skip to Main Content

টেকসহি I বসনে বর্ম

সম্ভাব্য বিপদ থেকে সুরক্ষা দেবে পোশাক। বাঁচাবে পকেটমারের হাত থেকে! রক্ষা করবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। বিশ্বজুড়ে চলছে এমনই এক হাই-ফ্যাশন ট্রেন্ড। আবৃতি আহমেদ জানাচ্ছেন বিস্তারিত

বৈশ্বিক ফ্যাশনের নতুন সংযোজন গার্ডিয়ান ডিজাইন। এ বছরের অন্যতম আলোচিত ম্যাক্রো ট্রেন্ডগুলোর অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে চলছে এ ধারার সরব প্রচার। বিষয়টি চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড ফোরকাস্টিং কোম্পানি ওয়ার্থ গ্লোবাল স্টাইল নেটওয়ার্ক (ডব্লিউজিএসএন)। প্রতিষ্ঠানটির হেড অব উইমেনসওয়্যার সারা ম্যাগিওনির মতে, জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। তাই ফ্যাশনেও যুক্ত হচ্ছে সতর্কতা ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা।
সত্যিই তা-ই! রাস্তায় হাঁটার সময় কিংবা মানুষে উপচে পড়া বাসে একটু পরপর পকেট চাপড়ে নেওয়া, অথবা বারবার ব্যাগের চেইনের দিকে চোখ চলে যাওয়া—এগুলো আজকাল নিত্য ঘটনা। নিজেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টার সূত্র ধরেই গার্ডিয়ান ডিজাইনের উৎপত্তি। অর্থাৎ, সম্ভাব্য বিপদ থেকে সাজপোশাক রক্ষার চেষ্টা। অনেকটা যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকের হাতে থাকা ঢালের মতো। এমন পোশাকে নান্দনিকতা কিছুটা কম থাকলেও বাস্তবিকতায় ভরপুর। হতে পারে আত্মিকও। মোটকথা, যাতে কিছুটা হলেও সহজ হবে জীবন। শহুরে ভিড়ভাট্টায় ব্যক্তিগত জিনিসগুলো পোশাকের ভেতর নিয়ে চলা যাবে নিরাপদে। হারানোর বা চুরির ভয় থাকবে না। অথচ হাতের কাছে রাখা যাবে ফোন, ব্যাংক কার্ড, চাবি, হেডফোনের মতো প্রয়োজনীয় সব পণ্য। এটিই গার্ডিয়ান ডিজাইনের মূল আবহ। এ ধারার ফ্যাশনে পোশাক ও অনুষঙ্গের কাজ ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আলাদা করে ভারী কিছু জুড়ে নয়; বরং পোশাকের স্বাভাবিক নকশার অংশ হিসেবে। এমন সাজপোশাকে প্রকাশিত হয় শক্তি ও আত্মবিশ্বাস। ঠিক যেন যোদ্ধার সাজপোশাক; তবে আক্রমণাত্মক নয়, আত্মরক্ষাই মূল লক্ষ্য।
যোগসূত্রে যোগাযোগ
পোশাকে সুরক্ষার এ ধারণা নতুন নয়। মানুষের জন্য শুরু থেকে পোশাক ছিল একধরনের সুরক্ষামূলক হাতিয়ার। রোদের তাপ, বৃষ্টির পানি, ঝড়-বাতাস, শীতের তীব্রতা, প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতা থেকে যুগে যুগে সুরক্ষা দিয়েছে পরিহিত পোশাক। তারপর সময়ের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়েছে মানুষ। তখন অন্যের আঘাত থেকে রক্ষাকবচের মতো কাজে লেগেছে সাজপোশাক। যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধরত সৈনিকের পরনের শক্ত ধাতব বর্ম, যা ভেদ করতে পারে না ধারালো তলোয়ার। মধ্যযুগের ইউরোপীয় যোদ্ধা থেকে জাপানের সামুরাই—প্রাচীন রোমান ও গ্রিকরাও পরতেন এমন পোশাক। সম্ভাব্য শারীরিক আঘাত থেকে পাওয়া যেত নিরাপত্তা। এ ছাড়া আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে পোশাকের ওপর, কাঁধে, পিঠে, বেল্টে সূর্য, চাঁদ, তারাসহ নানা প্রতীকী ব্যাজ বা ব্রোচ পরতেন অনেকে। ব্যাপারটি নজর না লাগার জন্য শিশুর কপালে কালো টিপ দেওয়ার মতোই। দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সব অশুভ থেকে যেন রক্ষা করবে পোশাক। সেই আবহ থেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত ফ্যাশনের এই কোর। দ্য গার্ডিয়ান ডিজাইন। কৃতিত্ব নব্য ডিজাইনারদের, যাদের কাছে ক্রেতাদের বাস্তবিক চাহিদাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস থেকে নিয়ে পুরোনো ধারণাগুলো জুড়ে দিচ্ছেন আধুনিক ফ্যাশনে। রূপান্তর ঘটছে কাপড়, কাটিং ও স্টাইলে। আজকাল গার্ডিয়ান ডিজাইনের দেখা মিলছে রানওয়ে থেকে স্ট্রিট ফ্যাশনে। হাই-ফ্যাশন হলেও বিশেষ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে কিশোর ও তরুণদের কাছে। পোশাক থেকে অনুষঙ্গ—সবকিছুতে জায়গা করে নিচ্ছে গার্ডিয়ান ডিজাইন।
কোর কাহন
জ্যাকেট, শার্ট বা প্যান্টের ভেতর লুকানো পকেট পুরোনো হলেও গার্ডিয়ান ফ্যাশনের অংশ। সহজে কাটা যাবে না এমন অ্যান্টি-স্ল্যাশ কাপড়ের পোশাক বা ব্যাগ আছে এ ধারায়। যাতে ছুরি-কাঁচির ব্যবহার থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। আরও আছে পোশাকের মধ্যে ইন-বিল্ট ক্যারাবিনার, জ্যাকেটে স্ট্রাকচারাল শোল্ডার, ম্যাক্সিমাম লেয়ারিং, ইউটিলিটি ভেস্ট এবং কার্গো প্যান্ট। গত বছরের লন্ডন ফ্যাশন উইকে একটি কিউর থিম ছিল আরমার। যেখানে দেখা গেছে প্রোটেকটিভ, স্ট্রাকচার্ড ও লেয়ার্ড নকশার পোশাক। র‌্যাম্পে নজর কেড়েছে ব্রেস্টপ্লেট, চেইনমেইল, মেটাল করসেট ও স্কাল্পড সিলুয়েট।
দুই হাত মুক্ত থাকে। আবার ব্যাগও থাকে চোখের সামনে। এ সূত্রেই জনপ্রিয় ক্রসবডি ব্যাগ। নারী-পুরুষ সবার কাছে। ব্যাগের ভেতর রাখা ক্রেডিট কার্ড, পাসপোর্ট কিংবা চাবির গঠন স্ক্যান করে চুরি প্রতিরোধে কার্যকরী আরএফআইডি-ব্লকিং পকেট। হাতের কাছে ফোন রাখার জন্য আছে ফোন স্লিং। শুধু কোমরবন্ধনী হিসেবে নয়; বেল্ট বা হারনেসে অতিরিক্ত হুক ঝুলিয়ে চাবি, আইডি কার্ড ঝোলানোর ব্যবস্থা রাখা হয়। ছোটখাটো প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো হাতের কাছে রাখার জন্য আছে রিসলেট। এই কোরের ব্যাগগুলোতে অনেক গোপন পকেট থাকে। তৈরি হয় অ্যান্টি-থেফট ম্যাটেরিয়ালে। জুতার সোল হয় ভীষণ মজবুত; গোড়ালির জন্য আরামদায়ক। হাই-টেক নকশায় অনেক সময় জুতা বা মোজার ভেতর লুকানো পকেট দেওয়া হয়। সবই ওয়াটারপ্রুফ। গার্ডিয়ান ডিজাইন কোরের পোশাক থেকে অনুষঙ্গ এমনকি স্টাইলিংও হওয়া চাই প্রতিরক্ষামূলক। স্ট্রাকচার্ড ও ফাংশনাল। মিনিমাল নকশায় ম্যাক্সিমাম সুরক্ষা। স্মার্ট ও স্টাইলিশ, সঙ্গে উদ্দেশ্যমূলক। শুধু সুন্দরই দেখায় না; পরিধানকারীকে বাহ্যিক যেকোনো বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখে।
হালের পাল
পরিবর্তিত ফ্যাশন চাহিদার প্রতিফলন গার্ডিয়ান ডিজাইন। বেসিক দেখালেও আদতে তা নয়, এমন কিছু। যা হয়ে ওঠে প্রতিদিনকার সঙ্গী। আবার হতে পারে হাই-ফ্যাশনও। অল্প সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই ফ্যাশন কোর। একে ভবিষ্যৎ ফ্যাশনের স্বরূপ হিসেবে দেখছেন অনেকে। তাই তো উঠতি পথে এই ধারার বাজার। ফিউচার মার্কেট ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সময় থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ব্যাপক হারে বাড়বে প্রোটেকটিভ ক্লদিংয়ের বাজার ও ক্রেতা। আসবে আরও নতুন সংযোজন; যাতে থাকবে বিজ্ঞানসম্মত ফ্যাশনচর্চা। ডেইলি ওয়্যার পোশাকেও দেখা যাবে আগুন ও রাসায়নিক প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য। আসবে হালকা ও স্মার্ট সেন্সরযুক্ত ফ্যাব্রিক। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী এই বাজার ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, যা ২০৩৫ সালে ৬ দশমিক ৮% বার্ষিক বৃদ্ধির হারে ২৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top