টেকসহি I প্রবঞ্চনার পরিণাম
ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কে বিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যা তথ্যে বিক্রেতা সাময়িক লাভবান হলেও আদতে তাতে বাজার নাশ ঘটে। বৈশ্বিক থেকে অভ্যন্তরীণ—সবখানেই অসত্য তথ্যের বেসাতির খোঁজ, শিল্পের স্বচ্ছতা এ সময়ে তাই ভীষণ জরুরি
বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম তাদের কনশাস কালেকশনের ব্যানারে দাবি করেছিল, পোশাকগুলো ইকো ফ্রেন্ডলি, অরগানিক ম্যাটেরিয়ালে তৈরি। কিন্তু পরে জানা যায়, এই সাসটেইনেবল কালেকশনের পুরোটা টেকসই তত্ত্বের ভিত্তিতে তৈরি হয়নি; বরং সেখানেও ফাস্ট ফ্যাশনের আগ্রাসন। আরেক ব্র্যান্ড জারার ইতিহাসেও পাওয়া যায় এমন ঘটনা। লেবেলটির জয়েন লাইফ নামে একটি লাইন ছিল, যেটিকে সাসটেইনেবল ও ইকো ফ্রেন্ডলি হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু এই লাইন পুরো ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেনি। জারার বেশির ভাগ পোশাক উৎপাদন টেকসই তত্ত্বের নিয়মের বাইরে হতো। বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড শেইনের রেকর্ডেও একই রকম ঘটনার সন্ধান মেলে। জানা যায়, ইকো ফ্রেন্ডলি, রিসাইকেলেবল, সাসটেইনেবল হিসেবে লেবেলিং করলেও বাস্তবে তাদের কাজ ফাস্ট ফ্যাশন মডেলেই সম্পন্ন হয়। তারা প্রচুর বর্জ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। অথচ তা আড়ালের উদ্দেশ্যে অসত্য তথ্যের প্রচারণা চালিয়েছে জেনে-বুঝে। ফ্যাশন দুনিয়ার ভাষায় একে বলে গ্রিন ওয়াশিং।
শুধু অন্য দেশে নয়; এমন হাজারটা উদাহরণ আমাদের দেশেও অনায়াসে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। মসলিন পুনরুদ্ধারের প্রকল্প তৎকালীন সরকারের মাধ্যমে শুরু হয় ২০১৮ সালে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে যুক্ত ছিল বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। সেই প্রকল্পের মাধ্যমে মসলিন ফিরিয়ে আনার প্রয়াস চালানো হয়। মসলিন পুনরুদ্ধারের কারিগর এম মনজুর হোসেনের দেওয়া তথ্যমতে, এই পরিকল্পনার দায়িত্বপ্রাপ্তরা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে মসলিন কাপড় সংগ্রহ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মসলিনের জন্য প্রয়োজনীয় আসল ফুটি কার্পাস তুলার জাত শনাক্ত করেন। গবেষণা সম্পন্ন করে মসলিন পুনরুদ্ধারে সক্ষমও হন; কিন্তু এই ফ্যাব্রিক এখনো বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হয় না বলে জানা যায়। অথচ এ দেশের বহু বিখ্যাত ফ্যাশন হাউসের প্রোডাক্ট লাইনে মসলিনের তৈরি বিভিন্ন পণ্য থাকার দাবি এবং উচ্চ মূল্যে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হয়। সত্য লুকোনো অথবা মিথ্যা তথ্যের বাহারি বাজারজাতকরণের মাধ্যমে ক্রেতাদের মধ্যে মসলিন নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে, যা এর ঐতিহ্যকেও হুমকির মুখে ফেলছে। র সিল্কে তৈরি এসব ফ্যাব্রিককে মসলিন ভেবে প্রতারিত হচ্ছেন তারা।
জামদানির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। পিট লুম বুননে তৈরি যেকোনো হ্যান্ড লুম শাড়িকে দাবি করা হচ্ছে জামদানি বলে। তাতে নতুন নতুন মনগড়া মোটিফ বোনা হচ্ছে। জামদানি হারাচ্ছে স্বাতন্ত্র্য। জামদানির ডিজাইনার তাঁতশিল্পীরা। তারা মনের মাধুরী আর যাপিত জীবনের নানা উপকরণে খুঁজে পেয়েছিলেন মোটিফ। সেগুলোকে উপজীব্য করেই এই শিল্প বাংলাদেশের জন্য নিয়ে আসে বিরল সম্মান। এই পণ্যের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এ দেশ জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন (জিআই) পায়। ভৌগোলিক নির্দেশক জামদানিকে করে তোলে অনন্য। আর এই সম্পদ ধরে রাখতে এর নিজস্বতা নষ্ট করা কাম্য নয়। জামদানি বয়নশিল্পকে ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি হিসেবে ইউনেসকোর স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জামদানির মোটিফ নিয়ে বিশিষ্ট ডিজাইনার এবং জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্র শেখর সাহা রচিত ও সম্পাদিত একটি উল্লেখযোগ্য বই ‘ট্র্যাডিশনাল জামদানি’। এই বইয়ে জামদানি নকশার ঐতিহ্য, বয়নশৈলী এবং নকশার পেছনের গল্প নিয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে। এটি বাংলাদেশের সমৃদ্ধ বয়নশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং ডিজাইনার, গবেষক ও জামদানিপ্রেমীদের জন্য আকরগ্রন্থ। ৬৭টি জামদানি নকশা প্রথমবার মুদ্রণের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়েছে এখানেই। বইটির মাধ্যমে জামদানির ঐতিহ্য রক্ষায় মোটিফ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মিরপুর বেনারসিপল্লি নিজেদের জায়গা তৈরি করেছিল রেশমে বোনা বেনারসি শাড়ি বানিয়ে। হস্তচালিত তাঁত ব্যবহারে এই শাড়ি তৈরি করা হয়। এ জন্য তাঁতশিল্পীদের লেগে যায় দীর্ঘ সময়। বিনিময় মূল্যও বেড়ে যায় বেশ। কারণ, শতভাগ রেশম সুতায় তৈরি শাড়ির চাহিদা থাকলেও এই খাঁটি সুতার দাম মোটেই কম নয়। এক কেজি খাঁটি রেশম সুতার দাম প্রায় ১০ হাজার টাকা। এই ওজনে ওয়াক্সের পরিমাণ থাকতে পারে ২০-২৫ শতাংশ; যা তাঁতে ব্যবহারের আগে সুতা থেকে আলাদা করা হয়। অর্থাৎ কেনা সুতার পরিমাণ কমে যায়। এ ছাড়া আমদানি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা খরচ বাড়িয়ে দেয়। লাভের পরিমাণ দাঁড়ায় সামান্য। যে শাড়ি তৈরিতে প্রয়োজন ৬৫ হাজার টাকা, তার বিক্রয়মূল্য ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা। আর এই শাড়ি তৈরি বাবদ একজন শ্রমিক আয় করেন মাত্র দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। মাস শেষে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত উপার্জন করতে পারেন তারা। যা বর্তমান বাজারে বেশির ভাগ পরিবারের জন্যই সামান্য। আবার এসব শাড়ির মূল্য অনেক ক্রেতারই নাগালের বাইরে। তাই তারা মানের ক্ষেত্রে আপোসে বাধ্য হচ্ছেন।
হস্ততাঁতে তৈরি মিরপুর বেনারসি শাড়ির পাশাপাশি বেশির ভাগ শোরুমে বিক্রি হচ্ছে আমদানি করা পাওয়ার লুমে তৈরি শাড়ি। এগুলো দামে সস্তা হওয়ায় ক্রেতারা আকৃষ্ট হচ্ছেন। কিন্তু এগুলোর বাহ্যিক সৌন্দর্য হাতে তৈরি মিরপুর বেনারসির কাছাকাছি হলেও ব্যবহার করলে ফারাকটা অনুভূত হয়। পয়সা খরচ করেও আস্থা হারাচ্ছেন ক্রেতা। হস্ততাঁতের জায়গা দখলে নিচ্ছে পাওয়ার লুম। দ্রুততম সময়ে শাড়ি তৈরির পাশাপাশি খরচ পড়ছে কম। তাই মূল্য তুলনামূলক কমই হাঁকছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু মানের দিক থেকে হস্ততাঁতের সঙ্গে বিস্তর ফারাক রয়েছে এসব শাড়ির; ফলে দিন দিন ফ্যাশন ও মান-সচেতন ক্রেতারা নিজ দেশের এই ঐতিহ্যবাহী শাড়ির প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন। জমকালো এই শাড়ির জায়গা দখলে নিচ্ছে পাশের দেশের মেশিনে বোনা শাড়ি। বাজার দখল হচ্ছে অসত্য তথ্যে।
বাংলাদেশের ফ্যাশন বাজার মূলত উৎসবকেন্দ্রিক। সেখানে তাই চিরকালীন ঐতিহ্যবাহী পোশাকের চাহিদা থাকেই। ঈদ, পূজা, নববর্ষ এবং বিয়ের মৌসুম—সব সময় ক্রেতারা এসব পণ্যের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন। কিন্তু বিশুদ্ধতা যখন হাওয়ায় মিলায়, তখন তার চাহিদা কমে আসে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। মিথ্যা তথ্য ক্রেতাকে সাময়িক সময়ের জন্য বাজেট সংকুলানে সাহায্য করলেও পরবর্তীকালে গুণমানের সঙ্গে ঘটে টানাপোড়েন; যা পরিণামে নিজ দেশের এসব শিল্পের প্রতি বিমুখ করে তোলে। কঠোর নজরদারি ও মান নিয়ন্ত্রণ তাই আবশ্যক। কারণ, ক্রেতার সচেতনতা আজ ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে। সঠিক তথ্য ও স্বচ্ছ লেবেল নিশ্চিত করলে ক্রেতা শুধু নির্ভরযোগ্য পণ্যই পাবেন না; একই সঙ্গে বাংলাদেশি মসলিন, জামদানি ও হস্ততাঁতের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পের মর্যাদাও রক্ষা পাবে। এককথায়, সত্যনিষ্ঠতা ও স্বচ্ছতা মিলেই ফ্যাশনশিল্পকে টেকসই করে তোলা সম্ভব। নয়তো বিদেশি আগ্রাসনে বিলুপ্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে।
সারাহ্ দীনা
ছবি: ইন্টারনেট
