সঙ্গানুষঙ্গ I বাজে রিনিঝিনি
লেইস ফিতার যুগে কাচের চুড়ি বাক্সে চড়ে পৌঁছে যেত ঘরের দুয়ারে। তারই দ্বিতীয় অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে সময়। দেশি অ্যাসথেটিকের প্রবল প্রকাশ
কবরী থেকে মৌসুমী—রুপালি পর্দায় নায়িকার হাত ভরা কাচের চুড়ি বহুবার দেখা গেছে। প্রভাব পড়েছিল বাস্তব জীবনেও। প্রেমিকা কিংবা স্ত্রীর জন্য এক গোছা রঙিন কাচের চুড়ি হয়ে উঠেছিল প্রেমময় উপহার। আবেদন কমেছে-বেড়েছে; কিন্তু উবে যায়নি কখনো। রাজধানীর বেইলি রোড, টিএসসি, শাহবাগে চুড়ি ফেরি করে চলেছে দীর্ঘকাল। সে জায়গায় কয়েক বছর ধরে যোগ হয়েছে অনলাইনের পসার। ছোট ছোট ভিডিওতে দেখা মেলে রংবেরঙের চুড়ির।
একটা সময় ছিল, কাচের চুড়ির শব্দ মানেই উৎসবের আগমনী বার্তা। আলমারির ভেতরে রাখা রঙিন বাক্স খুলে, যত্ন করে একগুচ্ছ চুড়ি বের করে হাতে পরার মধ্যে ছিল আলাদা আনন্দ। সেই চুড়ির টুংটাং শব্দ যেন ঘরের ভেতরে তৈরি করত উৎসবের পরিবেশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাস বদলেছে, ফ্যাশন পাল্টেছে, জীবনযাত্রার ঘটেছে পরিবর্তন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সবকিছু বদলে গেলেও কাচের চুড়ির প্রতি মানুষের টান কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি; বরং বর্তমানে সেটাই নতুনভাবে ফিরে এসেছে, একেবারে আনকোরা অর্থ নিয়ে। হালের কাচের চুড়ি আর শুধু ঐতিহ্যের ধারক নয়। এটি ব্যক্তিগত স্টাইল, স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক মিশ্র প্রকাশ। তাই এই ফিরে আসাকে শুধু ট্রেন্ড বললে হয়তো পুরো গল্পটা বলা হয় না।
কাচের চুড়ির গল্প শুরু হাজারো বছর আগে। খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ অব্দের মধ্যে মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পায় পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন জানান দেয়, তখনকার নারীরা হাতে একাধিক বালা বা চুড়ি পরতেন। বিখ্যাত ড্যান্সিং গার্ল মূর্তির হাতে থাকা সারি সারি বালা যেন সেই সময়ের ফ্যাশন-সচেতনতার সাক্ষ্য। প্রথমদিকে চুড়ি তৈরি হতো মাটি বা ধাতু দিয়ে। পরে কাচের ব্যবহার শুরু এই অলংকারে।
সে তো গেল পুরোনো দিনের গল্প। আমাদের দেশের নিজস্ব চুড়িও কিন্তু তৈরি হয় বেশ বড় পরিসরে। সেই মোগল আমল থেকে। পুরান ঢাকার চকবাজারে জমে উঠেছিল কেনাকাটা। আর তৈরি হতো যেখানে, তা-ও খুব দূরে নয়। নামকরণ হয়েছিল চুড়ির হাট। সেখান থেকে চুড়িহাট্টা। মোগল আমল থেকে মুসলমান কারিগরেরা কাচের চুড়ি তৈরি করে পুরান ঢাকার চকবাজারে বেচাকেনা করতেন। ফজরের আজানের পর শুরু হতো বিকিকিনি আর শেষ হতো মাগরিবের আজানের আগে। লেখক নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তি ঢাকা’ বইতেও আছে এর উল্লেখ। জানা যায়, চকবাজারের সন্নিকটেই রয়েছে চুড়িহাট্টা। একসময় সেখানকার মুসলমানরা কাচের চুড়ি তৈরি করতেন। উপমহাদেশে ঢাকার চুড়ির বেশ খ্যাতিও ছিল। চুড়িহাট্টাতেই ঢাকার চুড়ি কারখানা ছিল অনেক। পরবর্তীকালে অনেক কারিগর ঢাকা থেকে মধ্য ভারতে চলে যান।
আজকের দিনে কাচের চুড়ির পুনরুজ্জীবনের পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। ইনস্টাগ্রামের রিলস, পিন্টারেস্ট কিংবা টিকটক—সবখানে কাচের চুড়ির টুংটাং শব্দ বড্ড চেনা। এক জোড়া হাত, তাতে রঙিন চুড়ি আর রোমান্টিক গান—এমন কনটেন্টের দেখা পাওয়া এখন মুহূর্তের বিষয়। সোশ্যাল মিডিয়া কাচের চুড়িকে নতুন করে সামনে এনেছে। এই জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু ফ্যাশন কাজ করছে না; মানুষের মনও প্রভাবক।
প্রথমত, এখানে আছে নস্টালজিয়ার সুতীব্র প্রভাব। দ্রুতগতির এই জীবনে মানুষ বারবার ফিরে যেতে চায় সেই ছোট ছোট স্মৃতির কাছে, যেগুলো তাকে নিরাপত্তা আর স্বস্তি দেয়। কাচের চুড়ি সেসব স্মৃতির অংশ। এটি একদিকে যেমন মা, মাতৃস্থানীয়দের উপস্থিতিকে মনে করিয়ে দেয়; তেমনি শৈশবের সরল আনন্দকে আবার স্পর্শ করতে সাহায্য করে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে নিজের সংস্কৃতিকে নতুনভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। দেশি অ্যাসথেটিক এখন শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। কুর্তার সঙ্গে জিনস, শাড়ির সঙ্গে স্নিকার—এমন ফিউশন স্টাইলের ভেতর কাচের চুড়ি খুব সহজে জায়গা করে নিচ্ছে। এটি একদিকে ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করছে; অন্যদিকে আধুনিকতার সঙ্গেও তাল মিলিয়ে চলছে।
তৃতীয়ত, ফ্যাশনের ভেতরেও একটি পরিবর্তন এসেছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে মিনিমাল লুক ছিল জনপ্রিয়, এখন সেখানে ফিরে আসছে ম্যাক্সিমালিজম। মানুষ নিজের স্টাইলকে আরও দৃশ্যমানভাবে প্রকাশ করতে উৎসুক। কাচের চুড়ি এই প্রকাশের একটি সহজ কিন্তু কার্যকরী মাধ্যম।
বর্তমান সময়ে কাচের চুড়ির ট্রেন্ডে বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি নজরে পড়ে। নরম প্যাস্টেল রঙের চুড়িগুলো দৈনন্দিন ব্যবহারে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দেখতে যেমন আধুনিক, তেমনি সহজে যেকোনো পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে যায়। একসঙ্গে অনেক চুড়ি পরার এই স্টাইল একদিকে ঐতিহ্যকে স্মরণ করায়, অন্যদিকে সেটিকে আধুনিকভাবে উপস্থাপন করে।
ডুয়েল টোন বা ওমব্রে চুড়িগুলো ট্র্যাডিশনাল ডিজাইনের মধ্যে নতুনত্ব নিয়ে এসেছে। একই চুড়িতে দুই বা ততোধিক রঙের মিশ্রণ সেটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। উৎসব বা বিয়ের জন্য গ্লিটার ও ঝলমলে চুড়ির আবেদনও আগের মতো শক্তিশালী রয়েছে। বরং ভিডিও ও ফটোগ্রাফির যুগে এগুলোর ভিজ্যুয়াল ইমপ্যাক্ট বেড়েছে বেশ।
একই সঙ্গে, হ্যান্ড-পেইন্টেড বা শিল্পভিত্তিক চুড়ির চাহিদাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। এগুলো শুধু অলংকার নয়; বরং একধরনের শিল্পকর্ম, যা পরিধানকারীকে আলাদা করে তুলে ধরে। এরই উদাহরণ এবারের ঈদে বাজার দখল করেছিল কাশ্মীরি চুড়ি নামে। যেখানে কাচের ওপরে দেখা গেছে গোল্ড ফয়েলের কারুকাজ।
আজকের দিনের কাচের চুড়ির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, এর ব্যবহারে কোনো বাঁধাধরা নেই। যেমন ইচ্ছা তেমন স্টাইলিং করা যাচ্ছে; বিশেষ দিনের জন্য তুলে রাখাও আবশ্যক নয়। মন-মর্জি মেনে যখন ইচ্ছা, পরে নেওয়া যাচ্ছে। হোক অফিস কিংবা নববর্ষের সকাল। কখনো দেখা যাচ্ছে দুটি বালা দুদিকে দিয়ে মাঝখানে কাচের চুড়ি। আবার কখনো এক মুঠো কাচের চুড়ির মাঝে মাঝে সোনালি চিকন চুড়ির জমকালো উপস্থিতি। বড় একটি সামাজিক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন বলা যেতে পারে একে। মানুষ এখন নিজের স্টাইল নিজেই নির্ধারণ করতে চায়। কাচের চুড়ি সেই স্বাধীনতাকে সহজভাবে প্রকাশ করার একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
সারাহ্ দীনা
মডেল: ফারহানা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: স্বপ্নযাত্রা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
