ছুটিরঘণ্টা I কাজাখস্তানের অচেনা গ্রামে
কাজাখস্তান। মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে বড় স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের খনি যেন! ঘুরে এসে লিখেছেন ফাতিমা জাহান
পাহাড়ি আকাশের মন বোঝা দায়! একটু আগে স্বর্ণালি সন্ধ্যা দেখাবে বলে ডেকে আনল, আর এখন তার চোখে কাজল। সেই দেখে সামনের সরোবরও চট করে রং বদলে ফেলেছে। সে গাঢ় হচ্ছে, আকাশের মতো। সরোবর থেকে ফিরে আসতে আসতে বৃষ্টি নামল আর ঠান্ডাও জেঁকে বসল।
এতক্ষণ ছিলাম কাজাখস্তানের কোলসাই লেকে। এখন যাব স্থানীয় একজন কৃষকের বাড়িতে। গ্রামের নাম সাতি। আমার ট্যুর অপারেটর আইবেক তার ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি চালাচ্ছেন বৃষ্টির মাঝে। চারপাশে নেমে এসেছে আঁধার। সন্ধ্যা হয়ে এলো। ঘড়িতে সাড়ে আটটা। সঙ্গে আছেন গাইড রন। তিনি জাতিতে জার্মান আর আইবেক কিরগিজ।
সাতি গ্রামে পৌঁছতে পৌঁছতে নয়টা বেজে গেল। আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন কৃষক তেমুর খান। বাড়ির গেট খুলে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করলেন। তারপর নিয়ে গেলেন সোজা খাবার ঘরে। ঘরটা বেশ বড়; একসঙ্গে কয়েকজন বসে তিনটি বড় বড় টেবিলে খাবার খাওয়া সম্ভব। কারণ, যারা গ্রামে কৃষকের বাড়িতে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন, তাদের জন্য খুব অল্প ব্যবস্থা আছে কাজাখস্তানে। তেমুর খান সেই অল্প মানুষদের একজন। খাবার ঘরটি মূল বাড়ি থেকে আলাদা। পাকা ঘরের দেয়ালে কাঠের আস্তরণ দিয়ে সাজানো। এর ওপর গাছের গোলাকার গুঁড়ি পাতলা করে কেটে, পাশাপাশি রেখে, কাঠের দেয়ালে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশের গ্রাম তো দূরের কথা, শহরেও এত সুন্দর ইন্টেরিয়র ডিজাইন চোখে পড়েনি আমার।
তেমুর খান ইংরেজি জানেন না। আমি জানি না কাজাখ ভাষা। তেমুর খানের সারল্যে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তার মুখে শিশুর মতো হাসি লেগে আছে। ডাইনিং হলে ততক্ষণে তার স্ত্রী লরা চলে এসেছেন ট্রে ভরতি চকলেট, বিস্কুট আর চা নিয়ে। লরাকে দেখে আরও মোহিত আমি। কারণ, তার চোখে-মুখে তেমুর খানের চেয়ে বেশি সারল্য আর আনন্দ ঝিলিক দিচ্ছে। দুজনের পরনে টি-শার্ট আর ট্রাউজার; চুল ছোট করে কাটা। লরা আর তেমুরের সন্তান দুজন; একটি মেয়ে আর একটি ছেলে।
খাবার পরিবেশন করা হলো। মূল খাবারের নাম মানতি। আদতে চায়নিজ ডাম্পলিং বা ভারতীয় উপমহাদেশের মোমো। ভেতরে মাংসের পুর দেওয়া। সঙ্গে কাজাখস্তানের প্রধান খাবার নান বা রুটি, স্যালাদ, ঘরে তৈরি জ্যাম। এই জ্যামের বৈশিষ্ট্য হলো, এতে স্টার্চ মেশানো হয় না। অ্যাপ্রিকট, স্ট্রবেরি, রাস্পবেরি বা অন্য যেকোনো বেরিজাতীয় ফল দিয়ে তৈরি হয় জ্যাম। কাজাখস্তানবাসী এটি চায়ের সঙ্গেও মিশিয়ে খান। চা কাজাখস্তানের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়। যেকোনো সময়, যেকোনো পরিবেশে এখানে চা চলে। সেটি অবশ্যই রংচা বা ব্ল্যাক টি।
আমরা একেকজন পেটভরে মানতি খেয়ে ফেললাম। খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি খিদেও পেয়েছিল বেজায়। মানতির জন্য যে মাংস ব্যবহার করা হয়েছে, তা কৃষকের নিজের খামারের। সঙ্গে নান আর স্যালাদ এবং অবশ্যই চা। চায়ের বড় একটি কেতলি আর গাঢ় লিকারের ছোট কেতলি রাখাই আছে, যখন ইচ্ছা তখন চা পান করার জন্য।
রাতের খাবার শেষ হওয়ার পর লরা আমাকে আমার রুম দেখিয়ে দিলেন। খেয়াল করলাম, আরও বেশ কয়েকজন ট্যুরিস্ট ছেলেমেয়ে তখনো খাবার ঘরে, অন্য টেবিলে খাচ্ছেন। বেশির ভাগই রাশিয়ান; কিছু কাজাখও। এদের মাঝে একটি ছেলে বললেন, আমরা যেহেতু আরও এক দিন আছি এ গ্রামে, তাই তিনিও আমাদের সঙ্গে আগামীকাল পাহাড়ে, বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে চান। আমরা সম্মতি দিলাম। ছেলেটির নাম কনস্ট্যান্টিনো। কাজাখস্তানে বাবার ব্যবসা দেখেন। জন্ম রাশিয়ায়; আদি বাড়ি জার্মানিতে। মানুষের কী অদ্ভুত চলাচল এই জগতে!
বাইরে বেশ ঠান্ডা পড়েছে। আমি পুলওভার গায়ে দিয়ে বাইরের বাগানের চেয়ারে এসে বসলাম। চারদিক নীরব হয়ে গেছে। আশপাশে আলো থাকতেই কাউকে দেখিনি, এখন তো শুধু আমি, পাহাড় আর আকাশ! সাতি গ্রামবাসী নয়টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন। এ গ্রামের রাস্তায় কোনো বাতি নেই। গ্রামের বাড়িঘরগুলো একেকটি বেশ দূরে দূরে। সব বাড়ি পাকা; তেমুরের বাড়িও। বাইরের অন্ধকার এতক্ষণে আমার চোখ সয়ে গেছে। স্বচ্ছ আকাশে এখন লাখ লাখ তারা।
পরের দিন, সকালে উঠে চলে এলাম লরার রান্নাঘরে। এখানেই পাওয়া গেল তাকে। এই রান্নাঘর দেখে আমি অবাক। ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক আধুনিক বাড়িতেও এমন আধুনিক রান্নাঘর দেখতে পাওয়া যায় না। চার বার্নারের চুলাসহ ওভেন থেকে শুরু করে মাইক্রোওয়েভ, দুটো বড় ফ্রিজ, আধুনিক কিচেন ক্যাবিনেট, বাইরে নান-রুটি বানানোর জন্য তান্দুর চুলা অবধি আছে। আমি চা খেতে খেতে রান্নাঘরে বসেই লরার সঙ্গে আড্ডা দিলাম কিছুক্ষণ। অল্প অল্প ইংরেজি জানেন তিনি। জানা গেল, তেমুরের সবজির খেত আছে। গরু, ঘোড়া, মুরগিও পালেন। এখানে প্রায় সব কৃষক অল্প খেতখামারের কাজ করেন; পশুপালনেই সময় দেন বেশি।
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসার কিছুক্ষণ পর লরা ও তেমুর আমাদের নাশতা খেতে ডাকলেন। সাধারণ নাশতা—নান, ডিম ভাজি, জ্যাম, চা, ফল। লরার হাতে তৈরি জ্যাম আমার এত ভালো লেগেছে, বলার মতো নয়! পারলে বোতল ভরে বাড়ি নিয়ে আসতাম। লরা আমাকে এক বোতল দিয়েও দিচ্ছিলেন; কিন্তু এখান থেকে আরও কয়েকটি দেশে যাব, লম্বা সফর আমার। বোতল ভেঙে যেতে পারে কিংবা কোনো কোনো দেশে জ্যাম নিয়ে যেতে না-ও দিতে পারে; তাই ফিরিয়ে দিতে হলো।
আমাদের সঙ্গে আজ কনস্ট্যান্টিনো আছেন। তার সুবিধা হলো, তিনি রুশ ও জার্মান—দুটো ভাষাই জানেন। আইবেকের সঙ্গে রুশ আর রনের সঙ্গে জার্মান ভাষায় অবলীলায় কথা বলে যাচ্ছেন। ইংরেজিও জানেন। কনস্ট্যান্টিনো একজন সোলো ট্রাভেলার। আমি নিজেও সোলো ট্রাভেলার। এখানে গাইড নিয়ে বা দল বেঁধে যাচ্ছি; কারণ, এসব ন্যাশনাল পার্কে একা ঘোরা নিষেধ। অন্যথায়, দুর্ঘটনা ঘটলে কেউ জানতেও পারবে না; কেননা, এ দেশের জনসংখ্যা খুব কম।
সোলো ট্রাভেলিং শব্দবন্ধ কারও কাছে নতুন, কারও কাছে আবার পুরোনো। বাংলাদেশে এই কনসেপ্ট তেমন প্রচলিত নয়। সোলো ট্রাভেলিং মানে যেকোনো একটি জায়গায় একা একা যাওয়া। একা ভ্রমণ পরিকল্পনা করা, টিকিট কাটা, হোটেল খোঁজা, হোটেলে থাকা, ভ্রমণ করা; যেকোনো শহর বা গ্রামে কারও সহায়তা ছাড়া একা একা ঘুরে বেড়ানো।
আইবেক গাড়ি ছুটিয়ে চলছেন সাতি গ্রামের পথ ধরে। বাড়িগুলো পাকা একতলা, ছাদ দোচালা বা চারচালা আকারের ঢালু; কারণ, শীতকালে এখানে বরফ পড়ে। সামনে ছিমছাম বাগান, পেছনে অফুরন্ত জায়গা, আরও পেছনে পাহাড়। জমিনে যাওয়ার জন্য কৃষকের গাড়ি আছে। কারও কারও আবাদের জমিন বাড়ির পাশেই।
কাইন্ডি লেক আদতে কোলসাই ন্যাশনাল পার্কের অংশ। আমরা সেই অংশ আজ দেখব। গাড়ি ছুটে চলছে গ্রাম ছাড়িয়ে, সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে। পাহাড় আমাকে সব সময় টানে। পাহাড়ের রহস্য ভেদ করার জন্য মাঝে মাঝে মরিয়া হয়ে উঠি। একেক পাহাড়ের একেক রহস্য। পাহাড় সেই রহস্য সবার সামনে উন্মোচন করে না, অবগুণ্ঠন খোলে না; মেঘবৃষ্টি ঝরিয়ে দূরে থাকতে চায়।
এদিকের পথটি নুড়িপাথরের এবড়োখেবড়ো, ঝাঁকুনিপূর্ণ। সামনের পাইনবন আরও ঘন হচ্ছে। কোথাও কোথাও বরফ গলে পানি জমে পথে ছোট একটি নদী হয়ে গেছে। সেই হাঁটুজলের নদীর ওপর দিয়েই গাড়ি চালাচ্ছেন আইবেক। দুপাশের পাহাড়ের পাহারায় আমরা একসময় পৌঁছে গেলাম লেকের কাছে।এখান থেকে অবশ্য বড় বড় পাইনবনের পাহাড় ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
আকাশ আজ বাড়াবাড়ি রকমের নীল হয়ে আছে। এত নীল আকাশ আমি আগে কখনো দেখিনি। পাইনবনের পায়ের কাছে বুনোফুল হলুদ চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। বনভূমিতে এত ফুলের সজ্জাও আগে দেখিনি। মাটির কাছে যা দেখি, সবই হলুদ হয়ে আছে ফুলের জগতে। পাশের পাহাড় নুয়ে সেই ফুল ছুঁয়ে দেখতে দেখতে ঢালু হয়ে নেমে গেছে যেন ফুলেরই তপস্যা করবে বলে!
এখান থেকে লেক একটু দূরে। আমাদের ট্র্যাক করতে হবে অনেকটা পথ। প্রায় তিন কিলোমিটার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ শেষে আমরা লেকের কাছাকাছি চলে এলাম। এতখানি হেঁটেও ঠান্ডা কমেনি। আমাদের পথ দেখাচ্ছেন রন।
অন্য ট্যুরিস্টদের আগে সকাল সকাল আমরা চলে এসেছি। বনের মাঝে চড়াই-উতরাই; তবে পাহাড়ে পথ করে দেওয়া আছে। চারদিকে এক কোমল স্নিগ্ধতা! এখনো লতাগুল্ম থেকে ভোরের শিশির মুছে যায়নি। সূর্যও তেমন ওম ছড়াচ্ছে না। গাছের ঘুম এখনো ভাঙেনি। এত শান্ত প্রকৃতি যে পাখি ওড়ার সময় তার পাখার আওয়াজ অবধি শোনা যাচ্ছে। পাখিদের কিচিরমিচির আর গাছের নিশ্বাস নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো শব্দ আমার কানে আসছে না। আমরা যে পথ ধরে ট্র্যাক করছি, তার দুপাশে এখন বড় বড় পাইনগাছ ছায়া দিচ্ছে। গাছের শরীর জড়িয়ে আছে নাম না জানা অগুনতি গুল্ম; কোথাও ফুল ফুটিয়েছে, কোথাও অজস্র শিশির বুকে আগলে ধরে আছে পাতা। গাছের ছাউনিতে বেশ ঠান্ডাও লাগছে। আমি ছাড়া দলের কারও কোনো বিকার নেই। এদের কাছে এখন গ্রীষ্মকাল, আর আমি শীতে হি-হি করে কাঁপছি!
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আমরা কখনো ওপরে, কখনো নিচে ট্র্যাক করতে করতে এক জায়গায় এসে থেমেছি। আমার মনোযোগ পথে; কারণ, পথ এতটাই বিমোহিত, এতই আত্মমগ্ন করেছে যে পথের বাইরে আর কিছু দেখার অবকাশ নেই। প্রায় আধঘণ্টা আমরা হেঁটেছি। একসময় রন বলে উঠলেন, ‘বাঁ দিকে তাকাও। দেখো দেখো…।’
এ রকম ধাক্কা বুকে আগে লাগেনি, এমন ব্যথাবোধ আমাকে আচ্ছন্ন করেনি আগে। লেকের এই রঙের নিজের এক আচ্ছন্নতা আছে, নিজেই নিজের মাঝে গাঢ় হয়ে যাচ্ছে। আমার সামনে কাইন্ডি লেক। হৃৎস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার জন্য জলাধারের রঙের তুলনা আর কিছুতেই হওয়ার নয়। এমন নীলকান্তমণি রং আমি খোদ রত্নভান্ডারেও দেখিনি। এ কেমন জলাধার যে নিজেই নিজেতে ডুবে আছে, নিজেকেই ভাসিয়ে দিচ্ছে, আবার নিজেই আয়না হয়ে দেখাচ্ছে, দেখছে! এ কেমন ধোঁয়াশা! রন আমাকে তাড়া দিয়ে বললেন, ‘এ তো শুধু একাংশ দেখেছ। লেকের বাকি অংশ দেখবে না?’
আমরা লেকের ধার দিয়ে ধীরে ধীরে পাহাড় থেকে নিচের দিকে নামতে থাকলাম। কখনো পাইনবনের আড়াল থেকে, কখনো খোলা আকাশের আরশি দিয়ে নীল-সবুজ কাইন্ডি লেক দেখতে দেখতে একেবারে নিচে নেমে পড়লাম। জলাধারের জল এখানে হাঁটুসমান। রন বোতল ভরে পানি নিলেন। পাহাড়ি ঝরনার জল সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর। স্বচ্ছ জল; নিচে নুড়ি পাথর দেখা যায়। এখন আর পান্না সবুজ বলে মনে হচ্ছে না। তবে দূরে, অনেক দূরের জল মনে ঘোর লাগিয়ে দেয়।
রন বললেন, ‘চলো, আমরা জল পেরিয়ে আরেকটু দূরে যাই। ওই যে দূরে জলের ভেতর গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে যাই।’ আমি পানি ছুঁয়ে দেখি ভীষণ ঠান্ডা। এখানে বসে থাকা কিংবা আশপাশের বনানী ঘুরে দেখা যায়; কিন্তু এই ঠান্ডা জলে নামতে ইচ্ছা করছে না। কনস্ট্যান্টিনোরও আগ্রহ নেই জলে নামার। আমি এখানে একটি পাথরের ওপর বসে পড়লাম। কনস্ট্যান্টিনো কোথায় যেন উধাও হয়ে গেলেন।
সামনের জলে ছোট ছোট ঢেউ আর দূরে জলের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সাদা সাদা লম্বা গাছের গুঁড়ি। কাইন্ডি লেক আসলে কোলসাই লেকের একাংশে ভূমিধসের কারণে আলাদা হয়ে পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে। এখানে এক পাশে তখন চুনাপাথর জমা হওয়ার কারণে বনভূমিতে জল জমে গাছগুলোর মৃত্যু ঘটেছে। গাছগুলো সেই ১৯১১ সাল থেকে আজ অবধি পত্র-ডালপালাহীন ঠায় দাঁড়িয়ে। দূর থেকে অনেকটা ডুবন্ত জাহাজের মতো দেখায় বলে এই লেককে অনেকে সিংকিং শিপ নামে ডাকে।
রনকে এখন দেখা যাচ্ছে দূরে। মোজাসহ হাইকিং বুট পরে পানিতে নেমেছেন তিনি। সাদা হয়ে যাওয়া গাছগুলোর কাছে গিয়েই আওয়াজ দিলেন; আমি তার কিছু ছবি তুলে রাখলাম।
রোদ এখন একটু একটু তেজ বাড়াচ্ছে। অভিযান শেষে ফিরে এলেন রন। কনস্ট্যান্টিনোও জঙ্গল ফুঁড়ে বেরিয়ে এলেন। আমরা আবার ট্র্যাকিং শুরু করলাম। এবার ওপরের দিকের ট্র্যাক। যে পথ দিয়ে এসেছি, সে পথ ধরেই আবার জলাধারের আরেক প্রান্তে যাচ্ছি। রন আমাদের সব দিক থেকে এই অসীম ঘোর লাগানো জল দেখিয়েই ছাড়বেন!
অর্ধেক পথ গিয়ে আরেকটি বাঁক নিয়ে আমরা অন্য পথ ধরে, পাইনবনের ছায়ায় আবার নিচের দিকে নামছি। কোথাও কোথাও পাইনবন এতই ঘন হয়ে এসেছে, রবি মামাকে দেখা যাচ্ছে না একদম। এ রকম আলো-আঁধারি যখন পার হচ্ছি, হঠাৎ আইবেক এসে হাজির। আমাদের দল ভারী হলো। চারজনের একটি দল ট্র্যাকিং করতে করতে লেকের আরেক প্রান্তে পৌঁছে গেল। এ দলের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া যাত্রীটি আমি। পাতার খাঁজে খাঁজে, মাটিতে, বুনোফুলে, পাইনগাছের ডালে কত যে রহস্য লুকিয়ে আছে, তা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না!
জলাধারের এপাশে এতক্ষণে বেশ কয়েকজন ট্যুরিস্ট এসে পড়েছেন। জলে নেমে বেশ জলকেলি করছেন তারা। দু-তিনজন ফিশিং রড নিয়ে মাছ ধরতে বসে পড়েছেন। সীমিতসংখ্যক মাছ ধরার অনুমতি আছে এই লেকে। অবশ্য আসেই-বা কজন এখানে।
জলাধারের পাড়ে কয়েক জায়গায় কাঠের মাচা করে দেওয়া আছে। আমি আমার দলকে বললাম, ‘তোমরা ঘুরে বেড়াও, আমি এখানে বসে লেক দেখব। দুপুরের খাবারের সময় হলে এখানে চলে এসো। লেকের পাড়ে বসে আমরা একসঙ্গে খাব।’ ওরা চলে যাওয়ার পর জলাধারের পাড়ে একটি ফাঁকা জায়গায় বসে পড়লাম আমি। এখানে কোনো ট্যুরিস্ট নেই। লেকের দুপাশেই ঘন পাইনবন। সিংকিং শিপ আমার সামনে। এই পাইনগাছগুলো যখন ডুবে যাচ্ছিল, তখন কি ওরা খুশি হয়েছিল, না দুঃখী ছিল? ডুবে যাওয়া জাহাজের মতো ওরাও নিশ্চুপ। জীবন্ত পাইনগাছের মতো পাতা নাড়িয়ে সাড়া দিতে পারে না। এই নীলকান্তমণি রং দেখে ঘোরগ্রস্ত আমি; বিশ্বাস হয় না—এই রং আদতে বাস্তব, নাকি শুধুই আমার কল্পনা। আমি আরও কাছে এগিয়ে যাই; জলের রঙে পা ডুবাই। পা ডুবিয়ে বসে থাকার জন্য দূরে একটি মাচায় গিয়ে বসলাম। খুব কাছে এখন এই জল আর ঘোর লাগানো রং। ইচ্ছা করছে এই রং মুঠো ভরে নিয়ে গায়ে মাখি, চোখে মাখি। এই আলো, এই বনানী, এই পাহাড়, পাখি, বুনোফুল—কিছুই আটকাতে পারেনি এই রঙের ঘোর থেকে। চোখ ঘোরে টলমল—টলে যাচ্ছে, আবার ঘুরে দেখছে, ঢলে পড়তে চাইছে সরোবরের কোলে।
এদিকটায় বেশ রোদ; জলে বেশিক্ষণ পা রাখা মুশকিল। পানি বেশ ঠান্ডা; সাঁতার কাটাও নিষেধ। একটি গাছের নিচে লতাগুল্মের মাঝে বসে আমি আবার ঘোরের জগতে চলে যাই। সেখানে আমি আর নীলকান্তমণি ছাড়া অন্য কেউ নেই।
কতক্ষণ এভাবে কেটে গেছে, জানি না। আমার দল ফিরে এসেছে একসঙ্গে। আমাদের খাবারের সময় হয়ে এলো বলে। এবার চাদর বিছিয়ে পুরো পিকনিক-পিকনিক ভাব আনা হয়েছে। আমরা সবাই রনকে সহায়তা করলাম খাবার পরিবেশন করতে। খাবারের আয়োজন—পুর ভরা নান, সমুচা, কেক, ফল, জুস। গল্প করতে করতে আমরা খেয়ে আবার সব গুছিয়ে ট্র্যাকিং শুরু করলাম।
লেকের বাকি অংশ ট্র্যাক করার জন্য নেমে পড়লাম আমরা। এখন একটু গরম লাগছে। জ্যাকেট, পুলওভার খুলে ফেলে এক এক করে বেরিয়ে পড়লাম। পিপীলিকার মতো সারিবদ্ধভাবে ট্র্যাকের সরু পথ ধরে কখনো এঁকেবেঁকে, কখনো উঁচু-নিচু পথে। কখনো সরোবর ধরা দেয় চোখে, কখনো পাইনবনের আড়ালে হারিয়ে যাই। এই পাইনবন আমার কাছে রূপকথার রাজ্যের মতো। ঘন ডালপালা ভেদ করলেই পাওয়া যাবে অন্য জগৎ। সে জগতের সঙ্গে এই বনানী, এই পাখিদের ডাক, এই নীলকান্তমণি, এই গুল্মের বেগুনি ফুল—কোনো কিছুর তেমন ফারাক নেই। আমি এখানে হারিয়ে গেলেও কেউ খুঁজতে আসবে না। এই সরোবর, এই বন আমার ঘরবাড়ি হয়ে যাচ্ছে নিমেষে।
রন আর কনস্ট্যান্টিনো এত জোরে কথা বলছেন, আমার আর একা একা জলের নীলা, পান্নার জগতে বেশিক্ষণ থাকা হলো না। এখন আমরা যেখানে আছি, সেখান থেকে সরোবর লম্বালম্বিভাবে দেখা যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের ছয় হাজার ছয় শত ফুট ওপর থেকে সরোবরের রং যেন আরও ঠিকরে পড়ছে। আরও বেশি রং ছড়িয়ে দিয়েছে জলে। এই পানিতে ডুবে গেলেও কোনো খেদ থাকবে না। আমি যে উদ্ভট কথাবার্তা বলি, রন তা ভালোভাবেই জানেন। বললাম, ‘এখান থেকে ঝাঁপ দিলে নিশ্চয় বিশাল রত্নভান্ডারের মালিক হওয়া যাবে।’ আইবেক হা-হা করে উঠলেন, ‘ঝাঁপ দেওয়া নিষেধ, জল খুব ঠান্ডা’ ইত্যাদি। রন নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, ‘ফাতিমার মাথায় সমস্যা আছে। ওকে বলতে দাও। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, ও যেন উধাও হয়ে না যায়।’ রন আর আইবেকের কড়া পাহারায় লরা ও তেমুরের বাড়ি ফিরলাম আমি।
রাতের খাবার দেওয়া হলো সাতটার মধ্যে। আজ লরা রেঁধেছেন প্লোভ বা পোলাও। সঙ্গে স্যালাদ, নান, জ্যাম এবং অবশ্যই চা, বিস্কুট ও চকলেট। প্লোভের স্বাদ অতুলনীয়। নিজেদের জমিনের চাল, গাজর আর খামারের গরুর মাংস দিয়ে তৈরি; খেতে একেবারে অন্য রকম। আমরা এখন একটি দল হয়ে গেছি। খাবার টেবিলেও আমরা চারজন—আমি, রন, আইবেক, কনস্ট্যান্টিনো। খেতে খেতে নানা দেশের নানা মানুষের গল্প শুনি। আইবেক একটি হোটেল বানাবেন এই গ্রামে, কনস্ট্যান্টিনো বেরিয়ে পড়বেন ইউরোপের দিকে, রন বেড়াতে যাবেন ভারতে আর আমার পরবর্তী গন্তব্য সিল্ক রোড।
রাতের খাবারের পর আমি তেমুরের সবজি খেতের অন্য পাশে গিয়ে বসলাম। আজ সূর্য যাই-যাই করছে আর ঠান্ডাও পড়েছে। বাইরে বসে থাকা যাচ্ছে না। গ্রামের পাকা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রতিবেশীদের সবজিখেত দেখতে গেলাম। সবে সবজির চারা রোপণ করা হয়েছে—ক্যাপসিকাম, গাজর ইত্যাদি। কয়েক দিন আগে বরফ পড়া বন্ধ হয়েছে। ফসলের জন্য তৈরি হচ্ছে জমিন। সামনে সারি সারি পাহাড় আর নীল আকাশ। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগে আমি ফিরে এলাম।
লরা ও তেমুরের বাড়ির ভেতরে একটি বড় লিভিং রুম আছে, আর এই বাড়িতে রয়েছে পাঁচটি শোয়ার ঘর। সবই অতিথিদের জন্য বরাদ্দ। লরা ও তেমুর থাকেন পাশের আরেকটি বাড়িতে। সরল জীবনযাপন এদের। শুধু সরল নয়; সবুজও। কাজাখস্তানের সব গ্রামের চিত্র এমনই। শান্ত গ্রাম, গ্রামের কাছে বনভূমি, অদেখা রঙের জলাধার থাকলে এখানে চিরকাল থেকে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করাই যায়।
ছবি: লেখক ও ইন্টারনেট
