লেবেল অ্যালার্ট I শরদিন্দু
এক দশক আগে যাত্রা শুরু। দেশ পেরিয়ে পরবাসেও ছড়িয়েছে বিস্তার
দশ বছর আগের এক রাতের গল্প। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্রী হাবিবা আক্তার সুরভী একটি নামের সন্ধানে অতল ভাবনার জগতে। নিজের হাতে তৈরি নকশা ক্রেতার হাতে তুলে দিতে চান। তাই প্রয়োজন একটি নাম। সুন্দর, সরল। এমন কিছু, যার সবটা জুড়ে আছে প্রশংসা। কেন? কারণ, সুরভী অন্যের প্রশংসা করতে ভালোবাসেন। অন্যের সৌন্দর্যকে গুরুত্ব দিতে চান যথাযথ শব্দে। এমন কিছু খুঁজতে গিয়ে তিনি পেয়েছিলেন ‘শরদিন্দু’। যার অর্থ শরৎ কালের চাঁদ; যা বছরের শারদ সময়ে সবচেয়ে বেশি রূপ নিয়ে উদ্ভাসিত হয়। সেই চাঁদের মতো সুন্দর লাগবে তার প্রত্যেক ক্রেতাকে, এটাই চেয়েছিলেন সুরভী। তাই ঝটপট তৈয়ার। এই নামেই তৈরি হলো লোগো। যেখানে প্রশংসার সুমিষ্টতা শতভাগ।
চারুকলার গ্রাফিক ডিজাইনিং বিভাগ থেকে বিএফএ সম্পন্ন করে তিনি মাস্টার্স পর্ব সারেন যুক্তরাজ্যে। শরদিন্দুর সূচনা ও যাত্রা সুরভীর যাপিত জীবনের মতোই; যা তিনি, তা-ই প্রকাশিত তার কাজের ক্যানভাসে। নকশার সময়ে নিজের মতো করেই ক্রেতার বিষয়ে ভাবেন। তার ভাষায়, ‘নিজের জন্য যেমন সেরা ডিজাইন বেছে নিই, তেমনটাই ভাবি ক্রেতার ক্ষেত্রেও। যেন নিজের পরম আপন আলমিরার চাবি তুলে দিলাম ক্রেতার হাতে।’
শরদিন্দুর বুননজুড়ে আছে নস্টালজিয়া। সেখানেই পাওয়া যায় লেবেলটির সূচনা পর্বের গল্প। সে সময়ে সুরভী শুধু নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে বুনতেন স্বপ্নজাল। ফ্যাশন ট্রেন্ড কিংবা কাস্টমার ডিমান্ড নিয়ে ভাবতেন না একদমই। অনেক সময় একই রকম নকশা দেখে ক্রেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করে জানাতেন, এমন ডিজাইন আর কালার—দুই-ই আগে দেখেছেন তারা। কেউ কেউ পরেছেনও। এরপর লন্ডনে ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে পড়াশোনা তাকে ভালোভাবে তৈরি করেছে। বুঝিয়েছে, ফ্যাশন ট্রেন্ড নানাভাবে বিশ্লেষণেই আনন্দ। কাস্টমার ডিমান্ডকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে এখন নকশা সাজান তিনি। নকশা আর রং—দুই নিয়েই সৃজনশীলতায় মেতে ওঠেন।
বাজার সম্পর্কে সুরভী জানালেন, এক দশক আগে যাদের জন্য পোশাক তৈরি করতেন, এখনো তারাই আছেন কাস্টমার সেগমেন্টে—এমনটা নয়; বরং একের পর এক নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে তার লেবেল। মিলেনিয়াল থেকে জেনারেশন জেডে বদল হয়েছে ক্রেতা।
সুরভীর পছন্দের তালিকায় আছে কালচারাল মোটিফ নিয়ে কাজ। নানা দেশের মোটিফ নিয়ে কাজ করেছেন। উদ্দেশ্য বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক নকশা বোঝার প্রয়াস। তিনি মনে করেন, প্যাটার্ন হলো একটি সময়কালের পরিচয়, নিজস্বতার প্রমাণ।
মিরর বিজনেস কনসেপ্ট বাংলাদেশের লোকাল ফ্যাশন মার্কেটের জন্য এক অস্বস্তিকর সত্য। ডিজাইন কপির মাধ্যমে ব্র্যান্ড ভ্যালু কমলেও এই কাজ করে যাচ্ছেন অনেকে। সৃজনশীলতা হারাচ্ছে মূল্য। এতে শরদিন্দুও ভুগেছে বেশ। ডিজাইন কপিরাইট নিয়ে সচেতন হওয়ার পরও বিভিন্ন সময়ে মূল্য দিতে হয়েছে। তাই সুরভী স্বপ্ন দেখেন, সিগনেচারকে সম্মান দিয়ে ব্যবসা করবেন সকল ব্যবসায়ী। প্রতিযোগিতা হবে স্বাস্থ্যকর।
দেশে শরদিন্দুর মোট ছয়টি শোরুম। আর একটি আছে লন্ডনের গ্রিন স্ট্রিটে। সেখানে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতা আসেন; যা অভিভূত করে সুরভীকে। ভিনদেশের এই যাত্রা তিনি ২০২৪ সালে শুরু করেছেন। প্রবাস জীবন শুরুর সময়ে সঙ্গে ছিলেন শুধুই জীবনসঙ্গী। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু কিংবা পরিচিতজন—আর কেউই ছিল না সেই বিদেশ বিভুঁইয়ে। তাই তেমন কোনো বড় আশায় বুক বাঁধেননি। কিন্তু অবাক হয়েছেন প্রবাসী বাঙালিদের আন্তরিক উদ্দীপনায়। প্রবাস এই ডিজাইনারকে দিয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। লন্ডনের বিভিন্ন লেবেলের পোশাকে খুঁজে পাওয়া যায় ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লাইনটি। যার চাহিদাও বেশ। কারিগরি দিকে তৈরি শিল্পে দীর্ঘ সময় আস্থার জায়গা ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এবার শরদিন্দুর ব্যবসা বিদেশে করতে গিয়ে এই ডিজাইনার বুঝতে পেরেছেন, বাইরের দেশে বাংলাদেশি নকশার পোশাকেরও বেশ চাহিদা রয়েছে। তাই সেখানেই স্বপ্ন বুনছে তার মন। বিশ্বজুড়ে শরদিন্দুর শোরুম পৌঁছে দিতে চান। পরিণত করতে চান গ্লোবাল ব্র্যান্ডে।
ফ্যাশন ডেস্ক
ছবি: শরদিন্দুর সৌজন্যে
