skip to Main Content

কভারস্টোরি I মঙ্গলময় মধুরিমা

গয়না শুধু অনুষঙ্গ নয়; সভ্যতার অংশ। প্রমাণ প্রকাশিত হয় মোটিফে। গঠন থেকে আলংকারিক নকশা—সময়ের সংলাপ আলোড়িত হয় বেশি। জানা যায় কেমন ছিল সে সময়ের সমাজ, দর্শন, পরিচয়, স্মৃতি ও বিশ্বাস। এককথায়, অলংকারের জগতের ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ। সেই বিশালতার কিয়দংশ সারাহ্ দীনার লেখায়

সভ্যতার পর সভ্যতা গয়না সুরক্ষা, উত্তরাধিকার ও আবেগ বহন করে চলেছে। পরিণত হয়েছে ইতিহাসে। তার কেন্দ্রে রয়েছে মোটিফ। একটি পুনরাবৃত্ত নকশা বা প্রতীক, যা ধাতু ও রত্নকে অর্থবহ করে তোলে। গয়নায় মোটিফ মানে নকশার পাশাপাশি একধরনের সাংকেতিক ভাষা। সোনার গয়নায় নকশা খোদাই, মীনাকারিতে আঁকা কিংবা রুপায় ঠাসা রঙিন পাথরের মোটিফ বিশ্বাস, সামাজিক অবস্থান, সংযোগ এবং মনস্তাত্ত্বিক আকাক্সক্ষার কথা বলে।
মোটিফ মিনিং
নকশার ভাষায় মোটিফ একটি পুনরাবৃত্ত উপাদান। আকৃতি, ফিগার বা প্যাটার্ন, যা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়; বরং নির্দিষ্ট অর্থ বহনে বেছে নেওয়া হয়। যাকে উপজীব্য করে সম্পন্ন করা হয় পুরো নকশা। গয়নার ক্ষেত্রে মোটিফ হতে পারে প্রাণীর অবয়ব, ফুল, চাঁদ-সূর্যের মতো জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রতীক। বিমূর্ত রূপে জ্যামিতিক নকশা, স্পাইরাল প্যাটার্ন, ধর্মীয় প্রতীক, উপজাতীয় চিহ্ন। মোটিফ একদিকে ইতিহাসের অনুরণন বহন করে, অন্যদিকে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার জায়গাও তৈরি করে দেয়।
প্রাচীন প্রতীকী ভাষা
ইতিহাসে মোটিফের উৎস খুঁজলে দেখা যায়, মানুষ প্রথম অনুপ্রেরণা নিয়েছে প্রকৃতি থেকে। ফুল, লতা, পাখি, নদী ও আকাশ ছিল উৎস। বোটানিক্যাল মোটিফ উর্বরতা ও নবজন্মের প্রতীক হিসেবে তাই আজও প্রাসঙ্গিক। এর মাঝে ফুল, নদীর ঢেউ, চাঁদ, তারা বহুল ব্যবহৃত।
দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপটে পদ্ম বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কাদামাটি ভেদ করে প্রস্ফুটিত এই ফুল আধ্যাত্মিক পবিত্রতার প্রতীক। গয়নায় পদ্মমুদ্রা একধরনের ধর্মীয় স্মারক এবং শুভ্রতার উৎস হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। একইভাবে ময়ূর তার বর্ণিল পেখম নিয়ে গয়নায় বারবার ফিরে আসে। এই রঙিন পাখি সৌন্দর্য, গর্ব ও শুভসূচনা নির্দেশ করে। বাংলায় প্রজন্মান্তরে চলে আসা ভারী সোনার গয়নার সেটে ময়ূর মোটিফের খোদাই আদতে শৈল্পিক ঐতিহ্য এবং বিবাহিত জীবনের মঙ্গলকামনার প্রকাশ। চাঁদ-তারা-সূর্য বহুল ব্যবহৃত মোটিফ। সূর্য জীবনীশক্তি ও স্থিতির প্রতীক; চাঁদ কোমলতা ও আধ্যাত্মিক আলোর। এই দুইয়ের যুগল উপস্থিতি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভারসাম্য ধারণ করে।
বিশ্বাস বৈভব
প্রকৃতির পরেই আসে পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক প্রতীক। ইতিহাসজুড়ে গয়না ব্যবহারের পেছনে শুধু সজ্জা কাজ করেছে, এমন নয়; সুরক্ষাও সেখানে প্রাসঙ্গিক। নজর লাগা ঠেকাতে ব্যবহৃত ‘নজর’ বা ইভিল আই মোটিফ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। আধুনিক মিনিমাল লকেটেও এর প্রতীকী সুরক্ষার অর্থ অটুট। সাপ সবচেয়ে প্রাচীন মোটিফগুলোর একটি, যা রূপান্তর ও পুনর্জন্মের প্রতীক। খোলস বদলের ক্ষমতা একে নবজীবনের চিহ্নে পরিণত করেছে। মিসর, গ্রিস কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশ—সব জায়গাতেই সাপের অলংকার পাওয়া যায়। প্রাচীন সমাজগুলো গয়নার মোটিফ ব্যবহার করত জীবন, মৃত্যু, ক্ষমতা ও দেবতত্ত্বের মতো জটিল ধারণা প্রকাশের জন্য। যেমন প্রাচীন মিসরের গয়নায় তারা, ফুল, প্রাণীর প্রতীক ব্যবহৃত হতো। ধর্মীয় বিশ্বাস, সুরক্ষা এবং পরকালীন যাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিল সেসব। ধারণা ছিল, এই প্রতীকগুলো পরিধানকারীকে রক্ষা করবে, পথ দেখাবে; এমনকি মৃত্যুর পরও সঙ্গ দেবে। অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতায়ও গয়নার মোটিফে ফুটে উঠেছে মহাজাগতিক ধারণা ও সামাজিক কাঠামো। একই মোটিফের পুনরাবৃত্তি কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ; যা দেখে সমাজের মানুষ সহজে বুঝতে পারত কার বিশ্বাস কী, তার সামাজিক অবস্থান কোথায়।
আধখানা চাঁদ ইসলামি শিল্প ও দক্ষিণ এশীয় অলংকারে সময় ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। তাবিজকেও গয়না হিসেবে পাওয়া যায় এখন। অথচ এর নান্দনিকতার আগে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সুরক্ষার ভূমিকা। ধাতুতে সরল নকশার সেই টুকরো গয়নাকে মানুষ বিশ্বাস করত শক্তির ধারক হিসেবে।
মধ্যযুগে এসে ইউরোপীয় গয়নায় ধর্মীয় ও পারিবারিক প্রতীক গুরুত্ব পায়। ক্রস, সাধু-সন্তের চিত্র—সবই ছিল বিশ্বাস, আনুগত্য ও পরিচয়ের চিহ্ন। রেনেসাঁর সময় গ্রিক-রোমান পুরাণ আবার ফিরে আসে গয়নার মোটিফে। দেব-দেবীর ক্যামিও, লরেল পাতা, পৌরাণিক প্রাণী—এসব নকশা সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ প্রভাবিত করেছে; যা কালের পরিক্রমায় শিক্ষিত ও রুচিশীল পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ভিক্টোরিয়ান যুগে ফুল ছিল আবেগ প্রকাশের প্রতীক। প্রতিটি ফুলের আলাদা তাৎপর্য ছিল, যা গয়নায় ব্যবহৃত হয়ে ভালোবাসা, স্মৃতি বা প্রতিশ্রুতির সংকেত দিত। এরপর আসে আর্ট নুভো আন্দোলন, যেখানে শিল্প, প্রকৃতি ও আত্মিকতার মিলন ঘটে। ফরাসি শিল্পী রেনে লালিক এই ধারার অন্যতম পথিকৃৎ। ড্রাগনফ্লাই, অর্কিড, ময়ূর আর ঢেউখেলানো অর্গানিক লাইন—সবই জীবনের আন্তসংযোগ ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল তার কাজে। সেই সময় থেকে গয়না নিছক অলংকার নয়; শিল্পভিত্তিক গল্প বলার মাধ্যমেও পরিণত হয়েছিল।
রাজমহলের অন্দরে
রাজকীয় ও ঐতিহ্যবাহী মোটিফ ক্ষমতা ও বংশপরম্পরার ভাষা বহন করে। মোগল-প্রভাবিত নকশা, ফুলেল সামঞ্জস্য, রত্নখচিত সূক্ষ্মতা, এনামেলের কাজ সামাজিক ঐশ্বর্যের চিহ্ন। পেইজলি বা কলকা নকশা, যার উৎস পারস্য ও মোগল শিল্পে, তা বিবেচিত হয় জীবন ও অনন্ততার প্রতীক হিসেবে। তারকাটা সূক্ষ্ম কাজ প্রজন্মান্তরে কারিগরি দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করে। বাংলাদেশে নানি-দাদির কলকা খোদাই করা চুড়ি বা ফিলিগ্রি হার শুধু গয়না নয়; পারিবারিক স্মৃতির ধারক। রাজকীয় জ্যামিতিক বিন্যাস স্থিতি ও শৃঙ্খলার প্রতীক হয়ে ওঠে। রাজবংশীয় নারীরা গয়নাকে নিজেদের রক্ষাকবচ বানিয়েছিলেন। তখনকার সময়ে যুদ্ধজয়ী দল প্রতিপক্ষের ধন-দৌলতের পাশাপাশি নারীদেরকেও অধিকার করার চেষ্টা করত। আর সেখানেই ভয় ছিল। তাই আংটির নকশা এমনভাবে তৈরি করা হতো, যেন তাতে সংরক্ষণ করা যায় বিষ। শত্রুর হাতে ধরা পরার পূর্বমুহূর্তে সেই বিষপানে আত্মহনন করার ইচ্ছাই ছিল এমন নকশার কারণ।
সমকালে বসবাস
এ যুগে মোটিফ নতুন অর্থ ধারণ করেছে। মিনিমাল জ্যামিতিক নকশা, বিমূর্ত আকার মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। বৃত্ত তার অবিচ্ছিন্ন রেখায় পূর্ণতা ও চিরন্তনের কথা বলে। সরল নকশার পেনডেন্ট দৃঢ়তা ও ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। বিমূর্ত নকশা নির্দিষ্ট অর্থ এড়িয়ে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে। ডিজিটাল ক্যাওজের যুগে এই সরলতা এনে দেয় মানসিক প্রশান্তি।
জেনারেশন জেড আর মিলেনিয়ালদের আগ্রহ দেখা যায় সুররিয়াল জুয়েলারিতে; বিশেষ করে ইতালীয় ফ্যাশন ডিজাইনার এলসা শিয়াপারেল্লির নকশাতে। ১৮৯০ থেকে ১৯৭৩ সাল তার জীবনের দৈর্ঘ্য। কিন্তু এই ২০২৬ সালেও দারুণ প্রাসঙ্গিক। তার ব্র্যান্ডের বর্তমান ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ড্যানিয়েল রোজবেরি নতুন করে ফিরিয়ে এনেছেন সুররিয়াল জুয়েলারি। উপস্থাপন করেছেন আভাঁ গার্দ রানওয়েতে। যেখানে সোনালি ফেস মাস্ক, কানের কাফ, চোখের মতো দেখতে এমন ব্রোচ তৈরি করা হয়েছে। জেনডায়া, বিয়ন্সে আর লেডি গাগাকেও পাওয়া গেছে শিয়াপারেল্লির অলংকারে।
আধুনিক গয়নায় এসেছে সরলতা ও সংযম; বিশেষ করে মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মের কাছে মিনিমাল জ্যামিতি জনপ্রিয়। যেখানে ছোট্ট একটি বৃত্তও হয়ে ওঠে পূর্ণতা ও অনন্তের প্রতীক। সম্প্রতি ভারতীয় নায়িকা রাশমিকা মান্দানার বিয়ের গয়নার কথা টানা যেতে পারে উদাহরণে। সেই গয়নাজুড়ে গোলাকার বলের জৌলুশ ছিল নয়নাভিরাম।
একদম সরলরেখার নেকলেস সব সময় ইন ট্রেন্ড। শক্তি ও ভারসাম্যের ইঙ্গিতবাহী। বিমূর্ত আকার সরাসরি অর্থ না দিয়ে পরিধানকারীকে নিজের ব্যাখ্যা বসানোর সুযোগ দেয়। হিন্দু দেবী কালী আর মেক্সিকান আইকনিক চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলোকেও দেখা যায় জুয়েলারি ক্যানভাসে। দুজনই সাহস আর নারীবাদের প্রতীক। ভারতীয় ফ্যাশন মোগল সব্যসাচীর কল্যাণে গয়নার মোটিফে বেঙ্গল টাইগার এখন দারুণ আকাঙ্ক্ষিত।
ব্যক্তিগতকরণ বর্তমানে গয়নার শক্তিশালী ট্রেন্ড। নাম বা আদ্যাক্ষরের পেনডেন্ট পরিচয়কে পরিণত করেছে দৃশ্যমান ঘোষণায়। সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর আত্মপরিচয়ের যুগে গয়না হিসেবে নিজের নাম ব্যবহার করা অহমিকা নয়; এটি আত্মস্বীকৃতি। বার্থ স্টোন, জোডিয়াক সাইন, মোর্স কোডে প্রিয় মানুষের নাম আনকোরা আগ্রহের প্রকাশ ঘটায়। অনেকে শুধু ট্রেন্ডের জন্য নয়; নিজের ব্যক্তিত্ব বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের প্রতিফলন হিসেবে এগুলো বেছে নেয়। ফলে গয়না হয়ে উঠেছে আত্মজৈবনিক। প্রতিটি টুকরো যেন ছোট্ট গল্প। আমি কে, কী বিশ্বাস করি, কাকে ভালোবাসি, কী হতে চাই—এসবের উদ্ভাসন। যেখানে একসময় রাজকীয় মোটিফ বংশপরিচয় জানাত, এখন ব্যক্তিগত মোটিফ জানায় স্বতন্ত্র পরিচয়।
পুনঃপুন
অভিনব নকশা থেকে কিছু পুরোনো চেনা মোটিফ বারবার ফিরে আসে। সহজ ভাষায় বলা যায়, ফ্যাশনে নকশা ফেরত আসে; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গভীর। সুইস মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ুং আর্কিটাইপ তত্ত্বে বলেন, কিছু প্রতীক মানবজাতির সমষ্টিগত অবচেতনে প্রোথিত। সূর্য, সাপ, ফুল, বৃক্ষ—এসব চিহ্ন যুগে যুগে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। কারণ, এগুলো গভীর মানসিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। সাপ রূপান্তরের প্রতীক; কারণ, খোলস বদল আমাদের পুনর্জন্মের ধারণাকে নাড়া দেয়। সূর্য জীবনের উৎস, তাই শক্তির প্রতীক। ফুল ফুটে ঝরে যায়, তাই জীবনচক্রের প্রতীক। তার ভাষ্যে, কিছু চিত্র বা প্রতীক সর্বজনীন এবং বারবার পুনরাবৃত্ত হয়, যে ঘটনাকে তিনি কালেকটিভ আনকনশাস বা সম্মিলিত অচেতনতা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। যেখানে আলাদা করে সমাজের মানুষ একই রকম ভাবনা ভাবে।
দ্য ইউনিসেক্স মার্কেট
গয়না কখনোই শুধু নারীর নয়; তবু ‘স্ত্রী ধন’ হিসেবে নাম লেখা আছে ইতিহাসে। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে নারী-পুরুষনির্বিশেষে গয়নাগল্পের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে উপস্থিত। পোলারিস মার্কেট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক পুরুষদের গয়নার বাজারের মূল্য ছিল ৪৮-৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০৩৪ সাল পর্যন্ত তা বার্ষিক ৯ দশমিক ৯ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারসহ বাড়বে। এই প্রবৃদ্ধিকে চালিত করছে নতুন উপকরণ, সূক্ষ্ম নকশা এবং ক্রস-কালচারাল নান্দনিকতার প্রতি আগ্রহ। গয়নার কালেকশন ক্রমশ লৈঙ্গিক নিরপেক্ষ হয়ে উঠছে।
ডিজাইনাররা এখন লিঙ্গনির্ধারিত সীমা ভেঙে এমন ডিজাইন তৈরি করছেন, যা নির্দিষ্ট করে পুরুষ বা নারীকে ভেবে নয়, সবার জন্য উপযুক্ত। সোশ্যাল মিডিয়া ও সেলিব্রিটিদের প্রভাবও এতে বড় ভূমিকা রাখছে। অনেকে এমন সব চেইন, রিং বা ব্রেসলেট পরছেন, যেগুলো জেন্ডার-নিউট্রাল এবং যেকোনো স্টাইলের সঙ্গে মানানসই। এ ধরনের গয়নাকে শুধু লিঙ্গের আলোকে নয়; স্টাইল ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করছে মিলেনিয়াল ও জেন-জি। বিশেষ করে ইউনিসেক্স গয়নায় ত্রিভুজ, বর্গ, বৃত্ত, মিনিমালিস্ট লাইন ও বার, প্রাকৃতিক মোটিফ, পাতা, সূর্য-চাঁদ বা তরঙ্গের স্টাইলাইজড ফর্ম, লেটারিং বা মনোগ্রাম, অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট ফর্ম এবং সিমেট্রিক্যাল ডিজাইন বেশি জনপ্রিয়। এই মোটিফগুলো সরল, স্টাইলিশ এবং যেকোনো লিঙ্গের ক্ষেত্রে মানানসই। বাজারের বড় অংশ তাই লিঙ্গনির্ভরতার সীমা ছাড়িয়ে উদার ও আত্মপ্রকাশমুখী নকশার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
লাভ ল্যাংগুয়েজ জুয়েলারি
ভালোবাসা প্রকাশের অনুষঙ্গ হিসেবে গয়নার চাহিদা আগে থেকে ছিল। এনগেজমেন্ট রিং সেই তালিকারই একটি। সেখানে নতুন করে যোগ হয়েছে কয়েকটি মোটিফ। যেমন একটি হার্ট শেপ ভেঙে আলাদা দুটি অংশ, যার নাম ইউ অ্যান্ড আই। ছোট ঘরের মতো নকশাও দেখা যায়, যা স্থান পায় লকেট হিসেবে। এর নাম হোম পেনডেন্ট। সন্তান ও মাতৃত্বের স্মৃতি উদ্‌যাপনের জন্য ব্রেস্টমিল্ক জুয়েলারিও তৈরি করে থাকেন কোনো কোনো মা। আবার এসবের একদম বিপরীত, ডিভোর্স জুয়েলারিও ইন ট্রেন্ড।
সোনা-দানা দামি গয়না
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার মৌলিক মূল্যের এখন ঊর্ধ্বগতি। তাই বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই ধাতুর বিকল্প ইতিমধ্যে নজর কেড়েছে। গোল্ডের প্লেটেড, ফিল্ড এবং ভার্মিল বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিকল্প। এ তিন ক্ষেত্রেই মূল ধাতুর সাধারণত ব্রাস বা স্টার্লিং সিলভারের ওপর একটি স্তর হিসেবে আসল সোনা প্রয়োগ করা হয়; তবে স্তরের পুরুত্ব ও স্থায়িত্বের দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে। গোল্ড-প্লেটেড গয়নায় সোনার স্তর তুলনামূলক পাতলা, তাই এটি সাশ্রয়ী এবং ট্রেন্ডভিত্তিক ডিজাইনের জন্য উপযোগী। গোল্ড-ফিল্ড গয়নায় যান্ত্রিকভাবে সংযুক্ত পুরু সোনার স্তর থাকে; ফলে এটি দীর্ঘস্থায়ী এবং সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। অন্যদিকে গোল্ড ভার্মিলে স্টার্লিং সিলভারের ওপর নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী তুলনামূলক মোটা সোনার স্তর প্রয়োগ করা হয়; যা প্রিমিয়াম অনুভূতি দেয়, কিন্তু খাঁটি সোনার তুলনায় অনেক কম মূল্যে পাওয়া যায়। ফলে উচ্চমানের নকশা উপভোগ করা সম্ভব হয় বড় বিনিয়োগ ছাড়াই। এসবে জ্যামিতিক প্রাকৃতিক মোটিফ যেমন দেখা যায়, তেমনি আধুনিক ইনিশিয়াল, ইনফিনিটি, কি লকেটও তৈরি হয়।
ম্যাক্সি ম্যাজিক
নব্বইয়ের দশকের ম্যাক্সিমালিজমের ম্যাজিক্যাল টাচ এবারের জুয়েলারি বক্সকে করেছে জমকালো। তখনকার সময়ে উঠতি বয়সী ফ্যাশনিস্তারা মুড রিং, নেকলেস, চুড়ি, চুলের গয়নার মতো অনুষঙ্গের ফ্যান হয়ে উঠেছিলেন। সেই সময় ফেরত আসতে যাচ্ছে বলেই ধারণা করা যায়। ওয়াইটুকের স্টাইল এখন আবারও ইন ট্রেন্ড। জেনারেশন এক্স আর মিলেনিয়ালদের জন্য খানিকটা নস্টালজিক। তবে এই ট্রেন্ডের দর্শন খুঁজলে অনুভূত হয়, আনন্দটাই মুখ্য। আর সেই খুশি নিয়ে ফেরত আসবে মুড রিং, স্ট্রেচি প্ল্যাস্টিক নেকলেস, চার্ম ব্রেসলেট, ক্ল্যাসিক ওয়াইটুকে নেকলেস এবং অ্যাক্রিলিক গয়না, তা সহজে অনুমেয়। তবে ভারতীয় উপমহাদেশের গয়না বহু আগে থেকে ম্যাক্সিমালিস্টিক। ডিজাইনে মিনিমাল নকশার চল এসেছে বহু পরে। আবার এলেও যে জয় করেছে সব, এমন নয়।
অধ্যায় ২০২৬
শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল ফ্যাশন ও বিউটি প্রকাশনা হু হোয়াট অয়ার প্রকাশ করেছে, এ বছর কেমন নকশা গুরুত্ব পাবে ফ্যাশনিস্তাদের কাছে। এর মধ্যে রয়েছে ফরাসি জুয়েলারি লেবেল ক্লোয়ির ভিক্টোরিয়ান চার্ম নেকলেস; যেখানে একই সঙ্গে চেইনে জড়িয়ে আছে হার্ট শেপ মোটিফ আর চাবি। লেবেলটির মতে, এটি গোথিক ঘরানার গয়না। যদিও এই পেনডেন্ট মনে করিয়ে দেয়, উদারিং হাইটসের প্রিমিয়ারে বারবি-খ্যাত অস্ট্রেলিয়ান তারকা মার্গো রবির গলায় সতেরো শতকের ঐতিহাসিক তাজমহল নেকলেস চমকে দিয়েছিল পুরো দুনিয়া। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এক ভারতীয় গয়না এটি, যা একসময় মোগল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ছিল এবং পরে ক্লিওপেট্রাখ্যাত হলিউড তারকা এলিজাবেথ টেইলরের সংগ্রহে যায়। প্রায় ৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই হৃদয়াকৃতি হীরায় ফারসি ভাষায় খোদাই করা আছে—‘ভালোবাসা চিরন্তন’। ধারণা করা হয়, ১৬২৭-২৮ সালের দিকে মোগল দরবারে তৈরি হওয়া এই গয়না সম্রাট জাহাঙ্গীর উপহার দিয়েছিলেন নূরজাহানকে এবং পরবর্তীকালে এটি সম্রাট শাহজাহানের কাছে যায়। টেবিল-কাট হীরাটি জেড পাথরে বসানো; সোনার চেইনের সঙ্গে রুবি ও ছোট হীরা দিয়ে অলংকৃত। পরে এলিজাবেথ টেইলরের ৪০তম জন্মদিনে তাকে এটি উপহার দেন তার সহ-অভিনেতা রিচার্ড বার্টন; পরে এটি কার্টিয়ারের সংগ্রহে যুক্ত হয়। সেই নেকলেস মার্গো রবির গলায় দেখার পর, ঔপনিবেশিক আমলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী সম্পদ ফেরত দেওয়ার প্রশ্নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
এই গোথিক ক্যাটাগরিতে আরও থাকবে বক্স চার্ম নেকলেস, কসমিক সিগনেট রিং। আর্ট ডেকো মোটিফেও মন মজবে। সেখানে ডাবল র‌্যাপ কাফ দেখা যাবে। এবার বিভিন্ন নকশায় রত্নের ব্যবহার কাড়বে নজর। যেমন স্টোন ড্রপ নেকলেস, টাইগার আই রিং, মালাকাইট বিডেড ব্রেসলেট এবং বেঙ্গলি নেকলেস কাফের রাজত্ব চলবে। এক্সট্রা লং ট্যাসেল দেখা যাবে নেকলেস এবং কানের দুল—উভয়েই। স্টেটমেন্ট চোকার ফিরবে। চেইনে বিভিন্ন সরল মোটিফের মিলবে দেখা।
প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত মোটিফগুলো প্রকৃতি, পৌরাণিক ও রাজকীয় প্রতীক, জ্যামিতিক নকশা বা ব্যক্তিগত চিহ্নই শুধু সাজায়নি; বরং পরিচয়, বিশ্বাস ও আবেগের প্রকাশ ঘটিয়েছে। আধুনিক মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মের কাছে গয়না হয়ে উঠেছে আত্মপ্রকাশের মাধ্যম; যেখানে ইউনিসেক্স ডিজাইন, মিনিমাল নকশা, সিগনেচার বা জোডিয়াক মোটিফের মাধ্যমে স্টাইল ও পরিচয় একত্র হচ্ছে। চলতি বছরের ট্রেন্ডে ফিরে এসেছে ওয়াইটুকের হালকা চালের আনন্দময় গয়না; যা নস্টালজিয়ার সঙ্গে নতুন উদ্দীপনা যোগ করেছে।
গয়না শুধু শোভা নয়; এটি অনুভূতি, স্মৃতি ও গল্পের ভাষা, যা সব বয়স ও লিঙ্গের মানুষের জন্য আনন্দ ও তাৎপর্য বহন করে। সোশ্যাল মিডিয়া এখন গয়নার জগতে ট্রেন্ড গড়ার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও পিন্টারেস্টের মতো প্ল্যাটফর্ম মুহূর্তে নতুন ডিজাইন, মোটিফ ও স্টাইলকে বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে হেইলি বিবার বা বেলা হাদিদের কথা। এই দুই আমেরিকান মডেলের ইনস্টা পেজে স্ট্রেচি প্লাস্টিক নেকলেস, চার্ম ব্রেসলেট বা মিনিমাল জ্যামিতিক চেইন মুহূর্তেই জেনারেশন জেডের ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। টিকটকে এসব ছোট ছোট স্টাইলিং ভিডিও বা ডিআইওয়াই জুয়েলারি হ্যাকও ব্যবহারকারীদের প্রভাবিত করে।
গয়না আগেও সভ্যতার প্রতীক ছিল, এখনো তা-ই। এবারে শুধু মুকুটে যোগ হচ্ছে প্রযুক্তির পালক। যেখানে মোটিফ ম্যাজিক দেখাচ্ছে দ্রুতগতিতে। ডিজাইনে অংশ নিচ্ছে টেকনোলজি। নতুন নকশা মুহূর্তেই মনোযোগ টানছে। মুগ্ধ করছে।

মডেল: সাফা কবির
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: সাভাটা বাই রিফাহ্, ব্লুচিজ ও স্বপ্নযাত্রা
জুয়েলারি: জড়োয়া হাউজ
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top