skip to Main Content

ফিচার I সামারটাইম স্যাডনেস

গরমে সেদ্ধ, ঘামে অস্থির—এমন গ্রীষ্মকাল আসে কয়েক বছর ধরে। ব্র্যান্ডগুলো হাজির হয় সামার কালেকশন নিয়ে। নকশাদার। সুন্দর। কিন্তু তাতে স্বস্তি বড়ই অল্প। গরম যেন আরও আঁকড়ে ধরে। প্রেশার কুকারে পরিণত হয় পোশাক। যেন দুনিয়াতেই নরকের জ্বলন্ত চুলার তেজ। বিস্তারিত লিখেছেন সারাহ্ দীনা

ছয় ঋতুতে বছর শেষ হতো আমাদের দেশে। গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হলেও তাপমাত্রার তারতম্য ছিল লক্ষণীয়। যেখানে বর্তমানে পরিবর্তন প্রকট। বাংলাদেশের গ্রীষ্ম একটি নির্দিষ্ট ঋতু শুধু নয়, এটি যেন ধীরে ধীরে এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর সময়কালে পরিণত হচ্ছে। মার্চের শেষে যখন তাপমাত্রা ৩২-৩৫ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করে এবং কয়েক দিনের মধ্যে ৩৬ ডিগ্রির দিকে ওঠে, তখন বোঝা যায় গরম এখন আগেভাগে শুরু হচ্ছে। একসময় যে তাপমাত্রা বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি সময়ে স্বাভাবিক ছিল, এখন সেটিই বসন্তকালের বাস্তবতা।
গত ৭ থেকে ১০ বছরে ঢাকার গড় তাপমাত্রা ২-৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। আগে যেখানে ৩৩-৩৪ ডিগ্রি ছিল, এখন সেখানে ৩৬-৩৭ ডিগ্রি হয়ে উঠছে নিউ নরমাল। শুধু তা-ই নয়, ফিলস লাইক বা অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি। কারণ, আর্দ্রতা ও নগরায়ণের কারণে তাপ আটকে থাকে। ফলে শরীর যে গরম অনুভব করে, তা প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে বেশি।
২০২৪ ও ২০২৫ সালের গ্রীষ্ম এই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করেছে। টানা ২০ দিনের বেশি হিটওয়েভ, ৪০ ডিগ্রির ওপরে তাপমাত্রা—এগুলো এখন আর ব্যতিক্রম না; বরং পরিণত হচ্ছে নিয়মিত তাপমাত্রায়। এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। বাংলাদেশের ফ্যাশন কি এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে?
পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে গ্রিনহাউস ইফেক্ট। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন এবং জলীয় বাষ্পের মতো গ্যাসগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তাপ ধরে রাখে। ফলে পৃথিবী বাসযোগ্য থাকে। কিন্তু বর্তমানে শিল্পায়ন, যানবাহনের বৃদ্ধি এবং বন উজাড় হওয়ার কারণে এই গ্যাসগুলোর পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। তাতে তৈরি হয়েছে এনহ্যান্সড গ্রিনহাউস ইফেক্ট, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। এর প্রভাব বাংলাদেশে আরও বেশি অনুভূত হয়; কারণ, এখানে আর্দ্রতা বেশি। তাই ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাও ৪০ ডিগ্রির মতো মনে হতে পারে। তা ছাড়া ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে অবস্থিত, তাই সামান্য তাপমাত্রা বৃদ্ধি খুব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শহরাঞ্চলের আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট। যেখানে কংক্রিটের ভবন, কম সবুজায়ন এবং সরু রাস্তাঘাটের কারণে তাপ বেশি আটকে থাকে এবং রাতেও কমে না। পাশাপাশি গাছপালা কাটা, জলাশয় ভরাট এবং খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক শীতলতার উৎসগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে আমরা যে তাপ এখন অনুভব করছি, তা মূলত বৈশ্বিক উষ্ণতা, আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট, উচ্চ আর্দ্রতা এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল।
ঐতিহ্য বনাম বাস্তবতা
বাংলাদেশের পোশাকের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ঐতিহ্য। শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তা। এগুলো শুধু পোশাক নয়, সংস্কৃতির অংশ। এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকগুলো সব সময় বর্তমান আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসইভাবে তৈরি হচ্ছে না। বাংলাদেশি অভ্যন্তরীণ ফ্যাশন বাজার ঐতিহ্য ধরে রাখতে সফল হলেও দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার সঙ্গে ফ্যাব্রিক ও ডিজাইনের অভিযোজন বেশ জরুরি বলেই নিয়মিত ক্রেতাদের মতামতে জানা যায়। ক্যানভাস ম্যাগাজিন পরিচালিত অনলাইন জরিপে পাওয়া তথ্য জানান দেয়, আরামদায়কতার অভাবে অনেকে দেশি সামার কালেকশন-বিমুখ হচ্ছেন। পোশাকের আরাম নির্ভর করে মূলত দুটি বিষয়ের ওপর—ফ্যাব্রিকের ওজন এবং তার গঠন। অর্থাৎ কত জিএসএম এবং উইভিংয়ে তৈরি নাকি নিটিং। বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন সংকলনে কটন, লন, খাদি, নিট, কটন-পলিয়েস্টারের মতো ফ্যাব্রিক ব্যবহার করা হয়। কটন ১২০ থেকে ১৮০ সিএসএমে তৈরি হয়ে থাকে। তবে ১৬০-এর বেশি জিএসএম হলে কাপড় ভারী অনুভূত হয়। আর তাতে উইভিং যদি টাইট হয়ে থাকে, তাহলে বাতাস চলাচল কম হয়; যা তুলনামূলক উষ্ণতা বাড়ায়। কটন লন বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় ফ্যাব্রিক; যার জিএসএম ৮০ থেকে ১২০। তুলনামূলক হালকা ও নরম। তবে বেশির ভাগ সময় ক্যামিক্যাল ফিনিশ এই ফ্যাব্রিকে ব্যবহার করা হয়। যার কারণে ফ্যাব্রিকের বুননের ভেতর থেকে বায়ু চলাচল কমে যায়। খাদি ও হ্যান্ডলুম হয়ে থাকে ১২০ থেকে ১৬০ জিএসএমের। এর বুনন হালকা হলে তবেই শরীরে হাওয়া পৌঁছাতে পারে; নতুবা নয়। সিঙ্গেল জার্সি এবং ইন্টারলক নিট ফ্যাব্রিকও ব্যবহার করা হয়; যা স্ট্রেচি। তাই কম্ফি ফিলিংস দেয়। কিন্তু বেশি জিএসএম হলে তাপমাত্রা আটকে যায়। কটন-পলিয়েস্টার ব্লেন্ডও এখন আনকমন নয়। অনেক পোশাকের ফ্যাব্রিকেই দেখা যায়। কুঁচকে যায় না বলে এর আলাদা চাহিদা তৈরি হয়েছে; তবে ঘাম শোষণক্ষমতা কম। তাই অস্বস্তি হয় অনেকের। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কটন শব্দটি একা আরাম নিশ্চিত করে না। কটনের জিএসএম, উইভ এবং ফিনিশিং—সবকিছু মিলিয়ে তা নির্ধারিত হয়।
শুধু ফ্যাব্রিক নয়, ডিজাইনও বড় ভূমিকা রাখে। ডাবল লেয়ার বা আস্তরণ তাপ আটকে রাখে। স্লিম ফিট কাট বাতাস চলাচল কমায়। ভারী এমব্রয়ডারি বা স্ক্রিন প্রিন্ট বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত করে। ফলে অনেক সময় পোশাক দেখতে আকর্ষণীয় হলেও ব্যবহারিকভাবে তা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, বিশেষ করে দীর্ঘ সময় পরলে।
কর্মজীবী নারী বা শিক্ষার্থীদের জন্য পোশাক শুধু স্টাইল নয়, এটি তাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার অংশ। কিন্তু যখন গরমে পোশাক অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, তা সরাসরি প্রভাব ফেলে আত্মবিশ্বাস, কাজের মনোযোগ এবং মানসিক স্বচ্ছন্দের ওপর। অনেকে এখন ঐতিহ্যবাহী পোশাক পছন্দ করলেও, বাস্তব গরমের কারণে তা এড়িয়ে চলছেন। এটি শুধু একটি ফ্যাশন পরিবর্তন নয়; বরং বিহেভিয়ারাল শিফট। তাপমাত্রার এই পরিবর্তন মেনে নিয়ে নিত্যদিনের ডেইলি ওয়্যারের জন্য ১০০ থেকে ১২০ জিএসএমের ফ্যাব্রিক ব্যবহারের পরামর্শ দেন ফ্যাশন ডিজাইনার তানহা শেখ।
বাংলাদেশের গ্রীষ্ম বদলে গেছে। এটি আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বর্তমানের বাস্তবতা। এখন প্রশ্ন হলো, ফ্যাশন কি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে? কারণ, একটি পোশাক তখনই সত্যিকারের সফল, যখন তা শুধু সুন্দর নয়; বরং এই নতুন, পরিবর্তিত আবহাওয়ায়ও স্বস্তিদায়ক।

মডেল: সিনথিয়া ও দিবা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: আনোখি
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top