skip to Main Content

বিশেষ ফিচার I বাংলাদেশ টু ইন্টারন্যাশনাল রানওয়ে

ট্র্যাডিশনাল বিউটি কনটেস্ট আর আধুনিক বিউটি পেজেন্ট—দুইয়ের পার্থক্য সময়ের বিবর্তনের গল্প। মুকুট আজ শুধু অলংকার নয়; দায়িত্ব, প্রতিনিধিত্ব ও সম্ভাবনার প্রতীক। আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগী তার দেশ, সংস্কৃতি ও সমাজের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। অভিজ্ঞতার আলোকে সেই রোমাঞ্চ তুলে ধরলেন শীর্ষস্থানীয় কোরিওগ্রাফার এবং আজরা মাহমুদ ট্যালেন্ট ক্যাম্পের প্রতিষ্ঠাতা আজরা মাহমুদ

ট্র্যাডিশনাল বিউটি কনটেস্ট আর বিউটি পেজেন্ট কি এক? না। একটির চেয়ে অপরটি ভিন্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে মূলভাব। বর্তমানে বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগ, মানসিক দৃঢ়তা এবং স্বতঃস্ফূর্ততা—এই গুণাবলিই বেশি গুরুত্ব পায়। মুকুট এখন আর নিখুঁত সুন্দরতার জন্য নয়; দেওয়া হয় পরিপূর্ণ মানসিকতার প্রতিযোগীকে। যার আলোয় আলোকিত হতে পারে বিশ্ব। যার চিন্তা, চেতনা, দর্শন আর যুক্তি এগিয়ে নিতে পারে সমাজকে।
প্রস্তুতি পর্ব
বিশ্বমঞ্চ সব সময় প্রতিযোগীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। ভিন্ন দেশ-সংস্কৃতি-দর্শন নিয়ে বিভিন্নজন হাজির হন এক প্ল্যাটফর্মে। তাই সেখানকার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ওঠার আগে একজন প্রতিযোগী তিনটি বিষয়ে জোর দিতে পারেন। তাতে প্রস্তুতি শক্তিশালী হবে।
 মানসিকভাবে অটল থাকা চাই। সমালোচনা আসবে, তুলনা হবে। আপনি যদি নিজেকে না চেনেন, পৃথিবী আপনাকে তাদের মতো সংজ্ঞায়িত করবে। তাই আত্মবিশ্বাসের কোনো বিকল্প নেই এখানে। নিজেকে যেমন জানতে হবে পুরোটা, তেমনি স্বতন্ত্রতার চর্চা করাও শ্রেয়।
 শারীরিক সুস্থতা অতি গুরুত্বপূর্ণ। এর মানেই এই নয় যে জিরো ফিগার পেতে সাধনা করতে হবে দীর্ঘ দিবস-দীর্ঘ রজনী; বরং নিজের সুস্থ থাকাকে দেওয়া চাই গুরুত্ব। কারণ, পেজেন্ট মানেই সাধনা। সেখানে সুস্থতা জরুরি। স্ট্যামিনা, সঠিক ভঙ্গিমা ও শৃঙ্খলা গড়ে তোলার বিষয়ে মনোযোগী হওয়া জরুরি।
 পেশাগতভাবে যোগাযোগ দক্ষতা, মিডিয়া ট্রেনিং, বৈশ্বিক সচেতনতা ও ব্র্যান্ডিং বোঝা অপরিহার্য। কেননা, একটি মুকুট এক রাতে জেতা যায় না; এটি বছরের পর বছর চেষ্টায় সম্ভব হতে পারে।
দক্ষতার সখ্য
পেজেন্ট আগ্রহীদের তৈরির জন্য আজরা মাহমুদ ট্যালেন্ট ক্যাম্প নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। একজন তরুণ প্রতিযোগীর সঙ্গী হিসেবে কাজ করি আমরা; যাতে তিনি প্রতিটি ধাপেই অভিজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ পেয়ে আরও তৈরি হতে পারেন। গ্রুমিং, কমিউনিকেশন, কনফিডেন্স, স্টেজ প্রেজেন্সসহ সব বিষয়ে গাইডলাইন থাকে আমাদের। একই সঙ্গে দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্পর্কেও দক্ষ করে তোলা হয়। এই ক্যাম্পে প্রতিটি কোর্স আলাদা। তবে পেজেন্ট্রি কোর্সে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিই—যোগাযোগ, স্পষ্ট উচ্চারণ, স্টেজ প্রেজেন্স ও ভঙ্গিমা, আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা, সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তা, মিডিয়া হ্যান্ডলিং এবং মানসিক দৃঢ়তা বিষয়ে। এভাবে কোর্সটি সাজানোর পেছনে একটি যুক্তি রয়েছে। যখন একজন বাংলাদেশি তরুণী বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ান, তিনি শুধু নিজেকে উপস্থাপন করেন না; দেশের সকল জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন। আত্মবিশ্বাস তাই তার অলংকার। সেখানেই তার সাহস।
ভাব প্রকাশ
আন্তর্জাতিক যেকোনো আয়োজনে যোগাযোগ নিয়ে প্রতিযোগীরা দুশ্চিন্তায় ভোগেন। কারণ, বেশির ভাগ আয়োজনেই ইংরেজিতে কথা বলতে শোনা যায়। সত্যি হচ্ছে, সকল মানুষ বুঝতে পারে—এমন ভাষাই গ্রহণযোগ্য মনে করে বেশির ভাগ কমিটি। কারণ, আপনি যদি নিজের ভাবনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে না পারেন, বিশ্ব আপনার গভীরতা বুঝতে পারবে না। ইংরেজিতে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারা মানে স্পষ্টতা অর্জন করা। গ্লোবাল এটিকেট ও মিডিয়া ট্রেনিং তাই খুব জরুরি; কারণ, একটি ভুল বাক্য দীর্ঘ প্রস্তুতিকে ছাপিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে শতভাগ প্রকাশই সবকিছু।
বিচারক বিশেষ
অনেকে মনে করেন, পেজেন্ট মানে শুধুই সৌন্দর্য পরিমাপ। অথচ আদতে তা নয়। আজকের আন্তর্জাতিক জুরিবোর্ড মূল্যায়ন করেন আরও বেশ কিছু বিষয়ে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বলা যেতে পারে প্রতিটি পর্বে তার মেধার ধারাবাহিক প্রকাশ—চাপের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা, স্বতঃস্ফূর্ততা, সামাজিক কাজ ও অ্যাডভোকেসি, নেতৃত্বের গুণ এবং বিশ্ববাজারের জন্য উপযুক্ত বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি। একটি পেজেন্ট কোনোভাবেই শুধু আকর্ষণীয় নকশার গাউনে সবচেয়ে সুন্দর কাকে দেখাচ্ছে—তা নয়; বরং কে পুরো এক বছর একটি বৈশ্বিক উপাধি দায়িত্বশীলভাবে বহন করতে পারবেন, সেটি নিয়েই ভেবে থাকে।
শিকড়েই স্বাতন্ত্র্য
সাংস্কৃতিক পরিচয় আপনার শক্তি; কেবল পোশাক নয়। আমরা বাংলাদেশি হিসেবে স্টেরিওটাইপ দিয়ে নয়; আমাদের ঐতিহ্যকে গভীরতার সঙ্গে তুলে ধরতে পারি। যেকোনো একটি পর্বে তাই শাড়ি পরুন, অবশ্যই। কিন্তু যেকোনোটি কোনোভাবেই নয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের শাড়িই হোক প্রথম পছন্দ। যেখানে উপস্থিত আমাদের কারিগর, সংগ্রাম ও গল্প। হাজার বছরের জমকালো ঐতিহ্য। সঙ্গে মিশে যেতে পারে আধুনিকতা। তবে কোনোভাবেই নিজস্বতার বাইরের কিছু নয়।
কিছু বিষাদ হোক পাখি
বিদেশে বাংলাদেশি প্রতিযোগীরা একদমই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন না, বিষয়টি এমন নয়। শুধু প্রতিযোগীরাই নয়, জাতীয় পরিচালকেরা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের আগেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে থাকেন। এর মূল কারণ হিসেবে আমি চারটি বিষয়কে মনে করি—অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, সীমিত এক্সপোজার, রক্ষণশীল মানসিকতা এবং কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণের অভাব।
আমি যখন মডেল হিসেবে যাত্রা শুরু করি, কোনো রোডম্যাপ ছিল না। নিজেকে নিজেরই তৈরি করতে হয়েছে। অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝেছি, সঠিক প্রশিক্ষণ অনিরাপত্তাকে প্রস্তুতিতে রূপান্তর করে। আর প্রস্তুতি ভয় দূর করে। আশা করি, দ্রুতই আমরা এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারব। বিষাদ হবে বিলীন।
সাপোর্ট সিস্টেম
আমাদের প্রয়োজন করপোরেট স্পনসরশিপ, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, পেশাদার গ্রুমিং একাডেমি, মিডিয়া সাপোর্ট এবং পারিবারিক উৎসাহ। কারণ, একটি মুকুট কখনো একা জেতা যায় না; এটি সমষ্টিগত প্রচেষ্টার ফল। আমাদের দেশে অনেকে থাকেন, যারা উৎসাহী। কিন্তু শৈশব থেকেই তারা সাহস হারিয়ে ফেলেন। স্বপ্ন ভেঙে যায় তাদের। তাই যে মেয়েকে বলা হয়েছে তিনি বেশি শ্যামলা, বেশি সাহসী কিংবা বেশি উচ্চাকাক্সক্ষী; তাদের বলতে চাই, আপনার ভিন্নতাই আপনার স্বাতন্ত্র্য। আর পরিবারগুলোর প্রতি অনুরোধ, আপনার কন্যাদের পাশে থাকুন। ঘরের ভেতরের আত্মবিশ্বাসই বাইরের পৃথিবীতে তাকে মুকুট এনে দিতে পারে। জয় করতে পারে বিশ্ব।
বিউটি পেজেন্ট ও বাংলাদেশি ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি
আন্তর্জাতিক বিউটি পেজেন্টের জন্য সহায়ক হতে পারে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিও। আবার ভাইস ভার্সা। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে বিউটি প্যাজেন্টে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ। আবার যারা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে পেজেন্টের জন্য প্রস্তুত হন, তাদের জন্যও খানিকটা সুবিধা হয় বলে আমার মনে হয়েছে। এখানে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা পেয়েছি। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের সুবাদে পেজেন্ট পরিচালনা সম্পর্কে জ্ঞান যেমন ছিল, এর পেছনে কীভাবে শ্রম দেওয়া হয়, তা-ও বুঝতে পেরেছিলাম।
ডিজাইনারদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতির সুযোগ মেলে। সেখানে তারা প্রতিযোগীদের পরিচয় গড়ে দেন। একজন প্রতিযোগী যখন বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরেন, তখন তাঁতি, কারিগর ও স্থানীয় ব্র্যান্ড—সবারই উপকার হয়। ফ্যাশন ও পেজেন্ট আলাদা শিল্প নয়; দুটিই গল্প বলার শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম, যা একে অপরকে সমর্থন করতে পারে।
বিউটি পেজেন্ট ব্যক্তিগত অর্জনের যাত্রা নয়; সমষ্টিগত সৃজনশীলতার প্রকাশ। সঠিক প্রস্তুতি, সমর্থন ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে এই মঞ্চ হতে পারে বাংলাদেশের ফ্যাশন ও সংস্কৃতির এক খোলা জানালা।

ছবি: সংগ্রহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top