skip to Main Content

ইভেন্ট I ঝরনা কলমের ঝরনাধারা

অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দেশের প্রথম পেন শো। কাগজে ঝরনা কলমের নিব চুইয়ে পড়া আঁচড়-কালির আঁকিবুঁকি এখনো যে গুরুত্বপূর্ণ, সেই বার্তা জারি রেখে। বিস্তারিত আল মারুফ রাসেলের লেখায়
ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করার পরই কাগজে-কলমে লেখার চর্চা কমে গেছে আমাদের। গত শতকের শেষ দশকে কিংবা এই শতকের শুরুতেও ডায়েরি ও চিঠি লেখা, কার্ড দেওয়া-নেওয়ার যে চল ছিল, তা হুট করে এতটাই জিজিটাইজড হয়ে গেল, তাতে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সেই সব কাগজ, লেখাজোখার সরঞ্জাম; এমনকি এ-সংক্রান্ত কিছু সরঞ্জাম বিক্রির দোকানগুলোও কমতে কমতে এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। তার ওপর ঝরনা কলমের ওপর এই চাপ পড়তে শুরু করেছিল গত শতকের আটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। তাই রাজধানীর বুকে এই ঝরনা কলমের বিশেষায়িত প্রদর্শনী নজর কেড়েছিল নাগরিকদের।
ফাউন্টেইন পেন বা বাংলায় ঝরনা কলমই ছিল একটা সময়ে লেখার মানসম্পন্ন মাধ্যম। ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে ফাতিমি খলিফা মুইয-উদ-দিনুল্লাহর আবিষ্কৃত ঝরনা কলম হোক কিংবা সেটার প্রায় সাড়ে আট শ বছর পর ফরাসি পিথাশ পোয়েনাহুর প্রথম পেটেন্ট করা ঝরনা কলম পর্যন্ত ইতিহাস দীর্ঘ। তবে বাংলায় ঝরনা কলমের ইতিহাস ঔপনিবেশিক আমলের আগে নয়। তাই বলে এই কলমের ঐতিহ্য কি একেবারে নেই আমাদের?
এই প্রশ্নের উত্তর মিলল এবারের বাংলাদেশ পেন ক্লাব আয়োজিত দেশের প্রথম ঝরনা কলমের প্রদর্শনী ঢাকা পেন শোতে। রাজধানীর বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঁচতলায় বসেছিল ঝরনা কলমপ্রেমীদের এই মিলনমেলা। সংগ্রাহক, ক্যালিগ্রাফার, বিক্রেতা আর উৎসাহীদের অংশগ্রহণে প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত জমজমাট ছিল ৫ ও ৬ ডিসেম্বরের এই আয়োজন। ঝরনা কলমের এমন আয়োজনের চমৎকার আমন্ত্রণপত্র আর প্রদর্শনীর বিশেষায়িত ধরন অনেককে শুক্র-শনিবারের ছুটির দিন দুটোয় টেনে নিয়ে গিয়েছিল এই উৎসবে।
প্রদর্শনীর শুরুতে একেবারে ডান দিকের কোণের বিশাল অংশটা দখল করে রেখেছিল দোয়াতবাড়ি। নাজমুল হক মন্টু মূলত দোয়াতের সংগ্রাহক। তার সংগ্রহে রয়েছে নানা ধরনের দোয়াত, নানান সময়ের। আঠারো শতকের রুপার তৈরি নকশাদার দোয়াত যেমন আছে, তেমনি মাটির তৈরি পুরোনো দিনের দোয়াতও। ছিল সুলেখার বোতল কালি, পাতা কালির সংগ্রহ। তবে তার এখানের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে ছিল এক লিটারের ঢাউস আকারের পেলিক্যান ও পাইলটের কালির বোতল। আমরা সাধারণত ছোট ছোট, ৬০ মিলি বোতল দেখেই অভ্যস্ত। এগুলো আগে স্কুল বা অফিসে কেনা হতো, যেখানে প্রচুর কালির প্রয়োজন পড়ত। একাত্তরের পর বাংলাদেশে তৈরি প্রথম ঝরনা কলমটিও তার শোকেসে ঠাঁই করে নিয়েছিল—নবীন। একই সঙ্গে ছিল নলখাগড়া, বাঁশের কঞ্চি, শজারুর কাঁটা ও মহিষের হাড় দিয়ে তৈরি কলমও। এগুলো কালিতে ডুবিয়ে লিখতে হতো; এগুলোই ছিল ঝরনা কলম আসার আগেকার লেখার উপকরণ।
এরপর ছিল কাগজের দোকান। সেভেনডে’জ নোটস নামের এই প্রতিষ্ঠানের, জেলার নাম ও ঐতিহ্যের ছবিসংবলিত কভারের নোটবুক টেনেছে সবার দৃষ্টি। এই স্টলের ঠিক উল্টো দিক আলো করে ছিল পেশায় ব্যাংকার, নেশায় সংগ্রাহক দিদারুল আহসানের ঝরনা কলমের সংগ্রহ। প্রায় ৫০০ নামীদামি ব্র্যান্ডের কলম এনেছিলেন তিনি প্রদর্শন করার জন্য। অবশ্য কিছু কলম ছিল বিক্রির জন্য। যারা সংগ্রহ করে রাখতে চান, তাদের কথা ভেবে। মূলত শেফার, ওয়াটারম্যানস, মঁ ব্লঁ, কাতিয়ে, পাইলট, কনক্লিন ছিল তার সংগ্রহে। তবে অবশ্যই আধিক্য ছিল শেফারের। তার শেফার কলমের সংগ্রহ যদি কেউ টাইমলাইন ধরে দেখেন, তাহলেই হয়তো ঝরনা কলমের বিবর্তন সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেয়ে যাবেন। তার সংগ্রহে রয়েছে বাংলাদেশের সম্ভবত সবচেয়ে ক্ষুদ্র ঝরনা কলমটি—সালজ ব্রাদার ফাউন্টেইন পেন মিনিয়েচার; যেটি পিটার প্যান নামে পরিচিত। তিনি বাংলাদেশ পেন ক্লাবের ট্রেজারার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
এর পাশেই ছিল ইন্টেরিয়র ডিজাইনার ফাঈম মসাদ্দেকের সংগ্রহ। তার সংগ্রহগুলোর মধ্যে মূল আকর্ষণ ছিল ইতালিয়ান অরোরা ৮৮, ১০০ বছরের পুরোনো একখানা ওয়াটারম্যানস ৫২, আর ফাবা ক্যাস্টেলের সীমিত সংস্করণের কলম। এ ছাড়া আরও বহু কলম তিনি এনেছিলেন প্রদর্শনীতে; যেগুলোর মধ্যে অন্যতম পেলিক্যানের ১০০০, ৮০০ ও ৬০০ মডেল তিনটি।
তার পাশেই আবার পেন বাজার বিডির বিক্রিবাট্টার আসর। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মূলত প্রচলিত ধরনের, খানিকটা বাজেট কলম এনেছিলেন ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে। তবে এর মাঝেও আলো ছড়িয়েছিল মঁ ব্লঁ নবলেস। ২০১০ সালে বের হওয়া পাইলট পেটি এবং একই কোম্পানির সাতের দশকের বার্ডির জন্য বেশ ভালোই ভিড় হয়েছিল। এই ভিড়ের কারণ অবশ্য এ দুটো কলমই এখন আর বেরোয় না; ফলে এই কলমগুলো পরিণত হয়েছে সংগ্রাহকদের আরাধ্য বস্তুতে। এ ছাড়া হোংডিয়ান, জিনহাও, মুনম্যানের মতো চৈনিক কোম্পানির কলম ছিল তার স্টলে।
একদম দক্ষিণের ঘরে প্রথমে চোখে পড়ল বইয়ের সংগ্রহ। ক্যালিগ্রাফি, বিভিন্ন কোম্পানির পুরোনো ঝরনা কলমের ব্রুশিয়ার, প্রাইমার আর ঝরনা কলম নিয়ে দেশি-বিদেশি বই। সেখানে বসেই তিন হাজারের বেশি কলমের সংগ্রাহক এবং বাংলাদেশ পেন ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ইফতেখার হোসেন খান শোনাচ্ছিলেন কীর্তিমান সাহিত্যিকদের ঝরনা কলমের গল্প। তিনি নিজ সংগ্রহ নিয়ে না এলেও তার আলাপ কম আকর্ষণীয় ছিল না। পাশেই রাখা ছিল নানা ধরনের দেশি-বিদেশি কাগজ। দেশি বেশির ভাগই এখন আর বাজারে নেই। সেই সঙ্গে ছিল পোস্টকার্ড, খামও। তবে জাপানি টোমো রিভার পেপারের কথা না বললেই নয়। এই কাগজ রীতিমতো দুর্মূল্য, আর একই সঙ্গে ফাউন্টেইন পেন ব্যবহারকারীদের কাছে আরাধ্যও বটে! পাশেই ক্যালিগ্রাফিতে ব্যস্ত ছিলেন মুহাম্মাদ সাদ আহমদ। শেষ দিনে অবশ্য তার জায়গাটা দখল করেছিলেন আবির হোসেন। আরেকটু পাশে কোটস অ্যান্ড কফির টেবিল, সেখানে নাম, বিভিন্ন ধরনের উক্তি লিখে চলেছেন সানজিদা শহীদ। তার পাশেই পাবনা থেকে আসা স্কুলশিক্ষক সাব্বির আহমদ সোহাগের ইংক পেন বিডি। মূলত ভারতীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কলম ও কালি ছিল তার কাছে—ক্লিক, মোহি, কেনরাইট, ইন্ডাস, পিয়েহ কাহদোঁ, মার্ফি ইত্যাদি। প্রদর্শনীর জন্য নেওয়া পুরো হলই সাজানো হয়েছিল শেফার, পার্কারের মতো ব্র্যান্ডের ঝরনা কলমের বিভিন্ন ভিন্টেজ পোস্টার, টাইপোগ্রাফি কোলাজ দিয়ে।
শেষ দিন, ৬ ডিসেম্বর বিকেলে কাগজ, কলম ও কালি নিয়ে একটি সেমিনার পরিচালনা করেন বাংলাদেশে এই তিন বিষয়ের সমন্বয়ে লেখা এখন পর্যন্ত একমাত্র গবেষণামূলক বই ‘প্রকাশয়তি’র লেখক আমিন বাবু। বাংলাদেশ পেন ক্লাবের মেম্বার সেক্রেটারিও তিনি। কলমের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চেনা থেকে শুরু করে কালি ভরা, নিব, কালি ও কাগজের ধরন এবং কলম ও কালির রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামতি—সবকিছুরই সংক্ষিপ্ত ধারণা দিয়েছিলেন তিনি। সেদিন সন্ধ্যাতেই আবার আরেকটি কর্মশালা পরিচালনা করেছিলেন আন্তর্জাতিক হস্তলিপিকার জিয়াউর রহমান। তিনি ইংরেজি ছাপা অক্ষরের মতো হাতের লেখার কলাকৌশল দেখান এই কর্মশালায়। রাত আটটায় আয়োজকেরা ঝরনা কলমের সংগ্রাহক, গবেষক, ক্রেতা-বিক্রেতা, অনুরাগীদের এই মিলনমেলার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টানেন অংশগ্রহণকারীদের ক্রেস্ট বিতরণের মধ্য দিয়ে।
এই প্রদর্শনীর পরিকল্পনা হয়েছিল বেশ আগে; বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি তখন—জানালেন বাংলাদেশ পেন ক্লাবের সেক্রেটারি মাহের মোহাম্মদ মোজাম্মেল। তার কাছে জানা গেল, এই পেন শোর উদ্যোগ তারা ছড়িয়ে দিতে চান গোটা দেশে, অর্থাৎ সেটা হতে পারে বগুড়া, রাজশাহী, যশোর পেন শো-ও! পুরো বাংলাদেশের ঝরনা কলমের অনুরাগীদের মিলনমেলা হবে এসব পেন শো, এমনটাই বিশ্বাস তার।
প্রদর্শনীর বৃহত্তর উদ্দেশ্যের ওপর জোর দিয়ে আমিন বাবু বলেন, ‘একটি কলম, যখন ঠিকঠাকভাবে যত্ন নেওয়া হয়, তখন সেটা সারা জীবন স্থায়ী হতে পারে। এটি ওয়ানটাইম বলপয়েন্ট কলমের একটি টেকসই, সুন্দর বিকল্প। এটি আমাদের লেখার যে আনন্দ, সেটার সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করে।’
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশে ঝরনা কলমের পুনরুত্থান ঘটছে। তরুণেরা, যারা হাতে লেখার চেয়ে টাইপিংয়ে বেশি সময় দেন, তারাও সৃজনশীলতা, নিজেকে প্রকাশ করা আর ক্যালিগ্রাফির হাতিয়ার হিসেবে ঝরনা কলমকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন। তবে বাংলাদেশের প্রথম পেন শো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছে—কাগজে ঝরনা কলমের নিব চুইয়ে পড়া আঁচড়-কালির আঁকিবুঁকি এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top