ফিচার I প্যান্ট প্রকরণ
ঈদের সাজ মানে শুধু জামার জৌলুশ? এবার স্পটলাইট প্যান্টে। ক্ল্যাসিক সালোয়ার থেকে নাটকীয় ঘারারা, ফাইন টেইলরড সিগারেট প্যান্ট থেকে ফিউশন কুলোটস
ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ভিড় বাড়ছে ফ্যাশন বাজারে। সেই চিরচেনা দৃশ্য। গ্রাহকের পছন্দে তৈরি নানা নকশাকাট। সিঙ্গেল পিস টপের পরে এখন আলোচনায় তৈরি পাজামা। জামা যেমনই হোক, প্যান্টের ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়!
কাল্ট ক্ল্যাসিক
প্রচলিত এমন কিছু। চিরচেনা কোনো স্টাইল। নকশা নিয়ে যারা বেশি ঝামেলা চান না, তাদের জন্য। যদি মূল চমক জামায় হয়, তাহলে ক্ল্যাসিক প্যান্টে হতে পারে বাজিমাত। অল্পেই পূর্ণতা পাবে ঈদের সাজপোশাক।
কাল্ট ক্ল্যাসিক প্যান্টের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত হলো সালোয়ার; বাংলায় যাকে বলে পাজামা। একেবারেই ছাপোষা, ঢিলেঢালা, কোমরের দিকে কাপড়ের ভরাট কুঁচি, আর গোড়ালির কাছে সরু হয়ে আসা কাট—এটিই দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের পরা সবচেয়ে কমন স্টাইল। আরামদায়ক; ঘরে-বাইরে সহজে মানিয়ে যায় সাধারণ কিংবা জমকালো কামিজ আর ওড়নার সঙ্গে।
উৎসবকেন্দ্রিক কাল্ট ক্ল্যাসিকের মধ্যে আছে চুড়িদার। মোগল সাম্রাজ্যে ঘের দেওয়া জামার সঙ্গে চুড়িদার পরতেন রাজসভা মাতানো নৃত্যশিল্পীরা। নিচের দিকে চাপা প্যান্টের গোড়ালির কাছে চুড়ির মতো ভাঁজওয়ালা প্যান্টের এই ফ্যাশন ছড়িয়েছিল দ্রুত। সে সময় এই অঞ্চলের নারীদের পাশাপাশি শেরওয়ানির সঙ্গে পুরুষেরাও পরতেন চুড়িদার পায়জামা। উৎসব-আয়োজনে নারীদের লম্বা কামিজ, আনারকলি, আলিয়া কাট ইত্যাদির সঙ্গে আজও মানানসই প্যান্টের এই স্টাইল। আঁটসাঁট কাটের হওয়ায় আরামদায়ক হওয়া চাই চুড়িদারের কাপড়।
আরেকটি ক্ল্যাসিক প্যান্ট হলো পালাজো। ঢিলেঢালা ও সহজ এই স্টাইলকে বলে ভার্সাটাইল ক্ল্যাসিক। মানায় সব ধরনের কুর্তা-কামিজের সঙ্গে। আরামদায়কও বটে!
ফাইন টেইলরড
সূক্ষ্ম কাটে তৈরি হয় এই ক্যাটাগরির প্যান্টগুলো। খুব বেশি ঢিলেঢালা নয়; আঁটসাঁটও নয়। পায়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ মাপে তৈরি। এই ধারায় প্রথমেই বলতে হয় সিগারেট প্যান্টের কথা। স্টাইলটিকে স্লিম ফিট, স্ট্রেইট কাট এবং পেনসিল কাটও বলেন অনেকে। সোজা কাটের, মিনিমাল ডিজাইন। হতে পারে ঈদ পোশাকের স্মার্ট চয়েস।
ফাইন টেইলরের আওতার আরও আছে বুটকাট। কোমর থেকে আঁটসাঁট হয়ে নিচের দিকে ঢিলা। আরও আছে এ-লাইন প্যান্ট। ওপর থেকে ঢিলেঢালা, অনেকটা পালাজোর মতো। তবে কাটটি ইংরেজি ‘এ’ অক্ষরের মতো। খাটো কিংবা লম্বা—যেকোনো নকশাকাটের জামার সঙ্গে ফাইন টেইলরড প্যান্ট মানিয়ে যায়। তাই একই সঙ্গে ঝামেলাহীন এবং স্নিগ্ধ লুক চাইলে বেছে নিতে পারেন এই ক্যাটাগরি থেকে।
স্টেটমেন্ট পিস
পুরো সাজপোশাকে আলাদা করে নজর কাড়ে। মুহূর্তেই সাজ হয়ে ওঠে জমকালো। প্যান্টকে স্টেটমেন্ট পিস হিসেবে পরতে চাইলে মাথায় রাখা যেতে পারে কয়েকটি নকশা-প্যাটার্ন।
সারারা ও ঘারারা
পারস্যের শব্দ সারারা। অর্থ, টু ফ্লো বা প্রবাহিত। ষোলো শতকের ভারতবর্ষে মোগল আমলের রানি-রাজকুমারীরা পরতেন। সিল্ক, কাতান, মসলিন কাপড়ের সারারায় থাকত বাহারি কারুকাজ। দেখতে ঘের দেওয়া স্কার্ট বা লেহেঙ্গার মতোই; কিন্তু মাঝে সেলাই করা এই প্যান্ট পরে স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারতেন নারীরা। এমনকি সারারা পরে ঘোড়ার পিঠেও চড়তেন অনেকে। মানানসই কামিজ, কুর্তি, ক্রপ-টপ, শ্রাগ-জ্যাকেটের সঙ্গে। স্কার্টের মতো সোজা বা ধাপে ধাপে ফ্লেয়ার কাটেও তৈরি হয় সারারা প্যান্ট। নকশাকাটে নানা পরিবর্তন হলেও মোগল ও পারস্যের মধ্যকার আন্তসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে সারারা।
আরও জমকালো কিছু চাইলে বেছে নেওয়া যেতে পারে ঘারারা। হাঁটুর কাছ থেকে কুঁচির ঘের দেওয়া সিলুয়েটে তীব্র হয়ে ওঠে নাটকীয়তা। মুসলিম রাজতন্ত্র এবং নবাব পরিবারের নারীদের উৎসবকেন্দ্রিক পোশাকের অংশ ছিল এটি। একটি ঐতিহ্যবাহী ঘারারা তৈরিতে কাপড় লাগে ৬ থেকে ১২ মিটার। নির্ভর করে ঘেরের ওপর।
ফারশি সালোয়ার
হাল ফ্যাশনে জনপ্রিয়। প্যান্টের এই স্টাইলের উৎপত্তিও মোগল যুগে। পারস্যের ‘ফারশ’ শব্দ থেকে এসেছে ‘ফারশি’। অর্থ ‘মেঝে’। বিশেষ নকশার এই প্যান্টের অতিরিক্ত লম্বা ঝুল মেঝেতে গিয়ে ঠেকে। ঢিলেঢালা, নিচের দিকে প্রশস্ত হওয়ায় দেখতে যেমন স্টাইলিশ, তেমনই আরামদায়ক। সাধারণত খাটো বা লম্বা কামিজ এবং চওড়া ওড়না দিয়ে মিলিয়ে পরা হয় ফারশি সালোয়ার।
পাটিয়ালা
ভারতের উত্তরে পাঞ্জাব প্রদেশের পাটিয়ালার নারীরা কুঁচি দেওয়া একধরনের পায়জামা পরেন। খাটো জামার সঙ্গে অনেকটা ধুতির মতো দেখায় কুঁচির ভাঁজ বা প্লিটসগুলো। উৎপত্তিস্থলের নাম অনুযায়ী প্যান্টের এই স্টাইলকে বলা হয় পাটিয়ালা। অনেকে বলেন শাহি সালোয়ার।
আফগানি সালোয়ার
আঠারো শতকে আফগানিস্তান দখল করেছিলেন সে সময়ের শিখ সাম্রাজ্যের সেনাপতি ভাই হরি সিং নালওয়া। যুদ্ধে জয়ের পর সেই অঞ্চলের নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও একই নকশার সালোয়ার পরার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। কারণ, যুদ্ধে পরাজিত আফগান পুরুষ এবং নারীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না তার কাছে। কুঁচিওয়ালা ঢিলেঢালা, গোড়ালির কাছে মোটা পাইপিন বা বর্ডার দিয়ে কাফ করে আটকে দেওয়া। ইতিহাস করুণ হলেও সময়ের সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় ফ্যাশনে যুক্ত হয়েছে এই আফগানি সালোয়ার। আরেক নাম পশতুন সালোয়ার। কারণ, পশতুনরাও পরত এমন ডিজাইন।
ফিটফাট ফিউশন
ফ্যাশনে ফিউশন আসবেই! প্যান্টের ক্ষেত্রেও তাই। পুরোনো স্টাইলের সঙ্গে নতুনের সংযোজনে এসেছে নানা নকশাকাট। বাঙালি পুরুষের পরা ঐতিহ্যবাহী ধুতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ধুতি ধাঁচের প্যান্ট পরছেন নারীরাও। ক্ল্যাসিক পালাজোতে কোমরের কাছে কুঁচি দিয়ে তৈরি করেছেন অনেকে। এই স্টাইলকে বলে কুলোটস। লম্বায় কিছুটা শর্ট বা খাটো এবং স্কার্টের মতো ঢিলা কাটের এই প্যান্ট সম্পূর্ণ সামার-ফ্রেন্ডলি। বেল বটম কাট এবং গোড়ালির কাছে অ্যাসিমেট্রিক্যাল কাটের প্যান্টকে বলে টিউলিপ প্যান্ট। খানিকটা চাপা, নিচের দিকে টিউলিপ ফুলের পাপড়ির মতো। কোমরের কাছে ফিটেড, নিচের দিকে ঢিলা প্যান্টকে বলা হয় ড্রেপ স্টাইল।
আফগান ও পাটিয়ালা প্যান্টের মাঝামাঝি একটি স্টাইল হচ্ছে হারেম কাট। প্যান্টের মাঝের জোড়াটি দেওয়া হয় অনেকটা নিচের দিকে। আরেকটি ফিউশন স্টাইল হচ্ছে গুড্ডি কাট। সাধারণত কুঁচির হেরফের করে এসেছে প্যান্টের নানা স্টাইল। এরপর সুবিধামতো যুক্ত করা হয়েছে নকশা। গোড়ালির দিকে বোতাম দিয়ে বাটন বটম, নেট বা মসলিনের লেইস দিয়ে বানানো হয় লেইস প্যান্ট। জমকালো করে তোলে নানা নকশার এমব্রয়ডারি ও এমবেলিশমেন্ট। প্যান্টের নিচের দিকে পাশে স্প্লিট করা থাকতে পারে। ফিউশন চলে প্যান্টের ফ্যাব্রিকেও। উৎসবে পছন্দের শীর্ষে থাকে সিল্ক, মসলিন, জর্জেট, কোটা-কাতানসহ আরও অনেক কাপড়।
ঐতিহ্য, ইতিহাস, আঞ্চলিক প্রভাব আর সমকালীন ফ্যাশনের মেলবন্ধনে প্যান্ট আজ শুধু পরিপূরক নয়; নিজেই হয়ে উঠেছে কেন্দ্রবিন্দু। কখনো তা আরামের নির্ভরতা, কখনো ব্যক্তিত্বের প্রকাশ, কখনোবা উৎসবের নাটকীয়তা। ঈদের সাজে তাই জামার পাশাপাশি প্যান্টের কাট, কাপড় আর নকশা পাচ্ছে সমান গুরুত্ব। কারণ, ফ্যাশনে ভারসাম্যই শেষ কথা।
আবৃতি আহমেদ
মডেল: তানহা, তাজরিয়ান, মাহেলেকা ও তুবা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: রানে ও ক্লাবহাউস
ছবি: জিয়া উদ্দীন
