skip to Main Content

ফিচার I কালকূট কাহন

চকচকে পলিয়েস্টার, মসৃণ নাইলন আধুনিক জীবনের ফ্যাশনে স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। কিন্তু এই আরাম ও চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে গভীর স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা বন্ধ্যাত্বের সংকট নতুন করে প্রশ্ন তুলছে এই দৈনন্দিন অভ্যাস নিয়ে। স্বর্ণা রায়ের লেখায় বিস্তারিত

চকচকে পলিয়েস্টারের শাড়ি বা জিমে পরার ফ্লেক্সিবল নাইলনের পোশাক—আধুনিক জীবনযাত্রায় এখন অপরিহার্য। কিন্তু ফ্যাশনের এই চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি মাতৃত্বের স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রজনন স্বাস্থ্যের সংকট যখন বাড়ছে, বিশেষজ্ঞরা পোশাকের উপাদান নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। অনুসন্ধানের কেন্দ্রে পলিয়েস্টারের মতো সিনথেটিক কাপড়, যা প্রজনন স্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত। ফ্যাশন ও ফার্টিলিটির এই অপ্রত্যাশিত সংযোগ এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যেখানে প্রশ্ন উঠছে—সৌন্দর্যের জন্য স্বাস্থ্যকে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে না তো?
সিনথেটিকে সর্বনাশ
সিনথেটিক কাপড় মূলত পেট্রোলিয়ামভিত্তিক রাসায়নিকের এক জটিল মিশ্রণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন রং, ফিনিশিং এজেন্ট ও প্লাস্টিসাইজার। এই রাসায়নিকগুলোর মধ্যে বিপিএ, ফথালেটস ও পারফ্লুরিনেটেড কম্পাউন্ডস সবচেয়ে মারাত্মক। এগুলোকে এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর বা হরমোনবিনাশী রাসায়নিক বলা হয়। ত্বকের সংস্পর্শে এলে ধীরে ধীরে শরীরে প্রবেশ করে এবং এন্ডোক্রাইন গ্ল্যান্ডের স্বাভাবিক কাজে বাধা দেয়, যা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে এবং গর্ভধারণের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।
নির্বিশেষে বিষ
শুধু নারীস্বাস্থ্য নয়, পুরুষদের ওপরও সিনথেটিক কাপড়ের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। এর মূল কারণ দুটি—তাপ ও রাসায়নিক উপাদান।
 পলিয়েস্টার একটি অশ্বসনযোগ্য তন্তু, অর্থাৎ এটি বাতাস চলাচল করতে দেয় না। ফলে আঁটসাঁট সিনথেটিক অন্তর্বাস পরলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। চিকিৎসকদের মতে, অণ্ডকোষের তাপমাত্রা মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেই শুক্রাণুর সংখ্যা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এই অতিরিক্ত তাপ শুক্রাণু উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
 গবেষণায় দেখা গেছে, পলিয়েস্টারের অন্তর্বাস একটানা পরার কারণে অনেক পুরুষের বীর্যে শুক্রাণুর অনুপস্থিতি (এজোস্পার্মিয়া) দেখা দিয়েছে। তবে আশার কথা হলো, সিনথেটিক পোশাক পরা বন্ধ করলে কয়েক মাসের মধ্যে শুক্রাণুর সংখ্যা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
 ফ্যাটালেটস ও বিপিএর মতো রাসায়নিকগুলো নারীদেহে ইস্ট্রোজেন হরমোনের কাজে হস্তক্ষেপ করে। ফলে ওভুলেশন ব্যাহত হতে এবং ডিম্বাণুর গুণমান কমে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারীর শরীরে পানিনিরোধী পোশাকে ব্যবহৃত পিএফসির মাত্রা বেশি, তাদের গর্ভধারণের সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়।
 প্রজনন ঝুঁকির পাশাপাশি সিনথেটিক কাপড় আরও নানা স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে। যেহেতু এটি ঘাম শোষণ করতে পারে না, তাই ত্বকের ওপর ঘাম ও ব্যাকটেরিয়া জমে থাকে। এর ফলে র‌্যাশ, অ্যালার্জি, একজিমা ও ছত্রাক সংক্রমণের মতো ত্বকের রোগ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সিনথেটিক কাপড় ধোয়ার সময় এবং ব্যবহারের ফলে ক্রমাগত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা নির্গত হয়, যা নিশ্বাসের সঙ্গে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
সচেতন পোশাক নির্বাচন
এই ঝুঁকি থেকে বাঁচতে দৈনন্দিন জীবনে কিছু সহজ অথচ কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
 শতভাগ সুতি, লিনেন, বাঁশ, সিল্ক বা ভিসকসের মতো প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাককে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে এই সমস্যা থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব। পলিয়েস্টার, নাইলন, অ্যাক্রিলিক বা স্প্যানডেক্স এড়িয়ে চলা জরুরি।
 অনেক পোশাকেই কটন-পলিয়েস্টারের মিশ্রণ থাকে। শরীরের সঙ্গে সরাসরি স্পর্শে থাকা পোশাক, যেমন অন্তর্বাস, গেঞ্জি বা পায়জামা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক তন্তুর হলে ত্বক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষ পোশাকে মনোযোগ
 অন্তর্বাস: এটি শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশের সংস্পর্শে থাকে, তাই অবশ্যই সুতির মতো শ্বাস-প্রশ্বাসযোগ্য কাপড়ের হওয়া উচিত।
 ব্যায়ামের পোশাক: শরীরচর্চার সময় সিনথেটিক পোশাকের ব্যবহার বেশি হলেও ব্যায়াম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বদলে ফেলা এবং শরীর পরিষ্কার করা চাই।
 ঘুমের পোশাক: রাতে শরীর নিজেকে মেরামত করে। তাই ঘুমের সময় ঢিলেঢালা, আরামদায়ক এবং প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক পরাই শ্রেয়।
 কাপড় ধোয়ায় সচেতনতা: সিনথেটিক কাপড় ধোয়ার সময় মাইক্রোপ্লাস্টিক ফিল্টার ব্যাগ ব্যবহার করতে পারেন, যা পরিবেশদূষণ কমাতে সহায়ক।
বাড়তি সতর্কতা
 শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারী: শিশুদের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও শোষণক্ষম। তাই তাদের জন্য জৈব সুতির পোশাক ব্যবহার করা আবশ্যক। গর্ভবতী নারীদেরও সিনথেটিক কাপড় এড়িয়ে চলা মঙ্গল; কারণ, ত্বকের মাধ্যমে শোষিত রাসায়নিক গর্ভের শিশুর ক্ষতি করতে পারে।
 প্রজনন সমস্যায়: যারা ইতিমধ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), এন্ডোমেট্রিওসিস বা শুক্রাণুর স্বল্পতার মতো সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক পরা আরও জরুরি।
ধরণীপ্রেম
পলিয়েস্টার ও নাইলনের মতো কাপড় পেট্রোলিয়ামজাতীয় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি হয়। এর উৎপাদনপ্রক্রিয়া প্রচুর কার্বন নিঃসরণ এবং পরিবেশ দূষিত করে। সবচেয়ে বড় কথা, এই কাপড় প্রকৃতিতে সহজে মেশে না (নন-বায়োডিগ্রেডেবল) এবং হাজার হাজার বছর ধরে আবর্জনা হিসেবে পৃথিবীতে থেকে যায়।
সিনথেটিক কাপড়ের তৈরি সংকটময় পরিস্থিতিতে আশার আলো দেখাচ্ছে প্রকৃতি। জৈব সুতি, বাঁশ, সিল্ক, লিনেন বা মডালের মতো প্রাকৃতিক তন্তুগুলো কেবল আরামদায়কই নয়; প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্যও এককথায় নিরাপদ। এই তন্তুগুলো বাতাস চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় এবং ঘাম বা আর্দ্রতা শোষণ করে ত্বককে শুষ্ক ও স্বাস্থ্যকর রাখে। উদাহরণস্বরূপ, টেক্সটাইল রিসার্চ জার্নালের ২০২৩ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, বাঁশের তন্তু তুলার তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি আর্দ্রতা শোষণ করতে সক্ষম। এর সঙ্গে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য ত্বককে সংক্রমণ থেকেও সুরক্ষা দেয়। ভারতের গুরুগ্রামভিত্তিক গাইনোকোলজিস্ট রিতু শেঠি বিষয়টিকে সমর্থন করে বলেন, ‘প্রাকৃতিক তন্তু ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি কমায় এবং শরীরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, যা প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।’
স্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে এই নতুন সচেতনতা এখন ফ্যাশন জগতেও বিপ্লব আনছে। এটি এমন পরিবর্তন, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান এসে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে সমর্থন জানাচ্ছে। বিজ্ঞান প্রমাণ করছে, যা আমাদের দাদি-নানিরা সহজাতভাবে জানতেন, সুতির আরাম বা মসলিনের শীতলতা কেবল অনুভূতির বিষয় নয়, এর পেছনে রয়েছে শরীর সুস্থ রাখার কৌশল। আজকের ফ্যাশন জগৎ তাই শুধু ডিজাইন বা রঙের বাহার নয়; বরং ঐতিহ্যবাহী তন্তুর সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে স্বাস্থ্যসচেতন ও টেকসই পোশাক তৈরিতে মনোনিবেশ করছে। ডিজাইনাররা এমন পোশাক তৈরি করছেন, যা শুধু দেখতেই সুন্দর নয়, শরীরের জন্যও উপকারী। এই সমন্বয় ভবিষ্যতের ফ্যাশনের নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে, যেখানে সৌন্দর্য ও সুস্থতা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক।

ছবি: সংগ্রহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top