ইভেন্ট I আর্কা ফ্যাশন উইক নিউ পাল্স
৫ থেকে ৭ ডিসেম্বর। তিন দিনের উৎসব নিয়ে হাজির হয়েছিল আর্কা ফ্যাশন উইক উইন্টার ’২৫। ঢাকার তেজগাঁওয়ের আলোকিতে। ফ্যাশন-সচেতনদের হাজিরায় প্রাঙ্গণ ছিল মুখর। রানওয়ে, ক্র্যাফট এক্সিবিশন, আর্টিস্টিক এক্সপ্রেশন—সবই ছিল সেখানে। বিভিন্ন বয়স ও পেশার দর্শকেরা ছিলেন। দেশের নানা প্রান্তের ডিজাইনার, কারিগর, ছাত্র-ছাত্রী, ফ্যাশন-উৎসাহী ও সাধারণ দর্শক। যেন ফ্যাশন-সচেতনদের মিলনমেলা। বাংলাদেশের ফ্যাশন যে শুধু পোশাক নয়; বরং একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভও, তা প্রকাশ পেয়েছে স্পষ্টভাবে। যেখানে ছিল বৈচিত্র্যময় শো, ইন্টার্যাকটিভ মাস্টারক্লাস আর প্রতিষ্ঠিত ডিজাইনার থেকে শুরু করে উঠতি ব্র্যান্ডগুলোর নতুন কালেকশনের এক সমৃদ্ধ লাইনআপ।
ঐতিহ্যবাহী জামদানি ছিল এবারের স্টোরিটেলিংয়ের কেন্দ্রবিন্দু। ইভেন্টজুড়ে আর্কা তাদের সিজন থিম হিসেবে ধরে রেখেছিল জামদানি মোটিফ। ব্র্যান্ডিং, রানওয়ে ডিরেকশন, ভেন্যু ডিজাইন—সবকিছুতে জামদানি প্যাটার্নের সূক্ষ্ম উপস্থিতি দর্শকদের মনে করিয়ে দিয়েছে আমাদের কারিগরি সৃজনশীলতার গভীরতা।
এই সম্মান আরও স্পষ্ট হয় আড়ংয়ের বিশেষ সহযোগিতায়। প্রাঙ্গণে লাইভ ডেমোনস্ট্রেশন করেছেন ছয়জন মাস্টার কারিগর। জামদানি, নকশিকাঁথা, কারচুপি, মৃৎশিল্প, রিকশা পেইন্টিং আর রেশম চাষ—দর্শকেরা খুব কাছ থেকে দেখেছেন কীভাবে এই কারুশিল্পগুলো আমাদের ফ্যাশন কালচারের ভিত রচনা করে।
রানওয়ে
প্রতিদিনই ছিল ফ্যাশন শো। স্ট্রিটওয়্যার থেকে মডেস্ট—রানওয়েতে দেখা গেছে বিভিন্ন ঘরানার পোশাক। ফ্যাশন যে হতে পারে সব ধরনের পোশাকেই, তা এবারের শো বেশ ভালোভাবেই বুঝিয়েছে।
পরিচিত ব্র্যান্ডগুলো যেমন ছিল; তেমনি তুলনামূলক নতুন ডিজাইন ব্র্যান্ডের ঝলকও দেখা গেছে। প্রথম দিন মডার্ন থিমে পৌষি, কাঁঠাল, দনিয়া, রানো, গ্রীষ্ম ও রয়্যাল বাংলা কতুর। দ্বিতীয় দিন হেরিটেজ থিমে ভেনোরি, কেভো, জেন্টলম্যান ওয়্যারড্রোব, ইনটেব্লু, তান ও গুজেল।
শেষ দিনে সাসটেইনেবিলিটি থিমে ক্যানভাস, জুরেহ, সত্তা, অরণ্য, নাশরা, ডেনিম শেনিম ও সুথ। টেকসই তত্ত্ব, রিডিজাইন, ন্যাচারাল ডাই, আপসাইক্লিং—নতুন প্রজন্মের ডিজাইনাররা এই বিষয়গুলো আলাদা করে সামনে এনেছেন; যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ফ্যাশন দিগন্তকে আরও বিস্তৃত করে তুলবে বলে আশা করা যায়।
এই বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, আর্কার সবচেয়ে বড় শক্তি ফ্যাশনকে গণতান্ত্রিক করে তোলা। অর্থাৎ বয়স, অভিজ্ঞতা, ব্যাকগ্রাউন্ড বা স্টাইল—কিছুই বাধা নয়; এখানে সৃজনশীলতাই মূল।
রানওয়ে শোগুলোতে দেখা গেছে ডিজাইনের নতুন ভাষা; মাস্টারক্লাসগুলো তুলে ধরেছে কারুশিল্পের গভীরতা—কীভাবে একটি পোশাক শুধু কাপড় নয়; একটি গল্পও বহন করে। এই পুরো অভিজ্ঞতা দর্শকদের সামনে এনে দিয়েছে ফ্যাশনের সেই দিকগুলো, যা সাধারণত আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
মার্কেটপ্লেস
আর্কা ফ্যাশন উইকের উইন্টার শোর মার্কেটপ্লেসে সক্রিয় উপস্থিতি ছিল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের। তাতে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড, ডিজাইনার ও কারিগরদের সৃজনশীলতা একসঙ্গে উদ্যাপিত হয়েছে। এখানে দেখা গেছে প্রতিষ্ঠিত নাম; যেমন আমি ঢাকা, কাঁঠাল, ইনটেব্লু। আবার নতুন আসা লেবেল দানিয়া, জুহরাহও ছিল। এই মার্কেটপ্লেসের মূল দর্শন ছিল টেকসই তত্ত্বকে ধারণ করে লোকাল ট্যালেন্টকে পরিচিত করার চেষ্টা। লিভিং ব্লু, ডেনিম শেনিম, ঢাকা ওয়েস্ট কালেক্টিভ—প্রতিটিই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্র্যাফট, সংস্কৃতি ও আদিবাসী ন্যারেটিভ নিয়ে কাজ করে।
তাদের কালেকশন দেখিয়েছে, কীভাবে ঐতিহ্যবাহী মাটির গন্ধ সমসাময়িক ডিজাইনের সঙ্গে মিশে যায়। কখনো ব্লু ডাই, কখনো রিসাইকেলড ডেনিম, কখনো আবার আপসাইকেলড হোম-অ্যাকসেন্টসের মাধ্যমে। সব স্টল ছিল শতভাগ সাসটেইনেবল।
অর্গানিক, রিইউজেবল উপাদানে তৈরি। এর লক্ষ্য ছিল বর্জ্য কমানো এবং দায়িত্বশীল ইভেন্ট ডিজাইনের দিকে একটি সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া। স্টলগুলোর কাঠামো এমনভাবে তৈরি, যাতে ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক ইভেন্ট, প্রদর্শনী বা কমিউনিটিভিত্তিক প্রজেক্টে পুনর্ব্যবহার করা যায়। এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অঙ্গীকারকে আরও শক্ত করে তুলে ধরে।
ছোট উদ্যোক্তা, কারিগর এবং নতুন ডিজাইনারদের জন্য বাস্তব সুযোগ তৈরি করার একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছিল আর্কা ফ্যাশন উইক। মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে তারা আরও বিস্তৃত দর্শকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, যা ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, কোলাব ও ব্র্যান্ড-বিল্ডিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই আয়োজনের মিডিয়া পার্টনার ছিল ক্যানভাস; ফ্যাশন শোর মেকওভার পার্টনার পারসোনা।
ফ্যাশন ডেস্ক
ছবি: আর্কা ফ্যাশন উইকের সৌজন্যে
