ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন I পিরিয়ড প্রুফ
মাসিকের সময় স্বস্তি মিলবে পোশাকে। নিশ্চিত হবে স্বাস্থ্যসুরক্ষা। থাকবে স্টাইলও। স্বচ্ছন্দে কেটে যাবে মাসের এই কয়েকটি দিন। চর্চা চলছে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মহলে। ধারার নাম পিরিয়ড-ফ্রেন্ডলি
ঋতুস্রাবের সময় নারীদের অস্বস্তিগুলোকে স্বস্তিতে বদলে দেওয়ার চেষ্টা। এমন পোশাক কিংবা অনুষঙ্গ, যা একই সঙ্গে নিরাপদ ও আরামদায়ক। অর্থাৎ সম্পূর্ণ পিরিয়ড প্রুফ। শুরুতে শুধু ব্যবহারিক নিশ্চয়তা থাকলেও আজকাল এ ধারার ফ্যাশনে গুরুত্ব পাচ্ছে স্টাইলও। ডিজাইনাররাও মন দিয়েছেন এতে। পোশাক ও অনুষঙ্গগুলো মাসিকবান্ধবের পাশাপাশি হয়ে উঠছে স্টাইলিশও।
কিছুটা বিজ্ঞান আর অনেকটুকু মনস্তত্ত্ব—দুইয়ে মিলে নারীদের এ বিশেষ স্বাস্থ্যগত সময়কে সহজ করেছে একের পর এক উদ্ভাবন। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সেগমেন্ট পিরিয়ড প্রুফ অন্তর্বাস। মার্কিন হেলথ কেয়ার প্ল্যাটফর্ম ওয়েবএমডির তথ্যমতে, ঋতুস্রাব ঘিরে অনেক ধরনের পণ্য আছে। তবে সবচেয়ে দরকারি পণ্যটি খুঁজতে গেলে প্রথমে মাথায় আসে অন্তর্বাসের কথা। এ সময় প্রয়োজন তীব্র শোষণক্ষমতাসম্পন্ন কাপড়ের অন্তর্বাস। সাধারণত মাইক্রোফাইবার পলিয়েস্টার কাপড় দিয়ে বানানো হয় পিরিয়ড প্রুফ প্যান্টিগুলো। দেখতে সাধারণ অন্তর্বাসের মতোই; তবে ভেতরে সেলাই করে জুড়ে দেওয়া হয় কাপড়ের একাধিক স্তর। হাজার হাজার ক্ষুদ্র ফিলামেন্ট ফাইবার দিয়ে তৈরি এই বিশেষ কাপড়।
প্যান্টির বাইরের স্তরে সাধারণত নাইলন কাপড়ের তরল-প্রতিরোধী স্তর থাকে। এটি মাসিকের রক্তের পাশাপাশি শোষণ করে নেয় ত্বকের বাহ্যিক আর্দ্রতাও। ফলে সম্পূর্ণ লিক প্রুফ হয়ে থাকে এই অন্তর্বাসগুলো। আরামসে কেটে যেতে পারে কয়েক ঘণ্টা। সুরক্ষা দেয় বাতাসের দূষণ থেকেও।
অনেক সময় পিরিয়ড প্যান্টি ব্যবহার করলে আলাদাভাবে স্যানিটারি প্যাড বা ট্যাম্পন ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। তাই মাসিকের সময় প্যাডের পরিবর্তে এ ধরনের অন্তর্বাস ব্যবহার করেন অনেকে। বেঁচে যেতে পারে মাসে মাসে প্যাড অথবা ট্যাম্পন কেনার খরচ। আরেকটি অপশন হচ্ছে মেনস্ট্রুয়াল কাপ, যা ব্যবহারে অনেকের অস্বস্তি। এগুলোর পরিবর্তে ব্যবহার করা যেতে পারে পিরিয়ড প্যান্টি। অন্যান্য কাপড়ের মতোই ধুয়ে নিয়ে বারবার ব্যবহারযোগ্য।
তা ছাড়া একবার ব্যবহারের পর স্যানিটারি প্যাড বা ট্যাম্পন ফেলে দিতে হয়। এগুলো মাটির সঙ্গে মেশে না, সহজে ক্ষয়ও হয় না। ফলে দূষিত হয় মাটি ও পানি। পচে দুর্গন্ধ ছড়ায় বাতাসে। অতএব দুটির একটিও পরিবেশবান্ধব নয়। তবু নারীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষায় এর ব্যবহার অনিবার্য। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী নারীদের ঋতুস্রাবের সময় ব্যবহৃত প্যাড, ট্যাম্পন ও কাপড় মিলিয়ে বছরে ২ লাখ টনের বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হয়। ফেলে দেওয়া একটি প্যাড পচতে সময় লাগে ৪৫০ থেকে ৮০০ বছর! তাই এ ক্ষেত্রে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব বিকল্পের জুড়ি নেই।
পরিবেশের সঙ্গে এই ধারায় গুরুত্ব পেয়েছে পরিস্থিতিও। মাসিকের সময় স্বাাভাবিক কাজকর্ম অব্যাহত রাখার সুবিধার্থে নকশা করা হয়েছে পোশাক। আরামদায়ক এবং সম্পূর্ণ লিক প্রুফ। যেমন পিরিয়ড প্রুফ লেগিংস। সকালে হাঁটতে বা দৌড়াতে যাওয়া, জিমে গিয়ে শরীরচর্চা, কিংবা যেকোনো দৈনন্দিন কাজ, লেগিংসগুলোতে দাগ লাগার শঙ্কা নেই। আপস করতে হবে না স্টাইলের সঙ্গেও।
নব্য ফ্যাশন ট্রেন্ড্র অ্যাথলেইজারেও গুরুত্ব পেয়েছে পিরিয়ড প্রুফ কোদিং। এ ধারায় অ্যাথলেট বা ক্রীড়াবিদদের জন্য ফ্যাশনেবল পোশাক তৈরি করা হয়। একসঙ্গে নিশ্চিত করা হয় কমফোর্ট ও স্টাইল। এ ধরনের পোশাককে বলে অ্যাকটিভওয়্যার। লুলুলেমন, নাইকি, জিমশার্কসহ বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের তৈরি লেগিংস, জগার, হুডি, স্নিকার্স উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মাসিকের কারণে নারীদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হওয়া রোধে পিরিয়ড প্রুফ ক্লোদিং তৈরি করে ব্র্যান্ডগুলো। বিশেষ লিক প্রুফ কাপড়ে তৈরি এই পোশাকগুলো যেমন আরামদায়ক, তেমনই স্টাইলিশ। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নারী অ্যাথলেটদের পরনেও দেখা যায় পিরিয়ড প্রুফ পোশাক। এমনকি সাঁতারের পোশাকেও মিলছে এমন অপশন। ঋতুস্রাবের সময় ট্যাম্পন বা মেনস্ট্রুয়াল কাপ ছাড়াই পানিতে নামা যাবে এসব পোশাকে।
মাসিকের সময় পূর্ণ সুরক্ষার সঙ্গে সমন্বয় ঘটবে স্টাইলের। অফিসে, ক্লাসে কিংবা জিমে নিরবচ্ছিন্ন থাকবে সারা দিনের ব্যস্ততা। নিজেকে হারিয়ে ফেলা নয়; বরং বজায় থাকবে ব্যক্তিগত স্টাইলচর্চা। তবে সাবধানের মার নেই! আরামের সঙ্গে স্টাইল নিশ্চিত করতে পারে পোশাকের লেয়ারিং। পিরিয়ড প্রুফ অন্তর্বাসের ওপর সাধারণ পোশাকের সঙ্গে পরতে পারেন একটি স্টাইলিশ শ্রাগ অথবা টিউনিক। স্টাইলিশ দেখাবে। নিশ্চিন্ত থাকা যাবে দিনভর। ওয়ার্কআউট বা অ্যাথলেইজার লুকের জন্য পরতে পারেন লিক প্রুফ লেগিংস। ওভারসাইজড হুডি বা ফিটেড ক্রপ টপের সঙ্গে মানাবে বেশ। আর মাসিকের সময় মানসিকভাবে মিইয়ে যান যারা, কমিয়ে ফেলেন সাজ, অনুষঙ্গ নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন, নিজের স্বাভাবিক সাজ ধরা তাদের পক্ষেও সম্ভব। কারণ কথায় আছে, ‘ফেইক ইট টিল ইউ মেইক ইট’। এ সূত্রে ফিরে আসতে পারে স্বাভাবিক মনোবল। পরতে পারেন নিজের সবচেয়ে সুন্দর স্কার্ফ, প্রিয় নেকলেস কিংবা ঝলমলে এক জোড়া কানের দুল। এতে নিজেকে আয়নায় দেখেই ভালো হবে মন। দিনগুলোও কেটে যাবে স্বস্তিতে।
বৈশ্বিক বাজারে পিরিয়ড প্রুফ ক্লদিংয়ের চাহিদা বাড়ছে। গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের তথ্যমতে, গত বছর শুধু পিরিয়ড প্যান্টির বাজারের আকার ছিল ১৫৭ দশমিক শূন্য ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০৩৩ সালের মধ্যে ২১ দশমিক ১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হয়। সে অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে পিরিয়ড প্রুফ ক্লদিং ইন্ডাস্ট্রির আয়তন গিয়ে ঠেকবে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
ফ্যাশন ডেস্ক
ছবি: ইন্টারনেট
