ফটোস্টোরি I তন্বীর হাত ধরে বেনারসি ও কাতানের নতুন আখ্যান
ডিজাইনার ও আর্টিজানের সম্পর্ক অনেক সময় অদৃশ্য সমঝোতায় আটকে থাকে; যেখানে আর্টিজান যা জানেন, যা বোঝান; ডিজাইনার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা মেনে নেন। সেখানে নতুন প্রশ্ন তোলার, নতুন পথে হাঁটার সাহস খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু সেই স্থির জলে ঢেউ তুলেছেন তন্বী কবির। লিখেছেন শেখ সাইফুর রহমান
তিনি শুধু ডিজাইন করেননি; বরং কথোপকথন শুরু করেছেন আর্টিজানের সঙ্গে। ফলে সুতায়, বুননে, কাপড়ের জমিনে পড়েছে নিরীক্ষার ছাপ। বেনারসি ও কাতান—দুই ঐতিহ্যবাহী বয়নকে আমরা প্রায় অবধারিতভাবে বিয়ের আসরের সঙ্গে যুক্ত করি; তন্বী সেখানে যোগ করেছেন নতুন মাত্রা। ট্র্যাডিশনাল মোটিফের ভান্ডার থেকে নিয়েই তিনি খেলেছেন, কিন্তু খেলার নিয়ম বদলে দিয়ে। তার নিরীক্ষা সবচেয়ে স্পষ্ট সুতায়। সিল্কের সঙ্গে সুতি সুতা মিশিয়ে তৈরি করেছেন হাফসিল্ক বেনারসি; সেখানে মিনা করা হয়েছে প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো সুতায়। ফলে কাপড়ের শরীরে এসেছে বুননের নতুন ভাষা।
এখানেই থেমে না থেকে বেনারসি বা কাতানকে শাড়ির বৃত্ত থেকে বের করেছেন। নিজের পরিকল্পিত লে-আউট অনুযায়ী গজ কাপড় বুনিয়ে সেই কাপড়কে রূপ দিয়েছেন নানা পোশাকে—লেহেঙ্গা, ব্লেজার, লং কোট, স্কার্ট, শেরওয়ানি, এমনকি ওভারকোটও। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে এসেছে অনুষঙ্গ—জুতা, টাই, পকেট স্কয়ার। তার ব্র্যান্ড ‘ক্যানভাস’ তৈরি করছে এসব পোশাক। আর অনুষঙ্গের জন্য তিনি আলাদা একটি সাব-ব্র্যান্ডও চালু করেছেন। নাম দিয়েছেন জ্যাকার্ড।
আমাদের সামাজিক অভ্যাসে বেনারসি ও কাতান যেন প্রায় একরকম বন্দি—বিয়ের অনুষ্ঠানের ঝলমলে আলোয়। তন্বী সেই ঘেরাটোপ ভেঙে দিয়েছেন। এই কাপড়কে তিনি নিয়ে এসেছেন পার্টির পোশাকে, সমকালীন ফ্যাশনের মঞ্চে। বলা যায়, তিনি আমাদের হেরিটেজ টেক্সটাইলকে বৃত্তের বাইরে হাঁটার সাহস দিয়েছেন। অবশ্য তর্কের খাতিরে এই প্রয়াসকে নতুন নয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আগের কাজ ছিল বিক্ষিপ্ত এবং বেশির ভাগেরই পোশাক শাড়ি কেটে তৈরি।
এখানেই তন্বী আলাদা। তিনি শাড়ি কেটে নয়, বরং শুরু থেকে গজ কাপড় বুনিয়েছেন পোশাকের জন্য; অর্থাৎ বয়ন থেকে শুরু হয়েছে তার ভাবনা। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রযুক্তির সূক্ষ্ম প্রয়োগে। ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনার প্রযুক্তির সামান্য অনুঘটনে সেই বয়ন পেয়েছে নতুন বিস্তার। আগে যেখানে সাড়ে তিন ইঞ্চির বেশি ডিজাইন বোনা যেত না এবং একই মোটিফ বারবার পুনরাবৃত্তি করতে হতো, এখন সেখানে অনায়াসে ২২ ইঞ্চি পর্যন্ত ডিজাইন বোনা সম্ভব হচ্ছে।
এই পরিবর্তন তিনি একা আনেননি। বয়নশিল্পীদের সঙ্গে হাত ধরেই এগিয়েছেন। তাদের বোঝাতে পেরেছেন—এই সৃজনের সুফল, এই সম্ভাবনার অংশীদার তারাও। আর তাই, বয়ন দিতে পেরেছে নতুন চমক, নতুন আখ্যান। একেবারে শুরু থেকে এই উদ্যোগের সঙ্গে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাই দেখেছি, কীভাবে একেকটি পদক্ষেপ ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তনকে সূচিত করে। তন্বী কবিরের এই প্রয়াস শুধু নকশার সাফল্য নয়; এটা একধরনের সাংস্কৃতিক পুনরাবিষ্কার। সেই অর্থে, তার কাজ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
মডেল: তানহা, তুবা, তাজরিয়ান, মাহেলেকা ও আরহাম
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব ও জুয়েলারি: ক্যানভাস বাই তন্বী কবির
ছবি: জিয়া উদ্দীন
