skip to Main Content

বিশেষ ফিচার I স্কেচ টু স্পটলাইট

‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগলাইন এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে বিশেষ। তবে রানওয়ে দুনিয়ায় এখনো নবাগত বলা চলে। সেখানেও নিজেদের উজ্জ্বল উপস্থিতি ঘটাতে শুরু করেছেন বাংলাদেশি ফ্যাশন ডিজাইনাররা। পথ দেখিয়েছেন যারা, তাদের অন্যতম আফসানা ফেরদৌসী। এই সাসটেইনেবল ফ্যাশন ডিজাইনার, অন্ট্রাপ্রেনিউর ও এডুকেটর তার অর্জিত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন এই বিশেষ রচনায়

আন্তর্জাতিক ফ্যাশন রানওয়েতে বাংলাদেশি ডিজাইনারদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। তাই ডিজাইনার ও ফ্যাশন বোদ্ধাদের কাছে এখনো সেভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। আশার বিষয়, পরিবর্তন আসছে। নিজেদের মতো করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সৃজনশীল নকশাকারেরা। আমিও এ দলের একজন।
প্রথম থেকে আজ, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোতে নিজের দেশকে উপস্থাপন করার প্রতিটি অভিজ্ঞতাই বিশেষ। ঝলমলে স্পটলাইটের সামনে আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি যেকোনো ফ্যাশন ডিজাইনারের জন্য আকাঙ্ক্ষিত। স্থানীয় ফ্যাশন উইকের তুলনায় আন্তর্জাতিক ফ্যাশন উইক অনেক বড় পরিসরে আয়োজিত হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা আসেন বিভিন্ন দেশ থেকে। দর্শক, ক্রেতা, মিডিয়া আর শিল্প বিশেষজ্ঞদের ঘটে মিলনমেলা। পেশাদারির দিক থেকেও আন্তর্জাতিক শোগুলোর মান খুব উঁচু। সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা, স্টেজ ম্যানেজমেন্ট, লজিস্টিক এবং প্রেজেন্টেশন—সবকিছু নিখুঁতভাবে পরিচালিত হয়। থাকে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরশিপ। প্রত্যাশাও সেই অনুযায়ী। সৃষ্টিশীলতা, নকশা আর কারিগরি দক্ষতার সবকিছুতেই উচ্চমান আশা করা হয়। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শো নিয়ে আসে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ।
প্রতিনিধিত্বের প্রতিযোগে
ডিজাইনার যখন আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন, প্রথম ধাপ হতে পারে নিজের কাজকে প্রদর্শনের জন্য যথাযথ একটি পোর্টফোলিও তৈরি করা; যা তার সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও স্টাইলের পরিচয়। তাই এটি যতটা সম্ভব পেশাদার ও সমন্বিত হওয়া উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অন্য কোনো ডিজাইনারের কাজ অনুলিপি না করা। নিজের সৃজনশীলতাই আত্মপরিচয়—এই মন্ত্র এগিয়ে দিতে পারে অনেকটুকু।
যোগাযোগে যুক্ত
এরপর আসে রিসার্চ ও নেটওয়ার্কিং। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির ধারা, প্ল্যাটফর্ম, প্রতিযোগিতা ও ট্রেন্ড সম্পর্কে জানাটা খুব জরুরি। একই সঙ্গে শিল্প বিশেষজ্ঞ, মেন্টর বা অন্যান্য ডিজাইনারের সঙ্গে সংযোগ তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে খেয়াল রাখা চাই, কখনো কখনো কাজ আপনার নেটওয়ার্ক হিসেবে কার্যকরী হতে পারে। প্রথমে নিজের কাজকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা চাই; সৃজনশীলতা রাখা চাই অক্ষুণ্ন। পোর্টফোলিও অন্য সব সুযোগের দিকে এগোতে সাহায্য করবে।
আমন্ত্রণ আবেদন
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোতে ডিজাইনাররা সাধারণত বিভিন্ন মাধ্যমে নির্বাচিত হন। আবেদন, পোর্টফোলিও, প্রেজেন্টেশন সেখানে প্রয়োজন হতে পারে। কিছু শোতে আমন্ত্রণ আয়োজকদের পক্ষ থেকে আসে। কিন্তু সেটি সাধারণত তখনই হয়ে থাকে, যখন আয়োজনকারীরা কোনো ডিজাইনারের কাজ অনলাইনে দেখে আগ্রহী হন। এ ছাড়া বড় প্ল্যাটফর্ম বা কনসেপ্ট শোতে এজেন্সি বা প্রতিনিধি থাকলেও সাহায্য পাওয়া যেতে পারে; যারা ডিজাইনারের কাজ শো-অর্গানাইজারদের কাছে উপস্থাপন করবেন। এসব শোর জন্য কাজের মান ও সৃজনশীলতা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শোতে এখন নির্দিষ্ট মূল্যের রেজিস্ট্রেশন ফির মাধ্যমে অংশগ্রহণের সুযোগও থাকে, যেখানে ই-মেইল বা সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যোগাযোগ তৈরি হয়। এককথায়, নির্বাচনের কোনো নির্দিষ্ট পথ নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কাজের মান, পোর্টফোলিও এবং সঠিক যোগাযোগ।
প্রেরণা প্রসঙ্গ
আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণত কোনো এক ধরনের প্রেরণায় তৈরি কালেকশন চায় না। এটি পুরোপুরি শোর মূল ভাবনার ওপর নির্ভরশীল। কিছু শোতে থিম-বেসড বা কনসেপ্ট কালেকশন দেখা যায়; আবার কিছু শোতে সাংস্কৃতিক গল্প বলা কিংবা টেকসই ডিজাইন পায় গুরুত্ব। এ ছাড়া কিছু শোতে কমার্শিয়াল ওয়্যার বা বাজারমুখী ডিজাইনও প্রয়োজন পড়তে পারে। প্রতিটি শো আলাদা, তাই ডিজাইনারদের অবশ্যই শোর তাত্ত্বিক ধারণা, দর্শক ও লক্ষ্য বুঝে কালেকশন তৈরি করতে হয়।
আবেদন-নিবেদন
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোতে আবেদন বা নির্বাচনের প্রক্রিয়া সাধারণত খুব জটিল নয়; তবে কিছু ধাপ থাকে, যা জানা জরুরি।
টাইমলাইন
বেশির ভাগ শোর জন্য আবেদনের বিস্তারিত জানানো হয় কয়েক মাস আগে। শেষ সময়ের আগে পোর্টফোলিও এবং অন্যান্য দরকারি কাগজপত্র জমা দিতে হয়।
যা কিছু প্রয়োজন
সাধারণত পোর্টফোলিও, কাজের ছবি বা ভিডিও, ডিজাইন কনসেপ্ট এবং কখনো কখনো বায়োগ্রাফি বা সিভি দরকার হতে পারে। কিছু শোতে রেফারেন্স বা আগের কাজের উদাহরণ চাইতে পারে।
ভুল না হোক
শেষ মুহূর্তে জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা জরুরি। অসংগঠিত বা অসম্পন্ন পোর্টফোলিও পাঠানো উচিত নয় মোটেই। কনসেপ্ট বা থিম না বুঝে কালেকশন পাঠানো পুরোপুরি এড়িয়ে চলা চাই।
বৈশ্বিক বাজার
বাংলাদেশের নিজস্ব ফ্যাশন এবং গ্লোবাল ফ্যাশন ট্রেন্ড—দুয়ের মাঝে পার্থক্য স্পষ্ট। দুই-ই বুঝে তারপরে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। গ্লোবাল ট্রেন্ড আধুনিক, প্রাসঙ্গিক এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে ধারণা দেয়। আর নিজ দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং নিজস্ব সৃজনশীলতা প্রদর্শন করলে ডিজাইনগুলো সাধারণত আরও বিশেষ এবং মনে রাখার মতো হয়ে ওঠে। বাংলাদেশি নকশা, হাত তাঁতে বোনা ফ্যাব্রিক, হস্তশিল্প বা গল্পকে আধুনিক কনসেপ্টের সঙ্গে মিশিয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকের জন্য উপস্থাপনের চেষ্টা শ্রেয়। এতে দেশীয় পরিচয়ও স্পষ্ট থাকে।
হিসাব-নিকাশ
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোতে মূলত কিছু বড় ধরনের খরচ থাকে, যেমন রেজিস্ট্রেশন বা আবেদন ফি, কালেকশন প্রোডাকশন, মডেল ফি এবং যাতায়াত ও থাকার খরচ। বুঝে খরচ করার কিছু কৌশল জানা থাকলে সুবিধা হয়।
 বাস্তবসম্মত বাজেট তৈরি প্রয়োজন
 স্পন্সরশিপ বা পার্টনারশিপ পাওয়া গেলে সহজ হতে পারে; তাই যোগাযোগ দরকার
 ফি-ভিত্তিক শোতে অংশ নিলে কালেকশনের মান যাচাই করা প্রয়োজন, যাতে বিনিয়োগ সঠিক হয়
 যে শোতে যাচ্ছেন, সেটির মানও যাচাই করা দরকার। অনেক সময় বড় ফি দিয়ে শো করা হয়, কিন্তু দর্শক বা মিডিয়া কম থাকে। নয়তো ‘ইন্টারন্যাশনাল শো’ শুধু লেবেলেই উপস্থিতি ঘটে, যা মূলধারায় প্রভাব ফেলে না
 অনেক শোতে ডিজাইনারদের স্পন্সরসহ আমন্ত্রণ জানানো হয়। এ ক্ষেত্রে অংশগ্রহণে খরচ বহন করতে হয় না; শুধু নিজস্ব কালেকশন তৈরি করতে হয়।
তৈরি শতভাগ
বাংলাদেশের ডিজাইনাররা আন্তর্জাতিক শোতে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। যেমন প্রতিযোগিতা, নতুন সংস্কৃতি ও ভাষার পার্থক্য এবং শোর সব বিষয় সামলানো। এগুলোর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে আগে থেকে।
 নিজের কাজের মান ঠিক করা আবশ্যক, এটি সবচেয়ে বড় শক্তি
 শো ও দর্শক সম্পর্কে আগে থেকে জানা জরুরি
 ভালো কাজ, মানসিক দৃঢ়তা ও পেশাদারত্ব—এই তিন বিষয় আবশ্যক।
বাস্তব অধ্যায়
সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা সব সময় প্রধান। পোর্টফোলিওকে পেশাদার ও সময়োপযোগী রাখা তাই জরুরি। শো, কনটেস্টের মতো প্ল্যাটফর্মে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলাও কাজে দেয়। সবকিছুর জন্য সময় লাগে; তাই দ্রুত ফল প্রত্যাশা না করাই শ্রেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের উন্নতি ঘটানো চাই। নিরন্তর শেখা এবং আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত হওয়া আবশ্যক।

ওয়্যারড্রোব ও ছবি: আফসানা ফেরদৌসী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top