ফিচার I শাকান্ন সম্ভার
শাকান্ন। শাক ও ভাতের ঐতিহ্যবাদী সংযোগ। চৈত্রসংক্রান্তির রান্নায় আবশ্যকীয় পদ
ঋতুর পালাবদলে উৎসবের আমোদ ছড়িয়ে পড়ে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে, এমনকি এই শহুরে জীবনেও সেই হাওয়া এসে ছুঁয়ে যায়। কালের স্রোতে অনেক উৎসব হারিয়ে গেলেও বাঙালি আজও পরম মমতায় আগলে রেখেছে দুটি প্রধান পার্বণ—পৌষসংক্রান্তি ও চৈত্রসংক্রান্তি। বাংলা মাসের সর্বশেষ দিন বা চৈত্রসংক্রান্তি মানেই পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে নতুনের আহ্বান।
শাকান্ন বলতে অনেকে হয়তো ভাবেন, শুধু সাধারণ শাক আর ভাতের একঘেয়ে খাবার। কিন্তু সুকুমার রায় যেমন বলেছিলেন, ‘জলযোগে জল খাওয়া শুধু জল নয় তা’; ঠিক তেমনি শাকান্নও কেবল শাক-ভাতে সীমাবদ্ধ নয়। এ সময়ে এসে প্রকৃতি, স্বাস্থ্য, স্বাদ এবং গ্রামীণ ও শহুরে সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনে রূপ নিয়েছে শাকান্ন।
১৪ শাকের ঐতিহ্য: নিয়মের আড়ালে নিরাময়
চৈত্রসংক্রান্তি ছাড়াও ভূত চতুর্দশী বা কালীপূজার আগের চতুর্দশী তিথিতে শাকান্ন খাওয়ার প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এই প্রথা প্রবল। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী, বর্ষার শেষে এবং শীতের শুরুতে ঋতু পরিবর্তনের সময় মানবদেহে নানা রোগব্যাধি বাসা বাঁধে। এই সময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে এবং শরীর সুস্থ রাখতেই প্রকৃতি থেকে কুড়িয়ে আনা নানা ভেষজ গুণসম্পন্ন শাক খাওয়ার চল শুরু হয়েছিল।
কালীপূজার আগের চতুর্দশী তিথিতে যে ১৪ পদের শাক খাওয়ার রীতি রয়েছে। সেগুলো হলো ওলশাক, কেউশাক, বেতোশাক, কালকাসুন্দে, নিমপাতা, জয়ন্তী, শর্ষে, সাঞ্চে, হেলেঞ্চা, পলতা, শুল্কা, গুলঞ্চ, ঘেঁটু ও শুষনি। এ ছাড়া চৈত্রসংক্রান্তি বা সাধারণ সময়ে ঢেঁকিশাকের মতো বুনোশাকও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। একসময় নিমন্ত্রণে অতিথিদের প্রথম পাতে শাক পরিবেশনের চল ছিল, যদিও এসব কালের নিয়মে আজ অনেকটাই ফিকে। তবে গ্রামীণ জনপদে এই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে স্বকীয়তায়।
উত্তরবঙ্গের শাক পিতারি
উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জনপদে, বিশেষ করে রংপুর ও ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে শীতের শুরুতে বা নবান্নের সময় শাক ভোজন একটি আনন্দদায়ক উৎসবে পরিণত হয়। স্থানীয়ভাবে এটি ‘শাক উৎসব’ বা ‘শাক পিতারি’ নামে পরিচিত। রাজবংশী সমাজসহ বিভিন্ন লোকসমাজে এই প্রথা প্রাচীন।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সোনাপাতিলা গ্রামে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহায়তায় এবং ‘গিদরী বাউলি’ নামক একটি সংস্থার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে এমনই এক ব্যতিক্রমী বুনোশাকের উৎসব। উৎসবের দিন নারীরা দল বেঁধে ছুটে যান বিভিন্ন পুকুরপাড়ে, খেত, ঝোপঝাড়ে। তাদের হাতে থলে আর রকমারি বাটি। সেসব জায়গা থেকে তারা নানা জাতের শাক কুড়িয়ে আনেন। পুকুরপাড়ের গাছতলায় শামিয়ানা টাঙিয়ে কলাপাতা ও কচুপাতায় সাজানো হয় রান্না করা শাক। উৎসবে প্রায় ৮০ পদের রান্না করা শাকের সমাহার ঘটে, যার বেশির ভাগ বর্তমান প্রজন্মের কাছে অচেনা। পুকুরপাড়ের গাছে গাছে টাঙানো হয় রঙিন কাগজে আঁকা নানা ছবি ও শাকের গুণাবলি। গ্রামের শিশু-কিশোরেরা নিজ হাতে এই ছবিগুলো এঁকে শাকের উপকারিতা সবার সামনে তুলে ধরে এই উৎসবে। রান্না শেষে পুকুরের চারধারে খড় বিছিয়ে বসে পড়ে সবাই; কলাপাতায় পরিবেশন করা হয় গরম ভাত আর নানা পদের শাক। বহু বছর পর গ্রামজুড়ে এই উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। গিদরী বাউলির রিসার্চ অ্যান্ড প্ল্যানিংয়ের মতে, বাড়ির আশপাশে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা শাক নিয়ে আমরা কম ভাবি। আগাছানাশক ব্যবহার করায় এসব শাক উজাড় হয়ে যাচ্ছে। কোন শাকের কী নাম, কী উপকার, তা এ প্রজন্ম জানে না। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
গ্রামীণ প্রান্তর ছাড়িয়ে শাকান্ন এখন শহরের অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোর উৎসবের মেনুতেও জায়গা করে নিয়েছে। দুর্গাপূজা বা অন্যান্য উৎসবের সময় এগুলো শাকান্নের যে আয়োজন করে, তা রীতিমতো রাজকীয়। শহরের কোনো কোনো রেস্তোরাঁ পূজার চার দিনের ভোজের নাম রাখে অভিনব রূপে—সপ্তমীতে শাকান্ন, অষ্টমীতে মহাভোগ, নবমীতে মহাভোজ এবং দশমীতে ভূরিভোজ। শাক-ভাত মানেই যে সাধারণ খাবার নয়, তা এসব মেনু দেখলেই বোঝা যায়। মাটির পাত্রে পরিবেশিত এই শাকান্নতে থাকে লক্ষ্মীভোগ চালের ভাত, বিশেষ শাকের পদ ও গন্ধরাজ লেবু, কুমড়ি এবং বড়ি-আলু-পটোল-বেগুন ভাজা, সোনামুগ ডাল ও হিংয়ের কচুরি, ফুলকপির সবজি ও লাউপোস্ত, মুরগির মাংস ও মাছের ঝোল; শেষ পাতে রাজভোগ, দই, পাঁপড়, চাটনি আর পান।
ভুবন ভ্রমিয়া
ঋতু পরিবর্তনের সময়, বিশেষ করে শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে প্রকৃতি থেকে কুড়িয়ে আনা বুনোশাক বা লতাপাতা খাওয়ার এই রীতি বিশ্বের আরও অনেক সংস্কৃতিতে বেশ আড়ম্বরে উদ্যাপিত হয়। প্রতিবছরের ৭ জানুয়ারি জাপানিরা নানাকুসা-নো-সেক্কু উদ্যাপন করে। এই দিনে তারা সাত রকম বুনোশাক, মুলা, শালগম, পানিপাতার মতো ভেষজ দিয়ে চালের জাউ বা নানাকুসা-গায়ু রান্না করে। নববর্ষের ভারী খাবারের পর পেটকে আরাম দিতে এবং নতুন বছরে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করতে প্রতিবছর এই উৎসব উদ্যাপন করেন জাপানিরা।
জার্মানিতে ইস্টারের ঠিক আগের বৃহস্পতিবারকে গ্রুনডনারসটাগ বা সবুজ বৃহস্পতিবার বলা হয়। এই দিনে ঐতিহ্যগতভাবে সবুজ খাবার খাওয়ার চল আছে; বিশেষ করে বুনোশাক-লতাপাতা; যেমন বুনো রসুন, ড্যান্ডেলিয়ন, বিছুটি পাতা, পুদিনা, বুনো ডেইজি ইত্যাদি দিয়ে তৈরি বিশেষ স্যুপ খাওয়া হয়। উদ্দেশ্য—বসন্তকে স্বাগত জানানো এবং রক্ত পরিশোধন করা; কারণ, এই বুনোশাকগুলো ভিটামিন ও খনিজে ভরপুর।
বসন্তের বিষুব বা মহাবিষুবের দিন উদ্যাপিত হয় ফার্সি নববর্ষ বা নওরোজ। এই উৎসবের খাবারে শাকসবজির প্রাধান্য থাকে। এদিন তারা প্রচুর তাজা সবুজ শাকসবজি ও ভেষজ দিয়ে তৈরি ‘কুকু সাবজি’ নামের একধরনের শাকের অমলেট এবং ‘সাবজি পোলো মাহি’ বা ভেষজ মিশ্রিত পোলাও আর মাছ খান।
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বসন্তের শুরুতে বুনোশাক বা ভেষজ কুড়িয়ে খাওয়ার চল রয়েছে, যা দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রিসে যেকোনো বুনোশাক কুড়িয়ে সেদ্ধ করে অলিভ অয়েল ও লেবু দিয়ে খাওয়াকে ‘হোরতা’ বলে। ড্যান্ডেলিয়ন বা বুনো সর্ষে দিয়ে এটি বেশি বানানো হয়। ইতালির লিগুরিয়া অঞ্চলে বসন্তের শুরুতে বিভিন্ন বুনো লতাপাতা কুড়িয়ে ‘প্রেবোগিওন’ নামের এক বিশেষ মিশ্রণ তৈরি করা হয়, যা স্যুপ বা পাস্তার সঙ্গে খাওয়ার চল রয়েছে।
পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন, সব সংস্কৃতির মূল সুর কিন্তু একটাই—প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা, ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীর সুস্থ রাখা এবং উৎসবের আমেজে নতুনকে স্বাগত জানানো। বাঙালির কাছে ‘শাকান্ন’ বা ‘শাক পিতারি’ উৎসব শুধু রসনাবিলাস নয়; আমাদের হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্যেরও অংশ। একসময় আমাদের গ্রামগুলো নানা শাকে পূর্ণ ছিল; কিন্তু এখন সেসব হারিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে শহরের রেস্তোরাঁগুলো শাকান্নকে একটি বাণিজ্যিক ও বিলাসবহুল রূপ দিলেও এর মাধ্যমে অন্তত নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যবাহী পদগুলোর নাম বেঁচে থাকছে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে এক পাতায় বসে শাক-ভাত খাওয়ার এই যে সংস্কৃতি, তা ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতার প্রকাশ।
ফুড ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট
