skip to Main Content

টেকসহি I সুই-সুতায় সমঝোতা

একসময় হাতে সেলাই মোটেই রোমান্টিক ছিল না। একান্ত ব্যবহারিক, বাধ্যতামূলক ছিল। কখনো কখনো একঘেয়ে। নীরবে, ধৈর্য ধরে, কোনো প্রশংসা বা স্বীকৃতির অপেক্ষা ছাড়াই সুই-সুতার একত্র যাত্রা চলেছে। কেউ একে ট্রেন্ড বলেননি, কেউ দেননি মেইড উইদ লাভ ট্যাগ। সেই অবহেলিত হ্যান্ড স্টিচিংই এখন আলোচনার কেন্দ্রে

মিলেনিয়ালরা প্রশংসা করেছেন, জেন-জিরা করছেন উদ্‌যাপন। ইনস্টাগ্রামে ফ্যাশনপ্রেমীরা পোশাকের দৃশ্যমান সেলাইয়ে জুম করছেন; ব্র্যান্ডগুলো গর্বের সঙ্গে লিখছে হ্যান্ড-ফিনিশড, আর স্লো ফ্যাশন মুভমেন্ট বসিয়েছে টেকসই ভাবনার মূলে। হ্যান্ড স্টিচিং বদলায়নি। চিরায়ততেই সমসাময়িকতার আহ্বান আলিঙ্গন করেছে। আগে হাতে সেলাই ছিল অভাবের ফল—মেশিনের অভাব, সময়ের অভাব, সুযোগের অভাব। আজ তা একেবারে উল্টো; হাতে সেলাই করা মানে সচেতন সিদ্ধান্ত। দ্রুতগতির ট্রেন্ড আর ম্যাস প্রোডাকশনের দুনিয়ায় হাতে সেলাই করা মানে ইচ্ছা করে ধীর হওয়া, সময় নেওয়া। মানবিক স্পর্শ ও অসম্পূর্ণতাকে জায়গা দেওয়া। এই প্রয়োজন থেকে ন্যারেটিভে রূপান্তরই হ্যান্ড স্টিচিংকে সমসাময়িক ফ্যাশনে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
মেইড উইদ লাভ
হ্যান্ড স্টিচিং মানেই যেন এখন মেইড উইদ লাভ। বাজারজাতকরণের উপযুক্ত শব্দমালার মতো শোনালেও এর পেছনে গভীর মনস্তত্ত্ব কাজ করে। হাতে সেলাই মানেই সময় নিয়ে কাজটি সম্পন্ন করা। আর আজকের পৃথিবীতে সময় দেওয়া মানে যত্ন। মেশিন সেলাই যেখানে গতি আর একরকম নিখুঁততার পেছনে ছোটে; সেখানে হাতে সেলাই করা মানে সময় নেওয়া, অনুভব করা, কাপড়ের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা। প্রতিটি সেলাইয়ে থাকে একধরনের ছন্দ। কখনো সামান্য বিচ্যুতিও। একজন পরিধানকারীর কাছে এই মানবিক স্পর্শ আবেগপ্রবণ সম্পর্ক তৈরি করে। এটি আর শুধুই পোশাক থাকে না; হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত ভালোবাসাও।
টেকসই ফ্যাশন মানে আজকাল ভারী ভারী শব্দ! কার্বন ফুটপ্রিন্ট, এথিক্যাল সোর্সিং, কনশাস কনজাম্পশন। কিন্তু হ্যান্ড স্টিচিং টেকসই হয়েছে নীরবে, সূচনালগ্নেই। এতে বৈদ্যুতিক বা জ্বালানি শক্তি খরচ হয় না। দীর্ঘস্থায়িত্ব বেশি। আবার ফ্যাশন বর্জ্য হিসেবেও ঝামেলা পাকায় না। হাতে সেলাই করা জামা সাধারণত ফেলে দেওয়া হয় না। মেরামত করা হয়। নতুনভাবে ব্যবহৃত হয়। আবার প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সুতা ব্যবহার শেষে মিলিয়েও যায় মাটির সঙ্গে। মিলেনিয়ালদের কাছে টেকসই ভাবনা মানে দায়িত্ববোধ, জেন-জির কাছে তা পরিচয় ও মূল্যবোধের অংশ। হ্যান্ড স্টিচিং দুই প্রজন্মের মনের ভাব প্রকাশ করে।
অসম্পূর্ণতাতেই পূর্ণতা
একসময় নিখুঁততাই ছিল বিলাসিতার সংজ্ঞা। এখন অসম্পূর্ণতাই আসল সত্যতা; বিশেষ করে জেন-জি এমন জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়, যেগুলো মানবিক। অসম সেলাই, অনিয়মিত স্পেসিং, দৃশ্যমান গিঁট। এগুলো আর খুঁত নয়; বরং স্বাক্ষর। এআই-জেনারেটেড ইমেজ আর ফ্যাক্টরি-পারফেক্ট ফিনিশের যুগে হাতে সেলাই আমাদের আশ্বস্ত করে। বোঝা যায়, এখানে একজন মানুষ সময় ও শ্রম দিয়েছেন। ফ্যাশন সব সময় সমাজের প্রতিচ্ছবি। আর আজকের সমাজ স্বচ্ছতা, স্বাতন্ত্র্য আর সততাকে গুরুত্ব দেয়। হ্যান্ড স্টিচিং সেই মানসিকতার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে যায়। নিখুঁত হওয়ার ভান করে না; সেটাই এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। আগের প্রজন্মের কাছে হ্যান্ড স্টিচিং ছিল দক্ষতা আর টিকে থাকার উপায়। মিলেনিয়ালদের কাছে তা অর্থবহ নস্টালজিয়া। তারা বড় হয়েছেন মা-খালাদের সেলাই দেখতে দেখতে। মেরামত ও তৈরি করা—এসব ছিল আলগোছে সেরে নেওয়ার কাজ। জেন-জি সেই অভিজ্ঞতা থেকে দূরে থাকলেও আজ সোশ্যাল মিডিয়া, ডু ইট ইওরসেলফ কালচার আর ব্র্যান্ডের হাত ধরে নতুন করে এই শিল্পকে আবিষ্কার করছে।
দর্শন
হাতে সেলাই করা শুধু নান্দনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একধরনের দর্শনও; যা ফাস্ট ফ্যাশনের বিরুদ্ধে শক্তভাবে অবস্থান নিয়েছে। সহজে বাতিলযোগ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ফ্যাশন বর্জ্য কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে নিরন্তর। হাতে সেলাইয়ের জন্য একদম কড়কড়ে নতুন কাপড় আবশ্যক নয়। পুরোনো কাপড়কেও নতুন করে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে এই সৃজনশীল কৌশল। প্রি-লাভড পোশাক আগে থেকে জেনারেশন জেডদের আগ্রহের তালিকায় আছে। হ্যান্ড স্টিচিং আরও ক্যারিশম্যাটিক করে তোলে এমন পোশাককে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল ঘরের ভেতরে, দর্জির দোকানে, কারিগর সমাজে। নতুন হলো স্বীকৃতি; যা অবহেলিত ছিল, তা এখন উদ্‌যাপিত। যা নীরব ছিল, তা এখন উচ্চারিত। হ্যান্ড স্টিচিং আজ নস্টালজিয়া হয়ে নয়; আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফিরে এসেছে। হয়েছে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত, নবরূপে মূল্যায়িত।
প্রাসঙ্গিকতা
হ্যান্ড স্টিচিং আধুনিকতাকে অস্বীকার করে না; বরং তার ভেতরেই অর্থ খোঁজে। এটি মনে করিয়ে দেয়, আকর্ষণীয় পোশাকের জন্য ফাস্ট ফ্যাশন হওয়া প্রয়োজনীয় নয়। সুন্দর হতে হলে নিখুঁত হতেই হবে, এমনটাও নয়। কখনো কখনো শুধু সময়, স্পর্শ আর উদ্দেশ্যই যথেষ্ট। ২০২৬ সালে এই চিরচেনা হাতে সেলাই ফিরেছে নতুন করে। প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি সুতাকে রঙিন করতেও ব্যবহার করা হয় পরিবেশ থেকে পাওয়া রং। তারপর তাতে সম্পন্ন হয় রিজ স্টিচ, টাফটিং, অ্যাপ্লিকের মতো থ্রি-ডি ও টেক্সচার্ড স্টিচ। মিনিমাল ও অ্যাবস্ট্রাক্ট ডিটেইল আধুনিক এবং ক্যাজুয়াল লুকের পোশাকে ব্যবহার করা হয়। বর্তমান সময়ে চাহিদার তালিকার ওপরের দিকে আছে পার্সোনালাইজড এমব্রয়ডারি। অনেকে নিজস্বতার স্পর্শ চান। মনোগ্রাম, নাম, ছোট সিম্বল এঁকে নেওয়া হয় সুই-সুতার ঐকতানে। ট্র্যাডিশনাল ফিউশনে কাঁথা, চিকনকারি, জারদৌসিকে আধুনিক সিলুয়েটে ব্যবহার করা হয় উৎসবের পোশাক তৈরিতে। স্টেটমেন্ট ডিটেইলে হাতে সেলাই করা স্লিভ, ডেনিম প্যানেল, এমব্রয়ডারির ব্যবহার দেখা যায়।
সেই সময় থেকে এই সময়, বদলেছে নানা কিছু। প্রযুক্তির আশীর্বাদের বিরূপ ভাব কোণঠাসা করেছিল হাতে সেলাইকে। সৃজনশীলতার দৃপ্ত প্রয়াসে আবারও দারুণ প্রাসঙ্গিক হ্যান্ড স্টিচ।

 সারাহ্ দীনা
মডেল: দীপঙ্কর, দিবা ও নাদরুন
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: সিজ
ছবি: জিয়া উদ্দীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top