skip to Main Content

পাতে পরিমিতি I ভলিউম ডায়েট

আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে উদ্ভাবিত হয়েছে নতুন এক ডায়েট, যেখানে পেট ভরে খাওয়ার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই; ওজন নিয়ন্ত্রণে না খেয়ে থাকতে হয় না। বলছি ভলিউম ডায়েটের কথা। বিস্তারিত লিখেছেন পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশি

ভলিউম ডায়েটের মূল বিষয়টি খুব সহজ। এ ক্ষেত্রে খাবারের পরিমাণ কমানো নয়; বরং কম ক্যালরিযুক্ত খাবার বেশি গ্রহণ করাকে অনুমোদন দেওয়া হয়। সহজ কথায়, এমন সব খাবার বেছে নিতে হয়, যেগুলো পেট ভরাবে, কিন্তু শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি যোগ করবে না। ফলে ক্ষুধা কম লাগবে, অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমবে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।
মূলত যারা ওজন কমাতে চান, কিন্তু বারবার ক্ষুধা অনুভব করার ফলে কঠিন হয়ে পড়ে ডায়েট মেইনটেইন করা, অথচ স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গড়ে তুলতে আগ্রহী, তাদের জন্য এটি পারফেক্ট ডায়েট। মোটকথা, যাদের ডায়েট নিয়ে ভাবার তেমন সময় নেই, সারা দিন কাটে ব্যস্ততায়, পেট যেন শুধু দেয় ক্ষুধার তাড়না, তাদের জন্য এই ডায়েট চমৎকার।
আমাদের দেশের প্রধান খাবার ভাত। আজকাল কারও একটু ওজন বেড়ে গেলেই ছোটবেলা থেকে যে খাবার খেয়ে বড় হওয়া, সেটি শুধু ডায়েটের কথা মাথায় রেখে হঠাৎ ছেড়ে দেন। অর্থাৎ ভাত খাওয়া থামিয়ে দেন কিংবা কেউ আবার দিনে মাত্র একবার খান। তাদের ক্ষেত্রে প্রথমদিকে হয়তো কিছুটা ওজন কমে, কিন্তু কয়েক দিন পর দেখা দেয় ক্লান্তি, দুর্বলতা, খিটখিটে মেজাজ, এমনকি ভার্টিগো বা মাথা ঘোরা ইত্যাদি সমস্যা। আসলে শরীর তার প্রয়োজনীয় শক্তি না পেলে এমনটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে শরীর নিজেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে, ক্ষুধা বাড়ায় এবং ডায়েটে ব্রেক ঘটে। পরিণামে ওজন আবারও বেড়ে যায়। সত্যি বলতে, বারবার চেষ্টা করেও সফল না হলে আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং অনেকে মনে করেন, তাকে দিয়ে ডায়েট হবে না। আসলে সমস্যাটি ডায়েটে নয়; বরং পদ্ধতিতে। আর ভলিউম ডায়েট এই সমস্যার পারফেক্ট সমাধান এনে দেয়। এটি আমাদের সহজভাবে ডায়েট করতে সাহায্য করে।
ভলিউম ডায়েট কোনো কাল্পনিক চিত্র নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক যুক্তি। এটি কাজ করে এনার্জি ডেনসিটি বা ক্যালরি ঘনত্ব নিয়ে। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবারে কত ক্যালরি আছে, সেটাই পরিমাপ করা হয় এই এনার্জি ডেনসিটির মাধ্যমে। সহজভাবে বললে, যেসব খাবারে পানি ও ফাইবার বেশি, সেগুলোর এনার্জি ডেনসিটি কম। যেমন বিভিন্ন ধরনের শাক, সবজি, ফল ও স্যুপ। এগুলোর কোয়ানটিটি যতই হোক, দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে; কিন্তু ক্যালরি দেয় কম। অন্যদিকে, তেল-চর্বিযুক্ত বা প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন ফাস্ট ফুড, ভাজাপোড়া, মিষ্টি ইত্যাদি খুব অল্প পরিমাণে গ্রহণেই প্রচুর ক্যালরি জমা পড়ে শরীরে।
খাদ্যতালিকায় সংযোজন
ভলিউম ডায়েট মেইনটেইনে খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন বিশেষ কিছু খাবার।
স্যুপ
বিকেলের নাশতায় ভাজাপোড়া, কাবাব, ব্রেড, নুডলস বা ডেজার্টের চেয়ে বাসায় তৈরি এক বাটি ভেজিটেবল স্যুপ খেতে পারেন ভলিউম ডায়েট হিসেবে। এটি যেমন সুস্বাদু, তেমনি ডিনারের আগে আবারও স্ন্যাকস গ্রহণের প্রয়োজন বন্ধ করে দেয়। লো ক্যালরির এই স্যুপ ওজন নিয়ন্ত্রণে দারুণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া ডিনারের পরে যাদের একটু স্ন্যাকস গ্রহণের অভ্যাস এবং রাত জাগার সমস্যা থাকে, স্পাইসি খাবার তাদের পছন্দের তালিকায় থাকলেও লোভ সামলে বরং গ্রহণ করতে পারেন বিশেষ স্যুপ। টমেটো হালকা লবণ দিয়ে সেদ্ধ শেষে ব্লেন্ড করে তাতে ব্রাশ করা তেলে পেঁয়াজ, মরিচ, চিকেন আর মাশরুম ভেজে তৈরি করা যেতে পারে এই দারুণ স্যুপ।
স্যালাদ
আমাদের দেশে অনেকের কাছে এখনো স্যালাদ মানেই টমেটো, শসা, পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচের মিশ্রণ। তবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে স্যালাদ খাওয়া হয় শুধু স্ন্যাকস হিসেবে নয়; বরং দুপুর বা রাতের ভারী খাবারের পরিবর্তে মেইন ডিশ হিসেবে। অবশ্য সে ক্ষেত্রে এ ধরনের স্যালাদে থাকে রেসিপির ভিন্নতা। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক।
 নানা ধরনের সবজি আর চিকেন বয়েল করে তাতে কিছু মসলা ব্যবহারে তৈরি করা যেতে পারে ঝটপট চিকেন স্যালাদ।
 ভেজিটেরিয়ান ডায়েট করতে চাইলে, দুপুরে পাতে রাখা যেতে পারে চিকপি স্যালাদ। চিকপি বয়েল করে তাতে শসা, টমেটো, ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ, ধনেপাতা আর লেবুর মিশ্রণে এই স্যালাদ তৈরি করা খুব সহজ।
 বাটিতে বয়েলড এগ, চিকেন, মাশরুম আর ফুলকপি নিয়ে, ক্যাপসিকাম, ব্ল্যাক অলিভ, আনারস আর অল্প বেবিকর্ন দিয়ে তৈরি করা সম্ভব সুস্বাদু প্রোটিন স্যালাদ।
ভলিউম ভেলকি
আমরা কিন্তু সাধারণত হিসাব কষে ক্যালরি গ্রহণ করি না; বরং খাবারের পরিমাণ দেখে তৃপ্তি পাই অনেক সময়। প্লেট ভরা থাকলে মনে হয়, ভালোভাবে খেয়েছি। ভলিউম ডায়েট মনের এই অবস্থা কাজে লাগায়। যখন বেশি পরিমাণে কম ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার খাই, তখন পেট ভরে যায় এবং মস্তিষ্ক তৃপ্তির সংকেত পায়। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। এ ছাড়া ফাইবার হজম ধীর করে, রক্তে শর্করার ওঠানামা কমায় এবং দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা লাগা থেকে রক্ষা করে।
যেহেতু এ ধরনের ডায়েট কিছুটা নতুন; তাই অবশ্য প্লেট প্রেজেন্টেশনের বিষয়টি মাথায় রাখা শ্রেয়। অল্প সবজি আর বেশি ভাত খাওয়ার প্রবণতা বাঙালির অনেকটাই চিরন্তন; কিন্তু এই অভ্যাস বদলে প্লেট এমনভাবে সাজাতে হবে, যেন সবজি শুধু সাইড আইটেম না হয়ে বরং প্লেটের মূল অংশ হয়। আসলে ভলিউম ডায়েট অনুসরণ করতে খুব জটিল কিছু করার দরকার পড়ে না। এ ক্ষেত্রে প্লেটের অর্ধেক অংশ শাকসবজি, এক-চতুর্থাংশ ভাত বা রুটি এবং বাকি অংশে প্রোটিন; যেমন মাছ, মুরগি, ডাল, ডিম—এভাবে ভারসাম্যপূর্ণ করা গেলে যথাযথ পুষ্টি পেতে সাহায্য করবে এবং দীর্ঘক্ষণ আমাদের তৃপ্ত রাখবে।
প্রকৃত অর্থে, ব্যস্ত জীবনে কঠোর ডায়েট মেনে চলা কঠিন। কিন্তু ভলিউম ডায়েট সহজে দৈনন্দিন জীবনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। তাই বাস্তব জীবনে সহজ প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু পরামর্শ মানা যেতে পারে।
 খাবার গ্রহণের আগে এক বাটি স্যালাদ বা স্যুপ, অর্থাৎ কিছুটা তরল খাবার গ্রহণে কম ক্যালরি দিয়ে বাড়তি ক্ষুধা মেটানো সম্ভব।
 ভাতের পরিমাণ কমিয়ে সবজি গ্রহণ বাড়ানো শ্রেয়; কেননা, ক্যালরি কমাতে তা সেরা বিকল্প হিসেবে বিবেচিত।
 বিকেলের নাশতায় বিস্কুটের বদলে ফল খেতে পারেন। এতে মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি কম ক্যালরি অথচ অধিক তৃপ্তি পাওয়া সম্ভব।
 বাইরে খেতে গেলে ভাজা খাবারের বদলে গ্রিল বা স্টিম ফুড বেছে নেওয়া উত্তম।
বেঁচে থাকার জন্য খাবারের গুরুত্বের কথা ভুললে চলবে না। ভলিউম ডায়েট অনুসরণ করতে গিয়ে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। শুধু পরিমাণ নয়, পুষ্টিগুণও তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের শরীর সুস্থ রাখতে প্রয়োজন কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাটের মতো বিশেষ গুরুত্ববহ খাদ্য উপাদান। শুধু ফল ও স্যালাদ থেকে ম্যাক্রো নিউট্রিয়েন্ট ততটা পাওয়া সম্ভব হয় না; ফলে দীর্ঘ সময় এ ধরনের ডায়েট ফলো করলে শরীরে অনেক সময় প্রোটিনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। পরিণামে হতে পারে মাসল লস, চুল পড়ে যাওয়া, নখ ভঙ্গুর হওয়া, ব্রেন ঠিকমতো কাজ না করার মতো বিপদ। আবার ফল খাওয়ায় নিষেধ না থাকায় অতিরিক্ত মিষ্টি ফল খেলে অনেক সময় রক্তে সুগার বেড়ে যেতে পারে। সেই অতিরিক্ত সুগার জমে বাড়তে পারে রক্তের ট্রাই গ্লিসারাইড; হতে পারে ফ্যাটি লিভার। তাই কীভাবে বা কত দিন ডায়েট অনুসরণ করবেন, জানতে নিতে পারেন পুষ্টিবিদের পরামর্শ।

লেখক: প্রধান পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধান, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top