skip to Main Content

মনোযতন I লাভ বোম্বিং!

সত্যিকারের বোমার মতোই বিস্ফোরিত হতে পারে প্রেম! ছারখার করে দিতে পারে জীবন। তেমনই অদ্ভুত এক প্রেম-পরিস্থিতি এবং তা থেকে পরিত্রাণের কথা জানাচ্ছেন আবৃতি আহমেদ

প্রেম এক অদ্ভুত ঘটনা। হঠাৎ কাউকে ভালো লেগে যাওয়া কিংবা নিজেই হয়ে ওঠা কারও পছন্দের নারী বা পুরুষ। উল্টেপাল্টে যায় ভাবনাচিন্তা। একে অপরকে একটু একটু করে বুঝে উঠতে কেটে যায় সময়। স্বপ্নের মতোই অবাস্তব মনে হয় সবকিছু। প্রেমের শুরুতে সব ভালো লাগে। কিন্তু তখনই বিপদ ডেকে আনে, যখন এটি সত্যিকারের প্রেম না হয়ে রূপ নেয় প্রেমের বোমায়!
প্রেম ও সম্পর্ক নিয়ে প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এ সময়ের জেন-জিরা; অর্থাৎ এখন যাদের বয়স ১৪ থেকে ২৯-এর কোঠায়। সম্পর্কের ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিকে নাম দিতে ভালোবাসেন তারা। যেন বিষয়গুলো আরেকটু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কয়েক বছর ধরে জেন-জিদের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে ‘লাভ বোম্বিং’ শব্দবন্ধ। সরল বাংলায় ‘প্রেমের বোমা’। হঠাৎ শুনলে তা জেন-জিদের আবিষ্কার মনে হলেও ‘লাভ বোম্বিং’ প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল ১৯৭০ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে মানুষকে ঈশ্বরের ভালোবাসার প্রতি অন্ধ এবং গির্জামুখী করতে নানা কৌশল অবলম্বন করত সেখানকার গির্জাগুলো। এ প্রক্রিয়াকে বলা হতো ‘লাভ বোম্বিং’। ওই সময় পেরোলেও রয়ে গেছে কৌশলটির মূল আবহ।
পরিচয় সন্ধান
‘আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না!’, রাফির কথায় সায়মা একটু অবাকই হলেন। মাত্র এক সপ্তাহের পরিচয় তাদের। খুব একটা চেনা-জানা হয়ে ওঠেনি এখনো। একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন; একসঙ্গে দিনাতিপাত ভালো লাগে ঠিকই, কিন্তু আরও গভীর কোনো সম্পর্কের জন্য তা যথেষ্ট সময় নয়। অথচ রাফি নাছোড়বান্দা! দামি উপহার, ফুল; সঙ্গে হাজারো মধুময় প্রতিশ্রুতি। এদিকে প্রেমের সম্পর্কে এত দ্রুত এগোতে নারাজ সায়মা। এ নিয়ে খানিকটা অপরাধবোধও কাজ করে তার। সব মিলিয়ে মানসিকভাবে দিন দিন অস্থির হয়ে ওঠেন।
রাফি-সায়মার ঘটনাটি কাল্পনিক হলেও আমাদের চারপাশে এমনটা অহরহ ঘটছে। নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রেমের সম্পর্কে দ্রুত আগানোর এই তাড়না সায়মার জন্য বিপজ্জনক। আর স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত অনুভূতি প্রকাশকারী রাফির আচরণকে বলা চলে লাভ বোম্বিং।
একটু পরিষ্কার করা যাক। লাভ বোম্বিং হলো একধরনের ম্যানিপুলেশন বা কোনো ব্যক্তিকে মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণের কৌশল। মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণগত বিজ্ঞানবিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন সাইকোলজি টুডের মতে, রোমান্টিক বা আবেগতাড়িত সম্পর্কের শুরুতে কেউ যদি সঙ্গীকে মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা দেখিয়ে তার ওপর আধিপত্য বিস্তার এবং তাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন, সেই আচরণই লাভ বোম্বিং।
ব্যাপারটি আসলে কোনো অঞ্চলে বোমা ফেলার মতো। তবে এ ক্ষেত্রে বোমা পড়ে মানুষের মন ও মস্তিষ্কে। সত্যিকারের বোমার মতোই মারাত্মক এর প্রভাব; ক্ষতি করতে পারে মানসিক স্বাস্থ্যের। সম্পর্কে সাধারণত একজন অন্যজনকে লাভ বোম্ব করেন। আবার, কোনো কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে দুজনই দুজনকে লাভ বোম্ব করতে পারেন। অনেকে একে বলে প্রেমের ফাঁদ।
শিকার ও শিকারি দ্বৈরথ
যিনি লাভ বোম্ব করেন, তিনি মূলত অন্যকে নিজের ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ এবং জোর করে বিশ্বাস ও ভালোবাসা আদায় করতে চান। সময় নিয়ে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিবর্তে অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার তার একমাত্র উদ্দেশ্য। বেশির ভাগ লাভ বোম্ব করা ব্যক্তি ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক। নিজেকে অন্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। সহজে অধৈর্য হয়ে পড়েন। কোনো কিছু পাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করেন। নিজের ইচ্ছাপূরণে তার পক্ষে যেকোনো কিছু করা সম্ভব! শুধু প্রেম বা আবেগতাড়িত সম্পর্কেই এমনটা ঘটে, তা নয়। কখনো কখনো সামাজিক, পারিবারিক বা ধর্মীয় কোনো গোষ্ঠীতে যুক্ত করার জন্যও লাভ বোম্ব করা হতে পারে।
সম্পর্কের শুরুতে, অন্যকে অতিরিক্ত আবেগ ও ভালোবাসার কথা বলেন লাভ বোম্বকারী। ক্রমাগত প্রশংসা করতে থাকেন; কারণ ছাড়াই উপহার দেন এবং প্রতি মুহূর্তে যোগাযোগ ধরে রাখেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে দিয়ে বসেন নানা প্রতিশ্রুতি। ব্যাপারগুলোকে অবিশ্বাস্য মনে হয়। মনে হয়, যেন আত্মার সঙ্গী। এমন পরিস্থিতিতে ভাবনাচিন্তা না করেই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন অনেকে।
সম্পর্ক হওয়ার পর, লাভ বোম্বকারী হয়ে ওঠেন সম্পর্কের নিয়ন্ত্রক। তার আচরণেও আসে ব্যাপক পরিবর্তন। ক্রমাগত প্রশংসা বদলে যায় নিরন্তর সমালোচনায়। কোনো কিছু নিজের মনের মতো না হলেই রেগে যান। কারণে-অকারণে দোষারোপ করতে থাকেন। তখন ভুক্তভোগী আর নিজের মতো ভাবতে পারেন না। বাস্তবতা নিয়ে তার মনে সন্দেহ তৈরি হয়। এই অবস্থাকে বলে গ্যাসলাইটিং। অর্থাৎ, ভুক্তভোগীকে নির্যাতনকারী নিজের সুবিধামতো পরিচালনা করেন।
পরিণতি, ভুক্তভোগী নিজের আবেগ ও অনুভূতি নিয়ে সন্ধিহান হয়ে নানা প্রশ্ন তুলতে শুরু করলে, লাভ বোম্বকারী নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় পান। প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সমস্যার জন্য ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করতে থাকেন। এমনকি সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চালান। এতে ভুক্তভোগী বিভ্রান্ত, মূল্যহীন এবং মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বোধ করে। এই অবস্থায় লাভ বোম্বকারী সহজে বেরিয়ে যেতে পারলেও ভুক্তভোগী পড়েন সীমাহীন কষ্টে। অনেক সময় এভাবেই চলতে থাকে সম্পর্কগুলো।
লাল পতাকা
মনস্তত্ত্বের ভাষায়, এটি একধরনের ইচ্ছাকৃত ও কৌশলগত আচরণ। তবে হেলথ সাময়িকীতে মনোবিদেরা দাবি করেছেন, সম্পর্কের শুরুতে নতুনের উত্তেজনায় অনেকে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তখন মনের অজান্তে অন্যকে লাভ বোম্ব করেন। তাই শুরুতে কেউ অতিরিক্ত ভালোবাসা দেখালেই সেটি লাভ বোম্বিং হবে, তা কিন্তু নয়। ব্যাপারটি লাভ বোম্বিং কি না, বুঝতে কয়েকটি আচরণগত রেড ফ্ল্যাগ খেয়াল করতে পারেন।
 পরিচয়ের অল্পদিনেই দ্রুত সম্পর্কে যাওয়ার প্রয়াস চালানো এবং সামনের মানুষটির অনুভূতিকে গুরুত্ব বা সম্মান না দিয়ে বারবার সম্পর্ক গভীর করার ইচ্ছা প্রকাশ করা;
 সারাক্ষণ কথা বলতে এবং প্রতি মুহূর্তের খবর জানতে চাওয়া; অপরজন কথা বলতে না চাইলে বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হওয়া;
 অতিরঞ্জিত, বিলাসবহুল এবং অনাকাঙ্ক্ষিত উপহার দেওয়া;
 বিয়ে, সংসার, সন্তান তথা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে নিরন্তর কথা বলা এবং প্রতিশ্রুতি দেওয়া;
 সঙ্গীকে তার অন্য বন্ধুবান্ধব ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে দোষী সাব্যস্ত করা এবং সঙ্গীর পুরো সময়কে শুধুই নিজের জন্য বরাদ্দের প্রয়াস চালানো;
 সময়ের সঙ্গে সঙ্গীর ব্যক্তিগত সীমানা উপেক্ষা করা এবং তার মতামতকে সম্মান না দিয়ে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া।
ভুক্তভোগীর মন
প্রতিটি সম্পর্কের অনুভূতিই আলাদা। অভিজ্ঞতাও তা-ই। তবে লাভ বোম্বিংয়ের শিকার ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে একই রকম অনুভূতির মধ্য দিয়ে যান। প্রথমে ভুক্তভোগী নিজের মনের সব সুরক্ষা দেয়াল সরিয়ে নেন। দ্রুতই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন লাভ বোম্বকারীর ওপর। আবেগের মাধ্যমে পরিচালিত হতে থাকেন। সম্পর্কের সব সমস্যার জন্য নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করেন। বিভ্রান্ত, বিচ্ছিন্ন ও ক্লান্তি বোধ করেন। সব ধরনের মানসিক, এমনকি শারীরিক নির্যাতন উপেক্ষা করে একরকম জোর করে এমন একটি সম্পর্ক ধরে রাখতে চেষ্টা করেন, যা শুরুতে হয়তো তিনি করতেই চাননি।
মোকাবিলা
শুরুতেই একসঙ্গে কতটা সময় কাটাতে চান এবং কত ঘন ঘন যোগাযোগ করবেন, তা নিজে ভেবে নির্ধারণ করতে পারেন। আবেগের তাড়নায় সম্পর্কে দ্রুত না জড়িয়ে সময় নেওয়া শ্রেয়। বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন—এমন কারও পরামর্শ নিতে পারেন। উদ্বেগ প্রকাশ করলে কিংবা সীমানা নির্ধারণ করে দিলে তা নিয়ে সঙ্গীর প্রতিক্রিয়া দেখা জরুরি। একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক সঙ্গী আপনার অনুভূতিকে সম্মান করবে। অন্যদিকে, একজন লাভ-বোম্বকারী ব্যক্তি রাগান্বিত ও আত্মরক্ষী হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতিতে নিজের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। কারও আচরণ আপনার মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের কারণ হলে তা এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। বিশেষ প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হতে পিছপা হবেন না, প্লিজ!

ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back To Top