কভারস্টোরি I ডিকোডিং কাস্টমার ডিমান্ড
দেশি ফ্যাশন বাজারে হাওয়া বদলের খেলা। ক্রেতার সিদ্ধান্ত শুধুই উৎসব কিংবা ট্রেন্ডনির্ভর নয়; দাম, মান ও ব্যবহারিকতার সমন্বয় হয়ে উঠছে প্রধান বিবেচ্য। নকশার বৈচিত্র্য ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে প্রত্যাশাও আগের চেয়ে ঢের বেশি। ক্রেতারা পোশাককে দেখছেন দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে। যুক্ত হয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য ও দীর্ঘস্থায়িত্বের প্রশ্ন। এসব পরিবর্তন বাজারের গতিপথকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। তা বুঝতে সম্প্রতি বিশেষ জরিপ চালিয়েছে ক্যানভাস টিম। বিস্তারিত লিখেছেন সারাহ্ দীনা ও আবৃতি আহমেদ
ক্রেতা আসলে কী চান বিক্রেতার কাছে? নতুন পোশাক, তাই তো? কিন্তু এটুকুতেই কি শেষ? নাকি সেখানে আরও অনেক বিষয় কাজ করে? এমন হাজারো প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায় ফ্যাশন বাজারে। ফ্যাশনবোদ্ধাদের মনে। বাংলাদেশের লোকাল ফ্যাশন বাজারের বয়স পঞ্চাশ বছরের বেশি। দীর্ঘ সময় দেশকে মাতিয়ে রেখেছে ফ্যাব্রিক, রং আর নকশা। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেমন এগিয়েছে, তেমনি নিজেকে বদলেছে চাহিদা অনুযায়ী। অলস সময়ের ফুলতোলা নকশার পোশাক যেমন অভ্যন্তরীণ ফ্যাশন বাজারের অংশ; তেমনি ওত কতুরও। এ দেশের ফ্যাশনমনস্ক ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে পুরোটা। তবু এক দশক ধরে শোনা যায় হতাশার গুঞ্জন। ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, নকশাকার—সবার কণ্ঠে একই সুর। হারানোর ভয়! ক্রেতা আসলে কী চান, সেই খোঁজ করেছে ক্যানভাস টিম। বাংলাদেশের ফ্যাশন বাজারের ১০০ জন সাধারণ ক্রেতা অংশ নিয়েছেন প্রশ্নমালাভিত্তিক অনলাইন জরিপে। তারা বাংলাদেশি নারী। বয়স ২১ থেকে ৫০। ৭৯ জন কর্মজীবী, ১৫ জন শিক্ষার্থী এবং ৬ জন নিজেদের সংসারে সময় দিচ্ছেন।
কেনাকাটার ছক বদল
দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্যাশন বাজার নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা হলো, এটি মূলত উৎসবকেন্দ্রিক। বিশেষ উপলক্ষ সামনে রেখে কেনাকাটার সংস্কৃতি আমাদের সামাজিক বাস্তবতার অংশ। দুই ঈদ, পয়লা বৈশাখ, পূজা, ফাল্গুন কিংবা ভালোবাসা দিবস ঘিরে বাজারে দেখা যায় ক্রেতার ঢল। পাশাপাশি বিজয় দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা বন্ধু দিবস উপলক্ষেও আছে চাহিদা; যদিও তা খুব বড় কলেবরে নয়। তাই এসব দিবস ঘিরে তৈরি হয় বিশেষ ক্যাপসুল কালেকশন। সব মিলিয়ে বাজারবোদ্ধাদের ধারণা তৈরি হয়েছে, উৎসবই যেন ফ্যাশন বিক্রির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু বাজারের ভেতরের বাস্তবতা কি এখনো সেই ছকেই চলছে?
ক্যানভাস জরিপে উঠে এলো ভিন্ন চিত্র। মাত্র ৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, তারা মূলত উৎসব সামনে রেখে কেনাকাটা করেন। বাকিরা বছরজুড়ে। উৎসবে কলেবর বাড়ে। বাড়ে বাজেট। সংখ্যাটি ইঙ্গিত দেয়, উৎসব গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই কেনাকাটার একমাত্র প্রেরণা নয়; নিয়মিত ব্যবহারের প্রয়োজন এখন বড় ভূমিকা রাখছে। জরিপ অনুযায়ী, ৩৬ শতাংশ নারী দু-তিন মাস পরপর পোশাক কেনেন আর ৩২ শতাংশ ক্রেতা প্রায় প্রতি মাসে। অন্যদিকে ২৬ শতাংশ ক্রেতা আবহাওয়া বা মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে শপিং করেন। সংখ্যাগুলো মিলিয়ে নেওয়ার পর, তা স্পষ্টভাবে একটি ব্যবহারভিত্তিক কেনাকাটার প্রবণতা নির্দেশ করে।
পরিবর্তনের পূর্বাভাস
সম্প্রতি আয়োজিত এবং ক্যানভাসের জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় কভারস্টোরি হিসেবে প্রকাশিত ফ্যাশন ফোরকাস্ট আলোচনায় বিশেষজ্ঞদের কণ্ঠে শোনা গিয়েছিল এই পরিবর্তনের পূর্বাভাস। তাদের পর্যবেক্ষণ ছিল ক্রেতার মনস্তত্ত্ব বদলাচ্ছে এবং সেই বদল দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। জরিপের ফলাফল যেন সেই গোলটেবিলের বাস্তব প্রতিফলন। এখানে বোঝা যায়, ফ্যাশন বাজার এখন শুধু উৎসবের উদ্দীপনার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি ক্রেতার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে উঠছে।
ধরন বদলের কারণ
কেনাকাটার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। পেশাজীবী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি, নগরজীবনের গতিশীলতা এবং ক্রয়ক্ষমতার উন্নতি—সব মিলিয়ে পোশাক কেনার উদ্দেশ্য নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। পোশাক এখন শুধু বিশেষ দিনের সাজ নয়; এটি কর্মজীবন, চলাফেরা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের অংশ। এই প্রেক্ষাপটে ডেইলি ওয়্যার বা দৈনন্দিন পোশাকের চাহিদা স্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আরাম, প্রয়োগযোগ্য আর পুনরাবৃত্ত ব্যবহারের উপযোগিতা—এই বিষয়গুলো ক্রেতার সিদ্ধান্তে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাজেট বাস্তবতা
জরিপ বলছে, দেশের ফ্যাশন বাজার ধীরে ধীরে একটি চাহিদাভিত্তিক, জীবনধারাকেন্দ্রিক মডেল গ্রহণ করছে। উৎসবের আবেদন অটুট থাকলেও ক্রেতার বাস্তব প্রয়োজন এখন কেনাকাটার কেন্দ্রে। ভবিষ্যতের ফ্যাশন পরিকল্পনায় তাই ডেইলি ওয়্যার, বহুমুখী ব্যবহার এবং মৌসুমি অভিযোজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমনটাই এই নিরীক্ষার অন্যতম বার্তা।
মধ্যম বাজেটে বৃহত্তর ক্রেতাগোষ্ঠী
পোশাক কেনাকাটার ক্ষেত্রে ক্রেতার মাসিক বাজেট ফ্যাশন বাজারের বাস্তব চিত্র বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ক্যানভাস জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মাসিক বস্ত্র খাতের খরচ নিয়ে জানতে চাইলে উঠে আসে একটি বিশেষ তথ্য; বাজারের প্রায় বড় অংশই মধ্যম বাজেটনির্ভর। জরিপ অনুযায়ী, ৫৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মাসে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে পোশাক কেনেন। এটি এই খাতে তাদের মোট মাসিক ব্যয়। এই অর্থের বিনিময়ে তারা ঠিক কোন ধরনের পণ্য কেনেন, সে বিষয়ে আলাদা তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি। তবু সংখ্যাটি জানান দেয়, নিয়মিত পোশাক কেনার ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত, নিয়ন্ত্রিত বাজেটই অধিকাংশ ক্রেতার পছন্দ।
উচ্চ ব্যয়ের ক্রেতা
জরিপে দেখা যায়, ২০ শতাংশ ক্রেতা পোশাকের পেছনে মাসে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেন। এই অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি খরচ করতে প্রস্তুত; যা ইঙ্গিত দেয় ব্র্যান্ড-সচেতনতা, বৈচিত্র্যের চাহিদা অথবা জীবনযাত্রাভিত্তিক কেনাকাটার প্রবণতা। অন্যদিকে মাত্র ৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মাসিক বাজেট ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। সংখ্যাটি ছোট হলেও এটি বাজারের একটি প্রিমিয়াম সেগমেন্টের উপস্থিতি বোঝায়; যেখানে মান, নকশা বা ব্র্যান্ড ভ্যালু বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সীমিত বাজেটে নিয়মিত ক্রয়
১৪ শতাংশ ক্রেতা জানিয়েছেন, তারা মাসে ৫০০ থেকে হাজার টাকার মধ্যে পোশাক কেনেন। এটি এমন এক ক্রেতাগোষ্ঠীকে নির্দেশ করে, যারা সীমিত বাজেটের মধ্যেও প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটা চালিয়ে যান। এই প্রবণতা থেকে বলা যেতে পারে, ফ্যাশন এখন শুধু বিলাসিতা নয়; দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বাজেট ছোট হোক বা বড়, পোশাক কেনা একটি চলমান অভ্যাস অথবা প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।
সংখ্যার বার্তা
এই জরিপের ফল স্পষ্টভাবে জানান দেয়, বাংলাদেশের ফ্যাশন বাজারে মধ্যম বাজেটই মূল চালিকাশক্তি। বৃহৎ ক্রেতাগোষ্ঠী এমন একটি মূল্যসীমায় অবস্থান করছে, যেখানে ব্যবহারিকতা, মূল্যমান ও নকশার ভারসাম্য আকাঙ্ক্ষিত। ডিজাইনার ও ব্র্যান্ডগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। বাজারের বড় অংশকে ধরতে হলে শুধু ট্রেন্ড নয়, অ্যাকসেসিবল প্রাইসিং ও দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী পণ্যের দিকেও মনোযোগ দেওয়া চাই। কারণ, শেষ পর্যন্ত বাজেটই বলে দেয়, ক্রেতা কীভাবে ফ্যাশনকে নিজের জীবনের অংশ করে তুলছেন।
বৈশ্বিক হাওয়ায় স্থানীয় বাজার
দেশি ফ্যাশন বাজারে বৈশ্বিক প্রভাব নতুন ঘটনা নয়। বিদেশি পোশাকের উপস্থিতি বহুদিনের। শুরুতে আমদানিনির্ভর হলেও পরিস্থিতি বদলেছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো সরাসরি ব্যবসায় নামছে, অফিশিয়াল আউটলেট খুলছে এবং নিজেদের উপস্থিতি স্থায়ী করার চেষ্টা করছে। ভারতীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডের পাশাপাশি পাকিস্তানি ব্র্যান্ডও আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। এই দুই দেশ ছাড়াও আরও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এই দেশে রয়েছে। কিন্তু উপমহাদেশের মানুষের রুচির মিল থাকার কারণে ভারত ও পাকিস্তানের ফ্যাশন লেবেলের স্থায়ী অবস্থান বিশেষ প্রভাব তৈরিতে সক্ষম, যা একই সঙ্গে আশার এবং আশঙ্কার। ক্রেতার সামনে এখন পছন্দের পরিসর আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিস্তৃত। ক্রেতা এই অবাধ বৈশ্বিক বাজার নিয়ে ভাববেন, এটাই স্বাভাবিক।
লোকাল ব্র্যান্ডে আস্থা
জরিপে পাওয়া তথ্য বলছে, বিদেশি উপস্থিতি বাড়লেও স্থানীয় ব্র্যান্ড এখনো ক্রেতার প্রথম পছন্দ। ৯৪.৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, তারা লোকাল ফ্যাশন ব্র্যান্ড থেকে কেনাকাটা করেন। এই সংখ্যা শুধু জনপ্রিয়তার সূচক নয়; স্থানীয় ব্র্যান্ডের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থা, সহজপ্রাপ্যতা এবং সংস্কৃতিগত সংযোগের প্রতিফলন। স্থানীয় ডিজাইন, আবহাওয়া উপযোগী কাপড় এবং মূল্যসীমার ভারসাম্য মিলিয়ে লোকাল ব্র্যান্ড এখনো বাজারের প্রধান অনুঘটক।
সীমান্ত পেরোনো পছন্দ
জরিপে দেখা যায়, ক্রেতাদের মধ্যে ২৬.৩ শতাংশ পাকিস্তানি এবং ১৯.২ শতাংশ ভারতীয় ব্র্যান্ডের পোশাক কেনেন। এই প্রবণতা আঞ্চলিক ফ্যাশনের প্রতি ক্রেতার উদার মনোভাব নির্দেশ করে। পাশাপাশি নকশার ভাষা, কাটিং, কাপড়ের বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক মিল—এসব কারণেও এই ব্র্যান্ডগুলো একটি নির্দিষ্ট ক্রেতাগোষ্ঠীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
রেপ্লিকা বাজার
বিদেশি ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রতিফলন দেখা যায় রেপ্লিকা বাজারে। যেখানে ব্র্যান্ড অনুপ্রাণিত বা নকল পোশাক তৈরি হয়। জরিপ অনুযায়ী, ১৩.১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী নকল পাকিস্তানি পোশাক কেনেন এবং ৮.১ শতাংশ বেছে নেন নকল ভারতীয় পোশাক। এই প্রবণতা প্রমাণ করে, ব্র্যান্ড আকর্ষণ থাকলেও সবাই অফিশিয়াল মূল্যসীমার পোশাকে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে রেপ্লিকা বাজার একধরনের বিকল্প বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে স্টাইলের অনুকরণ ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় করে।
প্রতিযোগিতা, না সহাবস্থান
সংখ্যাগুলো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের ফ্যাশন বাজার এখন বহুমাত্রিক। স্থানীয় ব্র্যান্ডের দৃঢ় অবস্থানের পাশাপাশি বিদেশি ব্র্যান্ড ও রেপ্লিকা বাজার সমান্তরালে চলছে। ডিজাইনার ও ব্র্যান্ডগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা: ক্রেতা এখন বৈশ্বিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন; তবে স্থানীয় সংযোগ ছাড়তে নারাজ। ভবিষ্যতের বাজার তাই প্রতিযোগিতার চেয়ে সহাবস্থান ও অভিযোজনের জায়গা হয়ে উঠতে পারে। যেখানে বৈশ্বিক অনুপ্রেরণা স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিশে নতুন ভাষা তৈরি করবে।
সিদ্ধান্তের অনুঘটক
দাম
ক্রেতার আচরণ বোঝার জন্য জানতে চাওয়া হয়েছিল, ফ্যাশন প্রোডাক্ট কেনার সময় কোন বিষয়গুলো তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জরিপে দেখা যায়, ৫৩ শতাংশ ক্রেতার কাছে দামই মূল বিবেচ্য বিষয়। অর্থাৎ, ফ্যাশন তাদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও বাজেট চূড়ান্ত প্রভাব ফেলে।
মান
৭৭ শতাংশ ক্রেতা প্রোডাক্টের মানকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন। কাপড়ের টেক্সচার, সেলাই ও দীর্ঘস্থায়িত্ব—এসব বিষয় তার সিদ্ধান্তকে শক্ত ভিত্তি দেয়। এটি নির্দেশ করে, ক্রেতারা শুধু বর্তমানের সৌন্দর্য নয়; ভবিষ্যতের প্রয়োগযোগ্যতা ও স্থায়িত্বকেও বিবেচনায় রাখেন।
নকশা
ডিজাইন ক্রেতার চোখে গুরুত্বপূর্ণ—এমন মন্তব্য ৭২ শতাংশের। অর্থাৎ ফ্যাশন স্টেটমেন্ট ও ব্যক্তিগত স্টাইলের সঙ্গে সামঞ্জস্যও কেনাকাটার অন্যতম প্রধান সহায়ক।
ব্র্যান্ড ও টেকসই তত্ত্ব
১৩ শতাংশ ক্রেতা ব্র্যান্ড ভ্যালুকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। আর ২৮ শতাংশ ক্রেতা টেকসই, পরিবেশবান্ধব ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে পোশাক বেছে নেন, যাতে ক্রয় সিদ্ধান্তে ধরণীর প্রতি ভালোবাসা প্রতিফলিত হয়। এই তথ্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে, ক্রেতা এখন একাধিক দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। দাম, মান, নকশা—এই তিনটি সবচেয়ে বড় প্রভাবক। তবে ক্রমশ টেকসই ফ্যাশন ও ব্র্যান্ড সচেতনতা বাড়ছে। ডিজাইনার, ব্র্যান্ড ও উদ্যোক্তাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। সঠিক ভারসাম্য বজায় রেখে ক্রেতার চাহিদা পূরণ করা এবং একই সঙ্গে বাজারে স্থায়ী প্রভাব ফেলা সম্ভব।
ক্রেতার খোলাচিঠি
ক্যানভাসের আহ্বানে বিক্রেতাদের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন ৯০ জন ক্রেতা। তাদের মতামত বিশ্লেষণ করে কিছু তথ্য পাওয়া যায়।
মান ও স্থায়িত্ব
লোকাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি এখনো মান ও স্বস্তির ওপর পুরোপুরি ফোকাস করতে পারেনি বলে মনে করেন কয়েকজন ক্রেতা। বিশেষত কাপড়ের সোর্স কম এবং কিছু ক্ষেত্রে ধারাবাহিক মান বজায় রাখতে লেবেলগুলো হিমশিম খাচ্ছে বলে তাদের ধারণা। ডিজাইন, ফ্যাব্রিকের মানের ভিন্নতা, টিকে থাকার ক্ষমতা, সেলাই এবং নিখুঁত কাটিং ক্রেতার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে জানা যায়। প্রোডাক্টের দাম ও মানের মধ্যে মিল না থাকা নিয়েও তাদের অভিযোগ।
প্রত্যাশার পারদ
ক্রেতারা চান নতুন ডিজাইন, নতুন মোটিফ এবং বৈচিত্র্যময় প্যাটার্ন। একই ধরনের নকশা বারবার দেখা গেলে তারা হতাশ হন। মোটিফে একঘেয়েমি, নেক লাইন ও স্লিভে গঠনগত নকশার অনুপস্থিতি, বাস্তবতাহীন ডিজাইনের চাপ ক্রেতাকে কেনাকাটাবিমুখ করে। ডিজাইন শুধু ট্রেন্ড অনুসরণ নয়; ক্রেতারা চাচ্ছেন একটি স্বতন্ত্রতা, যা লোকাল ক্রাফটসম্যানশিপ ও কালচারাল আইডেনটিটির প্রতিফলন ঘটায়।
ব্র্যান্ডিং ও টেকসই ফোকাস
লোকাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি সুস্পষ্ট ব্র্যান্ড আইডেনটিটি ও সাসটেইনেবল প্রোডাকশন প্র্যাকটিসে এখনো পিছিয়ে আছে। ক্রেতারা চাচ্ছেন পরিচ্ছন্ন উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং পরিবেশবান্ধব কাপড়। একই সঙ্গে প্রয়োজন সাইজ ইনক্লুসিভিটি, যা বর্তমান বাংলাদেশিদের দেহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা এবং সে অনুযায়ী উন্নয়নও দেখতে চান তারা। এই ফোকাস থাকলে লোকাল ব্র্যান্ড বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে।
দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা
ক্রেতারা চাচ্ছেন বৈচিত্র্যময় নকশা, আরামদায়কতা এবং আবহাওয়ার উপযোগী পোশাক; যা তাদের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকবে এবং দৈনন্দিন জীবনের জন্য উপযোগী হবে। তারা আশা করেন, পছন্দের ব্র্যান্ড তাদের মনের ভাষা বুঝবে। আবহাওয়া এবং সমাজের চাপ তাদের পোশাকের নকশায় ভারী হয়ে চেপে বসবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বুঝে পরিবর্তিত হবে।
ক্রেতাদের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু চিন্তা-উদ্দীপক মতামতে জানা যায়, আঞ্চলিক ফ্যাশন বাজারে তারা সৃজনশীলতা, মুনশিয়ানা এবং নকশার বৈচিত্র্য খুঁজে বেড়ান। আবার মানের সঙ্গে দামের মিল হোক—এই চাহিদাও প্রকাশ করেছেন। টেকসই তত্ত্বকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন তারা। নকশার পুনরাবৃত্তি নয়; উদ্ভাবনী ক্ষমতার জয় হোক—এটাই তাদের চাওয়া।
বাংলাদেশি ক্রেতারা এখন দাম, মান, নকশা, স্বস্তি এবং পরিবেশগত দিক—সব মিলিয়ে বিচার করে থাকেন। যে ব্র্যান্ডগুলো এই ভারসাম্য ধরে রাখতে পারবে, তাদের সঙ্গে বন্ধন সুদৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
ক্রেতা চ্যালেঞ্জ
জরিপে অংশগ্রহণকারী ৮৪ জন ক্রেতা স্থানীয় ফ্যাশন প্রোডাক্ট কেনার সময় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। বেশি পাওয়া সমস্যাগুলো হলো—
দামের সঙ্গে মানের সামঞ্জস্য না থাকা
মান সময় অনুযায়ী বিভিন্ন রকম হওয়া
সব সাইজের পোশাকের অপ্রাপ্যতা
কালার প্যালেটের বৈচিত্র্যময় ব্যবহারের অভাব
নকশায় নৈপুণ্যের ঘাটতি
লিমিটেড প্যাটার্ন।
আশা ও চাহিদা
নতুন ব্র্যান্ডে আগ্রহ দেখিয়েছেন ৬৫ শতাংশ ক্রেতা। তারা নতুন ডিজাইনার ও ক্লদিং ব্র্যান্ডের পোশাক ব্যবহার করে দেখতে চান। এ-বিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণে বোঝা যায়, নতুনকে আহ্বান জানাতে প্রস্তুত বর্তমান সময়ের ক্রেতারা। এখন শুধু পরিচিত ব্র্যান্ড নয়; নতুন পণ্যকেও স্বাগত জানাচ্ছেন তারা।
ফ্যাশন ট্রেন্ড
ক্রেতাদের মধ্যে ট্র্যাডিশনাল পোশাকের চাহিদা যেমন রয়েছে, তেমনি অন্যান্য ট্রেন্ডের প্রতি আকর্ষণও। ৩৪ শতাংশ ক্রেতা দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ফিউশনধর্মী পোশাকেও একই সংখ্যক ক্রেতা আকর্ষিত হন। মিনিমাল ফ্যাশন ২৭.৩ শতাংশ এবং মডেস্ট ওয়্যার ১০ শতাংশ ক্রেতা বেছে নেন বলে জানা যায়। এটি নির্দেশ করে, তারা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়কে সমানভাবে নিয়েছেন।
শেষ সূচনা
শেষ পর্যন্ত এই জরিপ স্পষ্ট বাস্তবতা সামনে আনে। বাংলাদেশের ক্রেতারা এখন অনেক বেশি সচেতন, বিচক্ষণ। বৈশ্বিক ফ্যাশনের সঙ্গে তাদের তাৎক্ষণিক যোগাযোগ হয়। তারা শুধু পোশাক কিনছেন না; মূল্য, মান, নকশা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয় খুঁজছেন। বাজারের প্রতি তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্র্যান্ডগুলোর জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি সম্ভাবনারও দরজা খুলে দেয়। উদ্ভাবন, ধারাবাহিক মান এবং ক্রেতার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে পারলেই তৈরি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা। ফ্যাশন বাজার তাই এখন ক্রেতার বিবর্তিত চিন্তার প্রতিচ্ছবি। ক্যানভাসের এই অনুসন্ধান সেই পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে।
মডেল: তমা মির্জা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: সাভাটা বাই রিফাহ্
ডেকর: এস কে ডেকর বাই সাইমুল করিম
ছবি: জিয়া উদ্দীন
