ত্বকতত্ত্ব I ঋতুযোগ ঋদ্ধ
হরমোনের সঙ্গে ত্বকের সম্পর্ক ধারাবাহিক। অবিচ্ছেদ্য বলা চলে। হরমোন যা চায়, তা-ই ঘটে ত্বকে। মাসজুড়ে হরমোনজনিত নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় নারীদের। শরীরের ভেতরের এই অবস্থার সঙ্গে বাইরের যত্নের তালে তাল মেলানোতেই আনন্দ। সাইকেল কনসাস স্কিন কেয়ার তাই চর্চায়
মানবদেহের পুরোটা জুড়ে ত্বক আর ভেতরে হরমোনের উপস্থিতি। মাসিক চক্রের প্রতিটি ধাপে বদলে যায় হরমোনের পরিস্থিতি। মন থেকে ত্বক—সবেতে দেখা দেয় এর প্রভাব। কখনো তেলতেলে ত্বক, কখনো আবার খসখসে। ব্রণ, পোরস, লালচে ভাব, মলিনতা, সংবেদনশীলতা—সব আসে ঘুরেফিরে। হরমোন যেহেতু মাস্ট, তাই স্কিন কেয়ার জাস্ট না হয়ে প্ল্যানড হওয়াই শ্রেয়। তাতে কার্যকরী হবে সব চেষ্টা।
এন্ডোক্রাইন গ্রন্থি থেকে হরমোনের উৎপত্তি। রক্তের সঙ্গে প্রবাহিত রাসায়নিক বার্তাবাহক; সংকেত পাঠায় শরীরের বিভিন্ন অংশে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও টিস্যুগুলোর আচরণ কেমন হবে, তা বাতলে দেয়। পুরুষের তুলনায় নারীদেহের হরমোন জটিলতা তুলনামূলক বেশি। পুরো মাসকে বিভক্ত করা যায় কয়েকটি ভাগে—পিরিয়ড, ফলিকুলার, ওভিউলেশন ও লুটিয়াল ফেজ। এসবে নিয়ন্ত্রিত হয় ত্বকের স্বাস্থ্য, সুন্দরতা।
ইনার উইন্টার
ঋতুস্রাব শুরুর দিন থেকে পরবর্তী পাঁচ দিন। এ সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা কমে যায়। ফলে ত্বক নিস্তেজ, শুষ্ক এবং কখনো কখনো স্পর্শে সংবেদনশীল মনে হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে ব্রণ। কারণ, অ্যান্ড্রোজেন তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় হয়ে তেল উৎপাদন করতে থাকে। এই তেল ত্বকের রোমকূপে আটকে প্রদাহ তৈরি করতে পারে। কারও ত্বক হয়ে পড়ে ভীষণ শুষ্ক। মলিন দেখায়। সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। শরীরে অসুস্থতাবোধ তৈরি হয়। সঙ্গী হয় মানসিক যন্ত্রণাও। সৌন্দর্যে সায় দেয় না আয়না।
এ সময় বাড়তি নয়; সামান্য যত্নেই ভালো থাকে ত্বক। ব্রণ ঠেকাতে ত্বক পরিষ্কার রাখা জরুরি। খেয়াল রাখা চাই হাইড্রেশনের দিকেও। মুখ ধোয়ার পর একটি জেন্টল ময়শ্চরাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে নিয়মিত। প্রদাহ রোধকারী সুদিং কোনো ফেস মাস্কও রাখা যেতে পারে। এতে ত্বক শান্তি পাবে।
ইনার স্প্রিং
পিরিয়ড-পরবর্তী ৬ থেকে ১৩ দিন। এ সময় ডিম্বস্ফোটনের প্রস্তুতি নেয় গর্ভাশয়। বাড়ে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা। প্রোজেস্টেরন কমে যায়। এতে কোলাজেন উৎপাদন বাড়ে। শুষ্ক ও মলিন ত্বক ফিরে পায় আর্দ্রতা। ঋতুস্রাব চলাকালীন ক্লান্তি কাটিয়ে শরীরের সঙ্গে ত্বকও হয়ে ওঠে সুস্থ। ভেতর থেকে কমে আসে প্রদাহ। আগের চেয়ে উজ্জ্বল, টানটান ও স্থিতিস্থাপক দেখায়। তৈলাক্ততা কমে। ফলে কমে যায় ব্রণের প্রবণতা। ফিরে আসে ত্বকের স্বাভাবিক গ্লো। দ্রুত নতুন কোষ তৈরি হয়। তাই এক্সফোলিয়েশন পদ্ধতিতে মৃতকোষ দূর করা যেতে পারে এ সময়। এতে ত্বক পরিষ্কার দেখাবে। এ ছাড়া বাড়তি উজ্জ্বলতা চাইলে ব্যবহার করতে পারেন ভালো মানের ক্রিম বা ফেস মাস্ক।
ইনার সামার
মাসিক চক্রের মাঝামাঝি সময়। ১৪ থেকে ১৬তম দিন। কারও ক্ষেত্রে পাঁচ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এই ফেজ। এ সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে ইস্ট্রোজেন। বাড়ে পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন হরমোন লুটিনাইজিং। এতে ওভিউলেশন শুরু হয়। মাসের এ সময়ে সবচেয়ে ভালো থাকে ত্বক। যত্নেও কষ্ট কম হয়। ত্বক দেখায় মসৃণ, টানটান ও উজ্জ্বল। রোমকূপগুলো ছোট দেখাতে পারে। পূর্ণ আর্দ্র অবস্থায় থাকায় ডিউয়ি দেখায় ত্বক। তৈলাক্ত ভাব কমে। দূর হয় ব্রণ। অল্প সময়ের জন্য চলে ওভিউলেশন বা ডিম্বস্ফোটন পর্যায়।
ত্বকের স্বাভাবিক গ্লো ধরে রাখতে হালকা কোনো ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে এ সময়ে। ত্বককে ফ্রি র্যাডিক্যাল থেকে রক্ষা করতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত ক্রিম যোগ করা যেতে পারে। অতিরিক্ত বা ভারী পণ্য দিয়ে ত্বকের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপালে উল্টো হতে পারে ফল। পরিমিতিতেই প্রশান্তি। কারণ, এ সময় এমনিতেই সবচেয়ে সুন্দর অবস্থায় থাকে ত্বক।
ইনার অটাম
নতুন মাসিক চক্র শুরু হওয়ার আগের কয়েকটি দিন। সাধারণত ১৭-২৮ দিন। গর্ভাশয়ে ডিম্বস্ফোটনের পর প্রোজেস্টেরন বাড়ে। গর্ভধারণ না হলে পরে তা আবার কমে আসে। কমে ইস্ট্রোজেনও। প্রোজেস্টেরনের কারণে বাড়তে থাকে ত্বকের তৈলাক্ততা। পোরস বড় দেখায়। সেখানে তেল জমে সৃষ্টি করে ব্রণ। বাড়তে পারে ব্ল্যাক হেডস ও হোয়াইট হেডস। মুখের নিচের দিকে চিবুক ও চোয়ালের আশপাশে প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোমের ফলে ব্রণ দেখা দিতে পারে। ফিরে আসতে পারে প্রদাহ। ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার আগমুহূর্তে সংবেদনশীল হতে পারে ত্বক। এ সময় একটু বাড়তি যত্ন নিতে হয় ত্বকের।
হালকা এবং নন-কমেডোজেনিক ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করলে ব্রণের প্রবণতা কমতে পারে। পোরস বন্ধ করতে পারে—এমন ভারী বা তৈলাক্ত ক্রিম এড়িয়ে চলাই মঙ্গল। ব্যবহার করতে পারেন তৈলাক্ততা রোধকারী ফেস মাস্ক। অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি জেল বা স্যালিসাইলিক অ্যাসিডও বেশ উপকার দেবে। এ সময়ে রুক্ষ রাসায়নিকের উপস্থিতি আছে—এমন ক্রিম ও স্ক্রাব ব্যবহার না করা ভালো। কারণ, ইরিটেশন হতে পারে। ক্লিনজার দিয়ে মৃদু হাতে ত্বক পরিষ্কার করলেই সই।
হরমোনের টানাপোড়েন বুঝতে পারলে অনেকটা সহজ হয়ে যায় ত্বকের যত্ন। সুবিধামতো বানিয়ে নেওয়া যায় স্কিন কেয়ার রুটিন। সঠিক যত্নে নিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে ওঠে ত্বক। ভালো থাকে সব সময়।
আবৃতি আহমেদ
মডেল: তানহা
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
