টেকসহি I টেকসই ভ্রমণ ও পর্যটন
ভ্রমণ ও পর্যটন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসার করে এবং বিশ্বকে কাছাকাছি আনে। কিন্তু এই সংযোগ যদি প্রকৃতি ধ্বংস, সংস্কৃতি ক্ষয় এবং সামাজিক বৈষম্যের মাধ্যমে গড়ে ওঠে; তা কখনো টেকসই হতে পারে না। অন্যদিকে, টেকসই পর্যটন আমাদের শেখায় কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে ভ্রমণ করতে হয়, যাতে আমরা শুধু দর্শক নয়; বরং সংরক্ষক ও অংশীদার হয়ে উঠি
ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়, আনন্দ ও আত্ম-অনুসন্ধানের অনন্য মাধ্যমও। অজানা পথে হাঁটা, ভিন্ন সংস্কৃতির স্বাদ গ্রহণ কিংবা প্রকৃতির নৈঃশব্দ্যে সময় কাটানো—এসব অভিজ্ঞতা মানসিক ও সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই আধুনিক বিশ্বে ভ্রমণ এমন এক বিশাল শিল্প, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে। তবে এই শিল্পের দ্রুত ও অপরিকল্পিত বিস্তারের ফলে পরিবেশ, সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তা পর্যটনের ভবিষ্যৎকে ফেলেছে প্রশ্নের মুখে। এই প্রেক্ষাপটে ভ্রমণ ও পর্যটনে টেকসইতা কোনো বিকল্প ধারণা নয়; বরং একটি অপরিহার্য বাস্তবতা।
টেকসই ভ্রমণ ও পর্যটন মূলত উন্নয়ন ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভ্রমণ ও পর্যটনে টেকসইতা বলতে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গিকে বোঝায়, যেখানে ভ্রমণের আনন্দের পাশাপাশি প্রকৃতি ও মানুষের ওপর এর প্রভাবের কথাও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হয়। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের ফলে পরিবেশদূষণ, অতিরিক্ত ভিড় কিংবা স্থানীয় সংস্কৃতির ক্ষয় ঘটতে পারে। টেকসই পর্যটনের লক্ষ্য এসব ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নত করা। ইউনাইটেড নেশন ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশনের মতে, টেকসই পর্যটন এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে পরিবেশগত সুরক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব একসঙ্গে নিশ্চিত করা হয়। অর্থাৎ এটি শুধু ক্ষতি কমানোর কৌশল নয়; বরং এমন এক উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি, যা এর মাত্রাকে দীর্ঘ মেয়াদে টিকিয়ে রাখে।
টেকসই পর্যটনের মূল দর্শন দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা। পাহাড়, বন, সমুদ্রসৈকত বা ঐতিহাসিক স্থাপনা আজ যতটা আকর্ষণীয়, আগামী প্রজন্মের কাছেও যেন ততটাই মূল্যবান থাকে, এই নিশ্চয়তা দেওয়া এর লক্ষ্য। তাই পর্যটন সম্পদ ব্যবহারের সময় তাৎক্ষণিক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রাকৃতিক, সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক—সব সম্পদের ক্ষেত্রে আন্তঃপ্রজন্ম ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা টেকসই পর্যটনের অন্যতম ভিত্তি। একই সঙ্গে টেকসই পর্যটন আলাদা কোনো খাত নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ। অবকাঠামো, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে পর্যটনের যোগসূত্র তৈরি না হলে এর সুফল সীমিতই থেকে যায়। তাই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে পর্যটনকে উন্নয়নপ্রক্রিয়ার মূলধারায় যুক্ত করা টেকসই পর্যটনের অন্যতম নীতি।
বিশ্বজুড়ে পর্যটনের নেতিবাচক প্রভাব আজ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। পরিবেশগত দিক থেকে এই খাত বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য দায়ী। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের পরিবেশ ও সামাজিক গবেষণা অনুযায়ী, বৈশ্বিক মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ আসে ভ্রমণ ও পর্যটন খাত থেকে। যদিও ২০১০ সালের পর থেকে এই খাতের কার্বন নিঃসরণ-ঘনত্ব ধীরে ধীরে কমেছে; তবু বিশেষজ্ঞদের মতে এটি যথেষ্ট নয়। জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে শুধু নিঃসরণের হার কমানো নয়; মোট নিঃসরণ কমানোও জরুরি।
বিমান ভ্রমণ, বিলাসবহুল হোটেল, অতিরিক্ত পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার—সব মিলিয়ে প্রকৃতির ওপর চাপ বাড়ছে। সমুদ্রসৈকতে প্লাস্টিক দূষণ, পাহাড়ি এলাকায় বন উজাড়, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস—এসব এখন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় খাবারের অভাবে পেঙ্গুইনের বিলীন হওয়ার কথা। অস্ট্রিচ: জার্নাল অব আফ্রিকান অর্নিথোলজিতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা আফ্রিকান পেঙ্গুইনের অস্তিত্ব সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ২০০৪ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ডাসেন আইল্যান্ড ও রবেন আইল্যান্ড—আফ্রিকান পেঙ্গুইনের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন কেন্দ্র থেকে এ প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে গেছে। মাত্র আট বছরের ব্যবধানে এই দুই দ্বীপ কার্যত পেঙ্গুইনশূন্য হয়ে পড়েছে। গবেষকেরা মনে করছেন, এই বিপুল প্রাণহানির বড় অংশ ঘটেছে পালক ঝরে পড়ার সময়। এ সময় পেঙ্গুইনরা সাগরে নামতে পারে না; ফলে খাদ্যের জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে হয় শরীরে সঞ্চিত শক্তির ওপর। কিন্তু খাদ্যসংকটের কারণে বহু পেঙ্গুইন এ সময় অনাহারে মারা গেছে।
গবেষণাপত্র অনুযায়ী, এই সংকটের পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করেছে—জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিরিক্ত মাছ শিকার। আফ্রিকান পেঙ্গুইনের প্রধান খাদ্য সার্ডিন ও অ্যাঙ্কোভি। অথচ ২০০৪ সালের পর থেকে প্রতি তিন বছরে একবার বাদ দিলে প্রতিবছর দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের কাছে সার্ডিন প্রজাতির সার্ডিনপস সাগাক্সের মজুত প্রায় ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তন মাছের প্রজননে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যিকভাবে অতিরিক্ত মাছ শিকার, যা পেঙ্গুইনের খাদ্যভান্ডারকে আরও সংকুচিত করেছে। পরিণামে আফ্রিকান পেঙ্গুইন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বিলুপ্তির পথে।
পরিবেশের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও গভীর। অতিরিক্ত পর্যটনের ফলে অনেক শহর ও ঐতিহাসিক স্থানে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পর্যটন যখন স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের চেয়ে পর্যটকের চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন সামাজিক টানাপোড়েন ঘটে এবং সংস্কৃতি ধীরে ধীরে পণ্যে পরিণত হয়। এই বাস্তবতা টেকসই পর্যটনের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তোলে।
টেকসই পর্যটনের ধারণা মূলত তিনটি পরস্পর-সম্পর্কিত স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পরিবেশগত টেকসইতা নিশ্চিত করে, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করা চাই সংযত ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক টেকসইতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিচয় ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেয়। অর্থনৈতিক টেকসইতা পর্যটন থেকে অর্জিত সুবিধা ন্যায্যভাবে বণ্টিত হওয়া এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করা নিশ্চিত করে। এই তিন স্তম্ভের যেকোনোটির ভারসাম্য নষ্ট হলে টেকসই পর্যটন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
ইকো-ট্যুরিজম টেকসই পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। এটি এমন ভ্রমণ পদ্ধতি, যেখানে প্রকৃতি সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণ একসঙ্গে বিবেচিত হয়। পরিবেশবিদদের মতে, ইকো-ট্যুরিজম তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা শুধু প্রকৃতি দেখার অভিজ্ঞতা দেয় না; বরং সেই প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্বও পর্যটকের কাঁধে তুলে দেয়। একইভাবে দায়িত্বশীল ভ্রমণ ধারণাটি ব্যক্তিগত আচরণের মাধ্যমে টেকসইতাকে বাস্তবে রূপ দেয়। একজন সচেতন পর্যটকের ছোট সিদ্ধান্ত; যেমন স্থানীয় খাবার খাওয়া, প্লাস্টিক কম ব্যবহার করা কিংবা স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান জানানো সমষ্টিগতভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি টেকসই পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্মার্ট ট্যুরিজম, ডেটাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং ভার্চুয়াল ট্যুর—এসবের মাধ্যমে পর্যটনের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার পর্যটনের পরিবেশগত পদচিহ্ন কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে এটি পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টেকসই পর্যটনের গুরুত্ব আরও গভীর। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, নদীমাতৃক ভূগোল এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এ দেশের পর্যটনের বড় শক্তি। কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জীবনধারা—সব মিলিয়ে পর্যটন সম্ভাবনা বিপুল। কিন্তু অপরিকল্পিত পর্যটনের কারণে এই সম্ভাবনাই এখন ঝুঁকিতে। কক্সবাজারে প্লাস্টিক দূষণ ও অপরিকল্পিত স্থাপনা, পাহাড়ি এলাকায় বন উজাড় ও ভূমিধস, সুন্দরবনে পর্যটনের অতিরিক্ত চাপ—এসব উদাহরণ জানিয়ে দেয়, টেকসই নীতি ছাড়া পর্যটন উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এই বাস্তবতায় টেকসই পর্যটনের জন্য বহু-অংশীজনের সমন্বিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বেসরকারি খাত, এনজিও এবং পর্যটক—সবার অভিজ্ঞতা, মতামত ও দায়িত্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হলে উন্নয়ন হয় বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘস্থায়ী; বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং নারীদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা টেকসই পর্যটনের একটি মৌলিক শর্ত।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন ছাড়া কোনো পর্যটন পরিকল্পনাই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। স্থানীয় বাসিন্দারা যদি পরিকল্পনা প্রণয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অর্থনৈতিক সুফল ভোগের অংশীদার না হন; তবে পর্যটন সেখানে উন্নয়নের বদলে বাড়তি চাপ তৈরি করে। পরিবেশগত ক্ষয়, সামাজিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ পর্যটনকে রূপ দেয় সুযোগে। হোমস্টে, ছোট রেস্তোরাঁ, স্থানীয় গাইড সেবা কিংবা হস্তশিল্পভিত্তিক স্যুভেনির শপের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোগ শুধু পর্যটন অভিজ্ঞতাকে বৈচিত্র্যময় করে না; বরং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের জন্য টেকসই পর্যটন নীতির ক্ষেত্রে কয়েকটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, জাতীয় পর্যটন নীতিতে জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে বাধ্যতামূলক উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা চাই। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পর্যটন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া অনুচিত। তৃতীয়ত, কক্সবাজার, সুন্দরবন ও পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য আলাদা বহনক্ষমতা নির্ধারণ করে পর্যটক সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ জরুরি। চতুর্থত, হোটেল ও রিসোর্ট খাতে বাধ্যতামূলক পরিবেশবান্ধব মানদণ্ড প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে আমাদের দেশে পর্যটন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার নয়; বরং হয়ে উঠতে পারে টেকসই উন্নয়নের একটি কার্যকর মডেলও।
সুস্মিতা চক্রবর্তী মিশু
ছবি: ইন্টারনেট
