ফিচার I টাই আনটাইয়িং
বিবর্তনের জটিল ধাঁধায় ফেঁসেছিল টাই। লম্বা পথে ঘটেছে নানা পরিবর্তন। গলায় এঁটে পরা লম্বাটে-সরু এক টুকরো কাপড়। বহুরূপী তার চল। বিস্তারিত আবৃতি আহমেদের লেখায়
যেকোনো ফ্যাশন পরিবর্তনশীল। টাইও। কালের বিবর্তনে রকম-সকমে বদলে গেছে। চিরাচরিত রূপ বহাল এখনো। তবে ফিউশন ফ্যাশন ধারায় নতুন করে, নবরূপে দেখা হচ্ছে অনুষঙ্গটিকে। গয়নার সঙ্গেও হচ্ছে তুলনা। হবেই না কেন? নেকপিস বলে কথা!
প্রারম্ভে প্রাক্কথন
সতেরো শতকের শুরুর কথা। ফ্রান্সজুড়ে তুমুল যুদ্ধ। রাজা চতুর্দশ লুই পড়লেন সেনা-সংকটে। অদূরের দেশ ক্রোয়েশিয়া থেকে সৈন্য ভাড়া করলেন। শয়ে শয়ে সৈন্য এলেন ফ্রান্সে। সবার পরনে যোদ্ধার উর্দি। রাজার চোখ আটকে গেল তাদের গলায় বাঁধা একটুকরা সাদা কাপড়ে। জ্যাকেটের ওপরের অংশগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখাই ছিল ওই কাপড়ের কাজ। এ ছাড়া শত্রুর অকস্মাৎ আক্রমণ থেকে গলার সুরক্ষা এবং ঘাম বা রক্ত মুছতেও এটি ব্যবহার করতেন সৈন্যরা। অভিভূত হলেন রাজা। ডেকে পাঠালেন রাজদর্জিকে। রাজপরিবারের সব পুরুষের জন্য একই জিনিস তৈরি করার আদেশ দিলেন। ক্রোয়েশিয়ানদের ফরাসিরা বলেন ক্রোয়েট, সেখান থেকে পোশাকের এই অনুষঙ্গের নাম হয় ক্র্যাভেট। সে সময় পুরুষদের এই অনুষঙ্গ পরা বাধ্যতামূলক করেন লুই। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসে ক্র্যাভেটের আকার, আয়তন, কাপড়, রং ও ধরনে। পুরুষদের পাশাপাশি একসময় তা পরতে শুরু করেন রাজপরিবারের নারীরাও। ভাঁজ করে বা কুঁচি দিয়ে বাঁধতেন নানা ঢঙে। পার্টিতে কোট বা গাউনের সঙ্গে মিলিয়ে, ভ্রমণে বা ঘোড়ায় চড়ার সময় নারী-পুরুষ সবার গলায় শোভা পেত রাজকীয় নানা ক্র্যাভেট। দেখাদেখি প্রজামহলেও ঘটে এই গলাবন্ধনীর বিস্তার।
বিবর্তনে বিস্তরণ
অল্পদিনে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে ক্র্যাভেট। সে সময় মূল নকশার বাইরে নানা রকম তৈরি হতো। আঠারো শতকে সিল্ক, লিনেন, জর্জেট, নেট কাপড়ে কখনো লম্বাটে, কখনো একেবারেই ছোট গলাবন্ধনী পরতেন লোকে। গুরুত্ব পেত পছন্দের রং এবং প্রিন্ট। থাকত লেইসের নকশা। পোশাকের ছোট্ট এই অংশই ছিল ব্যক্তিগত স্টাইল স্টেটমেন্ট। ক্র্যাভেট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে উনিশ শতকের যুক্তরাজ্যে গলায় রঙিন রুমাল বাঁধতেন ব্রিটিশ পুরুষেরা। একে বলা হতো অ্যাসকট। সে সময় শিল্পবিপ্লবের পর লাখ লাখ মানুষ কৃষিকাজ ছেড়ে যোগ দেন বিভিন্ন কারখানার কাজে। সমাজে দ্রুতই প্রকট হয়ে ওঠে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক—এ দুই শ্রেণি। দুই দলের জীবনব্যবস্থা থেকে পোশাক-আশাক—সবই ছিল আলাদা। ইচ্ছেমতো পোশাক-আনুষঙ্গিক পরতেন ধনীরা। দামি দামি ক্র্যাভেট বা অ্যাসকট বাঁধতেন গলায়।
ক্র্যাভেট থেকে অ্যাসকট। তারপর এসেছে প্রচলিত ধারার টাই। মাত্র এক শতক আগের ঘটনা। সালটা ১৯২৪। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে দর্জির কাজ করতেন জেসি ল্যাংসডর্ফ। ৪৫ ডিগ্রি কোনাকুনি কাপড় কেটে তিন দিকে সেলাই করে একটি গলাবন্ধনী তৈরি করেন তিনি। এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম আধুনিক টাই। সেই নকশার পেটেন্টও করেছিলেন জেসি। এরপর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে টাই কখনো বেড়েছে, কখনো সংকুচিত হয়েছে। ১৯৪০-এর দশকে মার্কিন কাউবয় সংস্কৃতি থেকে এসেছে মোটা সুতা আর ব্রোচের তৈরি বোলো টাই। পঞ্চাশের দশকের জ্যাজ ও রক এন রোলের উত্থানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ফিনফিনে সরু উজ্জ্বল টাই। সে সময় কথিত ছিল, টাই না পরা পর্যন্ত একজন পুরুষের পোশাক পূর্ণতা পায় না। আধুনিক সময়ের এই গলাবন্ধনীতে ল্যাংসডর্ফের মূল নকশা এখনো অভিন্ন রয়ে গেছে। কারণ, দৈনন্দিন পরিধানের শার্ট-প্যান্টের সঙ্গে মানানসই। ফলে টাই দ্রুত হয়ে ওঠে কর্মজীবী থেকে ব্যবসায়ী—সকল পেশার পুরুষদের পোশাকের নিত্যসঙ্গী।
সুকৌশলে সমাদৃত
সময়ের সঙ্গে যৎসামান্যের পথে হেঁটেছে টাই। মিলেমিশে গেছে ব্যস্ত পৃথিবীর ব্যস্ততায়। আধুনিক টাই ভাবে সরল, যাকে বলে মিনিমাল। তবে দেখতে সহজ হলেও নানা কৌশল রপ্ত হয়েছে এতে। প্যাঁচের ওপর প্যাঁচ খেলিয়ে টাই বাঁধা খুব একটা সহজ নয়। কাজটিকে জটিল বললেও হবে ভুল! কারণ, একবার শিখে নিলে আর নিয়মিত চর্চায় থাকলে অল্পদিনে এসে যায় আয়ত্তে। আধুনিক টাইয়ের প্রচলিত বাঁধুনির আবিষ্কারক যুক্তরাজ্যের উইন্ডসরের ডিউক অষ্টম এডওয়ার্ড। ১৯৩০-এর দশকে টাই বাঁধার সুকৌশলটি আবিষ্কার করেন তিনি। এরপর নানাভাবে তা বেঁধেছে লোকে। কিন্তু ফরমাল বাঁধুনি মানেই উইন্ডসর নট। অবশ্য বাধ্যবাধকতা নেই তাতে। মহল বুঝে স্টাইল করা যায় যেকোনো পোশাক ও অনুষঙ্গ। এ সূত্রে বাদ যায় না টাইও। রূপান্তরিত ফ্যাশন ধারায় টাইয়ের অনুরণনেও এসেছে পরিবর্তন। নতুন করে ভাবা হচ্ছে এর ফ্যাশন নিয়ে। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড ডিওরের এ বছরের প্রথম ফ্যাশন শোতে স্পটলাইট পেয়েছে নেকটাই। ফিরিয়ে আনা হয়েছে ক্র্যাভেট স্টাইলকে। ফিউশন করা হয়েছে আধুনিক পোশাকের সঙ্গে।
একসময় টাই ছিল গম্ভীর ফ্যাশনের অংশ। আজ এ ধারণা পরিবর্তনের পথে। ফরমালে বেঁধে না রেখে টাইকে দেওয়া হয়েছে মুক্তি। এর উদাহরণ দেখা যায় বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর টাই সংগ্রহে। এ বছরের ১৭ জানুয়ারি আয়োজিত মার্কিন ফ্যাশন ব্র্যান্ড রালফ লরেনের ফল ২০২৬ ফ্যাশন শো ছিল বেশ টাই-টম্বুর! আধুনিক সময়ে পুরুষদের জীবনধারা, তাদের বিভিন্ন পরিচয় ও ব্যক্তিগত স্টাইল থেকে অনুপ্রাণিত ছিল টাইগুলোর নকশা ও স্টাইলিং। ব্র্যান্ডটির কর্ণধার ফ্যাশন ডিজাইনার রালফ লরেন একটি টাইয়ের নকশা এঁকে শুরু করেছিলেন দীর্ঘ কর্মজীবন। কিন্তু বিষয়টি শুধু টাই নিয়ে ছিল না—বলেন রালফ। তার মতে, ‘এটা ছিল জীবনযাপনের একটি ধরন। যখন আমি পুরুষদের পোশাক ডিজাইন শুরু করি, তখন ঐতিহ্যকে ভালোবাসতাম; কিন্তু কখনোই তার মধ্যে নিজেকে আটকে রাখিনি।’ সত্যিই তা-ই। টাই কখনো এক জায়গায় আটকে থাকেনি।
ক্যাজুয়াল পোশাকের সঙ্গেও মানানসই টাই পরছেন ফ্যাশনিস্তারা। কাপড়ের টাই তো আছেই, সঙ্গে নানা কায়দায় চলছে ফিউশন। টাইয়ের ওপর সুতার কারুকাজ, পুঁতি-পাথর বা ব্রোচ সংযোগ, যেন এক আমুদে স্টাইলিং। পছন্দের শীর্ষে আছে বো টাই, রিবন টাই, স্টক টাই। যেমন চাই, ঠিক তেমন। কাপড়ের টাইয়ের ওপর অর্থবহ ছোট ছোট ব্রোচ পরছেন অনেকে। বাদ যাচ্ছে না নিজের নাম লেখা টাইও। সাদামাটার বদলে রঙিনের প্রতি বাড়ছে আগ্রহ। ছোটবেলাকে মনে করে প্রিয় কার্টুন ক্যারেক্টার প্রিন্টের টাই পরছেন কেউ কেউ।
কাপড়ের আলমারি ছেড়ে আজকাল গয়নার বাক্সেও জায়গা করে নিচ্ছে টাই। কারণ, একে শুধু অনুষঙ্গ হিসেবে আটকে রাখার পক্ষপাতী নন ফ্যাশনিস্তারা। টাই যে সত্যিই নেক পিস, যেন সেটাই প্রমাণের প্রয়াস। হঠাৎ দেখলে কেউ বলবে নেকলেস। খেয়াল করলে ফুটে উঠবে টাইয়ের গড়নশৈলী। ফিউশনটা এখানেই।
বিবর্তনের রূপরেখায় সমাদৃত হয়েছে টাই। সামাজিক ফ্যাশন ধারায় পেশাদারত্ব ও কর্তৃত্বের প্রতীক এই গলাবন্ধনী আজকাল হাই-ফ্যাশনের অনুষঙ্গও বটে! নতুনেরা নতুন করে দেখছেন একে। দুই পায়ে দুই রঙের স্নিকার পরার মতোই নানা ঢঙে টাই পরছেন তারা। ফ্যাশনের কোনো নির্দিষ্ট নিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকা নয়; নয় আনুগত্য। টাই পরার কৌশলগুলো এখন অনেকটাই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রকাশের সুযোগ।
মডেল: আরহাম
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: ব্লুচিজ
টাই: ক্যানভাস বাই তন্বী কবির
ছবি: জিয়া উদ্দীন
