ত্বকতত্ত্ব I পার্বণ প্রস্তুতি
‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’। সঙ্গে নতুন যোগ—উইন্টার উইনসাম কালচার। বিয়ে, দাওয়াত, আড্ডা, কনসার্টসহ নানা উপলক্ষ। নিত্যদিনের কর্মচাপ, প্রসাধনের ওজন আর পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব তো আছেই। সব মিলিয়ে নাস্তানাবুদ ত্বক; যত্নে চাই সঠিক অনুশীলন
বাংলাদেশের মতো আর্দ্র ও দূষণপ্রবণ বায়ুমণ্ডলে ত্বক রক্ষার প্রথম লড়াই শুরু হয় প্রতিদিনের বাতাসের সঙ্গে। দিনের পর দিন সূর্যের তাপে ট্যান জমে, বাতাসে থাকা ধূলি নিঃশব্দে আঘাত করে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা স্তরে। উৎসবের আগে নিজের সেরা রূপ তুলে ধরতে গিয়ে অনেকে দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় অসংযত স্কিন কেয়ার রুটিনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু এ ধরনের হঠকারী পদক্ষেপ অনেক সময় ত্বক আরও দুর্বল করে দেয়। তাহলে উৎসবের আগে কীভাবে ত্বক ঠিক রাখা সম্ভব? মাত্র তিনটি কৌশলেই হতে পারে আধুনিক সমাধান!
থ্রি রুলস ম্যাজিক
ত্বকের প্রাকৃতিক কাজ হলো বাইরের ধুলা, দূষণ, জীবাণু এবং ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান থেকে শরীরকে সুরক্ষা দেওয়া। স্বভাবতই সবকিছু শোষণ করে না ত্বক। ফলে স্কিন কেয়ার পণ্য একবার হালকা ব্যবহার করলে তা ত্বকের উপরিভাগেই থেকে যায়। অথচ কার্যকারিতা শুরু করার জন্য ভেতরের স্তরে পৌঁছানো জরুরি। এ কারণেই স্কিন কেয়ারের সুফল পেতে দরকার একটু ভিন্ন পদ্ধতি। জনপ্রিয় একটি ধারণা হলো ‘থ্রি রুলস’; অর্থাৎ তিন ধাপে ময়শ্চারাইজার প্রয়োগ। প্রথমে হালকা করে, তারপর দ্বিতীয় স্তরে আরেকটু ভারী, আর শেষে মুখজুড়ে যথাযথ প্রলেপ। এতে ত্বক ধীরে ধীরে ময়শ্চারাইজের গুণাগুণ শোষণ করতে পারে এবং আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতাও বাড়ে। এই তিন ধাপ শেষে বাকি স্কিন কেয়ার লেয়ার করলে তা আরও ভালোভাবে ত্বকের ভেতরে কাজ করতে পারে।
মেকআপ না করা দিনে ডাবল ক্লিনজিং বিশেষভাবে উপকারী। প্রথম ধাপে ত্বকের ওপরের ময়লা ও সানস্ক্রিন পরিষ্কার হয়, পরের ধাপে দূষণ ও ঘামজনিত জমে থাকা ময়লা উঠে যায়। এতে ত্বক স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে। পরে ময়শ্চারাইজার প্রয়োগ করলে ত্বকের ভারসাম্য ফিরে আসে।
ধুলা, ধোঁয়া বা দূষণের মধ্যে বাইরে ঘোরাফেরা করলে হালকা থারমাল স্প্রিং ওয়াটার স্প্রে ত্বককে দিনে কয়েকবার আরাম দিতে পারে এবং শুষ্কতা কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত পরিষ্কার করা, যথাযথ ময়শ্চারাইজার ব্যবহারের সঠিক কৌশল জানলে ত্বক স্বাভাবিকভাবে সুস্থ, আর্দ্র ও প্রাণবন্ত থাকবে।
নিয়মিত যত্নের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে ত্বককে একটু বিশ্রাম দেওয়াও জরুরি। সেই বিশেষ দিনকে অনেকে বলেন রেস্ট ডে, যেদিন ত্বককে অযথা প্রসাধনীর চাপ থেকে মুক্ত রাখা হয়। প্রতিদিনের সেরাম, অ্যাসিড, রেটিনল বা ভারী স্কিন কেয়ারের বদলে একে ধরে নেওয়া যায় ত্বকের জন্য একটি ছুটির দিন, যখন ত্বক নিজে নিজেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার সুযোগ পায়। রেস্ট ডে শুরু হতে পারে হালকা ডাবল ক্লিনজিং দিয়ে। মেকআপ না থাকলেও প্রতিদিনের দূষণ, সানস্ক্রিন বা ঘাম ত্বকে জমে থাকে। তাই প্রথম ধাপে নরম ক্লিনজার দিয়ে ওপরের স্তর পরিষ্কার এবং দ্বিতীয় ধাপে জেল বা ফোম ক্লিনজার দিয়ে গভীর ময়লা দূর করা ত্বককে আরাম দেয়। ক্লিনজিংয়ের পর ত্বককে কিছুক্ষণ একদমই ছেড়ে রাখা ভালো। এতে ত্বক স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারে এবং অযথা টান পড়ে না।
ত্বকের বিশ্রামের দিনে ভারী বা একাধিক স্তরের স্কিন কেয়ারের দরকার নেই; বরং একটি জেন্টল, ফ্র্যাগরেন্স ফ্রি ময়শ্চারাইজারই যথেষ্ট। সেরামাইড, হায়ালুরনিক অ্যাসিড বা প্যানথেনলযুক্ত হালকা টেক্সচারের ময়শ্চারাইজার ত্বকের ব্যারিয়ার শক্ত করে, শুষ্কতা কমায় এবং সারা দিনের জন্য আরাম বজায় রাখে। তৈলাক্ত ত্বকের ক্ষেত্রে জেল বেসড, আর শুষ্ক ত্বকের জন্য মাঝারি ভারী ক্রিম বেছে নেওয়া যেতে পারে। মূলকথা হলো, ত্বক শান্ত রাখতে যতটা প্রয়োজন, ততটাই ব্যবহার করা। রেস্ট ডেতে চাইলে থারমাল স্প্রিং ওয়াটার স্প্রে দিনে দু-একবার ব্যবহার করা যায়। বাইরে ধুলা-ধোঁয়ার মধ্যে থাকলে এই স্প্রে ত্বকের জ্বালা কমাবে এবং সতেজ রাখবে। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়; শুধু আরামের জন্য ব্যবহারযোগ্য। দিনের বেলায় অবশ্যই সানস্ক্রিনের প্রলেপ দেওয়া চাই; কারণ, রেস্ট ডে মানে স্কিন কেয়ার কমানো হলেও ত্বককে সূর্যের ক্ষতি থেকে রক্ষা করা অপরিহার্য।
শিকড়ে ফেরার গান
ত্বক ভালো রাখতে মাঝেমধ্যে বেসিকে ফিরে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় আমরা বিভিন্ন স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টের মধ্যে হারিয়ে যাই; তবে আসল লক্ষ্য হলো ত্বক সুস্থ রাখা এবং অযথা চাপ না দেওয়া। বাংলাদেশের আবহাওয়ায়; বিশেষ করে ব্রণ বা ফুসকুড়ি সহজে হতে পারে; তাই যেসব ক্ষেত্রে ব্রণ শেষ মুহূর্তেও কমে না, সেখানে কিছু সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়। রাতে হালকা হাইড্রোকলয়েড প্যাচ ব্যবহার করলে ব্রণ ফুলে ওঠা কমে এবং ত্বক শান্ত থাকে। এটি ব্যবহার করা খুবই সুবিধাজনক; কারণ, রাতের মধ্যে কাজ করে এবং দিনের ধুলাবালু বা সূর্যালোকে ব্রণকে আরও ক্ষতিকর হওয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। ছোট ছোট ব্রন বা স্পটের ক্ষেত্রে স্পট ট্রিটমেন্ট ক্রিম ব্যবহার করা যায়।
ত্বকের যত্নে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক পণ্য বাছাই। যেকোনো ক্রিম বা ময়শ্চারাইজার বেছে নেওয়ার আগে লেবেল ভালোভাবে পড়া জরুরি। হালকা হলেও কার্যকর ব্যারিয়ার রিপেয়ার ময়শ্চারাইজার ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। এতে সাধারণত সিরামাইড, প্যানথেনল ও স্কোয়ালেন থাকে, যা ত্বকের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা শক্তি বজায় রাখে। এমন ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বক আরও স্থিতিশীল থাকে এবং অ্যাকটিভ ব্রণ কমানোর পণ্যের সঙ্গে নিরাপদে ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ত্বক সহজে তৈলাক্ত ও সংবেদনশীল হয়ে যায়। তাই ভারী বা তেলযুক্ত ক্রিমের পরিবর্তে হালকা, জেল বা লাইট ক্রিম ব্যবহার বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। এ ছাড়া দিনের বেলায় সূর্য এবং ধুলা-দূষণ থেকে রক্ষা পেতে সানস্ক্রিন নিয়মিত প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।
উম্মে হানী
মডেল: আসকি
মেকওভার: পারসোনা
ছবি: জিয়া উদ্দীন
