ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন I মৃদু মোহিনী
ট্রেন্ডি ফ্যাশনের কাউন্টার ন্যারেটিভ। ৩০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কেট। সেখানে যুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও। ব্যবহৃত হচ্ছে স্টাইলিং সারতে। তাতে তুষ্ট ক্রেতা আর কলেবরে বাড়ছে ব্যবসা
ধরুন, আলমিরায় একটি লেদার জ্যাকেট আছে। হাইলি ফ্যাশনেবল, স্টেটমেন্ট পিস। মানাবে বেশ। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আপনি মডেস্ট পোশাকে অভ্যস্ত। তাই শখ করে কেনা জ্যাকেটটি পড়ে রয়েছে এক কোণে। প্রায়ই ভাবেন পরবেন; কিন্তু ঠিকঠাক মানায় না কোনো কিছুর সঙ্গে। শখের এমন অনেক ক্লদিং আইটেম থাকে, যা ঠিক কীভাবে পরলে মানাবে—ভেবেই কেটে যায় দীর্ঘ সময়। কারণ, স্টাইলিং কনফিউশন। সেখানে প্রযুক্তি হাজির হয়েছে আশীর্বাদ নিয়ে। স্টাইলিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কাঁধে। অগমেন্টেড রিয়ালিটিতে সারতে হবে অ্যাসাইনমেন্ট! নয়তো চাকরি নট করবে ফ্যাশন দুনিয়া। কাজে মনোযোগী উদ্ভাবকেরা। একের পর এক নতুন ফিচার যোগ হচ্ছে। এইসব টেকনোলজিক্যাল স্টাইলিস্ট অ্যাপের কোনোটি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে, কোনোটি আবার এক কাপ কফির দামে বাতলে দিচ্ছে সাজপোশাকের বিভিন্ন স্টাইল ট্যাকটিক।
এআই স্টাইলিং
ব্যক্তিগত এই ফ্যাশন স্টাইলিস্টের নাম এআই স্টাইলিং। অনলাইনভিত্তিক ভার্চুয়াল রিয়েলিটি। পোশাক বাছাই থেকে পরিপাটি করে পরার কৌশল, বলে দিতে পারে সাজপোশাকের আদ্যোপান্ত। ডিজিটাল বা ভার্চুয়াল মডেলের ওপর ফ্যাশন আইটেমগুলোকে মিলিয়ে তৈরি করে লুক। পোশাকের রং, কাপড়ের ধরন, দেহের মাপ এবং ব্যক্তির পছন্দ বিশ্লেষণ করে দেয় পারফেক্ট স্টাইল টিপস। কী থেকে কীভাবে পরব—প্রশ্নের উত্তর মেলে নিমেষে। অতঃপর বাইরে যাওয়ার আগে দ্রুত তৈরি হয়ে নেওয়া সহজ হয়; সময় বাঁচে। কিনতে গিয়ে একের পর এক পোশাক পরে দেখার ঝামেলা থেকেও মুক্তি দিতে পারে এআইয়ের ভার্চুয়াল ট্রাই-অন ফিচার। এতে ছবি বা ভিডিওতেই দেখা যায় পোশাকের আউটলুক। আরও আছে ভার্চুয়াল ট্রাই-অন মিরর; যা পরিচিত স্মার্ট মিরর নামে। অগমেন্টেড রিয়েলিটি বা এআর টেকনোলজি। যেন রূপকথার জাদুর আয়না। সামনে দাঁড়ালেই ইচ্ছেমতো বদলে দেয়। কোন পোশাকে কেমন লাগবে, বুঝে নেওয়া যায়। অহেতুক ভাবনার মেঘ জমে না। সহজে সামলানো সম্ভব।
পুরোনো ধারণা, নতুন ছক
ফ্যাশনে এআই নতুন নয়। পোশাকের নকশা থেকে গ্রাহকের চাহিদা যাচাই এবং ট্রেন্ড বিশ্লেষণের অভিজ্ঞ সঙ্গী। নতুন নয় এআই স্টাইলিং ধারণাও। ফিরে দেখা যাক একটি আইকনিং সিনেমার দৃশ্য; যখন ছিল না এআইয়ের কোনো নামগন্ধ। ১৯৯৫ সালের মার্কিন সিনেমা ‘ক্লুলেস’। প্রধান চরিত্র শেহ পুরোদস্তুর ফ্যাশনিস্তা। প্রথম দৃশ্যে স্কুলের জন্য তৈরি হচ্ছে সে। পারফেক্ট আউটফিটের খোঁজে কম্পিউটারে একটি স্টাইলিং সফটওয়্যার ব্যবহার করতে দেখা যায় তাকে। একের পর এক টপসের সঙ্গে স্কার্ট মিলিয়ে দিচ্ছে সফটওয়্যারটি। স্টাইল পছন্দ করে ‘ড্রেস মি’ বাটন চাপলে ভার্চুয়ালি পুরো পোশাক পরিয়ে, দেখিয়ে দিচ্ছে লুক। অর্থাৎ, কোন পোশাকে কেমন দেখাবে, তা আগেই বুঝে নিয়ে তৈরি হওয়া। ৩১ বছর আগের এই সিনেমায় দেখানো পুরো ব্যাপারটাই ছিল কাল্পনিক। এমন কোনো সফটওয়্যার তখন ছিল না; কিন্তু এখন আছে।
সেই সময় থেকে এই সময়। অভিজাত মহল থেকে ফ্যাশনকে মুক্তি দিয়েছে এআই। করেছে গণতান্ত্রিক। দেশ, জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে হচ্ছে এআইয়ের স্বাধীন ব্যবহার। সহজ হয়েছে নানামুখী ফ্যাশন প্রয়াস। বৈশ্বিক ফ্যাশন আঙিনায় জায়গা করে নিয়েছে ব্যক্তিগত পছন্দ ও সংস্কৃতি। যেখানে জাঁকজমক নয়, বরং ডে টু ডে পোশাকই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেটিই ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। পরিবর্তন নয়, পরিবর্ধন। যেখানে থাকবে বিশ্বের প্রায় সাড়ে ৮ বিলিয়ন মানুষের পোশাকের স্বাচ্ছন্দ্য। সমান গুরুত্ব পাবে প্রত্যেকের পছন্দ। সেই সূত্রে বিশ্ব ফ্যাশনে স্থান পেয়েছে মডেস্ট ক্লদিং।
শুনতে মধ্যপ্রাচীয় এবং ইসলামিক ধাঁচ মনে হয়। ইতিহাস বলে, শুরুটা অটোমান সাম্রাজ্যে—মিসর, গ্রিস ও রোমে। ২০০০ সালে প্রথমবার দেখা গিয়েছিল মডার্ন মডেস্ট; বিস্তার ঘটে ২০১০-এ। তারপর শুধুই এগিয়ে যাওয়া। নানাভাবে, নানা নকশায়। দেশ-জাতি-ধর্মনির্বিশেষে দেখা যায় মডেস্ট ফ্যাশনের চাহিদা। একেক সংস্কৃতিতে বিষয়টির সংজ্ঞাও একেক রকম। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বোরকা, অন্যদিকে জাপানের কিমোনো; আফ্রিকার লম্বাটে রঙিন পোশাক বুবু, হেড পিস জালাবিয়াস ও হেয়ার কাভারিং ক্লদিং পিস জেলা। ধর্মভেদেও আছে মডেস্ট ক্লদিংয়ের নানা নিয়ম। ফ্যাশনের এই ধারায় ব্যক্তিগত স্বচ্ছন্দ ছাড়াও দেখা মেলে জাতিগত সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চা। আছে আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রভাব। ফল—আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। মডেস্ট ক্লদিং লাইন চালু করছে ডিওর, গুচি, নাইকি, ডলশে অ্যান্ড গ্যাবানার মতো আন্তর্জাতিক লাক্সারি ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোও। মডেস্ট সংগ্রহে রাখছে স্কার্ফ, হিজাব, ম্যাক্সি ড্রেস, ফ্লোয়ি সিলুয়েট, টিউনিক ও শ্রাগ। নিচ্ছে ফরমায়েশ। কগনিটিভ মার্কেট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, গেল বছর মডেস্ট পোশাকের বৈশ্বিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০৩৩ সালের মধ্যে তা সম্ভবত ৩৭৫ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
এআই মডেস্টি
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফ্যাশনিস্তাদের প্রিয় টুল হয়ে উঠেছে এআই। যেন তাদের পারসোনাল স্টাইলিস্ট খুঁজে পাওয়া গেল! আর সেখানে মডেস্ট ফ্যাশন এআই টুল আলাদা করে বিশেষ হয়ে উঠেছে ক্রেতা চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে। ফ্যাশন রাইটারদের লেখায় পাওয়া যায় এ নিয়ে অভিজ্ঞতা। রাইটিং প্ল্যাটফর্ম মিডিয়ায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন অনেকে। সেখান থেকে জানা যায়, একজন খেয়াল করেছেন মডেস্ট শব্দটি নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ভোগে রেগুলার এআই। কোন ধরনের মডেস্ট পোশাক, তা বোঝাতে হচ্ছে পোশাকের ছবি দিয়ে। তার মতে, ইন্টারনেটে মডেস্টির নানা সংজ্ঞা থাকায় এমন অভিজ্ঞতা হতে পারে। কারণ, একেক দেশে এই ফ্যাশন কোর একেক রকম। আছে জাতিগত ও ধর্মীয় পার্থক্য। প্রায়ই এ পার্থক্যগুলো ধরতে পারে না এআই। তাই কী খুঁজছেন, তা নিয়ে নিশ্চিত না হলে ফ্যাশনের জন্য এআই ব্যবহার করা কঠিন।
গুরুত্ব পেয়েছে সমস্যাটি। কারণ, মডেস্ট পোশাকের বিস্তৃত বাজার। জনপ্রিয় স্টাইলিং সফটওয়্যারগুলোতে আলাদাভাবে যোগ করা হয়েছে মডেস্ট ক্লদিং অপশন। তৈরি করা হয়েছে শুধু মডেস্ট ফ্যাশনের জন্য বরাদ্দ সফটওয়্যারও। জর্ডানের নারীদের ব্যবহৃত জনপ্রিয় মডেস্ট ফ্যাশন অ্যাপ থাকিবাহ। কানাডার কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম নারীরা ব্যবহার করছেন জানুবিয়া। ভারতে আছে শিভায়া। ব্যবহারকারীর উচ্চতা, ত্বক এবং চুলের রং থেকে শুরু করে নানা শারীরিক বৈশিষ্ট্য যাচাই করে এআই স্টাইলিং। আমলে নেয় সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিগত পছন্দ। তারপর দেয় ফ্যাশন পরামর্শ। কোনোটি আবার স্ক্যান করে নেয় পুরো আলমারি। ১০টি পোশাক থাকলে মিক্স অ্যান্ড ম্যাচের মাধ্যমে তৈরি করে দিতে পারে অন্তত ৩০টি আউটফিট কম্বিনেশন। মিনিমালে ম্যাক্সিমাম প্রাপ্তি একেই বলে। তৈরি করতে পারে ক্যাপসুল ওয়্যারড্রোবও। যেখানে অল্পেই পূর্ণতা পায় ফ্যাশন। এতে বাড়তি পোশাক কেনার চাপ কমে। নিশ্চিত হয় প্রতিটি পোশাকের টেকসই ব্যবহার। অতিরিক্ত পোশাকবর্জ্য থেকে রক্ষা পায় পরিবেশ।
বর্তমান ফ্যাশন চিন্তাশীল। হাঁটছে অন্তর্ভুক্তির পথে। মডেস্ট ফ্যাশন-সম্পর্কিত জল্পনাকল্পনা তারই প্রতিফলন। অন্য সব ফ্যাশন ধারার মতো মডেস্ট ফ্যাশনকেও মূল ধারায় যুক্ত করেছে এআই। ইন্ডাস্ট্রি প্রজেকশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এআইভিত্তিক মডেস্ট ফ্যাশন অ্যাপ ব্যবহার করবে বিশ্বের ২৫০ মিলিয়নের বেশি নারী।
ফ্যাশন ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট
