বিশেষ ফিচার I বয়ন, বসাক ও ব্র্যান্ড : টাঙ্গাইল শাড়ির অন্তরালের ইতিহাস
সূক্ষ্ম সুতার টানাপোড়েনে জড়িয়ে আছে শৈলী, শ্রম ও নীরব স্বপ্ন। টাঙ্গাইল শাড়ি তাই শুধু বস্ত্র নয়; একটি ভূখণ্ডের আত্মপরিচয়। বাংলার ইতিহাস, শ্রম, নান্দনিকতা ও নারীর সৌন্দর্যবোধের এক জীবন্ত দলিল। বসাকদের হাতে গড়া এই বয়ন ঐতিহ্য নদীভাঙন, দেশভাগ ও অভিবাসনের অভিঘাত পেরিয়েও অমলিন। নকশার ভাঁজে লুকিয়ে আছে স্মৃতি, গরিমা ও উত্তরাধিকার; জিআই আর বাজার-রাজনীতির বিতর্কে আজও সমান প্রাসঙ্গিক। লিখেছেন সাংবাদিক ও টেক্সটাইল হেরিটেজ গবেষক শেখ সাইফুর রহমান
ঐতিহাসিক যাত্রাপথ
দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর দেশান্তর, অনিশ্চয়তা ও আশ্রয়-অন্বেষণের পর বসাক সম্প্রদায় অবশেষে যে ভূখণ্ডে স্থিরতা খুঁজে পায়, তার নাম টাঙ্গাইল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা নদীপথে ভেসেছেন; আর নদীতীরে বসত করেছেন। কিন্তু কেন যেন মন ওঠেনি। তাই তো সিন্ধু থেকে গঙ্গা, গঙ্গা থেকে পদ্মা, পদ্মা পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্র, তারপর বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী হয়ে লৌহজং অববাহিকায় এসে থিতু হওয়া। এ ছিল কেবল ভূগোলের পরিবর্তন নয়; ছিল পেশাগতভাবে টিকে থাকা এবং নিজেদের পরম্পরার শিল্পকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম, সামাজিক চাপে সরে যাওয়া, ধর্মীয় বিশ্বাস আঁকড়ে থাকা এবং উপযুক্ত আবহাওয়ার নিরন্তর অনুসন্ধান।
টাঙ্গাইলে এসে তারা পান কাঙ্ক্ষিত মাটি, আলো ও আর্দ্রতা—তাঁত ও সুতো যার প্রাণ। নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু, বাতাসের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও পর্যাপ্ত আলো-বাতাস বয়নশিল্পের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তাই টাঙ্গাইল তাদের কাছে হয়ে ওঠে এক কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। স্থায়ীভাবে থিতু হওয়ার আশ্বাস।
কারণ, যাদের যাপনজুড়ে আছে তাঁত ও সুতা, সেই বসাক সম্প্রদায়ের কাছে টাঙ্গাইল হয়ে ওঠে একধরনের অভীষ্টে পৌঁছানো। এই ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশই তাদের দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের প্রধান কারণ বলে বিবেচিত।
মালদহ বা মুর্শিদাবাদ থেকে তারা প্রথমে আসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে। সেখানে কিছুদিন থাকার পর চলে আসেন কিশোরগঞ্জে। সেখান থেকে ঢাকায়। এরপর আবার ঠাঁই নাড়া হয়ে ধামরাই। সেই পাট চুকিয়ে আসেন টাঙ্গাইলে। এসে প্রথমে বসতি স্থাপন করেন গাততলা গ্রামে। সে সময় পাতরাইল ও চণ্ডীর মাঝখানে প্রবাহিত লৌহজং নদীর চরাঞ্চল, যা চরচণ্ডী নামে পরিচিত ছিল, সেখানে ধামরাই থেকে আগত বসাকেরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অন্যদিকে চৌহাট্টা বা চৌৎথ থেকে আগত বসাকেরা নিকটবর্তী নলশোধা এলাকায় বসতি গড়ে তোলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুই ধারার বসাকেরা ছড়িয়ে পড়েন টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন গ্রামে। সেগুলো হলো—চন্ডী, পাথরাইল, নলশোধা, অলোয়া, কাগমারী, সন্তোষ, বিন্যাফৈর, পোড়াবাড়ী, চাড়াবাড়ী, বাজিতপুর, বেড়াই, টাঙ্গাইল সদর, সহদেবপুর, বাংড়া, কোকডহড়া, উতরাইল, গোসাই জোয়াইর, নিয়োগী জোয়াইর, সুরুজ, আদি টাঙ্গাইল, ঘারিন্দা ও নলুয়া। এগুলোর মধ্যে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে টাঙ্গাইলের তাঁতকেন্দ্রিক জনপদ ও বয়নসংস্কৃতি।
এর আগে বসাকেরা বিভিন্ন অঞ্চলে থাকার সময় শাড়ি ছাড়াও থান কাপড়সহ নানা ধরনের বস্ত্র বুনতেন। কিন্তু টাঙ্গাইলে এসে মূলত শাড়ি বয়নেই মনোনিবেশ করেন। এখানেই টাঙ্গাইল শাড়ির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, নকশা ও গুণগত মান বিকশিত হয়। ফলে টাঙ্গাইলের শাড়ি শুধু একটি পোশাক বা একটি বয়নপদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এই অঞ্চলের বয়ন ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। সময়ের পরিক্রমায় টাঙ্গাইল শাড়ি একটি স্বীকৃত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে; যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বসাক সম্প্রদায়ের শ্রম, দক্ষতা ও শতাব্দীপ্রাচীন অভিজ্ঞতা।
এই দীর্ঘ পরিক্রমণ শেষে টাঙ্গাইলেই বসাকদের যাত্রা যেন স্থিরতা পায়। গত আড়াই শ বছর, মতান্তরে দেড় শ বছরের বেশি সময় তারা এখানেই রয়ে গেছেন। দেশান্তরের ইতিহাস পেছনে ফেলে টাঙ্গাইলে তারা শুধু বসতি স্থাপন করেননি; বরং গড়ে তুলেছেন এক অনন্য বয়ন ঐতিহ্য, যা আজ আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ।
কালপর্বে বিকশিত টাঙ্গাইল শাড়ি
হস্তচালিত তাঁতের ঐতিহ্য আমাদের এই ভূখণ্ডের বৈশিষ্ট্য। এই তাঁত অবশ্যই গর্ততাঁত। এই তাঁতের সঙ্গে পরবর্তীকালে যোগ হয়েছে জ্যাকার্ড মেশিন। এই যন্ত্র যদিও হস্তচালিত; ফলে হস্তচালিত তাঁতের কৌলীন্য এতে নষ্ট হয়নি।
বসাকেরা এই অঞ্চলে বসতি স্থাপনের আগেও টাঙ্গাইলে কাপড় বোনা হতো। বিশেষত কালিহাতী এ ক্ষেত্রে ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে বসাকেরা এসে নতুন কৌশল প্রচলন করে। শুধু বোনা নয়; বোনার আগের নানা পর্যায়ে তাদের মুনশিয়ানা টাঙ্গাইল শাড়িকে দিয়েছে অনন্যতা। ফলে সময় পরিক্রমায় একটি ব্র্যান্ড নেমে পরিণত হয়েছে। তৈরি করেছে নিজস্ব পরিচয়। পরবর্তী সময়ে যদিও জ্যাকার্ডের সংযোজন এবং নকশার তারতম্য ঘটেছে; তা সত্ত্বেও টাঙ্গাইল শাড়ির সৌন্দর্যহানি ঘটেনি।
টাঙ্গাইলে মুসলমান তন্তুবায়
একটি অসমর্থিত সূত্রমতে, ১৯৫৫ সালের দিকে বসাকদের বয়নে মুসলমানদের প্রবেশ ঘটে। এটি তাদের পারিবারিক পেশা ছিল না। তবে কালক্রমে সেটি হয়ে উঠেছে। বর্তমানে তাদের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ। তবে বসাকেরা আসার আগে থেকে টাঙ্গাইলে মুসলমান তন্তুবায়রা ছিলেন। কালিহাতীর বিভিন্ন এলাকা; যেমন বল্লা, রামপুর, কাজিবাড়ী, দরিখরশিলায় একসময় মোটা কাপড় তৈরি হতো; টানা ও ভরনায় ৪০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করে। একসময় ‘মোটা ভাত মোটা কাপড়’ বলে প্রবাদ চালু ছিল। এই মোটা কাপড় ওই সব অঞ্চলে তৈরি হতো বলে জানিয়েছেন রাধেশ্যাম নীলকমল বসাক।
অন্যদিকে ইবন বতুতা ও হিউয়েন সাংয়ের বর্ণনায়ও মেলে টাঙ্গাইলের বয়নসৌকর্য। কিন্তু সেই সময়ে কারা সেই বস্ত্র বুনতেন, তা অনুসন্ধানসাপেক্ষ বটে। কারণ, বসাকেরা তখনো এই অঞ্চলে পা রাখেননি।
টাঙ্গাইল শাড়ির অনন্যতা
টাঙ্গাইল শাড়ি তার গরবের ধন। তা আসলে কী? মিহি সুতায় বোনা শাড়িই টাঙ্গাইল শাড়ি। টাঙ্গাইলের আদি শাড়ি বলতেই সুতি শাড়ি। মিলের সুতা আসার আগে তা অবশ্যই হাতে কাটা সুতায় বোনা হতো। বাঙালির সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী টাঙ্গাইলে আগে তিন ধরনের শাড়ির প্রচলন ছিল। বিধবাদের জন্য থান শাড়ি, পুরুষদের জন্য চুড়িপাড় ধুতি আর সধবা ও কুমারীদের জন্য নকশাপাড় ও বুটি শাড়ি। এই শাড়ি বোনা হতো পিটলুম বা গর্ততাঁতে। একে আবার খটখটি তাঁতও বলা হতো। শাড়ির সামগ্রিক পরিকল্পনা, বয়নকৌশলের সঙ্গে আবহাওয়া-উপযোগী ব্যবহারের স্বাচ্ছন্দ্যের কারণে সেই সময়ে ভারতবর্ষজুড়ে এই সুতি শাড়ির চাহিদা ছিল অকল্পনীয়। পূর্ববর্তী সময়ে ১২ থেকে ১৫ ঝাঁপের (শাফ্ট) কৌশলে নকশাগুলো শাড়ির দুই পাড়ে বোনা হতো। আঁচলে তিন থেকে চারবার হাইসা অর্থাৎ মোটা ও চিকন লাইন বুনে শাড়ি বোনা শেষ করা হতো।
বুটি শাড়ি দুই ঝাঁপে তৈরি হতো; হাতের সাহায্যে টানার সুতার গণনার মাধ্যমে তাঁতির সৃজনমান নকশার সঙ্গে গণনার সাহায্যে শাড়ির জমিনে বুটির আকৃতিগুলো বয়নের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে ফুটে উঠত। প্রকৃতির অনুপ্রেরণায় সৃষ্ট জ্যামিতিক নকশাগুলোর সঙ্গে জামদানি নকশার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই ধরনের শাড়িকে টাঙ্গাইল জামদানি বলা হয়; যদিও তা একেবারে সঠিক নয়; বরং টাঙ্গাইল জমদানির অধিক পরিচিতি আমাদের মূল জামদানির পরিচয়কে সংকটে ফেলে। ক্রেতাও বিভ্রান্ত হন তাতে।
যাহোক, শাড়ি তৈরির সময়কাল নির্ধারিত হয়েছে বুটি বা মোটিফের জটিলতা এবং শাড়িতে এর সংখ্যা ওপর। সেই সময়ে টাঙ্গাইল শাড়ি সবার কাছে টাঙ্গাইল বিটি শাড়ি নামে বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। সেখানকার বসাকেরা একসময় হাতে কাটা ৩০০-৪০০ কাউন্ট সুতায়ও কাপড় বুনেছেন। প্রয়াত বয়নশিল্পী মনমোহন বসাক (ভাষা বসাক) বুনেছেন ২৫০ কাউন্ট সুতায়। এ কথা ২০১৩ সালে তার কাছ থেকেই শোনা।
টাঙ্গাইলে একসময় আমদানি হয়ে আসা র-সিল্ক সুতায় শাড়ি বোনা হতো। এই শাড়ি পরিচিতি পায় মসলিন নামে। এই নাম কার দেওয়া, তা জানা যায় না। পাকিস্তান আমলেও ছিল এই স্বচ্ছ শাড়ি। স্বচ্ছতার কারণে হয়তো মসলিন নামে এর এই পরিচিতি ছিল। আশির দশকের শুরুতে নতুন সংযোজন হাফ সিল্ক। সিল্কের সঙ্গে সুতি সুতার সহাবস্থানে এই কাপড় বোনা শুরু হয়।
গেল শতকের বিশ বা ত্রিশের দশকে আসে ডাবল জ্যাকার্ড বুনন। প্রথমে সিল্কে এবং পরে সুতিতে। জ্যাকার্ডে কৌশলগত প্রয়োগের বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়। সেদিক থেকে বলতে হয়, জ্যাকার্ড বুননের কৌশল অপরিবর্তিত রয়েছে। এই পদ্ধতিতে নকশা আগে শুধু পাড়ে হতো; এখন তা ছড়িয়েছে জমিন ও আঁচলে। ফলে শাড়ি আরও দৃষ্টিনন্দন হয়েছে। বয়নশিল্পীদের সৃজনশীলতার সঙ্গে কারিগরি কৌশলের অপূর্ব মেলবন্ধন তাঁতজাত এই শিল্পকর্ম ভোক্তাদের মুগ্ধ করে চলেছে। পরে অবশ্য যোগ হয়েছে চিত্তরঞ্জন তাঁত। এটি সেমি-অটোমেটিক লুম। বর্তমানে এই তাঁতগুলোই রূপান্তরিত হয়েছে পাওয়ারলুমে।
মজার কথা, টাঙ্গাইল শাড়িতে কখনোই ব্লাউজ পিস ছিল না। এটি এসেছে সময়ের প্রয়োজনে। প্রথমে বাতিল শাড়ি কেটে ব্লাউজ পিস করা হতো, পরে শাড়ির সঙ্গে বোনা শুরু হয়। অর্থাৎ ১২ হাত শাড়ি তৈরি হলো ১৪ হাত দৈর্ঘ্যের। কৌশলগত দিক থেকে প্রধানত শাড়ি তিন ধরনের—ভাইটাল, জ্যাকার্ড (নকশাপাড়) ও বুটি। ভাইটাল শাড়ি আসলে একরঙা থান শাড়ি।
তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সংযোজনের মাধ্যমে টাঙ্গাইল শাড়িতে নতুন নতুন রূপান্তর ঘটেছে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে। এই বিষয়গুলোর সঙ্গে উপকরণের ব্যবহারবিধির বহুমুখিতার বদৌলতে আজ টাঙ্গাইল শাড়িতে ‘ধরনের’ বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে অনেক। ফলে ক্রেতার অন্তহীন নতুনত্বের প্রতি আগ্রহ প্রশমিত হলে তা সময়ের বহমানতায় উৎপাদকদের জন্য শাপে বরের মতো ধরা দিয়েছিল। সুতির পাশাপাশি হাফ সিল্ক, সফট সিল্কের শাড়িও তৈরি করেছে তারা। তবে এসব সুতার দাম বাড়ার কারণে ঢুকে গেছে সিনথেটিক সুতা। এমনকি ঢুকেছে নানা মোটিফ। তাতে হারিয়ে গেছে পুরোনো সব নয়ন মনোহর নকশা ও লে-আউট। এখন যেসব শাড়ি আমরা পাচ্ছি, সেগুলোকে গরবের ধন বলা দুষ্কর; বরং পর্যবসিত হচ্ছে অবহেলায়।
নীলয় কুমার বসাক সম্পাদিত নবপর্যায়ে প্রকাশিত বসাক সম্প্রদায়ের মুখপাত্র টানাপোড়েনের দ্বিতীয় সংখ্যায় ‘টাঙ্গাইলের নকশি বুটি কি হারিয়ে যাবে: উবিনীগ’ নিবন্ধে বিষয়টিতে আলোকপাত করা হয়েছে। নকশি বুটির আছে বিভিন্ন নাম। প্রকৃতি ও প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত কিছু উপাদানকে তারা নকশা হিসাবে আত্তীকরণ করেছে। পাতা বুটি (আট-পাতা, তিন-পাতা বুটি), পদ্ম বুটি, জবা ফুল বুটি, ঢেঁকিশাক বুটি, পান বুটি, গাছ বুটি, লতা বুটি, শাপলা বুটি, সূর্যমুখী বুটি ইত্যাদি। কিছু বুটি আছে, যা একেবারে ঘরের জিনিসপত্রের নকশায় করা; যেমন জগ বুটি, কলসি বুটি, লাটিম বুটি, লাঙল বুটি, হুক্কা বুটি, ঝাকা বুটি, ফুলদানি বুটি, বই বুটি, দাঁড়িপাল্লা বুটি, পাখা বুটি, বোতাম বুটি, টিকলি বুটি, ঘুড়ি বুটি, হারিকেন বুটি, বোতল বুটি, বল বুটি, বীণবাঁশি বুটি, চরকা বুটি, ঝাড়বাতি বুটি, বিস্কুট বুটি ইত্যাদি। ঘরের ভেতরে থাকা বা আশপাশের পোকামাকড়ও বয়নশিল্পীকে উৎসাহিত করেছে বুটির নকশায় রূপান্তর করতে। ফলে নানা কিছু পরিগ্রহ করেছে বুটির রূপ; যেমন টিকটিকি বুটি, ভোমরা বুটি, প্রজাপতি বুটি, মাছ বুটি, কাঁকড়া বুটি, তেলাপোকা বুটি, মাছি বুটি, শঙ্খ বুটি ইত্যাদি। ফলের মধ্যে আনারস বুটি, কামরাঙা বুটি, করলা বুটি ইত্যাদি। তা ছাড়া চোখ বুটি, তারা বুটি, সূর্য বুটি, ঢেউ বুটি, চমচম বুটিও এসেছে জীবন আর প্রকৃতি থেকে।
এত ধরনের বুটির অভিজ্ঞতা থাকলেও বাজারের চাহিদা না থাকায় বয়নশিল্পীরা অনেক বুটি করেন না। তিনটি বুটি প্রায় উঠে গেছে বলা যায়। এগুলো হচ্ছে—জবা ফুল বুটি, টিকলি বুটি ও লাঙল বুটি। কৃষিতে লাঙলের ব্যবহার কমে যাচ্ছে, ফুলের মধ্যে জবা ফুল হয়তো কম রোপণ হচ্ছে। অন্যদিকে কামরাঙা ও শাপলা আগে বেশি ছিল না; কিন্তু এখন বেশ দেখা যাচ্ছে। বলা যায় মহাজনেরা বয়নশিল্পীদের এই বুটি করতে দিচ্ছেন। টিকটিকি বুটি, প্রজাপতি বুটি প্রায় উঠে গিয়েছিল। কিন্তু আবার নতুনভাবে শুরু হয়েছে।
২০০০ সালের দিকে উবিনীগের একটি গবেষণায় দেখা যায়, তেরোটি বুটি এখন প্রায় সব নকশি বুটি শাড়িতে দেখা যাচ্ছে। এগুলো হচ্ছে: বল বুটি, বেকি বুটি, বিস্কুট বুটি, বোতাম বুটি, হাতি বুটি, করলা বুটি, কলসি বুটি, লতা বুটি, পদ্ম বুটি, পান বুটি, পাতা বুটি, সূর্যমুখী বুটি ও তারা বুটি।
টাঙ্গাইল শাড়িতে ধরন অনুযায়ী নকশার প্রচলিত নাম রয়েছে। বয়নশিল্পীরা একই নকশাকে বিভিন্ন নামেও শনাক্ত করেন। মহাজন অথবা প্রধান বয়নশিল্পী কিংবা নকশার মাস্টার কারিগর প্রতিটি ধরনের একটি করে নাম দেন। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে নকশাভেদে নির্দিষ্ট নামের প্রচলন করে থাকেন বয়নশিল্পীরা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত নকশা বা মোটিফগুলোর ছবি না দেখেই শুধু নামের মাধ্যমে তারা সেটি খুব সহজে শনাক্ত করতে পারেন। জমিন আর পাড়ের নকশারও রয়েছে আলাদা নাম।
পরিসংখ্যান ও পরিস্থিতি
তখনকার ২২ গ্রাম থেকে তাঁত বর্তমানে অর্ধশতাধিক গ্রামে ছড়ালেও টাঙ্গাইল শাড়ির সেই সুদিন আর নেই। রঘুনাথ বসাক তাই আক্ষেপ নিয়ে বললেন, তাঁত কমার কারণে শাড়ির বিক্রি কমেনি; বরং শাড়ির চাহিদা কমায় কমেছে তাঁত। করোনা অতিমারি আবার হয়েছে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। সেই ধাক্কা আজও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের আবেদনের জন্য করা তাঁত বোর্ডের অনুসন্ধান অনুযায়ী, পুরো টাঙ্গাইল জেলায় শাড়ি তৈরি হয়। এর মধ্যে কালিহাতী, দেলদুয়ার আর টাঙ্গাইল সদরে হয় সিংহভাগ উৎপাদন। এ ছাড়া বাসাইল ও মির্জাপুর উপজেলাতেও উৎপাদিত হয়; তবে কম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ (২০১৮) অনুযায়ী বর্তমানে তাঁতের সংখ্যা (খটখটি, জ্যাকার্ডসহ) ২৮ হাজার ৬৩৩টি; যদিও হিসাবে পাওয়া যাচ্ছে ২৮ হাজার ৫৭২টি। এগুলোর মধ্যে বেশি আছে কালিহাতীতে; ১৫ হাজার ৮৯টি। এরপর টাঙ্গাইল সদর; ৭ হাজার ৮টি। তৃতীয় অবস্থানে দেলদুয়ার; ৪ হাজার ১৯৩টি। নাগরপুরে আছে ১ হাজার ১০৫টি। এ ছাড়া বাসাইলে ৯০৩টি, মির্জাপুরে ১২৮টি এবং মধুপুরে ৩০টি। তবে কত মানুষ কিংবা আরও বিস্তারে কত পরিবার এই পরম্পরার পেশায় জড়িত, তার সঠিক হিসাব নেই।
ঐতিহ্যের মূল কারিগর
টাঙ্গাইল শাড়ি হিসেবে যে শাড়ি পরিচিত, তার মূল কারিগর বস্তুত বসাকেরা। সময়ের সুদীর্ঘ পরিক্রমায় তারা এই ব্র্যান্ড গড়ে তুলেছেন। এই শাড়ি তৈরির কারিগরি বিষয় তাদের করায়ত্ত। বয়নপূর্ব ও বয়নকালীন প্রক্রিয়াও অন্যদের বয়নের চেয়ে আলাদা। এসব প্রক্রিয়ার অনেক কিছু এখন আর প্রয়োগ হয় না। বিশেষত টানা তৈরির পর নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি ডাস্টার দিয়ে ঘষে সুতার আঁশ দূর করা হতো, যেটি এখন আর হয় না। অথচ এর কারণে শাড়ি মসৃণ ও আরামদায়ক হয়। বোনার সময় দেওয়া হয় চুনের পানির ছিটা। এতে শাড়ি হয় উজ্জ্বল।
সীমান্ত পেরোনো বিভ্রান্তি ও পরিচয়ের রাজনীতি
দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ বহু পরিবারের মতো বসাক সম্প্রদায়কেও শিকড়ছাড়া করেছে। ভারত ভাগের আগে-পরে তাদের পশ্চিমবঙ্গে যাত্রা শুরু হলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় বসাক পরিবার দেশান্তরি হয়। তারা মূলত নদীয়ার ফুলিয়া ও পূর্ব বর্ধমানে স্থায়ী হন। সামাজিক নিগ্রহই ছিল প্রস্থানের প্রধান কারণ। প্রবীণ সদস্যদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, জমি-বাড়ি জবরদখল, লুটপাট, নারীদের ওপর নির্যাতনসহ নানা অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তারা ভিটেমাটি ছাড়েন; এসব ঘটনাকে তারা মোটাদাগে ‘ডাকাতি’ বলেই উল্লেখ করেন। এরপর আরেক দফা দেশছাড়ার ঘটনা ঘটে ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনায়।
বলা যায়, টাঙ্গাইলের ২২ গ্রামের ৮০-৯০ শতাংশ বসাকই সীমান্তের ওপারে চলে গেছেন। ফলে বহু গ্রামে এখন বসাক পরিবার নেই; কোথাও থাকলেও সংখ্যা অতি সামান্য। হাতে গোনা কয়েকটি গ্রাম; যেমন পাথরাইল ও চন্ডী তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য।
দেশান্তরি জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন হরিপদ তথা মনোহর বসাক তার উপন্যাস ‘নীলাম্বরীর নকশা’ ও ‘তাঁতিপাড়ার আখ্যান’-এ। আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-ব্যর্থতা এবং ভিটেমাটি হারানোর টানাপোড়েন সেখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ‘নীলাম্বরীর নকশা’য় ফণী মহাজনের উচ্ছ্বাস—‘ঔবো আবার হেই নীলাম্বরী? জমিতে চাঁপার কলি, আঁচলায় কলকা বুটি’—তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য ও আবেগেরই প্রতিধ্বনি।
পশ্চিমবঙ্গে বসাকেরা নীলাম্বরী পুনরুজ্জীবিত করেছেন, নতুনত্বও এনেছেন। ফুলিয়ায় গড়ে উঠেছে টাঙ্গাইল জামদানি তন্তুবায় সমবায় সমিতি লিমিটেড। স্বাধীনতার পর দেশান্তরি বীরেন বসাক ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা এখন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তুলনামূলকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত—এ কথা নিলয় কুমার বসাকও স্বীকার করেছেন।
ভারত সরকার এদের যথাযথভাবে পুনর্বাসন করেছে। ফলে তারা হয়ে উঠেছেন সেখানকার সম্পদ। আর এর কারণেই টাঙ্গাইল শাড়ির দাবিদার হয়ে উঠেছে ভারত। জিআই নিয়েছে ভুল তথা মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে। এসব তথ্য বিভ্রান্তি উৎপাদকও বলা যেতে পারে। কারণ, এই শাড়ির উৎপত্তি তো আর পশ্চিমবঙ্গে নয়; ফলে তাদের প্রথম আবেদন নাকচ হয়। পরে তারা ‘বেঙ্গল’ শব্দটি ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গের জায়গায়। বেঙ্গল নামের কোনো ভূখণ্ডের অস্তিত্ব বর্তমান পৃথিবীতে নেই। অথচ এই তথ্যেই তারা নিয়েছে জিআই স্বীকৃতি।
ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতির গুরুত্ব
যেকোনো দেশের কোনো জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। এই ট্যাগ পণ্যের মর্যাদা ও মূল্য—উভয়ই বাড়ায়। এটি সব দেশ বুঝলেও আমরা বুঝি না! এখানে বলে রাখা ভালো, টঙ্গাইল শাড়ি একটি ব্র্যান্ড। এই উপমহাদেশে এটি সুপরিচিত। নতুন করে পরিচয়ের তেমন প্রয়োজন নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতির কিংবা এর ভুবনায়নের জন্য জিআই মর্যাদা বিশেষ গুরুত্ববহ। যদিও তা বুঝি না বলেই সমস্যা ঘটেছে। ভারত টাঙ্গাইল শাড়ি তাদের জাতীয় পর্যায়ের জিআই নেওয়ার পর আমাদের টনক নড়েছে। এখন আমরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি। এটিকে স্রেফ গাফিলতি ছাড়া আর কীই-বা বলা যায়! শুধু তা-ই নয়, আবেদনের জন্য জমা দেওয়া জার্নালেও থাকে গুচ্ছের ভুল। টাঙ্গাইল শাড়িও এর বাইরে নয়। এ বিষয়ে প্রসঙ্গান্তরে আলোচনা করা যাচ্ছে।
জিআই শুধু আইনি স্বীকৃতি নয়; এটি একটি দেশের ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার প্রতিফলন। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউটিও) ট্রেড-রিলেটেড অ্যাসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (টিআরআইপিএস) চুক্তি অনুযায়ী, জিআই হলো এমন মেধাস্বত্ব, যা কোনো পণ্যের গুণ, সুনাম ও বৈশিষ্ট্যকে তার উৎপত্তিস্থলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে। বাংলাদেশ ১৯৯৫ সালে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও নিজস্ব জিআই আইন প্রণয়নে ১৮ বছর দেরি করে; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জিআই বিশেষজ্ঞ ড. মাসউদ ইমরান মান্নুর মতে, এটি ঐতিহ্য রক্ষায় একধরনের ‘অন্ধকার যুগ’ সৃষ্টি করেছিল। তিনি মনে করেন, এই দীর্ঘসূত্রতা প্রশাসনিক উদাসীনতারই প্রতিফলন। টাঙ্গাইল শাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ক্ষেত্রে তা ছিল প্রায় আত্মঘাতী। আন্তর্জাতিকভাবে জিআই দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে পণ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মাটি, পানি, জলবায়ু ও কারিগরি ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক সম্পর্ক প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ দীর্ঘদিন উৎপাদন ও রপ্তানিতে মনোযোগ দিলেও আইনি সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়নি।
২০১৩ সালের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন দেরিতে এলেও কাঠামোগত দুর্বলতা থেকে যায়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিপার্টমেন্ট অব পেটেন্টস, ডিজাইনস, অ্যান্ড ট্রেডমার্কস (ডিপিডিটি) জিআই নিবন্ধন করে; পরিতাপের বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত অতি গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ের জন্য আলাদা বিভাগ নেই। অন্যদিকে হস্তশিল্প তদারক করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড আর ইউনেসকোর বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (আইসিএইচ) বিষয়টি দেখে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। টাঙ্গাইল শাড়ির ইস্যুতে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট হয়েছে।
জিআই জার্নালের যত ভুল
এবার টাঙ্গাইল শাড়ির অনুমোদিত জিআই জার্নালের কিছু ভুলের ওপর আলোকপাত করা যাক। প্রথমে উল্লেখ্য, এটির জার্নাল (জামদানি ছাড়া সব কটি) ইংরেজিতে ভাষান্তরিত নয় বলে বিদেশিদের কাছে বোধগম্য নয়।
স্পেসিফিকেশন ১: টাঙ্গাইল শাড়ি আবহমানকাল ধরে হাতে বোনা হয়ে থাকে, হস্তচালিত গর্ততাঁতে। এই শাড়ির জন্য জিআই আবেদন করা হলেও সেখানে মেশিনে বোনার কথা উল্লেখ আছে। তাহলে কি জিআই আবেদনে মেশিনে বোনা শাড়িও ছিল? সেটি না হলে মেশিনে বোনা শাড়ির উল্লেখের প্রয়োজন কেন হলো?
স্পেসিফিকেশন ২: এখানে যমুনা ও ধলেশ্বরীর কথা বলা হলেও মূল যে নদী, সেই লৌহজংয়ের উল্লেখ নেই।
স্পেসিফিকেশন ৩: টাঙ্গাইল শাড়ি মার্জিত, রুচিশীল ও আভিজাত্যপূর্ণ—এটি বলার কারণ বোধগম্য নয়।
ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের বর্ণনায় বলা হয়েছে, টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন উপজেলার তাঁতিদের মাধ্যমে তৈরি হয় এই শাড়ি। এটি মূলত বসাকদের কীর্তি। এটি তাদের পরম্পরা। বসাকেরা আসার আগে থেকে মুসলমানরা কাপড় বুনতেন। কিন্তু সেটি এই টাঙ্গাইল শাড়ি নয়; বরং এই শাড়ি বোনা শুরু হয়েছে অনেক পরে। অথচ মুসলমানদের প্রবেশ কবে, তার উল্লেখ নেই।
আবার অন্যত্র বলা হয়েছে, মিহি মসলিন ও সুতি সুতা দিয়ে তৈরি হতো। অথচ জানামতে, মসলিন সুতা নয়; মসলিন মিহি সুতায় (অন্তত ৪০০ কাউন্ট বা তার বেশি) বোনা থান কাপড়। তাহলে মিহি মসলিন সুতা কী? অন্যদিকে সুতি সুতা আর মিহি মসলিনের তফাতই বা কী? কারণ, তখন মিলের সুতা ছিল না। সবই ছিল হাতে কাটা সুতা। আর সবই ছিল সুতি সুতা। উপরন্তু হাতে কাটা সুতা মানেই খাদি সুতা। তাহলে কেন এই ভুল?
অন্য এক জায়গায় লেখা হচ্ছে মসলিন শাড়ি। টাঙ্গাইলে মসলিন বোনা হয়নি। আর যে মসলিনের কথা বলা হচ্ছে, সেটি মসলিন নয়; বরং র-সিল্ক। উপরন্তু জানামতে, টাঙ্গাইলে কখনো কাতান বোনা হয়নি; হয়ও না। টাঙ্গাইলে বোনা পিওর সিল্কের শাড়ি আর কাতান শাড়ি এক নয়।
এখানে তাদের পরিযায়ন প্রসঙ্গে রাজশাহী থেকে ধামরাইয়ে চলে আসার কথা বলা হয়েছে। অথচ তারা রাজশাহী থেকে কিশোরগঞ্জে, সেখান থেকে পুরান ঢাকা হয়ে ধামরাইয়ে যান। রাজশাহী থেকে সরাসরি টাঙ্গাইলে তারা যাননি।
অন্যদিকে টাঙ্গাইল শাড়ির দাম ২০০ টাকা থেকে লাখ টাকা হয়, সেটাও সর্বৈব ভুল তথ্য। কারণ, বর্তমানে একটি নকশা ছাড়া হ্যান্ডলুম টাঙ্গাইল শাড়ি ৮০ কাউন্টের সুতায় বোনা হলে, নকশা ছাড়া শাড়ির ন্যূনতম উৎপাদন ব্যয়ই পড়বে ১০০০ টাকা। আর সর্বোচ্চ মানের শাড়ির উৎপাদন ব্যয় হবে ১৮-২০ হাজার টাকা।
এই জার্নালে আরও বলা হয়েছে, ২০ আর ৪০ কাউন্টের সিঙ্গেল প্লাই সুতায়, কিংবা ২০০, ৩০০, ৪০০ কাউন্টের সুতায় টাঙ্গাইল শাড়ি বোনা হয়—এমন তথ্য চোখ কপালে তোলে বৈকি! কারণ, ২০ কাউন্টের সুতায় শাড়ি বোনা হলে সেটি পরার অনুপযোগী। আর এক লাখ টাকা বলাও বাহুল্য ছাড়া কিছু নয়; বরং তারা যে সিল্ক সুতা ব্যবহার করেন, সেটির কাউন্ট ২০/২২; এই সুতার পাঁচটি গ্রেড হয়, যার মধ্যে এ, বি ও সি গ্রেডের সুতা সাধারণত ব্যবহার করা হয় বলে জানান রাধেশ্যাম নীলকমল বসাক। তিনি আরও বলেন, সুতি সুতা মূলত ৮০ ও ১০০ কাউন্টের ব্যবহার হয়; কখনো প্রয়োজনে ৬০ কাউন্টের। এ ছাড়া মার্সেরাইজড সুতার ক্ষেত্রে ১০২ কাউন্ট ব্যবহৃত হয়।
আরও একটি প্রশ্ন, টাঙ্গাইলের কোন শাড়িকে আমরা জিআই দিচ্ছি? নাইলন, সিল্ক এবং মেশিনে বোনা শাড়িকেও কি? তা ছাড়া টাঙ্গাইল শাড়ি বোনা হয় যেসব সুতায়, তার সবই কি বাংলাদেশে তৈরি? এমন তথ্য কোথায় পাওয়া গেল?
গেল শতকের আশির দশকে টাঙ্গাইল শাড়িকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের মনিরা এমদাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু আরও একজনের নাম এই জার্নালে থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। তিনি কণিষ্কের নীনা আমিন। তিনিও টাঙ্গাইল শাড়ির পুনরুজ্জীবনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। আরও ছিল আড়ংয়ের ভূমিকা। নব্বইয়ের দশকে এসে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসও অবদান রেখেছে। এ ক্ষেত্রে কে ক্র্যাফট, অঞ্জন’স ও রঙ-এর কথা উল্লেখ করতেই হয়। প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো সুতায় বোনা টাঙ্গাইল শাড়ির প্রচলন করেন অরণ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রুবি গজনবী।
উৎপাদন পদ্ধতির বর্ণনাতেও আছে ভুল; বিশেষ করে টাঙ্গাইল শাড়ির মাড় দেওয়ার পদ্ধতি একটিও ঠিক লেখা হয়নি। প্রথমত, শাড়ি তৈরির পর মাড় দেওয়া হয় না; বরং সুতায় মাড় দেওয়া হয়। আর শাড়ি বোনার সময় প্রতি দেড় হাত পরপর মাড় দেওয়া হয়। সেটি খই আর চুনের পানি দিয়ে তৈরি মন্ড সুতার ওপর ঘষা হয়। এর আগে খেও ছাড়ানো হয় বাড়ি দিয়ে। বাঁশের যে দণ্ড দিয়ে বাড়ি দেওয়া হয়, সেটিকে খিলবাড়ি বলে।
আর সুতার ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তা হলো, রাতে সুতাকে ভালো করে ভিজিয়ে রাখা হয়। সকালে পান্তাভাত ও ভেজানো খই বেটে ভালো করে ঘষা হয়; বা বলা যায় চটকানো হয়। এ কাজ পুরুষেরা করেন। এরপর ওই সুতাকে দুই নখের মধ্যে দিয়ে টানা হয় মসৃণ করার জন্য। এটি নারীরা করেন। সুতায় মাড় দেওয়ার কারণে শ্রিংকেজ হয় না। শাড়ি বোনার সময় মাড় দেওয়ায় শাড়ি খাপে না বা শ্রিংক করে না। পাশাপাশি এই দুই পদ্ধতিতে মাড় দেওয়ার কারণে টাঙ্গাইল শাড়ি যত ধোয়া হয়, ততই উজ্জ্বল হয়। এটিই এই শাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য।
এ ছাড়া স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় বা বর্ষাকালে মাড় দেওয়া সুতা শুকাতে চায় না। এর জন্য একটি পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। এতে মূলত টানা সুতাকে ঘষা হয় নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি ডাস্টার (যেটিকে সোয়াশ বলে) দিয়ে। এই ডাস্টারে হালকা করে মাড়ের প্রলেপ দিয়ে সুতায় ঘষা হয়। এই পদ্ধতি বর্তমানে রুহিতপুরে লুঙ্গি বোনার সময় ব্যবহৃত হয়।
এমন অজস্র ভুল আর খামতিতে ভরা এই জার্নাল। এতে করে গবেষণার বা তথ্য সংগ্রহের দুর্বলতা প্রকট হয়। অথচ পরিতাপের বিষয়, এত সব ভুল নিয়ে আমরা অন্য দেশের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছি।
জিআই ও মান নিয়ন্ত্রণ: সুযোগ না চ্যালেঞ্জ?
জিআইয়ের সুবিধাভোগী বস্তুত বয়নশিল্পীরা। কিন্তু তারা কি এই জিআই সম্পর্কে ওয়াকিবহাল? এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। জিআই স্বীকৃতি বা মর্যাদা—যা-ই বলি না কেন, এটি পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর; বিশেষত তাঁত বোর্ডের তরফে কোনো উদ্যোগ কি নেওয়া হয়েছে? ব্র্যান্ডিং, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট মার্কেটিং এবং প্রোডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন নিয়ে কোনো আলোচনা, কোনো উদ্যোগ? উত্তর—সর্বৈব নেতিবাচক। ফলে টাঙ্গাইল শাড়ি যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই আছে। কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে তাঁত বোর্ড দুটি সফল হাট থাকা সত্ত্বেও নতুন একটি হাট বসানোর পরিকল্পনা করছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হতে পারে?
অথচ এই জিআই আদতেই একটি সুযোগ। কারণ, টাঙ্গাইল শাড়ির পাশাপাশি একই পদ্ধতিতে কাপড় বুনে সেটি দিয়ে পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণ ঘটানোর এবং তা সঠিক বাজারজাতকরণের সুযোগ সামনে রয়েছে। এটি চ্যালেঞ্জ ভাবলে চ্যালেঞ্জ; তবে সেটি মোকাবিলায় চাই সঠিক পরিকল্পনা। এ ছাড়া মানোন্নয়ন, আসল-নকল পার্থক্য করা এবং অপব্যবহার রোধেও জিআই স্বীকৃতি কোনো জটিলতা নয়; বরং নানামুখী সুবিধাও তৈরি করতে পারে। এসব বিষয় নিশ্চিত হলে আখেরে লাভ হবে এই বয়নশিল্পের। আর এই স্বীকৃতি সুবিধা হলো, পণ্যের দাম ২০-৩০ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হলো, এই বৃদ্ধির সুবিধা কে পাবেন—সরাসরি বয়নশিল্পীরা না মধ্যস্বত্বভোগী? বস্তুত এর দাবিদার তো বয়নশিল্পীরা। কিন্তু লাভের গুড় তো পিঁপড়া থুড়ি মধ্যস্বত্বভোগীরাই খেয়ে যান! কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেটি যাতে না হয়, তা মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের।
এখানে একটি বিষয়ের উল্লেখ প্রাসঙ্গিক, টাঙ্গাইল শাড়ির বাজারমূল্য নির্ভর করে কাঁচামালের বাজারদর, নকশার পরিমাণ, মজুরি ইত্যাদির ওপর। আবার কাঁচামালের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর হওয়ায় এর দাম স্থির থাকে না। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের হেরফের হয়েই থাকে।
আন্তর্জাতিক বাজার ও রপ্তানির সম্ভাবনা
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতায় যেসব পণ্যের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে, সেগুলোর মধ্যে টাঙ্গাইল শাড়ি একটি। ২০২৪ সালের জুনের আগে প্রতিমাসে ৬ থেকে সাড়ে ৬ লাখ শাড়ি ভারতে রপ্তানি হয়েছে। ফলে মাসপ্রতি গড়ে আড়াই লাখ ডলার আয় হয়েছে। কিন্তু স্থলপথে ভারত বেশ কিছু পণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় বর্তমানে দুদর্শায় আছে এই শিল্প খাত। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, ভারতে যেসব শাড়ি যায়, সেগুলোর দাম ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা। এসব শাড়ির একটি বড় অংশ পাওয়ারলুমে বোনা। দামি শাড়ি রপ্তানি হয় না। অথচ এই সুযোগ আমাদের আছে। শুধু ভারত নয়; শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান আর ভারতে দামি শাড়ি রপ্তানি করা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে বাস করা বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের কাছেও এই শাড়ি জনপ্রিয় করে তোলা যেতে পারে।
এ ছাড়া শাড়ির পরিবর্তে গজ কাপড় বুনিয়ে তা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করা যায়; সঙ্গে রপ্তানিও। এতে সৃষ্টি হতে পারে নতুন বাজার। এভাবে টাঙ্গাইল শাড়িকে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, জাদুঘর, ফ্যাশন উইক ও এথিক্যাল ফ্যাশন মার্কেটে পৌঁছে দিতে পারে।
সংরক্ষণ বনাম বাণিজ্যিকীকরণ
এ দুয়ের মধ্যে বিরোধ নেই; বরং কোনো ঐতিহ্য যথাযথভাবে সংরক্ষিত হলে সেটিকে ছড়িয়ে দেওয়া যায় বাণিজ্যিকভাবেই। আর এই ইতিবাচক বাণিজ্যিকীকরণের মধ্য দিয়েই কিন্তু রক্ষা হয় পরম্পরার শিল্প, হেরিটেজ এবং শিল্পী জনগোষ্ঠী। হ্যাঁ, এখানে একটি কথা থেকে যায়, এই শিল্পীরা সঠিক মজুরি পান কি না। এটি বস্তুত নির্ভর করে সঠিক নীতিমালার ওপর। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই নীতিসহায়তা প্রয়োজন। টাঙ্গাইলের কথাই ধরা যাক, এখানকার শাড়ির ঐতিহ্য বজায় রাখতে গেলে হ্যান্ডলুম এলাকার মধ্যে পাওয়ারলুম বসানো বন্ধ করতে হবে। এরই মধ্যে যেগুলো বসানো হয়েছে, সেগুলো সরিয়ে নেওয়া চাই। প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা এবং প্রয়োজনে প্রণোদনা প্রদানের পাশাপাশি কাঁচামাল সুলভ করতে হবে। এর সঙ্গে আরও আছে ডিজাইনারদের সম্পৃক্ততা এবং নতুন বাজার ও বাজার উপযোগী পণ্যের গবেষণা। একটি ডিজাইন সেন্টার এবং আঞ্চলিক জাদুঘরও করা যেতে পারে। হতে পারে যথাযথ গবেষণা।
টাঙ্গাইল শাড়িকে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, ফ্যাশন উইকেও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। সেটি শুধু শাড়ি হিসেবে। এখন আমাদের প্রয়োজন শুধু টাঙ্গাইল শাড়ি নয়; বরং অভিন্ন পদ্ধতিতে তৈরি কাপড়ের জিআই স্বীকৃতি নেওয়া। তাহলে সেই কাপড় দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্যকেও আমরা আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে যেতে পারব।
এবার আসে এথিক্যাল ফ্যাশন মার্কেটে পৌঁছানোর বিষয়। সে ক্ষেত্রে যেসব পূর্বশর্ত আছে, সেগুলো পূরণ করতে পারলেই কাঙ্ক্ষিত অর্জন সম্ভব।
আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন আর ঐতিহ্য রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় নেই। বলে রাখা ভালো, হাতে তৈরি পণ্যের উৎপাদন মেশিনে তৈরি পণ্যের সমান হবে না। এ জন্য দামও এক নয়। তবে কারিগরের সংখ্যা বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব; বাজারের চাহিদাও। সবার আগে প্রয়োজন ঐতিহ্যের বিনির্মাণ। তবেই সব সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আমরা এক ধাপ এগিয়ে আছি।
বাংলাদেশের ষষ্ঠ বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপাদান হিসেবে ‘টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প’ চূড়ান্তভাবে তালিকাভুক্ত হয়েছে ৯ ডিসেম্বর ২০২৫। ভারতের নয়াদিল্লির লাল কেল্লায় অনুষ্ঠিত ২০তম অধিবেশনে ইউনেসকোর রিপ্রেজেন্টেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটিতে (আইসিএইচ) স্থান পেয়েছে এই বয়নশিল্প। বলতেই হবে, এই স্বীকৃতি আমাদের অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। তবে চিরাচরিতভাবে বয়ন-কূটনীতির দুর্বলতার কারণে অনেক কিছুতেই পিছিয়ে পড়ি; যা কাটিয়ে ওঠার বিকল্প নেই।
তথ্যঋণ: ‘পৃথিবীর তাঁতঘর: বাংলার বস্ত্রশিল্প ও বাণিজ্য’/ সুশীল চৌধুরী, ২০১৮; ‘বাংলাদেশের তাঁতশিল্প’/ শাওন আখন্দ, দেশাল, ২০১৮; ‘টেক্সটাইল ট্র্যাডিশন অব বাংলাদেশ’/ সম্পাদনা ড. এনামুল হক, ন্যাশনাল ক্র্যাফটস কাউন্সিল অব বাংলাদেশ, ২০০৫; ‘ঢাকাই মসলিন’/ আব্দুল করিম, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ২০১০; ‘বাংলার তন্তুবায় সমাজের অতীত-ইতিহাসের সন্ধানে’/ নিলয় কুমার বসাক ও ড. দেবাশিষ মহলানবিশ, জার্নাল অব কালচারাল রিসার্চ স্টাডিজ, ভলিউম-১ ইস্যু-১, ২০২২
কৃতজ্ঞতা: ড. মাসউদ ইমরান মান্নু, অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; শাহিদ হোসেন শামীম, পরিচালক, প্রবর্তনা; রাধেশ্যাম নীলকমল বসাক, উদ্যোক্তা; রঘুনাথ বসাক, উদ্যোক্তা; নিলয় কুমার বসাক, শিক্ষক ও গবেষক
স্মরণ: মনমোহন বসাক
মডেল: আনসা, দিবা, ইলা ও মৃদুলা
মেকওভার: পারসোনা
ওয়্যারড্রোব: কিমুফারাহ
ছবি: জিয়া উদ্দীন
