skip to Main Content

দেহযতন I মৈত্রী মুগ্ধতা

মেত্তা মেডিটেশন। ধ্যানকে সঙ্গী করে জীবনের প্রকৃত উন্নতি ঘটানোর পন্থা। সঙ্গে যদি থাকে একান্ত প্রিয়জন, তাহলে ইতিবাচক প্রভাব বৃদ্ধির সমূহ সম্ভাবনা

মানুষ জীবনে শান্তি চায়। কিন্তু শান্তির খোঁজে সবচেয়ে বেশি যা হারায়, তা হলো ভালোবাসা! নিজের প্রতি, অন্যের প্রতি, জীবনের প্রতি। হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন সাধকেরা উপলব্ধি করেছিলেন, ভালোবাসা ছাড়া মন কখনো স্থির হয় না। আর অশান্ত মন শরীরকেও অসুস্থ করে তোলে। এই উপলব্ধি থেকে জন্ম নিয়েছে মেত্তা (উচ্চারণভেদে মেটা) মেডিটেশন বা মৈত্রী ধ্যান; যা ভালোবাসা ও করুণাভিত্তিক এক গভীর আত্মিক অনুশীলন।
‘মেত্তা’ (Metta) শব্দটি এসেছে পালি ভাষা থেকে। আভিধানিক অর্থ নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সর্বজনীন মৈত্রী ও কল্যাণ কামনা। মেত্তা মেডিটেশনের উৎপত্তি প্রাচীন বৌদ্ধদর্শনে, বিশেষ করে থেরবাদ ধারায়। গৌতম বুদ্ধ মানবজীবনের দুঃখের মূল হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন লোভ, রাগ ও অজ্ঞানতাকে। এই তিন বিষ থেকে মুক্তির পথ হিসেবে তিনি চারটি ব্রহ্মবিহার বা মহান মানসিক গুণের কথা বলেন। মেত্তা (ভালোবাসা), করুণা (দয়া), মুদিতা (অন্যের সুখে আনন্দ) ও উপেক্ষা (মানসিক ভারসাম্য)। মেত্তা মেডিটেশন এই চারটির ভিত্তির সমন্বয়ে পরিশীলিত এক অনুশীলন।
প্রাচীনকালে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রথমে নিজের, তারপর ধাপে ধাপে প্রিয় মানুষ, নিরপেক্ষ ব্যক্তি, শত্রু এবং শেষে সমগ্র বিশ্বের উদ্দেশে মৈত্রী পাঠ করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অনুশীলন ধর্মীয় সীমা ছাড়িয়ে আধুনিক মনোবিজ্ঞান, মেডিটেশন ও ওয়েলনেস চর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
মেত্তা মেডিটেশন শুধু নীরবে বসে থাকার ধ্যান নয়; এটি সক্রিয় মানসিক ব্যায়াম, যেখানে অনুশীলনকারীরা সচেতনভাবে নিজের ও অন্যদের জন্য শুভকামনা করেন। এই ধ্যানে তারা মন্ত্রের মতো একযোগে বলে যান—‘আমরা যেন সুখী হই, যেন নিরাপদ থাকি, অন্যরাও যেন শান্তিতে থাকে।’ এই বাক্যগুলো শুনতে সহজ মনে হলেও, নিয়মিত অনুশীলনে মনের গভীরে প্রভাব ফেলে। রাগ, ঈর্ষা ও বিদ্বেষের জায়গায় ধীরে ধীরে জন্ম নেয় সহানুভূতি ও মমতা।
আজকের মানুষ প্রযুক্তিতে এগিয়েছে, কিন্তু মানসিকভাবে অনেকে ক্লান্ত ও একাকী। সামাজিক যোগাযোগ বাড়লেও হৃদয়ের যোগাযোগ কমে গেছে কারও কারও। মেত্তা মেডিটেশন এই বিচ্ছিন্নতার দেয়াল ভাঙতে সাহায্য করে। এর নিয়মিত চর্চায় মানসিক চাপ এবং নেতিবাচক চিন্তার প্রবণতা কমে; বাড়ে মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও সহনশীলতা। এটি আমাদের অন্যকে বিচার করা নয়; বরং বোঝার মনোভাব এনে দেয়।
মেত্তা মেডিটেশনের শুরু হয় নিজের থেকে। কারণ, নিজেকে ভালোবাসতে না পারলে অন্যকে ভালোবাসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমরা প্রায়ই নিজের ভুল নিয়ে নিজেকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিই। মেত্তা চর্চা সেই কঠোর আত্মসমালোচক মনকে শান্ত করে তোলে; তাতে নিজেকে ক্ষমা করার ক্ষমতা তৈরি হয় এবং আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস বেড়ে নিজের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে রাখে সহায়ক ভূমিকা।
যুগলদের ক্ষেত্রে এই চর্চা বিশেষভাবে কার্যকরী। প্রতিদিন যখন দুজন মানুষ একসঙ্গে বলেন, ‘তোমাকে পেয়ে আমি সুখী’, তখন তা শুধুই একটি বাক্য থাকে না; বরং মনের গভীরে নতুন বিশ্বাস তৈরি করে। প্রেম ও দাম্পত্যজীবনে ভুল-বোঝাবুঝি স্বাভাবিক; কিন্তু জমে থাকা রাগ ও অভিমান ধীরে ধীরে সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। মেত্তা মেডিটেশন এখানে নীরব নিরাময়ের মতো কাজ করে। এর চর্চা ক্ষমা করতে শেখায়, সঙ্গীর ভালো দিকগুলো মনে করিয়ে দেয়, সম্পর্কের ভেতর নিরাপত্তা ও উষ্ণতা বাড়ায়। কেউ যখন প্রিয়জনের জন্য নিয়মিত শুভকামনা করেন, তখন তার আচরণ অবচেতনভাবেই কোমল হয়ে ওঠে। মেত্তা মেডিটেশন আমাদের শুধু প্রিয়জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে না; অপরিচিত মানুষ, সহকর্মী এমনকি যাদের অপছন্দ করি, তাদের প্রতিও সহনশীল হতে শেখায়। এই অনুশীলন মনে করিয়ে দেয়, সব মানুষই সুখ চায়; স্বেচ্ছায় কষ্ট নয়।
মেত্তা মেডিটেশন শুধু মানসিক প্রশান্তির বিষয় নয়; এর গভীর প্রভাব পড়ে শরীরের ওপরও। আধুনিক বিজ্ঞান আজ স্পষ্টভাবে বলছে, ‘মন ও শরীর’ আলাদা নয়। নিয়মিত এর চর্চা করলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা কমে। ফলে দুশ্চিন্তা, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্যন্ত্রের ওপর চাপ কমে। ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি হৃৎস্পন্দনকে স্থিতিশীল রাখে। আর ইতিবাচক মানসিক অবস্থা যে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, সে কথা তো বলাই বাহুল্য। এ ছাড়া সর্দি-কাশি, সংক্রমণ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কমাতেও এটি সহায়ক।
আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মেত্তা মেডিটেশন কোষের টেলোমিয়ার দীর্ঘ রাখতে সহায়ক, যা বার্ধক্য ধীর করে এবং শরীর দীর্ঘদিন কর্মক্ষম রাখে। এই চর্চা স্নায়ুতন্ত্র শান্ত করে, মেলাটোনিন হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং গভীর ও নির্বিঘ্ন ঘুমে সহায়তাও করে।
মেডিটেশনটি অনুশীলনের রয়েছে কয়েকটি ধাপ। দুজন সঙ্গী কীভাবে একসঙ্গে এর চর্চা করবেন, আসুন, চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক তেমন ধাপগুলোতে:
 শান্ত জায়গায় বসে চোখ বন্ধ করুন;
 নিজেদের উদ্দেশে বলুন, ‘আমরা নিরাপদ থাকি, সুখী থাকি, সুস্থ থাকি’;
 প্রিয় মানুষের জন্য একই শুভকামনা পাঠান;
 নিরপেক্ষ ব্যক্তির উদ্দেশেও একই মৈত্রী বার্তা দিন;
 যাকে অপছন্দ করেন, তারও শান্ত থাকা কামনা করুন;
 শেষে বলুন, ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’।
মেত্তা মেডিটেশন কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নয়। এটি মন ও শরীরকে ধীরে ধীরে সুস্থ করার এক গভীর যাত্রা। প্রতিদিন মাত্র ১০-১৫ মিনিট এই অনুশীলন জীবনে এনে দিতে পারে আশ্চর্য পরিবর্তন। ভালোবাসাই যখন চর্চা হয়ে ওঠে, তখন জীবন নিজেই হয়ে ওঠে শান্ত, সুস্থ ও অর্থবহ।

 নাঈমা তাসনিম
ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top