বাংলাদেশি প্রতিশ্রুতিশীল ফ্যাশন ডিজাইনার সামিউল আলমের (ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি সামি আলম নামে অধিক পরিচিত) নকশায় সৃষ্টি হয়েছে ‘মহাআরঙ্গ’ (The Great Arena)। অনন্য এক নকশিকাঁথা।
নকশিকাঁথা বাংলাদেশের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এক সূচিশিল্প। প্রাচীন এই হস্তশিল্প প্রসিদ্ধ হয়েছে সূক্ষ্ম সেলাইয়ের কাজের মাধ্যমে আমাদের গ্রামবাংলার জীবন ও সংস্কৃতি তুলে ধরার জন্য।

মহাআরঙ্গ
৪৪ ফুট উচ্চতার নকশিকাঁথাটি আড়ং-এর ২৫০ জনেরও অধিক কারুশিল্পীদের ছয় মাসের নিবিড় পরিশ্রমের ফল। পুরোনো কাপড়, অব্যবহৃত পুঁতি আর ফেলে দেওয়া অলংকারের টুকরো দিয়ে সুনিপুণ কারিগরি দক্ষতায় তৈরি অপূর্ব এই কাঁথার প্রতিটি ভাঁজে যেন লুকিয়ে আছে এর শত বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের স্পন্দন ও প্রতিধ্বনি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিসূত্রে জানা যায়, ব্র্যাক-এর অন্যতম সোস্যাল এন্টারপ্রাইজ, আড়ং-এর যাত্রা শুরু হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে। ঐতিহ্য, স্থায়িত্ব আর আত্মনির্ভরশীলতাকে ধারন করে বাংলাদেশের কারুশিল্পকে গোটা বিশ্বের কাছে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে তৈরি অনন্য এই কাঁথা যেন আড়ং-এর পথচলারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

‘মহাআরঙ্গ’-এর কারুশিল্পীদের একাংশের সঙ্গে সামিউল আলম
আড়ং-এর পথচলার এই গল্পে কাঁথার নিচের অংশে দেখানো হয়েছে একটি গ্রাম, যেখানে নারীরা একত্রিত হয়ে গাছের ছায়ায় বসে নকশিকাঁথা সেলাই করছেন; যার প্রতিটি ফোঁড়ে ফুটে ওঠে তাদের দৈনন্দিন অথচ অসাধারণ সব গল্প। এই পুরো দৃশ্যে গাছ ও তার ছায়াকে একই সঙ্গে উন্নতি, শক্তি ও ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কাঁথার একই অংশে আছে একটি গ্রামের বাড়ি আর তার সঙ্গে একটি মাটির ব্যাংক, যা গ্রামীণ সঞ্চয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলে।
এমন অসংখ্য কারুশিল্পীর স্বপ্ন, আবেগ, সংগ্রাম ও নিষ্ঠার প্রতি সম্মান জানিয়ে আড়ং-এর সংরক্ষিত আর্কাইভের ছবি নিয়ে রঙিন পুঁতি ব্যবহার করে তাদের মুখাবয়ব তৈরি করা হয়েছে। কাঁথার ওপরের অংশে দেখানো হয়েছে এক সুবিশাল আকাশ, যেখানে ভোরের আলোর সোনালি আভায় জ্বলছে কারুশিল্পীদের নাম; ঠিক যেন আশা আর একতার এক নতুন সূর্যোদয়।

মহাআরঙ্গ
আড়ং শব্দের অর্থ হলো গ্রাম্য মেলা; নকশিকাঁথার এই অংশে সেই গ্রাম্য মেলার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সংরক্ষিত আর্কাইভের ছবি থেকে নিখুঁত কারুকাজে ফুটে উঠেছে সেইসকল প্রান্তিক আর্টিসানের মুখচ্ছবি, যারা যুগ যুগ ধরে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কাঁথায় আঁকা আড়ং-এর প্রতিটি কারুপণ্য যেন বাংলাদেশের হস্ত ও কারুশিল্পের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। হাসি আর রঙ্গে মাখা এই মেলার চারপাশ মুখরিত হয়ে আছে মেলায় আসা সকলের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে। আর তার ঠিক মাঝখানেই আছে একটি নাগরদোলা।
এর পরের অংশে উৎসবের আমেজে দেখা যায় জামালপুরের জোনাকিকে, যিনি মহারঙ্গ নকশি কাঁথার একজন আর্টিসান, আড়ং-এর সেই আইকনিক ব্যাগ একজন কাস্টমারের হাতে তুলে দিচ্ছেন। আড়ং-এর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দুই স্তম্ভের অপূর্ব এই সমীকরণ সৃষ্টি করেছে পারস্পারিক ঐক্যতা, উষ্ণতা ও এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক বিশেষ বন্ধন।

মহাআরঙ্গ
নকশিকাঁথাটির এই অংশে ভেসে উঠে গোধূলির আলোয় আমাদের অতি পরিচিত এক নগরীর দৃশ্যপট। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আলোকিত ভবনের প্রতিটি সেলাইয়ের আঁচর যেন সভ্যতার শিকর থেকে বেড়ে ওঠা একেকটি বটবৃক্ষ। শহরের এক প্রান্তে স্বগৌরবে নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অনন্য মিশেলে গড়ে ওঠা আমাদের চিরচেনা আড়ং আউটলেট। নাগরিক জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেই রাতের ঝলমলে আলোর মতোই আমাদের দেশীয় কারুশিল্প বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকে পরিবর্তনকে সঙ্গে নিয়ে, বেঁচে থাকে যুগের পর যুগ ধরে।
শহরের ওপরের অংশে দেখা যাচ্ছে, একজন বৃদ্ধ আর্টিসান, তাঁত বুনছেন আপনমনে। মহাজাগতিক রশ্মি ঘিরে আছে তার চারিদিকে, যেন তিনি নিজেই মহাবিশ্বের এক নক্ষত্র।

মহাআরঙ্গ
৪ তলা বিশিষ্ট বিশাল কাঁথাটির এই অংশে আছে এক অসীম মহাকাশ, যেখানে মুশরি এবং কদম, (নকশিকাঁথায় ব্যবহৃত বৃত্তাকার মোটিফ) দিয়ে তৈরি নক্ষত্রের মতো ঝলমলে চাকতি খেলা করছে পুরো ছায়াপথজুড়ে। তারই চারপাশে ভেসে বেড়ানো অসংখ্য রঙিন মাছ যেন বাংলাদেশের নদীমাতৃক প্রকৃতিরই আরেক রূপ। চাঁদের আলো থেকে সূর্যোদয়ের উষ্ণ আভায় রং বদলাতে বদলাতে তারা নতুন প্রাণের ছন্দে ছুটে চলে। মহাজগতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘ট্রি অব লাইফ’ বা জীবনবৃক্ষ। সৃষ্টির এই ঘূর্ণায়মান বলয় আবার আমাদের নিয়ে আসে আমাদের আদি উৎসে, যেখানে প্রথম ফোঁড়ে জন্ম নিয়েছিল প্রতিটি গল্প, প্রতিটি সৃষ্টি।
‘মহাআরঙ্গ’ প্রসঙ্গে ক্যানভাসকে সামি আলম বলেন, ‘মহাআরঙ্গ’ আমাদের মূল উৎসের দিকে একটি যাত্রা। এটি ছিল সম্মিলিত শক্তির বিশালতা সম্পর্কে একটি আলোকিত অভিজ্ঞতা। আমি বিশ্বাস করি, এই নকশিকাঁথা আমাদের শিকড়ের দরজা খুলে দেবে আলোকিত ভবিষ্যতের জন্য।’

‘মহাআরঙ্গ’-এর সামনে সামিউল আলম
‘আমাদের ঐতিহ্যবাহী উপায় হিসেবে নকশিকাঁথার মূল উৎপত্তি সংরক্ষণ করা এবং ফ্যাশন ও জীবনযাত্রায় আধুনিকতার একটি ভিন্ন ধারায় এটি বিকশিত হতে দেওয়া উচিত। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সংরক্ষণ ও পুনর্নবীকরণের এই সহাবস্থান এই শিল্পকে চলমান ও ক্রমবর্ধমান রাখবে,’ যোগ করেন তিনি।
এই প্রকল্পের জন্য আড়ং এবং আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সামিউল আলম।
- ক্যানভাস অনলাইন
ছবি: সামিউল আলম-এর সৌজন্যে