বাংলার লোকশিল্পের অন্যতম প্রাচীন ও নান্দনিক রূপ আলপনা, যা মূলত লেপন বা রঙের প্রলেপের মাধ্যমে তৈরি একধরনের কারুকার্য। সহজ রেখা, সীমিত রং এবং বিমূর্ত নকশার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পরীতি দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির জীবনে গভীরভাবে জড়িত। বাড়ির আঙিনা, চৌকাঠ, বিয়ের পিঁড়ি কিংবা বৈশাখী বরণ আয়োজন—সবখানেই আলপনার ব্যবহার লক্ষণীয়। অনেক গবেষকের মতে, ব্রত ও পূজার সঙ্গে যুক্ত আলপনার উৎপত্তি প্রাক্-আর্য যুগে। তবে আধুনিক সময়ে এর রূপ আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে, যেখানে বিমূর্ততা, অলংকরণ এবং ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনার সমন্বয়ে আলপনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

প্রচলিতভাবে আলপনা আঁকতে ভেজানো চালের গুঁড়া সাদা রং হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি তেল-সিঁদুর থেকে লাল এবং হলুদবাটা থেকে হলুদ রংও ব্যবহারের নজির রয়েছে। সাধারণত পিটালিতে রাখা চালের গুঁড়ায় কাপড় বা পাটের ছোট টুকরো ভিজিয়ে অনামিকার সাহায্যে মেঝের ওপর এই নকশা আঁকা হয়। আলপনার রেখাগুলো মোটা ও দ্বিমাত্রিক হওয়ায় এর নকশা সহজ হলেও দৃষ্টিনন্দন। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, বাংলার নারীরাই এই শিল্পচর্চার ধারক ও বাহক। ধর্মীয় আচার, ব্রত, উৎসব কিংবা গৃহসজ্জা—সব ক্ষেত্রে আলপনার ব্যবহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নকশার বিষয়বস্তু হিসেবে পদ্মফুল, ধানের শীষ, সূর্য, বৃত্তাকার রেখা, মাছ, শঙ্খলতা বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আলপনার ব্যবহার ও পরিসরও বিস্তৃত হয়েছে; বিশেষ করে বৈশাখী বরণ, একুশে ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবসে ঢাকার শহীদ মিনারসহ আশপাশের সড়কে আলপনা আঁকার মাধ্যমে এই শিল্প নতুন তাৎপর্য পেয়েছে। বাঙালি ও আলপনা উৎসবে-আনন্দে ওতপ্রোত জড়িত।
I ক্যানভাস অনলাইন
