কুন্তলকাহন I আরব্য রজনী যেন
আরব ভূখণ্ডের কালজয়ী প্রেমের লোকগাথা লাইলি-মজনু। লাইলির চুলকে গভীর রাতের সঙ্গে তুলনা করেছেন কবি নিজামী গনজবি। সেখানেই নাকি পথ হারিয়েছিলেন প্রেমিক মজনু! এখনো আরব নারীদের চুল মনে করিয়ে দেয় মরুভূমির নিকষ রাত্রির কথা। কোমল, গাঢ় অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া
ছোটবেলায় পড়া আরব্য রজনীর আলাদিন গল্পের রাজকুমারী জেসমিনের সেই দীঘল কালো কেশ মনে আছে? অমানিশা যেন। তেমন চুল দেখা যায় আরব্য নারীদের। আর আরব রাজ্য? প্রখর মরুভূমি। দিনভর উত্তাপ। রাত নামলেই হিম। এমন বৈরী আবহাওয়ায় আরবের মানুষের বাস। মানিয়ে নেওয়াই পরিণতি। ভালো থাকার চেষ্টায় তৈরি হয় জীবনযাপনের নানা রীতি। চুলের ব্যাপারটিও তা-ই। আবহের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি থাকা চাই। এটিই মন্ত্র। শতাব্দী ধরে অভ্যাসে পরিণত হওয়া কিছু রীতিনীতিই ভালো রেখেছে আরববাসীর চুল। শুধু তেলে কালো হয়নি, জলেও সুন্দর হয়নি কেশ। সব মিলিয়ে তৈরি ম্যাজিক।
আয়োজন করে চুল বাঁধতেন আরবের নারীরা। মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা থেকে তুরস্কের অটোমান বাদশা সুলতান সুলেমানের হারেম—সর্বত্রই ছিল কেশবন্দনা। চুল সাজানোর আগে ঠিক করে ধুয়ে নেওয়া ছিল মূলমন্ত্র। প্রাচীন আরবে চুল ধোয়া হতো একধরনের গুঁড়া সাবান দিয়ে; যার নাম ঘাসুল। খাতমি, সিদর এবং বিশেষ ধরনের ক্লে দিয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে তৈরি হতো এটি। চুল ধোয়া হতো নানা ভেষজ উপাদান ভেজানো পানি দিয়ে। ঘিসলাত ও নুদুহ নামক সুগন্ধিযুক্ত তরল দিয়ে কেশ ধুয়ে নিতেন অভিজাতেরা। একাধিক কৌশলে তৈরি হতো এগুলোর রেসিপি। মরুভূমির রুক্ষ ও শুষ্ক হাওয়া থেকে চুল রক্ষায় বহুদিন ধরে সিল্কের ওড়না বা হিজাব ব্যবহার করেন আরবের নারীরা। এতে সূর্যের তীব্র তাপ ও ধুলাবালি থেকেও সুরক্ষা মেলে চুলের।
সৌরভের সমাদর
বাতাসে মিষ্টি সৌরভ ছড়াবে চুল—এই আয়োজনে কোনো কমতি রাখেন না তারা। তখনো, এখনো। নয় ও দশ শতকের আরবের বিভিন্ন চিকিৎসা ও সুগন্ধিবিষয়ক শাস্ত্রেই মিলেছে প্রমাণ। চুল ধোয়া থেকে আঁচড়ানো—আর্দ্রতা ও সৌরভ ধরে রাখার প্রাচীন সব কৌশলের উল্লেখ পাওয়া যায় আরবের চিকিৎসক আল-তামিমির লেখা সুগন্ধিবিদ্যা গ্রন্থে। সুগন্ধিযুক্ত তেল, গোলাপজল ছাড়াও গুঁড়া করা সুগন্ধি দিয়ে হতো চুলের পরিচর্যা। চুলে সৌরভ ধরে রাখতে কোনো পারফিউম বা স্প্রে নয়; ব্যবহৃত হতো ধোঁয়া। জ্বলন্ত ধূপে পোড়ানো হতো আউদ। সেই ধোঁয়া বোলানো হতো চুলে। তাতেই আটকে যেত সৌরভ। এই চর্চার নাম বাখুর। আজও এ পদ্ধতিতে চুল সুবাসিত করেন আরবের নারীরা। ইতিহাস থেকে পাওয়া এ জ্ঞানগুলোই তাদের চুলের নিত্যসঙ্গী। সঙ্গে আধুনিক পন্থাগুলো তো আছেই।
তেলের তেলেসমাতি
চুলের যত্নে তেলের প্রয়োজন ফুরাবার নয়; বিশেষ করে প্রাকৃতিক তেল। পুষ্টি জোগাতে নিয়মিত চুলে তেল দেন আরবীয় নারীরা; বিশেষ করে, আরগান অয়েল। তারা বলেন তরল সোনা। মরক্কোর আরগান গাছের বীজ থেকে প্রাপ্ত এই তেল অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ। আরও আছে ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ভিটামিন ই। চুলের জন্য প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়ক। গোড়া থেকে মজবুত করে চুল। আরেকটি হচ্ছে কাঠবাদামের তেল। চুলের কোঁকড়ানো ভাব সহজে মসৃণ করতে পারে। বাড়ায় উজ্জ্বলতা। প্রতিকূল পরিবেশেও হয়ে ওঠে চুলের ঢাল। ব্যবহার করা যায় রোজমেরি বা ল্যাভেন্ডার তেলের সঙ্গে মিশিয়ে। সপ্তাহে এক দিনই যথেষ্ট।
ন্যাচারাল কন্ডিশনার
মেহেদি বেটে চুলে প্রয়োগের রীতি এই অঞ্চলেও আছে। চুল রং করাই উদ্দেশ্য। তবে আরবের নারীরা এর ব্যবহার করেন কন্ডিশনার হিসেবে। অসংখ্য মেহেদিগাছ জন্মায় মধ্যপ্রাচ্যে। চুলে নিয়মিত মেহেদি দেন সেখানকার প্রায় সব বয়সের মানুষ। এতে চুলের স্বাভাবিক রং পরিবর্তন হতে পারে। এমনটি না চাইলে ব্যবহার করেন রংহীন নিউট্রাল মেহেদি। টক দই বা চায়ের সঙ্গে মেহেদির গুঁড়া মিশিয়ে তৈরি করা হয় হেয়ার মাস্ক। তাতে শক্ত হয় চুলের কেরাটিন। তৈরি হয় সুরক্ষা স্তর। চুল ভাঙা এবং ঝরে যাওয়া কমে। দেখায় ঝলমলে।
প্রকৃতিপ্রাণিত
চুলে বিভিন্ন ভেষজ উপাদানও ব্যবহার করা হয়। বেশি ব্যবহার মেথির। কারণ, এতে ভরপুর প্রোটিন ও আয়রন। আরও আছে সেইজ ও থাইম। স্বাদে ও গুণে দুটোই অনেকটা পুদিনাপাতার মতো। পাওয়া যায় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলগুলোতে। উপাদানগুলো পানিতে ভিজিয়ে কিংবা ফুটিয়ে নিয়ে সেই পানিতে চুল ধুয়ে নেওয়া হয়। ফলে ভেষজ উপাদানের সব গুণ চুলের গোড়ায় প্রবেশ করে; গোড়া হয় মজবুত। চুল পড়া অনেকটাই কমে। এই প্রক্রিয়াকে বলে হারবাল ইনফিউশন।
মাসাজ এবং মাসাজ
মাথার সুস্থ ত্বকই সুন্দর চুলের ভিত্তি—আরবদের মধ্যে এমন বিশ্বাস প্রচলিত। নিয়মিত মাথা মাসাজ করেন তারা। এতে রক্তসঞ্চালন বাড়ে। চুলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। শক্তির জোগান মেলে ফলিকলে। চুলে তেল দেওয়ার সময় হাতের আঙুলগুলোকে গোলাকারে ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে মাসাজ করেন এই নারীরা। ব্যবহার করেন কাঠের চিরুনি।
যত্নে বাড়ে চুল
শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে আরবের নারীদের চুল সাধারণত ঘন ও খসখসে হয়। তাই সালফেট মুক্ত শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার ব্যবহারে ঝোঁক তাদের। যাদের চুল শুষ্ক, তারাও এমন চর্চা করতে পারেন। খুব জোরে চুল মোছেন না তারা। আলতো হাতে তোয়ালে দিয়ে পানি চেপে নিলেই হলো। ৫ মিনিট মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে রাখলেই শুষে যায় অতিরিক্ত পানি। চুলের প্রতি মমতাময়ী আরবের নারীরা। মরুর প্রতিকূল হাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে এসেছে এই রীতিনীতি। আধুনিকের সঙ্গে ঐতিহাসিক নানা পন্থার সংমিশ্রণ আরব্য কেশ অভিনিবেশ।
দিন দিন বদলে যাচ্ছে আমাদের আবহাওয়া। বাড়ছে রুক্ষতা। চাইলে আরবদের মতো করে মমতাভরে যত্ন নেওয়া যেতে পারে চুলের। তাতে সৌন্দর্য বাড়বে বৈ কমবে না।
আবৃতি আহমেদ
ছবি: সংগ্রহ
