশেষ খাদ্য নিবেদন করা হতো প্রতি চান্দ্রমাসে; বিশেষ করে ভুট্টা ও চিচা। পুষ্টিবিজ্ঞান আজ যে খাদ্যগুলোকে স্বাস্থ্যকর হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, ইনকারা তা ব্যবহার করেছিলেন বহু বছর আগেই। প্রতিকূল ভূপ্রকৃতি, উচ্চতা ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে তারা যে ধরনের খাদ্যাভ্যাস, সংরক্ষণ পদ্ধতি ও রান্নার কৌশল গড়ে তুলেছিলেন, তা সত্যি বিস্ময়কর।
নাঈমা তাসনিম
চিত্রকর্ম: ইন্টারনেট
